রম্য

গরুর হাটে একদিন

গতকাল গরুর হাটে গিয়ে হঠাৎ আমার আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেল। কেন? কারণ আর কিছুই না, বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সব কবিদের গরুর হাটে ঘোরাঘুরি করতে দেখে। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম।

প্রথমেই দেখা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাথে। তিনি তখন চিন্তিত চোখে একটা নধরকান্তি গরুর দিকে তাকিয়ে দাড়ি চুমরোচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলামঃ

“আরে গুরু! আপনি এই গরুর হাটে?”

কবি জবাব দিলেনঃ

“সারা দিন ধরে বহু হাট ঘুরে
ব্যথা করি ঠ্যাং গরু ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে
খাইয়াছি কিছু আচমকা গুতা
ব্যথা হইয়াছে অঙ্গ
তাই ভাবিতেছি চিন্তিত মনে
এই গরুখানা যদি দামে বনে
তাহলে কিনিব, না হয় এবার
রণে দিয়া দিবো ভঙ্গ।”

বুঝলাম, কবি এবার গরু কিনেই ছাড়বেন। তাকে দামাদামির সুযোগ করে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। কয়েক পা না যেতেই এবার বিদ্রোহী কবি নজরুলের সাথে দেখা। তিনি তখন ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দুলিয়ে পাইকারের সাথে তর্ক করতে ব্যস্ত। চুপি চুপি গিয়ে একটু দূরেই দাঁড়ালাম। বলা তো যায় না, বিদ্রোহী কবি বলে কথা। উত্তেজনার বশে যদি চড়চাপড় চালিয়ে দেন! তবে কবি তখন কোনদিকে না তাকিয়ে উদাত্ত গলায় বলে চলেছেনঃ

“ব্যাটা চোর!!

ব্যাটা পাইকার তুই মহা শয়তান
মন চায় তোর ধরি দুই কান
ঠাস ঠাস দুই চটকানা দিলে
বিবেকবুদ্ধি যদি কিছু খোলে
আকাশ্চুম্বী দাম হাঁকিবার শখ যদি যায় তোর!
গরুর দামেতে ছাগল বিকোবি, হাটখানা বুঝি শ্বশুরের বাড়ি তোর?!”

কবির এই রুদ্রমুর্তি দেখে আর কিছু বলার সাহস পেলাম না। কেটে পড়ার জন্য আলগোছে ঘুরে দাঁড়িয়ে পা বাড়াতে যাবো, হঠাৎ একজনের সাথে ধাক্কা লেগে গেল। দেখি, বরিশালের সেই বিষন্নতার কবি, জীবনানন্দ দাস! প্রশ্ন করলামঃ

“আরে, জীবন’দা! কি খবর? গরু টরু কিছু কেনা হলো?”

জীবনানন্দ বিষণ্ণ চোখ মেলে তাকিয়ে জবাব দিলেনঃ

“বিগত সপ্তাহ জুড়ে আমি পথ হাটিতেছি কুরবানীর হাটে
গাবতলী থেকে শুরু করে রহমতগঞ্জ ও গনিমিয়ার মাঠে
অনেক ঘুরেছি আমি, স্বাস্থ্যবান ও সুপুষ্ট গরুর খোঁজেতে
সেখানে ছিলাম আমি, আরও দূর দূরান্তে গরুর বাজারে
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে কত গরু হইতেছে লেনদেন,
তবু কেনা হয় নাই গরু, শোনা হয় নাই – কত দিয়ে কিনলেন?”

কবির বিষণ্ণ কথা শুনে আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। তাই আস্তে করে ঘুরে দাড়ালাম, আজ আর গরু কিনতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু শেষ চমকটা অপেক্ষা করছিল হাট থেকে বের হওয়ার রাস্তায়। সেখানে দেখি আধুনিক কবিতার অন্যতম দিকপাল হেলাল হাফিজ দাঁড়িয়ে আছেন! এবং তার হাতে ধরা রয়েছে বিশালাকায় এক ষাঁড় গরুর দড়ি! যাক, অবশেষে একজনকে পাওয়া গেল যিনি গরু কিনতে সক্ষম হয়েছেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলামঃ

“হাফিজ ভাই, কত দিয়ে কিনলেন?”

কবি একটু উদ্ভ্রান্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। বললেনঃ

“কোনো কোনো গরু আছে ক্রেতাকে দেউলিয়া হতে হয়। 
কেউ যদি গরু কিনে দেউলিয়া হতে চান
তবে তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়!
এখন যৌবন যার গরু কিনতে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়,
এখন যৌবন যার দেউলিয়া হওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *