ছোট গল্প রম্য

শমশের বখশ এবং একটি প্রতিবেদন

টাইম মেশিনের দরজা খুলে বেরোতেই নাকে মুখে ধুলোর ঝাপটা খেয়ে খকখকিয়ে কেশে উঠল শমশের বখশ। যে সময় থেকে সে এসেছে, অর্থাৎ ২৩১৩ খ্রীষ্টাব্দ; সেখানে ধুলোবালি ময়লা আবর্জনার চিহ্ন নেই বললেই চলে। শমশেরকে তাই এখানে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা বেগ পেতে হল।


প্রফেসর হাওলাদার অবশ্য আগেই তাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের জাদুকর প্রফেসর হাওলাদার। আর তার যোগ্য শিষ্য হচ্ছে শমশের। টাইম মেশিনটা প্রফেসরেরই তৈরি।
প্রফেসর তাকে বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে একটা বিশেষ অনুরোধ এসেছে।তিনশ বছর আগের বাংলাদেশ নিয়ে একটা দলিল তৈরি করে দিতে হবে। আর দেশের একমাত্র টাইম মেশিনের মালিক যেহেতু এই মূহুর্তে প্রফেসর হাওলাদার, সেহেতু এ কাজের জন্য তার চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই। কিন্তু বয়স হয়ে গেছে, এখন আর আগের মত শক্তি নেই গায়ে। তার হয়ে তাই শমশেরকেই আসতে হয়েছে।

আপাতত প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়ে সামনে এগোল শমশের। যে জায়গায় মেশিনটা তাকে নিয়ে এসেছে সেটা দেখে মনে হচ্ছে রাজপথ। তবে এখন জনমানবহীন, হয়তো সময়টা এখন ভোর বলে।আবছা আলোয় টাইম মেশিনটার দিকে ভাল করে তাকাল শমশের। একুশ শতকের লোকজন টাইম মেশিন দেখে যাতে ভয় না পায় সেজন্যে প্রফেসর হাওলাদার এটার ডিজাইন করেছেন বাসের মত করে। বাস নাকি এই শতকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হিসেবে খুবই জনপ্রিয় ছিল। বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে এটা অন্য কিছু হতে পারে।
যতটুকু জানা গেছে তাতে এই সময়টায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ থাকার কথা। তবে দেখে শুনে তেমন কিছু তো মনে হচ্ছে না, ভাবল শমশের। ইতিহাস জিনিসটা এমনিতেও তার কাছে বোগাস মনে হয়। ফিরে গিয়ে প্রতিবেদনে লেখার কিছুই থাকবে না বোধহয়।
কানে লোকজনের হইহল্লার আওয়াজ পেতে শমশের ঘুরে তাকাল। আট দশ জন লোক এক সাথে স্লোগান দিতে দিতে এদিকেই আসছে। এদের সাথে কথা বললে কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে,ভাবল সে।
লোকগুলো তার কাছে চলে আসতে শমশের খেয়াল করল সবার চকচকে চোখ তার টাইম মেশিনের দিকে। কেউ কেউ দাত বের করে হাসছে।
মিছিলের পেছন থেকে একজন হাতে একটা বড় প্লাস্টিকের পাত্র নিয়ে এগিয়ে এল, পাত্রটা থেকে কিছু একটা তরল টাইম মেশিনের গায়ে ছিটাতে শুরু করল সে। একটা ঝাঁঝালো গন্ধ পেল শমশের। কিছুই মাথায় ঢুকল না তার। আরে আরে, কি করছেন আপনারা?’ বলতে বলতে লোকগুলোর দিকে ছুটে গেল সে।
বাকি লোকগুলো এতক্ষণ বাসের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন শমশেরকে দেখিয়ে বলল, ‘বাসটা মনে হয় এই হালার। ওই, অরে ধর। বাসের মইধ্যে ভইরা দরজা লাগায়া দে।
বাধা দেয়ার আগেই শমশের দেখল তাকে তার টাইম মেশিনের ভেতর ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জানালার বাইরে একজন তার দিকে তাকিয়ে আবার হাসল, লোকটার হাতে একটাম্যাচের কাঠি জলে উঠেছে। কাঠিটা ঝাঁঝালো তরলে ভেজা বাসের সীটে ছেড়ে দিল সে। দপ করে আগুন জ্বলে উঠল, চোখের পলকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল বাসের ভেতর।
শমশের হা করে তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ। গায়ে আগুনের ছ্যাকা খেয়ে সম্বিৎ ফিরে পেতে ছুটে গিয়ে ২৩১৩ সালে ফিরে যাওয়ার বোতামে চাপ দিল সে।

***************************************
প্রফেসর হাওলাদার তার ল্যাবের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরিচিত গুঞ্জনের মত শব্দে চমকে উঠলেন তিনি। এত তাড়াতাড়ি তো শমশেরের ফিরে আসার কথা নয়? তড়িঘড়ি করে ল্যাবের ভিতর ঢুকতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে তার টাইম মেশিনের গায়ে। তবে প্রফেসর দিশা হারালেন না। ল্যাবে এ ধরণের সমস্যায় প্রায়ই পড়তে হয় তাকে। একটা বোতামে চাপ দিলেন তিনি, সাথে সাথে তরল কার্বন ডাই অক্সাইডের ধারা বিভিন্ন দিক থেকে এসে আগুনটা নিভিয়ে দিল।
শমশের বেরিয়ে এল এবার। কালিঝুলি মেখে রীতিমত পাগলের মত দেখাচ্ছে তাকে। স্যার, এই নিন আপনার প্রতিবেদন।হাপাতে হাপাতে পোড়া টাইম মেশিনটার দিকে আঙুল তুলে দেখাল সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *