ছোট গল্প রম্য

আমাদের মেসে একজন সেলিব্রিটি থাকে

রাসেল আমার মেসের ছোটভাই। একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। গোলগাল ভালমানুষ চেহারা, নাকের উপর বসানো ভারী ফ্রেমের চশমা। থ্রী কোয়ারটার প্যান্ট আর টিশার্ট নিত্য সঙ্গী।

তবে রাসেলের সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে সে একজন সেলিব্রিটি। যেনতেন না, ফেসবুক সেলিব্রিটি। ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্ট তিনবছর আগেই ফুল হয়ে গেছে, এখন ফলোয়ারের সংখ্যাও ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে প্রায়। সারাদিন বিছানায় বসে বসে মোবাইল না হয় ল্যাপটপে ফেসবুকে পড়ে থাকে। খাওয়া আর ঘুম বাদে বাকি পুরো সময়টাই তাকে অনলাইনে পাওয়া যায়।

একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ফেসবুকে এত সময় দিলে লাইফ চলবে কিভাবে?

রাসেল সাথে সাথে জবাব দিল, ভাইয়া কি করব বলেন। আমার এই একাউন্টটা তো এখন নর্মাল কিছু না, একটা বিশাল অর্গানাইজেশন। হাজার হাজার মানুষ এখানে যাওয়া আসা করে, নানা প্রশ্নের জবাব চায়। একটা স্ট্যাটাস লিখতে অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করা লাগে, কমেন্টের জবাব দেওয়া লাগে। সবার জবাব দেওয়া যায় না, সেটাও ঠিক করে রাখতে হয়। সব মিলিয়ে ভাই বিশাল ঝামেলার কাজ।

তাই নাকি? বল কি! আমি তো ভেবেছিলাম ফেসবুক চালানো খুবই সহজ। আমাদের কাজের বুয়াও তো ফেসবুক চালায়, সেদিন আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। অবাক হয়ে বললাম আমি।

নাক মুখ কুঁচকে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়ে আসল রাসেল। হ্যাহ, ওদের চালানো আর আমার চালানোর মাঝে পার্থক্য আছে ভাই।
তার মুখের ভাব দেখে আমি আর কিছু বলার সাহস পেলাম না।

কপাল ভাল রাসেলের ফ্রেন্ড লিস্টে শুরুর দিকেই জায়গা করে নিয়েছিলাম। এখন রিকোএস্ট পাঠালে একসেপ্ট করত কিনা কে জানে! কিন্তু আমাদের কারও স্ট্যাটাস বা ছবিতেই রাসেল একটা লাইক দেয় না, কমেন্ট তো দুরে থাকে। একদিন আমরা রাসেলকে চেপে ধরলাম। রাসেল, তোমার সমস্যা কি? আমাদের আপডেটে লাইক কমেন্ট দাও না কেন?

রাসেল বিজ্ঞ একটা ভাব নিয়ে বলল, ভাই বোঝার চেষ্টা করেন। আমি এখন ফেসবুকে কি করি না করি সেটা আমার হাজার হাজার ফ্রেন্ড প্লাস ফলোয়াররা দেখতে পায়। আপনার ছবিতে একটা লাইক দিলে সেটা ওরাও দেখবে, ফলে রাতারাতি আপনার একাউন্টে লাইক কমেন্টের সংখ্যা বেড়ে যাবে। তখন আপনারাও সেলিব্রিটি হয়ে যাবেন। এক বনে যেমন দুই বাঘ থাকতে পারে না, তেমন এক মেসেও দুই সেলিব্রিটি থাকতে পারে না।

রাসেলের কথা শুনে আমরা অবাক হয়ে গেলাম। সত্যিই তো, এভাবে তো আমরা চিন্তা করিনি! তখন বুঝলাম রাসেল কেন সেলিব্রিটি, আর আমরা কেন আম ফেসবুকার!

তবে এই ঘটনার পর ঝামেলা বাধল আরেক জায়গায়। আমাদের মেসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ যে সদস্য শাহরিয়ার ভাই, তার খুব ইচ্ছা ফেসবুকে বিখ্যাত হওয়ার। জাতীয় থেকে মাস্টার্স পাশ করেও তিন বছর বেকার বসে আছেন। সময় এবং বয়স তো আর থেমে থাকে না, তিনি মাথার টাক এবং পেটের ভুড়ির দ্রুত বর্ধনশীল অবস্থা নিয়ে খুবই চিন্তায় থাকেন। বিয়ে করতে হবে না! ফেসবুকে কত সুন্দরী দের নক করেছেন, কেউ পাত্তা দেয়নি। অথচ রাসেল প্রতি রাতেই এক হাতে চ্যাট আর আরেকহাতে মোবাইল সামলে কুল পায়না।

তাই যেদিন শাহরিয়ার ভাইকে রাসেলের সাথে বসে গুজুরগুজুর করতে দেখলাম সেদিনই সন্দেহ হল। হঠাৎ দেখি শাহরিয়ার ভাই রাসেলের হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট গুজে দিচ্ছেন। কি কাহিনী! হাড়কিপটে শাহরিয়ার ভাই এভাবে টাকা বিলাচ্ছে কেন?

কাহিনী পরিষ্কার হল রাতে। শাহরিয়ার ভাইয়ের hi vondora, gebona ato kostho kanu স্ট্যাটাসে যখন রাসেলের লাইক দেখলাম তখনই বুঝে গেলাম কি হয়েছে। আর সকাল হতে না হতেই শাহরিয়ার ভাইয়ের স্ট্যাটাসে চারশ সাড়ে চারশ লাইক পড়ে গেল। শখানেক মানুষ তাকে কমেন্টে সমবেদনা জানাল। তার ভেতর সুন্দরী ললনা ছিল কয়েকজন!

এর কয়েকদিন পর রাসেলের রুমের দরজায় একটা নতুন সাইনবোর্ড দেখে আমরা চমকে উঠলাম। সেখানে লেখা- লাইকঃ ৫০০ টাকা, কমেন্টঃ ১০০০ টাকা, শেয়ারঃ ১৫০০ টাকা (শর্তসাপেক্ষ), ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টঃ২০০০ টাকা।

সবাই মিলে রাসেলের কাছে গেলাম। কি ব্যাপার রাসেল?
রাসেল বত্রিশ দাত বের করে বলল, ভাই, ফেসবুক তো অনেক চালালাম ফাও ফাও। এবার এইটাকে একটু প্রোডাকটিভ কাজে লাগানোর সময় আসছে। তাই এই সাইনবোর্ড লাগালাম, আমার বর্তমান রেট। ইচ্ছা আছে ফলোয়ার সংখ্যা এক লাখ ছাড়ালে রেটটা দ্বিগুন করে দিব। আর সামনের মাসে আমার নামে একটা ফেসবুক পেজ খুলব, আপনাদের ভেতর কেউ এডমিন হতে চাইলে বলেন। উপযুক্ত বেতন দেয়া হবে। সাথে বাৎসরিক ভাতা, ঈদ বোনাস।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রাসেলের সেলিব্রিটি বানানোর ব্যবসা ভালোই চলছে। প্রতিদিন অনেকেই এসে লাইক কমেন্ট কিনে নিয়ে যায়। এমনকি আমাদের কাজের বুয়ার রান্নাও হঠাৎ ভাল হয়ে গেছে, গোপন সূত্র জেনেছি সেলিব্রিটি বানিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে রাসেল বুয়ার কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতিই আদায় করে নিয়েছে।

ভাবছি রাসেলের পেজের এডমিনের দায়িত্বটা আমিই নেব। কি দরকার ফাও ফাও ফেসবুকে সময় নষ্ট করার! আর এভাবে চলতে চলতে যদি একদিন সেলিব্রিটি হয়েই যাই, সেদিন নাহয় আমিও একটা ব্যবসা খুলে বসব!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *