ছোট গল্প রম্য

রবীন্দ্রনাথের একাল সেকাল

বিরক্ত চোখে ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিল রবী। গত এক সপ্তাহে কবিতা, গল্প আর কয়েকটা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত রূপ নোট আকারে ফেসবুকে ছাড়ার পরেও কোনটাতেই দশ খানার বেশি লাইক পড়ে নাই। তার ভিতর আবার জ্যোতিদা, আর বউঠানের কাছ থেকেই এসেছে দুটো। রবীর কবিতার একনিষ্ঠ এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র স্বঘোষিত ভক্ত বউঠান। জ্যোতিদা অবশ্য সুযোগ পেলেই কবিতার মান নিয়ে ঠাট্টা করে, তবে বউয়ের পাল্লায় পড়ে নিশ্চয়ই লাইকটা দিতে বাধ্য হয়েছে।
হঠাৎ টুং করে নোটিফিকেশনের শব্দ এল। সচকিত হয়ে সেটা ওপেন করল রবী। তার বাবা দেবেন্দ্রনাথ তার একটা কবিতায় কমেন্ট করেছেন! কি না কি লিখেছেন এই ভেবে স্ট্যাটাসে গেল সে।
দেবেন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ

প্রিয় পুত্র, এই বিশাল জমিদারীর ভার আমি কার হাতে দিয়ে যাব? তোমার দাদা একটা অপদার্থ বিশেষ। তুমিও সেই পথেই ধাবমান। কাব্য লিখে পেট চলে না তা এতদিনে তোমার বোঝা উচিত ছিল। যাই হোক, তোমার কাব্যখানা পড়লাম। অতিশয় নিকৃষ্ট মানের অখাদ্য হয়েছে। এসব ছাইপাঁশ উদগীরন বাদ দিয়ে কাল থেকেই ঠাকুর গ্রুপ অভ ইন্ডাস্ট্রীজ এর মতিঝিল অফিসে জয়েন করবে। না হলে তোমার ল্যাপটপ আমি বাজেয়াপ্ত করব। ইতি তোমার পিতা।

ঘ্যাস ঘ্যাস করে দাড়ি চুলকে নিয়ে কিছুক্ষণ হা করে চেয়ে রইল রবী। তারপর তার মনে হল, ঠিকই আছে। যে কবিতা লিখে লাইক পাওয়া যায় না তা লিখে কি হবে? ওদিকে ওপাড়ার কোন কুরুক্ষেত্র কুদ্দুস আর দুর্বিনীত দবির নামে দুই ফেবু সেলেব চব্বিশ ঘণ্টায় আটচল্লিশ স্ট্যাটাস প্রসব করে, ছিয়ানব্বই হাজার লাইক পায়। বউঠান বলেছেন তাদের কবিতার তুলনায় রবীর লেখা অনেক উঁচু স্তরের। রবী যে একদিন দবিরের স্ট্যাটাসে বউঠানের আবেগে গদগদ কমেন্ট দেখেছিল তা আর বলেনি। কি দরকার!

ঠিক আছে। পিতার কথামতই কাজ হবে। এই ভেবে বাবার কমেন্টটা কপি করে নিল সে। তার নিচে লিখলঃ প্রিয় বন্ধুরা! আবেগভারাক্রান্ত মনে জানাইতেছি যে আজ আমার পিতৃদেব আমার এক স্ট্যাটাসে এহেন মনের ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন। তাই আমিও সিদ্ধান্ত নিয়াছি যে আর ফেবু চালাইব না। তুমরা কেউ আমাকে লাইক দাও নাই, কমেন্ট দাও নাই। লাইককমেন্টবিহীন এই নীলাভ ফেবু দুনিয়া আমার কাছে বিষবৎ পরিত্যাজ্য মনে হইতেছে। যাইবার প্রাক্কালে তোমাদের জন্য আমার শেষ কাব্যঃ

ফেসবুকের মাঝে মারিলাম স্ট্যাটাস
লাইক নাই, ওরে, লাইক নাই
কতজনে লাইক করিলাম দান,
কমেন্ট নাই, তবু কমেন্ট নাই!!

এই সট্যাটাস দিয়েই রবি বিছানায় পাশবালিশ চেপে ধরে মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে লাগল অদ্ভুত সুন্দর এক মেয়ে তার হাত ধরে কবিতা শোনার জন্য পীড়াপিড়ি করছে। মেয়েটার মুখটা দেখা যায় না।

ঘুম থেকে ওঠার পর রবীর মনে হল, একাউন্টটা ডিএক্টিভেট করা দরকার। আবার ফেবুতে ঢুকল সে, সাথে সাথে তার চক্ষুস্থির হয়ে গেল! তার লাস্ট স্ট্যাটাসে কয়েক হাজার লাইক পড়ে গেছে। কয়েকশ কমেন্ট আর রিকু। আর তার বেশিরভাগই এসেছে সুন্দরী সব মেয়েদের কাছ থেকে।

আনন্দে তখনই তিন পাক নেচে নিল রবী। অবশেষে তার প্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন হতে শুরু করেছে!

এক বছর পর।
রবী এখন দেশের সবচেয়ে বড় ফেবু সেলেব। তার “ফ্রেন্ডচ, ইয়ে করে এনু” টাইপ স্ট্যাটাসেও ভক্তবৃন্দ আবেগের ঝড় বইয়ে দেয়। দারুন সুন্দরী এক বালিকা, এঞ্জেল মৃনালিনীর সাথে এখন তার অহোরাত্র গুটুর গুটুর চলে। রবী রাতে মৃনালিনীর সাথে চ্যাট করে, আর সেই সব কথা নিয়ে দিনের বেলায় কবিতা লেখে। দেবেন্দ্রনাথ রবীর ল্যাপটপ ঠিকই বাজেয়াপ্ত করেছিলেন, কিন্তু বউঠান তার হাতের বালা বেচে রবীকে একখানা নতুন চকচকে ম্যাকবুক কিনে দিয়েছে। রবীও তার প্রতিদান দিয়েছে বউঠানকে নিয়ে তিন খানা কাব্য লিখে ফেলে!

তবে একটা ব্যাপার রবীর মাথায় ঢোকে না। মৃনালিনী প্রায়ই জানতে চায়, ঠাকুর গ্রুপ অভ ইন্ডাস্ট্রিজ এর অফিসে সে কবে থেকে বসবে! অফিসে বসতে শুরু করলে যে রবীর কাব্যপ্রতিভা বিকশিত হওয়ার কোন পথ পাবে না, তা কি মেয়েটা বোঝেনা?

(এই লেখাটি সম্পূর্ণ অলসমস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত। জীবিত, মৃত বা ভবিষ্যতে জন্ম নেবে এমন কারও সাথে মিলে গেলে তা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র!)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *