প্রতিক্রিয়া রম্য

আমার সিনামা দর্শনের অভিজ্ঞতাঃ বিষয়- বাংলার রাজনীকান্ত

গত কয়েকদিন ধরিয়া নানাবিধ চিন্তা ভাবনা লইয়া আমার মাথা কিঞ্চিৎ ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। এহেন অবস্থায় নিজেকে ভারমুক্ত করিতে কিছু বিনুদুন আবশ্যক বলিয়া সিদ্ধান্ত লইলাম। কিন্তু বহু ভাবিয়াও বিনুদুনের কোন যুতসই উপায় ঠিক করিতে না পারিয়া গুগল মামুর দ্বারস্থ হইতে হইল। মামুর পেটের ভিতর “নির্ভেজাল বিনুদুন” লিখিয়া সার্চাইতেই মামু দুইখানা রেজাল্ট হাজির করিল। ‘ছাকিব খান’ এবং ‘বাংলা সিনামা’।

মনে মনে গুগল মামুকে এই উপকারের জন্য শতকুটি ধইন্যবাদ জানাইয়া আমারই মতন আরও কিছু বিনুদুন পাগল ইয়ার খুজিয়া লইলাম। এই মুহুর্তে ছাকিব খানের কোন ফিলিম চলিতেছে কিনা সেই বিষয়ে কিছুটা সন্দেহ ছিল, কিন্তু পরক্ষনেই ভাবিলাম এই দেশে এমন কোন সপ্তাহ থাকে না যে সপ্তাহে ছাকিব খানের কোন ফিলিম মুক্তি পায় না। বাংলার রজনিকান্ত বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না!

সুতরাং সবাই মিলিয়া সিনামা হলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিলাম। আসিয়াই দেখি আমার অনুমান মিথ্যা হয় নাই, সিনামা হলের সামনে ছাকিব খানের রাগান্বিত চেহারা সম্বলিত বিশালাকায় কয়েকখানা বিলবোর্ড সদর্পে অবস্থান করিতেছে। সিনামার নাম ‘এক মন এক প্রাণ।’ যদিও সিনামার নামের তাৎপর্য সিনামার পোস্টার দেখিবার পরে কিছুতেই মাথায় ঢুকিল না। কারন ছাকিব খান ভাইজান পোস্টারের দুই পাশে দুই নায়িকাকে জড়াইয়া ধরিয়া দাড়াইয়া আছেন। সেই তাৎপর্য বুঝিলাম আরও পরে।

যাই হোক, আর বিলম্ব না করিয়া আমরা টিকিট কাটিয়া হলে প্রবেশ করিলাম। ঢুকিয়া দেখি সিনামা শুরু হইয়াছে। তড়িঘড়ি করিয়া সীট খুজিয়া বসিয়া পড়িলাম, তাহার পরে চোখ রাখিলাম পর্দার দিকে।
পর্দার দৃশ্য দেখিয়া বুঝিতে পারিলাম ছাকিব খান এইখানে হবু ডাক্তারের ভুমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছেন, অর্থাৎ তিনি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। ক্লাসে প্রফেসর উপস্থিত, এবং নায়ক মহাশয় তাহাকে তীব্র নায়কোচিত বাক্যবানে ঘায়েল করিয়া চলিয়াছেন। তাহার এই ফুলস্পীড বক্তৃতার কারন বুঝিলাম তখন, যখন দেখিলাম দুই দুইখানা সুন্দরী ললনা তাহার পাশে বসিয়া আছে। মনে মনে ভাবিলাম, হু হু বাবা, পাশে এমন ললনা থাকিলে মফিজও তাহার মুখের খোশবাইয়ের কথা ভুলিয়া রবীন্দ্রসংগীত গাইতে শুরু করিত, আর তুমি তো ছাকিব খান!

এতক্ষণ দৃশ্য দেখিতে গিয়া সংলাপে মন দিতে পারি নাই। এইবার দিলাম। কিন্তু দুই তিনটা কথা শুনিয়াই আমার কেমন জানি খটকা লাগিয়া উঠিল। কোথায় শুনিয়াছি, কোথায় শুনিয়াছি…ইউরেকা! কিন্তু এ কি?

এ যে আর কিছুই নয়, থ্রী ইডিওটস মুভিতে আমির খান যেই দৃশ্যে প্রফেসরের সাথে মেশিনের সংজ্ঞা লইয়া বাদানুবাদ বাধাইয়া দিয়াছিল তাহারই বাংলা অনুবাদ মাত্র! প্রতিটি কথা, এমন কি দাড়ি কমা সেমিকোলন সহ! তাহারপরেই দেখিলাম প্রফেসর পকেট হইতে কলম বাহির করিয়া বীরদর্পে সবাইকে দেখাইয়া কি যেন বলিতে শুরু করিয়াছেন। ভাবিলাম, কি আর শুনিব প্রফেসরের লেকচার, উহা যে শুনিতে শুনিতে মুখস্ত! ইহার চেয়ে রুমে বসিয়া আরেকবার থ্রী ইডিওটস দেখিলেই পারিতাম!

আমির খান যদি থাকে, তবে চাতুর কেন থাকিবে না? এই চিন্তা মাথায় আসিতে না আসিতেই দেখিলাম পরদায় চাতুরের আগমন ঘটিয়াছে। তবে এই চাতুরকে দেখিয়া শুধু আমার না, সিনামা হলে উপস্থিত অনেক তরুণের চোখই টেরা হইয়া গিয়াছিল তাহা আমি হলফ করিয়া বলিতে পারি। এ যে ডানাকাটা চাতুর! আধুনিকা, রূপসী, বড়লোকের টাকার গরবে গরবিনী কইন্যা! দেখিলাম প্রফেসরও তাহার ব্যাতিক্রম নন, তিনি মহিলা চাতুরের চাটুকারিতা করিতে করিতে মুখে ফেনা তুলিয়া ফেলিবার উপক্রম করিতেছেন। তাহার প্রশংসা হইতে বুঝিতে পারিলাম যে সে শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যাবসায়ীর আদরের ছোট বইন। ভাবিলাম, এই তবে ভিলেনের আগমনবার্তা ঘোষিত হইল!

তো এহেন চাতুর প্রফেসরের কলমের মালিকানা পাইবার লক্ষ্যে ছাকিব খানকে চ্যালেঞ্জ করিয়া বসিল। হাসিয়া ভাবিলাম, ছাকিব খানের হাত হইতে কলম ছিনাইয়া নিবি? তাহার চাইতে বরং কুকুরের মুখের হাড্ডি ছিনাইয়া নেয়া সহজ! ইহা তো এখনও বাংলা সিনামা, অবাস্তব কিছু নহে!

চাতুরের আরও কিছু কথা না বলিলেই নয়। তিনি এত বড় হইয়াছেন, কিন্তু এখনও যেকোনো সমস্যায় বাচ্চাদের মতন নেকু নেকু গলায় তাহার ভিলেন ভাইকে ডাক দেন। তাহাকে কেউ অপমান করিয়াছে?…ভাইয়া! রুমে এসি নাই, গরম লাগিতেছে?…ভাইয়া!! আর ভাইও সেইরকম, ফোন পাইতে দেরি, লোকলস্কর লাগাইয়া ক্লাস রুমে এসি লাগাইয়া দিতে দেরি নাই! এই লইয়া প্রফেসর কিছু বলিলে চাতুর উলটা প্রফেসরকেই সাসপেন্ড লেটার পাঠাইয়া দেন! বলিহারী!!

এইবারে আমাদের নায়ক নায়িকার কথায় আসি। ছাকিব খানের বাবা রিকশাওয়ালা। তিনি হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়া ছেলেকে ডাক্তার বানাইতে চান। যদিও তাহার ভুড়ির সাইজ, এবং ছাকিব খানের লাল্টু মার্কা চেহারার মেকাপের বাহার দেখিয়া যথাক্রমে পরিশ্রমের মাত্রা এবং ছেলের মেধা-উভয় সম্পর্কেই সন্দেহের আগমন ঘটিতে পারে। সিনামার নায়িকা আর কেউই নন, ছাকিব খানের লেজুড়বিশেষ অপু আপু। পুরা সিনামায় অবশ্য তাহার কতখানি প্রয়োজনীয়তা বুঝিতে পারিলাম না, বারবার ভুলিয়া যাইতেছিলাম যে এই সিনামায় একজন নায়িকাও আছে।

ছাকিব খানের ডাক্তারী বিদ্যা সম্পর্কে কিছু না বলিলেই নয়। পুর্বে যে প্রফেসরের উল্লেখ হইয়াছিল, তাহার একখানা পুত্র বিদ্যমান। প্রফেসর চাইয়াছিলেন তাহার পুত্রকে ডাক্তার বানাইতে, কিন্তু পুত্রের ইচ্ছা সে ইঞ্জিনিয়ার হইবে। কাহিনী কি আবারো পরিচিত ঠেকিতেছে? সঠিক ধরিয়াছেন। সে পুত্র একদিন কি একখানা মেশিন বানাইয়া পেটেন্ট করিবার উদ্দেশ্যে বাবার কাছে টাকা চাইতে আসিল। বাবা তাহাকে দূরদূর করিয়া খেদাইয়া দিলেন। অদুরে দাড়াইয়া সবই লক্ষ্য করিলেন আমাদের ছাকিব খান।
পুত্র পিতার কাছে প্রত্যাখ্যাত হইয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিল এবং কিছু বুঝিয়া উঠার আগেই দেখিলাম সে পকেট হইতে একটি শিশি বাহির করিয়া উহার তরল গলায় ঢালিতে শুরু করিয়াছে। ভাবিলাম, ডাইল খাওয়ার এই দৃশ্য কি না দেখাইলে হইত না? ভুল ভাঙ্গিতে অবশ্য দেরি হইল না। দেখিলাম পুত্র শিশি খালি করিয়া মাটিতে শুইয়া দাপাইতে শুরু করিয়াছে। বুঝলাম উহা ডাইল নহে, বিষ ছিল।

পুত্রকে হাসপাতালে নিয়া আসা হইল এবং কর্তব্যরত ডাক্তার একবার দেখিয়াই তাহাকে মৃত ঘোষণা করিলেন। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্তু তাহাতে তো আর নায়কের কেরদানী প্রমানিত হয় না! নায়ক আসিয়াই ঘোষণা করিলেন পুত্র মরে নাই! তিনি পুত্রের বুকে হাত লাগাইয়া সজোরে চাপ দিতে শুরু করিলেন। আমি ভাবিলাম, পুত্র তো বিষ খাইয়াছে, পানিতে ডোবে নাই। এহেন চাপ দেয়ার হেতু কি?

চাপে কোন কাজ না দেখিয়া নায়ক এইবার পুত্রকে জোরে জোরে ঝাকাইতে শুরু করিলেন। আর কি কেরামতি, সাথে সাথেই পুত্র খক খক করিয়া কাশিয়া উঠিল। একবারে মরিয়া যাওয়া রোগীকেও যে ঝাকি মারিতে মারিতে বাচাইয়া তোলা যায়, এই বিদ্যা বোধ করি আমাদের দেশের বিজ্ঞ ডাক্তারগণ জানেন না। জানিলে এত হাসপাতাল বানাইয়া টাকার শ্রাদ্ধ করা হইত না, তাহার বদলে শয়ে শয়ে ঝাকি কেন্দ্র খোলা হইত।

ওদিকে সেই রূপসী চাতুর পদে পদে ছাকিব খানের নিকট অপদস্থ হইয়া জীবন বিসর্জনের পথ বাছিয়া নিয়াছিল। কিন্তু পিস্তলের ট্রিগার দাবাইবার আগ মুহুর্তে তাহার ভাবান্তর ঘটিল, সে নিজে না মরিয়া উলটা ছাকিব খান কে মারিবার প্ল্যান করিল। অর্থাৎ ছাকিব খান কে বিবাহ করিবার ফন্দি আটিল। কিন্তু ছাকিব খান যে অপু আপুর প্রেমে হাবুডুবু খাইতেছেন, তাহার কি হইবে? ছলে বলে কৌশলে যখন চাতুর ছাকিব খানের মন জয় করিতে পারিল না, তখন সে ছাকিব অপুর বিবাহের আসর হইতে কনেকে কিডন্যাপ করাইল।

এইখানে আসিয়া বাংলা সিনামার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন লক্ষ্য করিলাম। ছাকিব খান নায়িকা উদ্ধারে ব্যস্ত হইয়া ঝাপাইয়া না পড়িয়া উলটা চাতুরের কাছে গিয়া জানাইয়া দিলেন তিনি বিবাহে রাজি! ভাবিলাম, যাক, এতদিনে নায়কগন একটু বাস্তববাদী হইতে শিখিয়াছেন!

কিন্তু আমার এই অনুমান ভুল প্রমানিত হইল। শেষ মুহুর্তে যখন বন্দী অপুকে ছাকিব খানের সামনে হাজির করা হইল, তখন ছাকিব সব ভুলিয়া আবার স্বমুর্তি ধারন করিলেন। ভিশুম ভিশুম মারপিট শুরু করিলেন, এবং শেষ পর্যন্ত আবার গোয়ালের গরু গোয়ালেই ফিরিয়া আসিল। ছাকিব খান চাতুরকে ভুলিয়া আবার অপুর হাত ধরিলেন। ফাকতালে অপু আবার চাতুরের দিকে ধাবমান একখানা বুলেট নিজের অঙ্গে ধারন করিয়াছিলেন, সুতরাং চাতুরও ছাকিব অপুর উপর হইতে সকল রাগ তুলিয়া নিলেন! আঙ্গুর ফল টক আর কি!

কাহিনী বোধহয় এইভাবে অভিনয় আর পালটা অভিনয়ের মধ্য দিয়াই চলিতে থাকিত, কিন্তু তিন ঘন্টা সময় শেষের পথে। পরিচালক আর উপায় না দেখিয়া এইখানেই সিনামার রাশ টানিয়া ধরিলেন। হ্যাপী এন্ডিং ঘটিল, নায়ক নায়িকা ভিলেন জোকার সবাই পরস্পর শত্রুতা ভুলিয়া হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাড়াইয়া ইতি ঘোষণা করিল। আমরাও গাত্রোত্থান করিয়া বাড়ির পথ ধরিলাম।

ফিরিবার পথে একবার মস্তিস্ককে জিজ্ঞাসা করিলাম, এহেন বিনুদুনে তুমি কি সন্তুষ্ট হইয়াছ বৎস? মস্তিস্ক কোন জবাব দিল না। বুঝিলাম সে এখনও কি দেখিল তাহার বিশ্লেষণে ব্যাস্ত।

(২৩ এপ্রিল ২০১২ তারিখে সামহোয়ারইনব্লগে প্রকাশিত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *