ছোট গল্প

অপরাধী

মরিয়ম এইবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। আর এক মাস পরেই তার পরীক্ষা। তাদের গ্রামে সেই একমাত্র মেয়ে যে কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা করছে। গ্রাম এলাকার লোকজন এখনও মেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখতে শেখেনি। তাদের কাছে মেয়ে সন্তান একটা বোঝার মত। যে বোঝাকে আল্লাহতালা কোন অজানা পাপের শাস্তি হিসেবে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পছন্দ করেন।

গ্রামের কারো ঘাড়ে যদি এই শাস্তি চেপে বসে তাহলে সে চেষ্টায় থাকে দ্রুত এই শাস্তিটাকে আরেকজনের উপর চাপিয়ে দেয়ার। মেয়ের বয়েস তেরো চোদ্দ পুরলেই তাদের বিয়ে দেয়ার যোগাড়যন্ত্র শুরু হয়। ছেলে কানা খোড়া মাঝবয়েসী যাই হোক না কেন তাতে কোন আপত্তি করা হয় না। মেয়ের মা হয়তো ঘরের দরজা ধরে একটু কান্নাকাটি করে নেন চুপিচুপি। তারপরে কাজী দ্রুত সূরা কেরাত পড়ে বিবাহকার্য শেষ করে দেন। শাস্তিটি আরেকজনের বাড়িতে গিয়ে খেলনা হাড়িকুড়ি ফেলে সত্যিকারের হাড়িপাতিল নাড়াচাড়া শুরু করে।

এইদিক দিয়ে মরিয়মের বাবা ব্যতিক্রম। আশে পাশে পাঁচ কিলোমিটারের ভিতর একমাত্র কলেজের শিক্ষক তিনি। জমিজমাও যে একেবারে খারাপ আছে তা না। তিনি ঘোষনা দিয়েছেন একমাত্র মেয়েকে অনার্স পাশ না করিয়ে বিয়ে দেবেন না। ইতিমধ্যেই গ্রামের লোকের অনেকের চোখ টাটাচ্ছে। তারা এসব দেখে অভ্যস্ত নয়। মেয়েমানুষ মানে তাদের কাছে তিন হাত লম্বা একটি বস্তু, নির্দিষ্ট সময় পরে যে বস্তুটি লালপেড়ে শাড়ি জড়িয়ে তাদের ঘরের সাজসজ্জা বৃদ্ধি করতে কাজে লাগবে। বস্তুটির একমাত্র উল্লেখযোগ্য উপকারিতা হচ্ছে বংশরক্ষায় সাহায্য করা। সেই বস্তুটি যদি কলেজ ড্রেস পরে বইখাতা বুকে জড়িয়ে প্রত্যেক দিন কলেজে যাওয়া আসা করে তাহলে তা দেখতে অদ্ভুত লাগারই কথা।

গ্রামের লোকজনের এই মনোভাব মরিয়ম ইতোমধ্যেই টের পেতে শুরু করেছে। গ্রামের মাতবরের মাস্তান ছেলে মুরাদ মোড়ের চায়ের দোকানে বসে গুলতানি করে। সে প্রায়ই মরিয়মকে রাস্তা দিয়ে কলেজে যাওয়ার সময় চোখের কোনা দিয়ে লক্ষ্য করে।

একদিন সে মরিয়মকে ডেকে বলেছে, এই দোকানের চা খাইয়া জুইত পাই না। এত চিনি দিতে কই, এই ব্যাডার কানে যায় না। অর চিনিতেই মনে হয় মিষ্টি নাইক্কা, বুঝছ। চা বানাইতে হয় মিষ্টি মানুষের হাতে। আমার মনে লয় তুমার হাতে চা বানাইলে চিনি দেওন লাগবো না। এমনেই মিষ্টি হইব। এই কথা বলা শেষ করে মুরাদ অত্যন্ত অভদ্র ভাবে পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হেসেছে।

দোকানের একদম কোনার দিকের একটা বেঞ্চিতে বসে মনা ভাই চা খাচ্ছিলেন। মনা ভাই ছোটবেলা থেকে মরিয়ম দের বাড়িতে মানুষ। আশ্রিত বলা যায়। মরিয়ম যখন স্কুলে পড়ত তখন মনা ভাই তাকে পড়া দেখিয়ে দিতেন। কলেজে ওঠার পরে সেটা বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ মনা ভাই ক্লাস টেনের বেশি পড়ালেখা করেননি। এখন মরিয়মদের বাড়িতে থাকেন, মরিয়মের বাবার ফুটফরমাশ খেটে দেন।

মুরাদের কথাগুলো শুনে মরিয়ম কিছু বলেনি। সে মনা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। মনা ভাই অপরাধীর মত মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। একবারও মরিয়মের তাকাননি। মরিয়মের তখন খুব মন খারাপ হয়েছে। সে ঘুরে দোকান থেকে বেরিয়ে চলে এসেছে।

রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে মরিয়মের শুধু মনা ভাইয়ের কথা মনে হচ্ছিল। তার অপরাধীর মত মাথা নিচু করে বসে থাকার দৃশ্যটা সে কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিল না। আর আশ্চর্য, মুরাদের কথায় তার যতটা রাগ হয়েছিল, এখন তার চেয়ে বেশি মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে মনা ভাইকে গিয়ে বলে, মনা ভাই, আপনি যে মুরাদ কে কিছু বলেননি এতে আমি কিচ্ছু মনে করিনি। কিন্তু এত ভাল মানুষ হয়েছেন কেন আপনি? আপনার ঘাড়ের স্ক্রুতে কি জং ধরে গেছে যে আমার দিকে একবারও তাকালেন না? তাকালে কি মুরাদ আপনার চোখ তুলে নিত?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *