প্রতিক্রিয়া

বংশালের বনলতাঃ অতিপ্রাকৃত পৃথিবীর আমন্ত্রণ

পড়লাম মুহাম্মদ আলমগীর তৈমুরের লেখা “বংশালের বনলতা”। অতিপ্রাকৃত রোমাঞ্চকর গল্পের সংকলন এই বইতে রয়েছে ছয়টি গল্প, যেগুলোর নাম যথাক্রমে “বংশালের বনলতা”, “অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধান”, “কালো পাথর”, “বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন”, “ইব্রাহিম কাদরির মৃত্যু” এবং “হাকিনী”। প্রতিটি গল্পই অলৌকিকতাকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে, তবে এর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো – গল্পগুলোকে পড়লে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে।

বংশালের বনলতাঃ

পুরনো ঢাকার এক পুরনো বাড়িতে গল্পকথক খুঁজে পায় এক প্রাচীন দেবী, লিলিথের মূর্তি। সেই দেবীর উপাসনায় কিছু দিনের মধ্যেই অজস্র সম্পদের মালিক হয় সে। কিন্তু এর বদলে কি দিতে হবে তাকে?

অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধানঃ

শতাব্দী প্রাচীন এক অভিশাপ লেগে আছে অসীম আচার্য্যের বংশের উপর। সেই অভিশাপ কি তাকেও গ্রাস করবে শেষ পর্যন্ত? গ্রামের এক কোণে দাঁড়ানো ওই জমিদার বাড়িটার উপর বসে থাকা শকুনটা কি চায়? এই সংকলনে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প।

কালো পাথরঃ

গল্পটা আগেই পড়া ছিল, তাই পাতা উল্টে গেছি স্রেফ। তবে দারুণ শক্তিশালী কাহিনী। কালো পাথরের তৈরি এক স্তম্ভের সন্ধানে ভারতের এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে হাজির হয়েছিল খ্যাপাটে কবি উগ্র গরিবুল্লাহ। সেখানে কি খুঁজে পেয়েছিল সে? পাথরের কি সত্যিই অলৌকিক ক্ষমতা আছে?

বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তনঃ

ভয়ঙ্কর এক অপদেবতার উপাসনা করতে গিয়েছিল বজ্রযোগী। সব কিছু গুরুর কাছ থেকে শিখে ওঠার আগেই মারা গিয়েছিল সে। কিন্তু পুনর্জন্ম বলে যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে, তাহলে কি আবার জন্ম হয়েছে তার?

ইব্রাহিম কাদরির মৃত্যুঃ

বিরক্তিকর চরিত্র ইব্রাহিম কাদরি। বিদেশী কাল্ট উপাসকদের পাল্লায় পড়ে চলে গেল পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায়, এক প্রাচীন মন্দিরের সন্ধানে। সেখানে কি পরিণতি হলো তার?

হাকিনীঃ

পুরনো শত্রুকে নিকেশ করার জন্য ভয়ঙ্কর পিশাচ হাকিনী জাগানোর সিদ্ধান্ত নিল গল্পের কথক। নিচুস্তরের পিশাচ এই হাকিনীরা, যাকে দেখিয়ে দেয়া হয় তাকে মারতে না পারলে ক্ষেপে গিয়ে খুন করে বসে যে ডেকে এনেছে তাকেই। শেষ পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হবে তো?

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ 

মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের লেখার সাথে আমার পরিচয় ঘটে রহস্যপত্রিকার মাধ্যমে, তার “বংশালের বনলতা” নামের বেশ বড় সাইজের একটি গল্প পড়ার মধ্য দিয়ে। সেই একটা গল্প পড়েই বুঝে গিয়েছিলাম যে এই লেখক কতটা প্রতিভার অধিকারী। পরবর্তীতে সেবার আরও একটি হরর সংকলনে তার “কালো পাথর” নামের একটি গল্প পড়ি এবং একই রকম বিস্মিত হই তার লেখনীর ক্ষমতায়। তাই এই বইমেলায় যখন তার অতিপ্রাকৃত রোমাঞ্চকর গল্পের সংকলন বের হওয়ার খবর পেলাম সেটা কোন দ্বিধা না করেই কিনে ফেলেছিলাম। আজ সেটা পড়ে শেষ করে এখন লিখতে বসলাম এই রিভিউ।

গল্পগুলোর প্রতিটিই লেখা হয়েছে দেশিয় পটভূমিতে, ইতিহাসের আশ্রয় নিয়ে। সে কারণেই গল্পগুলো আমার এত ভাল লেগেছে। প্রাচীন ইতিহাসের সাথে যখন অলৌকিকতার ছোঁয়া মেশে, উঁকি দেয় গা ছমছমে প্রেত আর অপদেবতার দল, তখন সেই গল্পের চাইতে স্বার্থক ভৌতিক গল্প আর কিছু হতে পারে না। বৃষ্টির দিনে অন্ধকার ঘরে মোমের আলোতে এই সব গল্প পড়তেই সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে, এবং সবচেয়ে বেশি মজাও পাওয়া যায়! নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে এই বছর আমার পড়া ভৌতিক সংকলনদের মধ্যে অন্যতম স্থান দখল করে থাকবে এই বইটি। এবং যারা আমার মতো অলৌকিক গল্প ভালবাসে তাদের জন্যও এটা অবশ্যই সাজেস্ট করব।

পজিটিভ দিকঃ

প্রথমেই বলতে হয় লেখকের অসামান্য সেন্স অফ হিউমারের কথা। খুব সামান্য কোন কথাও তার বিবরণের কারণে হয়ে উঠেছে দারুণ রসালো, পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের অজান্তে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। এখানে তার সাথে মিল পেয়েছি আরেক প্রিয় লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের। এহেন রসবোধের সাথে অলৌকিকতার মিশেল ঘটাতে পেরেছেন বলেই বইটি হয়েছে এক মাস্টারপিস!

প্রতিটি গল্প পড়লেই বোঝা যায় কতটা গবেষণা করা হয়েছে, কতটা সময় দেয়া হয়েছে এদের প্রত্যেকের পেছনে। লেখকের চিন্তার গভীরতা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এ ধরণের গল্প একটি পড়লেই পুরো উপন্যাস পড়ার স্বাদ পাওয়া যায়।

নেগেটিভ দিকঃ

সত্যি কথা বলতে, নেগেটিভ দিক আমার তেমন চোখে পড়েনি। তবে প্রথম গল্পটির কথা বলতেই হয়ঃ মনে হয়েছে যেন হঠাৎ করেই শেষ করে দেয়া হলো গল্পটা, আরেকটু ভাল ফিনিশিং আমরা আশা করতেই পারতাম। সংকলনে আরও দুই একটা গল্প যোগ করা হলেও খারাপ হতো না বোধহয়। যাই হোক, ভবিষ্যতে লেখকের কাছ থেকে এমন গল্প আরও আশা করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *