ধারাবাহিক ফিচার

ক্লাইড ব্যারো, বনি পার্কারঃ সন্ত্রাসের রাজত্বে প্রেম (প্রথম খণ্ড)

বনি এলিজাবেথ পার্কার এবং ক্লাইড চেস্টনাট ব্যারো, আমেরিকার অপরাধ জগতে এক ব্যতিক্রমী যুগলের নাম। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে মধ্য আমেরিকা জুড়ে তারা কায়েম করেছিল ত্রাসের রাজত্ব। বর্তমান সময়ের মানুষ তাদের চেনে মূলত ব্যাংক ডাকাত হিসেবে। যদিও তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য থাকত মূলত নির্জন গ্যাস স্টেশন, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি জায়গা। সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার হিসেব মতে তাদের হাতে কমপক্ষে নয়জন পুলিশ অফিসার, এবং একাধিক বেসামরিক লোক নিহত হয়।

বনি পার্কারের জন্ম ১৯১০ সালের পহেলা অক্টোবর, টেক্সাসের রোয়েনায়। চার বছর বয়সে বাবা মারা যায়, তিন সন্তানকে নিয়ে তার মা চলে আসে টেক্সাসের সিমেন্ট সিটিতে। হাই স্কুলে পড়ার সময় বনির সাথে পরিচয় হয় রয় থর্নটনের। দুজন বিয়ে করে, কিন্তু ১৯২৯ সালে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তবে কখনও ডিভোর্স হয়নি, এমনকি মৃত্যুর সময়ও বনির হাতে থর্নটনের দেয়া আংটি ছিল।

(বনি এবং ক্লাইড)

ক্লাইড ব্যারোর জন্ম ১৯০৯ সালে, টেক্সাসের এলিস কাউন্টিতে। দরিদ্র পরিবারের সাত সন্তানের মধ্যে সে ছিল পঞ্চম। প্রথমবার পুলিশের খাতায় তার নাম ওঠে ১৯২৬ সালে, গাড়ি চুরির দায়ে। আরও নানা অপরাধে গ্রেফতার হওয়ার পর ১৯৩০ এর এপ্রিলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে এক সহবন্দীর মাথায় পাইপ দিয়ে বাড়ি মেরে খুন করে সে, যে তাকে প্রায়ই সেক্সুয়ালি নির্যাতন করত। এছাড়া আরেক বন্দীর সহায়তায় নিজের পায়ের দুটো আঙুল কেটে ফেলে, যাতে পরিশ্রমের কাজ করতে না হয়। এ কারণে বাকি জীবন সে খুঁড়িয়ে হাঁটত।

(ক্লাইড ব্যারো)

বনি এবং ক্লাইডের প্রথম দেখা হয় ১৯৩০ সালের ৫ জানুয়ারি, ক্লাইডের এক বন্ধুর বাড়িতে। প্রথম দর্শনেই দুজনের মধ্যে প্রেম হয়ে যায়। ধারণা করা হয় যে কেবল ভালবাসার জন্যেই ক্লাইডের সাথে যোগ দিয়েছিল বনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পরবর্তী সকল অপরাধে দুজনকে একসাথেই দেখা গেছে।

১৯৩২ সালে জামিনে মুক্তি পায় ক্লাইড, যখন সে পোড় খাওয়া অপরাধী। তার সাথে জেলে ছিল এমন এক লোকের বর্ণনা অনুসারে, “ক্লাইড জেলে ঢুকেছিল দুধের শিশু হয়ে, আর বের হয়েছিল র‍্যাটলস্নেক হয়ে।” জেল থেকে বেরিয়েই নানা ছোটখাট অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে, সাথে চালাতে থাকে স্টোড় এবং গ্যাস স্টেশন ডাকাতি। তার প্রিয় অস্ত্র ছিল M1918 মডেলের ব্রাউনিং অটোমেটিক রাইফেল। এ সময় আরও কিছু অপরাধীকে নিয়ে একটা দল গঠন করে বনি এবং ক্লাইড। এপ্রিলে এক স্টোর ডাকাতির সময় ধরা পড়ে বনি, এবং তাকে জেলে পাঠানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত জুরি বোর্ড তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে নারাজ হওয়ায় জুন মাসে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার ক্লাইডের সাথে যোগ দেয় সে।

(অস্ত্র হাতে, সিগার মুখে পোজ দিয়েছে বনি পার্কার)

আগস্টের ৫ তারিখে ওকলাহোমার এক বারে মদ খাচ্ছিল ক্লাইড এবং তার গ্যাঙের আরও দুই সঙ্গী। এই সময় এক শেরিফ ও তার ডেপুটি তাদের গ্রেফতার করতে গেলে ক্লাইড গুলি ছোড়ে, যার ফলে ডেপুটি মারা যায় এবং শেরিফ গুরুতর আহত হয়। এটাই ছিল ক্লাইডের হাতে কোনো আইনের লোক নিহত হওয়ার ঘটনা। অক্টোবরে তারা হাওয়ার্ড হিল নামে আরও একজনকে খুন করে। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে ব্যারো ক্লাইডের দলের হাতে নিহত হয় ডয়েল জনসন নামের এক যুবক। দুই সপ্তাহ পর ট্যারান্ট কাউন্টির ডেপুটি শেরিফ ম্যালকম ডেভিসও খুন হয় তাদের হাতে।

১৯৩৩ সালের মার্চে ক্লাইডের ভাই বাক ব্যারো জেল থেকে ছাড়া পায় এবং স্ত্রীকে নিয়ে বনি ও ক্লাইডের সাথে তাদের মিসৌরির আস্তানায় যোগ দেয়। তাদের উদ্দাম হইচই, চেঁচামেচির কারণে সন্দেহের বশে এক প্রতিবেশী পুলিশে খবর দেয়। পাঁচ পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়, কিন্তু ক্লাইড এবং বাকের হাতে ডিটেকটিভ ম্যাকগিনিস নিহত হয়, আহত হয় কনেস্টবল হ্যারিম্যান। এরপর ব্রাউনিং রাইফেলের এলোপাথাড়ি গুলিতে পালানোর পথ পরিষ্কার করে নেয় ক্লাইড, এবং সবাইকে নিয়ে গাড়িতে করে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদের মিসৌরির আস্তানা থেকে অস্ত্রশস্ত্র, বনির লেখা একটি কবিতা এবং একটি ক্যামেরাসহ বহু প্রমাণ সংগ্রহ করে পুলিশ।

পরবর্তী তিন মাসে তারা টেক্সাস থেকে মিনেসোটা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে লুটপাট চালায়। মে মাসে ইন্ডিয়ানা এবং মিনেসোটায় দুটি ব্যাংকে ডাকাতি করে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য তারা গাড়ি ডাকাতি করত। গাড়ির মালিককে সাধারণত নিয়ে যেত নিজেদের সাথে, এবং বহু দূর যাওয়ার পর ছেড়ে দিত। কখনও কখনও বাড়ি ফেরার পয়সাও দিয়ে দিত তাকে। পুলিশের হাতে গিয়ে পড়া ক্যামেরা থেকে বেশ কিছু ছবি সাংবাদিকরা পেয়ে যায়, ফলে ব্যারো গ্যাঙের নাম ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। তাদের নির্মমতা এবং ঠাণ্ডা মাথার খুনগুলো ধীরে ধীরে জনগণের মন বিষিয়ে তোলে। দলের পাঁচ সদস্যের মধ্যেও প্রায়ই ঝগড়া লাগত। এক পর্যায়ে তাদের ড্রাইভার এবং সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জোনস আরেকটি গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে জুনের ৮ তারিখে আবার দলের সাথে যোগ দেয় সে।

১০ জুন তারিখে এক দুর্ঘটনায় পড়ে তাদের গাড়ি, যাতে বনি পার্কার বেশ ভালভাবে আহত হয়। তার ডান উরুর কাছে অনেকখানি অংশ পুড়ে বিকৃত হয়ে যায়। বনিকে নিয়ে আরকানসাসের এক হোটেলে আশ্রয় নেয় তারা। এখানে ডাকাতি করতে গিয়ে তারা খুন করে বসে টাউন মার্শাল হেনরি হামফ্রেকে, এবং আবার পালাতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয় খণ্ড পড়ুন এখানে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *