ধারাবাহিক ফিচার

ক্লাইড ব্যারো, বনি পার্কারঃ সন্ত্রাসের রাজত্বে প্রেম (তৃতীয় খণ্ড)

দ্বিতীয় খণ্ড

প্রথম খণ্ড

১৯৩৪ সালের পহেলা এপ্রিল, ইস্টার সানডের দিন ক্লাইড এবং হেনরি মেথভিনের হাতে নিহত হয় দুই তরুণ পুলিশ সদস্য। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে বনি এবং ক্লাইড তাদের গুলি করে খুন করেছে বলে জানা গেলেও পরে জানা যায় যে বনি তখন গাড়ির পেছনের সিটে ঘুমিয়েছিল। গুলির শব্দ শুনে সে বেরিয়ে আসে, এবং আহত অফিসারদের সাহায্য করতে এগিয়ে যায়। কিন্তু তার আগেই ক্লাইডের গুলিতে মারা যায় দুজন। কিন্তু এই খুনের কাহিনী রংচঙ লাগিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে সংবাদপত্রগুলো। বিশেষ করে একজন নারীর হাতে মানুষ খুন হবে, তাও এমন নিষ্ঠুরভাবে – এটা তখন কেউই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।

জনগণের সাথে সাথে পুলিশ বিভাগও ক্ষেপে ওঠে। খুনীদের লাশের জন্য এক হাজার ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়। টেক্সাসের গভর্নর এর সাথে আরও পাঁচ শ ডলার অতিরিক্ত যোগ করেন। পাঁচ দিন পর ব্যারো এবং মেথভিনের হাতে ষাট বছর বয়সের এক কনস্টেবল নিহত হওয়ার পর জনরোষ আরও তুঙ্গে ওঠে। এবারও বনির নাম চলে আসে খুনী হিসেবে। মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচার যে আশাটুকু ছিল তার সামনে, সেটাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

(ক্যাপ্টেন হ্যামার)

১৯৩৪ এর ফেব্রুয়ারি থেকেই তাদের পেছনে আঠার মতো লেগে ছিলেন ক্যাপ্টেন হ্যামার। তিনি আবিষ্কার করেন যে দলটি আমেরিকার পাঁচটি স্টেটকে বেছে নিয়েছে নিজেদের এলাকা হিসেবে। আমেরিকার এক স্টেটের পুলিশ অন্য স্টেটে কাজ চালাতে পারে না, এবং এই নিয়মেরই সুযোগ নিচ্ছিল তারা। আইনের ফাঁকফোকর জানা ছিল ক্লাইডের, কিন্তু তার চলাফেরা ছিল রুটিন বাঁধা। হ্যামার এই সুযোগটি কাজে লাগান, এবং আন্দাজ করে নেন যে এর পরে তারা কোথায় যেতে পারে। নিজেদের পরিবারের সাথে তারা নিয়মিত দেখা করত। হ্যামারের হিসেবে দেখা যায় যে এরপর তারা লুইজিয়ানায়, মেথভিনের পরিবারের সাথে দেখা করতে যাবে।

২১ মে, ১৯৩৪ সালে হ্যামার এবং তার চার সহযোগী জানতে পারে যে ওই দিন রাতে মেথভিনের সাথে তার পরিবারকে দেখতে যাবে বনি এবং ক্লাইড। এই তথ্যের ভিত্তিতে লুইজিয়ানা স্টেট হাইওয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশে ঘাপটি মেরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় পাঁচ পুলিশ সদস্য। ২১ তারিখ রাত নয়টা থেকে শুরু করে পরের সারা দিন অপেক্ষা করে তারা, কিন্তু শিকারের দেখা মেলে না।

২৩ মে সকাল সোয়া নয়টার দিকে যখন হ্যামার হাল ছেড়ে দিতে যাবেন, তখনই ক্লাইডের চুরি করা ফোর্ড ভিএইট গাড়ির শব্দ ভেসে আসে তার কানে। গাড়িটি কাছে আসতেই একনাগাড়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। সবার কাছে ছিল অটোমেটিক রাইফেল এবং পিস্তল। এছাড়া শটগানও ছিল কয়েকজনের কাছে। প্রথমে রাইফেল, পরে শটগান এবং সবশেষে পিস্তলের সবগুলো গুলি ছোড়া হয়। সব মিলিয়ে একশ ত্রিশ রাউন্ড গুলি ছোড়ে তারা। প্রথম গুলিতেই মারা যায় ক্লাইড। তার লাশ দেখে বনি চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু তাকেও একই পরিণতি বরণ করতে হয়।

বনি এবং ক্লাইডের দেহে সব মিলিয়ে পঞ্চাশটিরও বেশি বুলেট খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর পুলিশ গাড়ির কাছে এগিয়ে যায়, এবং ভেতর থেকে চুরি করা রাইফেল, সেমি অটোমেটিক শটগান, হ্যান্ডগান এবং কয়েক হাজার রাউন্ড বুলেটসহ প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে। সেই সাথে আরও পাওয়া যায় গাড়িতে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন স্টেটের পনেরোটি লাইসেন্স প্লেট।

(গ্রেফতারের পর রাস্তায় পড়ে ছিল বনি এবং ক্লাইডের গাড়ি)

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থল ভরে যায় উৎসুক মানুষের ভীড়ে। কেউ কেউ অতি আগ্রহের বশে নিহতদের চুল, পোশাকের টুকরো, বুলেটের খোসা ইত্যাদি সংগ্রহ করে নিতে থাকে, যেগুলো পরবর্তীতে স্যুভেনির হিসেবে বিক্রি হতে দেখা যায়। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে তাদের মৃত্যুর খবর, জনতাকে সামাল দিতে হিমশিম খেতে থাকে পুলিশ। বনি পার্কারের শেষকৃত্যে প্রায় বিশ হাজার মানুষের জমায়েত হয়। কেবল টেক্সাসের ডালাস শহরেই বনি এবং ক্লাইডের মৃত্যুর কারণে বিক্রি হয় প্রায় পাঁচ লাখ খবরের কাগজ।

(ক্লাইড ব্যারোর সমাধিফলক)

পুলিশের হাতে ধরা পড়া জোনসের কাছ থেকে বনি এবং ক্লাইড সম্পর্কে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাকে পনেরো বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। মেথভিনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে আট বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া সে বনি ও ক্লাইডকে ধরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে পুলিশকে সাহায্য করেও কিছুটা সাজা কমিয়ে নিয়েছিল। বাকের স্ত্রী ব্ল্যানশ ব্যারোকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়, তবে ভাল আচরণের কারণে ছয় বছরের মাথায় সে মুক্তি পায়। ১৯৬৭ সালে আর্থার পেন-এর পরিচালনায় মুক্তি পায় এই সন্ত্রাসী যুগলকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা “বনি অ্যান্ড ক্লাইড”, যা প্রচুর সাড়া ফেলে। এতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন ওয়ারেন বিটি এবং ফে ডানাওয়ে। এছাড়া বিভিন্ন গান, টিভি সিরিজ এবং মিউজিক্যালেও অনেকবার তাদের উল্লেখ রয়েছে। নিজ সময়ে হয়তো বনি এবং ক্লাইড অপরাধী ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তারা পরিণত হয়েছে এক ট্র্যাজিক গল্পের অ্যান্টি-হিরোতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *