প্রতিক্রিয়া

মাহমুদুল হকের চিক্কোর কাবুকঃ অন্যরকম ভাললাগা

ছোট্ট, কিন্তু অদ্ভুত মায়াময় একটা বই। সেই সব বইয়ের একটা, যেগুলো থেকে কৈশোরের গন্ধ আসে, ঘুঘু ডাকা নিঝুম দুপুরে যখন সবাই ভাতঘুমে মগ্ন তখন একটা বইয়ের মাঝে ডুব দিয়ে অজানায় হারিয়ে যাওয়ার যে উত্তেজনা তার গন্ধ আসে। প্রথম প্রকাশ ১৯৭৯ তে, অথচ এখনও কি দারুণ জড়িয়ে ধরেছে আমাকে!

বলছিলাম মাহমুদুল হকের অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসমালা সিরিজের বই “চিক্কোর কাবুক” এর কথা। নামটা শুনলেই কেমন যেন অদ্ভুত মনে হয়, তাই না? আমাকেও এই নামটাই টেনেছিল খুব, তাই আর কিছু না ভেবে কিনে ফেলেছিলাম। বইয়ের গল্পটাও তেমনি টানবে, যদি আপনি একবার জানতে পারেন। টুপু নামে এক কিশোরের গল্প এটা, যে কিনা শব্দের রঙ দেখতে পায়! কি অদ্ভুত কথা, লোকে শুনলে পাগল বলবে না? তা বলবে, কিন্তু একই রকম পাগলাটে ছোট মামা যখন আছে তখন আর ভয় কি? ভাগ্নেকে নানা রঙের শব্দ দেখানোর উদ্দেশ্যে তাই সে বেরিয়ে পড়ে খাগড়াছড়ির জঙ্গলে। নানা রকম ছোট বড় বিপদ আপদের সাথে মোলাকাত, সেই সাথে নতুন জীবনের আস্বাদ।

কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসমালা সিরিজের বই যখন, তখন অ্যাডভেঞ্চার না থেকে যায়ই না! তাই এসে হাজির হয় স্ট্যানলি আর তার ভয়ঙ্কর দলবল, পাহাড় জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর দস্যু তারা। আরও আছে সাহসী কিশোর চিক্কো আর কুশল। টুপু আর ছোটমামা কি করে বিপদে পড়ে, কি করে আবার ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসে সেই বিপদ থেকে, “চিক্কোর কাবুক” তারই মায়ামাখা বিবরণ।

মাহমুদুল হকের লেখায় খুব অদ্ভুত একটা মায়া লুকিয়ে থাকে, মনে হয় এক টুকরো ছোটবেলা যেন কলমের ডগায় মাখিয়ে লিখতে বসেছিলেন তিনি। বইয়ের মাঝে আদুরে সব শব্দের ব্যবহার, দারুণ দক্ষতায় লেখা বর্ণনা আর ভাষার বিনুনী, সব মিলিয়ে একবার পড়তে শুরু করলে আর ছাড়ার উপায় নেই। কিছুটা লেখা তুলে দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি নাঃ

“ …যাকে বলে চোখ জুড়ানোর হাজারো এলোমেলোমি। পাহাড়ের গায়ে ধস নেমেছে কোথাও। খিলখিলে হাসির মতো রোদে ভাঁজ খেলানো নানা রঙের মাটির স্তর সেখানে কতো রকমেরই না নকশা টানিয়ে রেখেছে। হাতে রঙ-পেন্সিল পেলে নতুন ইল্টু-বিল্টুরা ঘরের দেয়ালে মনের আনন্দে যেমন দাগকাটা ছবি আঁকে। ধরো, মাথা থেকে রেললাইনের পাটির মতো দুটো পা, কানের ওপর থেকে দুটো হাত, যা মনে আসে তাই।

…পাহাড়ের গায়ে ঝামরে উঠেছে কতকটা সেই রকম ঘাস। মাটির ধস নামায় কোথাও ঝুলছে কালো কুচকুচে রাশি রাশি ঘাসের শিকড়। পাহাড়গুলো রোদে এভাবে তাদের চুল শুকোয়।”

ছোট্ট, কিন্তু সুন্দর এই বইটি সব বয়সের পাঠকের জন্য অবশ্যপাঠ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *