প্রতিক্রিয়া

কমলা রকেটঃ মানবিক এক গল্পের সুনিপুণ ব্যাখ্যান

নূর ইমরান মিঠুর পরিচালনায় “কমলা রকেট” সিনেমাটি দেখে শেষ করলাম এইমাত্র। বলতে বাধ্য হচ্ছি, অনেকদিন এমন সুস্বাদু গল্প বলার ভঙ্গি চোখে পড়েনি। আমি বরাবরই বলি, একটি গল্প যতই সাধারণ হোক না কেন, গল্পের কথক যদি দক্ষ হয় তাহলে সাধারণ গল্পও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। কমলা রকেট দেখার পর আমার সেই ধারণার সপক্ষে আরও একটি প্রমাণ পাওয়া গেল।

নূর ইমরান মিঠুকে দেখা গিয়েছিল মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর পিপড়াবিদ্যা চলচ্চিত্রে। এরপর কয়েকটি নাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি, কিন্তু তার মূল আগ্রহ ছিল চলচ্চিত্র নির্মাণে, অভিনয়ে নয়। সেই আগ্রহ থেকেই পরিচালনায় আসা। তার মতে, “আমাদের মধ্যে শ্রেণীবিন্যাস, কাম, ক্ষুধা, বিলাসিতার রকম আলাদা আলাদা থাকলেও মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে সবাই এক। সবাই মুখোশের আড়ালে থাকে, কিন্তু দিন শেষে সবাইকে একই কাতারে আসতে হয়।” কমলা রকেট তার এই মতামতকেই তুলে ধরবার প্রয়াস।

ঢাকা-মংলা রুটে যাতায়াত করা প্রাগৈতিহাসিক স্টিমার রকেটে করে পাড়ি জমানো কিছু বিচ্ছিন্ন মানুষের গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে কমলা রকেট সিনেমার কাহিনী। প্রিয় গদ্যকার শাহাদুজ্জামানের দুটো গল্প – ‘মৌলিক’ এবং ‘সাইপ্রাস’কে একত্র করে তৈরি হয়েছে সিনেমার গল্প, যার চিত্রনাট্য লিখেছেন যৌথভাবে শাহাদুজ্জামান এবং নূর ইমরান মিঠু। সিনেমার শুরুতেই আমরা দেখতে পাই লঞ্চঘাট থেকে পাড়ি জমাচ্ছে স্টিমার রকেট। নানা রকম যাত্রী তাতে, প্রত্যেকেরই আছে আলাদা আলাদা গল্প। সিনেমায় তাই কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর গল্প চিহ্নিত করা যায় না, কিন্তু পরিচালক বোধ করি নির্দিষ্ট করে কোনো গল্প এখানে বলতে চাননি। প্রচলিত ধারার সিনেমার মতো তাই এখানে গল্পকে বিভিন্ন অঙ্কে বিভক্ত করার সুযোগ অনুপস্থিত। পুরো সিনেমা জুড়ে ঘটে যাওয়া টুকরো টুকরো ঘটনা, বিভিন্ন চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, দৃশ্যপট জুড়ে থাকা নানা রকমের মানুষ – সব কিছু মিলিয়ে এটা আসলে এক অনুভূতি, বুকের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে থাকা এক টুকরো মুক্ত বাতাস অনুভব করার গল্প। যে গল্প দুই ঘন্টার ব্যপ্তি শেষে পর্দা থেকে মিলিয়ে যায়, কিন্তু মনের ভেতর ঠিকই রেশ রেখে যায়।

সিনেমার কাহিনীপ্রবাহ নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই। কয়েক বছর আগে ভয়াবহ গার্মেন্টস অগ্নিকাণ্ডের কথা আমরা সবাই জানি। সিনেমার শুরুতে আমরা দেখতে পাই আতিককে, যার গার্মেন্টসে আগুন লেগে সতেরোজন শ্রমিক মারা গেছে। ইনস্যুরেন্সের টাকা জোগাড় করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে – এই অভিযোগ মাথায় নিয়ে মংলায় বন্ধুর কাছে পালিয়ে থাকার জন্য যাচ্ছে সে। একই স্টিমারে যাত্রী হয়েছে গার্মেন্টসের অগ্নিকান্ডে মারা যাওয়া এক শ্রমিকের লাশ, আর তার শোকবিহবল স্বামী। নানা ঘটনা পরিক্রমায় এই দুই চরিত্র মুখোমুখি হয় গল্পের শেষে গিয়ে। কিন্তু তার আগে শুরু থেকে ঘটে যাওয়া সব কিছুকে একই রকম নিপুণ ভঙ্গিমায় বলে যাওয়া, সুরের অসঙ্গতি না রাখা – এই সবটুকু কৃতিত্ব দিতে চাই পরিচালক নূর ইমরান মিঠুকে। পুরো গল্পটি তিনি এমনভাবে বলে গেছেন যে কোথাও মনে হয়নি একটু খামতি ছিল, কিছু কম বা বেশি হয়ে গেল কোথাও। দৃশ্যায়ন, আবহসঙ্গীত – এই দুইকে আমি দশে দশ দিতে চাই, যদি পারি তো আরও কিছু বেশি। সংলাপ, অভিনয় – ইত্যাদিতেও কমলা রকেট উতরে গেছে বেশ ভালভাবেই। অসংখ্য ছোট ছোট, আপাত সম্পর্কবিহীন ঘটনাকে জোড়া দিয়ে এক নিখুঁত অনুভূতি তুলে ধরার মধ্যে পরিচালকের যে মুন্সিয়ানা, তাতে নূর ইমরান মিঠু খুব ভালভাবেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এ ধরণের সিনেমা আমাদের দেশে খুব, খুব জরুরী এখন।


সকল দর্শকের মতামত আমার সাথে নাও মিলতে পারে। কারও কারও কাছে মনে হতে পারে কিছু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয় ছিল, গল্পের সাথে সম্পর্কবিহীন ছিল। তবে আমার তেমন মনে হয়নি। সম্পূর্ণ গল্পটা তুলে ধরার জন্য এই দৃশ্যগুলো এসেছে বলেই আমার ধারণা। দিশি চরিত্রে থাকা অভিনেত্রীর অভিনয়কে বাদ দিলে সিনেমাকে সর্বাঙ্গসুন্দরই বলা যায়। মোশাররফ করিম আর তৌকির আহমেদকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রতিনিয়ত নিজেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছেন তারা। একমাত্র পূর্ণাঙ্গ যে গানটি সিনেমায় ছিল তা হৃদয় ছুয়ে গেছে।

এক সময় প্রচুর সিনেমা দেখতাম। ভাল সিনেমা দেখেছি যেমন, খারাপ সিনেমাও ছিল তার মধ্যে। আফসোসের কথা হলেও সত্যি, বাংলা সিনেমার মধ্যে মন জয় করতে পেরেছিল এমন সিনেমা খুব কমই আছে। আজ তেমন একটি সিনেমাই দেখলাম। সিনেমাপ্রিয় সকলেরই কমলা রকেট দেখা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *