ছোট গল্প

অনীক ভাইয়ের মহাজাগতিক গোল্ডফিশ

অনীক ভাইয়ের শখ হয়েছে গোল্ডফিশ পুষবেন। সে দিন তার সাথে কাঁটাবনে গিয়ে বেশ দরাদরির পর একটা দুই ইঞ্চি সাইজের গোল্ডফিশ, কাচের জার আর কিছু ফিশফুড কিনে আনলাম। অনীক ভাই নাচতে নাচতে মাছের জার নিয়ে বাসায় চলে গেলেন। 

তারপর অনেক দিন ভাইয়ের কোনো খবর নেই। আজ সকালে হঠাৎ ফোন। ‘তাড়াতাড়ি আয়। ভয়ঙ্কর কাণ্ড।’

সাত সকালে কি হলো ভাবতে ভাবতে ভাইয়ের পুরনো ঢাকার বাসায় পৌছালাম। রিকশা থেকে নামতেই দেখি ভাই রাস্তার উপর পায়চারি করছেন। চুল এলোমেলো, চশমাটা বাঁকা হয়ে নাকের ডগায় ঝুলে আছে। আমাকে দেখেই দৌড়ে এলেন। ‘বিরাট ব্যাপার!’ কাছে এসেই চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। ‘এবার আর আমার নোবেল প্রাইজ কেউ ঠেকাতে পারবে না। চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো..’ 

গান গাইতে গাইতে অনীক ভাই কেমন যেন কাঁপতে শুরু করলেন। তাড়াতাড়ি পাশের দোকান থেকে একটা ঠাণ্ডা পানির বোতল কিনে মাথায় ঢেলে ঠাণ্ডা করলাম। ভাই কোনো কিছু নিয়ে এক্সাইটেড হয়ে গেলে এমন কাপাকাপি করতে দেখেছি আগেও, তাই অবাক হইনি। 

ভাইয়ের অবস্থা একটু নর্মাল হতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এইবার বলেন, কি হয়েছে?’
ভাই পাগলাটে একটা অট্টহাসি ছেড়ে বললেন, ‘বাসায় চল। নিজের চোখেই দেখবি কি হয়েছে!’

তিনতলার উপর উঠে এলাম সরু, অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে। ভাইয়ের ফ্ল্যাটের দরজাটা বাইরে থেকে তালা মারা। পকেট থেকে একটা ভারি চাবির গোছা বের করে তালা খুললেন অনীক ভাই। তারপর আস্তে করে ঠেলা দিলেন। খুলল না দরজা। 

আরেকটু জোরে ধাক্কা দেয়ার পরেও একই কাজ হলো। বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে অনীক ভাই বললেন, ‘গাবলুটা আটকে রেখেছে দরজা।’
‘গাবলু কে?’ আমি প্রশ্ন করলাম। 
‘কাটাবন থেকে গোল্ডফিশ কিনে দিয়েছিলি আমাকে, মনে নেই?’ 
ওটার নাম তাহলে গাবলু রাখা হয়েছে? কিন্তু একটা গোল্ডফিশ দরজা আটকে রাখে কিভাবে? 
হঠাৎ করে দরজাটা বাইরের দিকে ঠেলে আসতে শুরু করল। মনে হলো কেউ একজন ঠেলছে ভেতর থেকে। 
তারপরেই একটা কর্কশ শব্দের সাথে সাথে দরজাটা ভেঙ্গে গেল তিন চার টুকরো হয়ে। সেই সাথে এমন একটা দৃশ্য দেখলাম, যেটা আমি জীবনে ভুলব না। বুঝতে পারলাম, “বিরাট ব্যাপার” বলে অনীক ভাই আসলে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন। 

ইয়া বড় একটা মুখ, কম করেও চার ফিট হবে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত – আধখোলা হয়ে হাঁ করে আছে দরজার ওপাশে। মুখের ওপাশে একটা বিস্ফারিত চোখও দেখা গেল। মুখটার রঙ সোনালি। আমাদের চোখের সামনে মুখটা একবার খুলল, বন্ধ হলো। তারপর আশটে গন্ধ মেশানো বাতাসের ঝাপটা এসে লাগল আমাদের গায়ে। 

নিজের অজান্তেই এক লাফে পিছিয়ে এলাম আমি। অনীক ভাইয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে চাইলাম, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হলো না। 
‘দেখেছিস? গাবলুর অবস্থা?’ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন অনীক ভাই।

‘এইটা – এইটা আপনার গাবলু?’ আমিও ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম। ‘এত বড় হলো কিভাবে!’
হঠাৎ লেজের ঝাপটা মেরে দরজা দিয়ে বের হয়ে আসার চেষ্টা করল মাছটা। কিন্তু দরজাটা বেশ সরু, তাই পারল না। তবে দরজার সাথে বাড়ি লাগার ফলে ঝুরঝুর করে বালি খসে পড়ল দরজার ফ্রেমের চারপাশ থেকে। বাড়িটা কম করেও পঞ্চাশ বছরের পুরনো। 
‘এখন এত সময় নেই বলার, জলদি ছাদে চল!’ বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে এক লাফে তিনটে করে সিঁড়ি ডিঙিয়ে ছাদে উঠতে শুরু করলেন অনীক ভাই। বাড়িটা তিনতলাই, তাই ছাদে উঠে আসতে আমাদের চার সেকেন্ডের বেশি লাগল না। 

ছাদে এসে আমার দ্বিতীয়বার অবাক হওয়ার পালা। এক কোণে দাড়িয়ে আছে একটা কিম্ভুতকিমাকার মহাকাশযান! এক নজরেই চিনে ফেললাম, কারণ এমন চায়ের পিরিচের মতো মহাকাশযান সায়েন্স ফিকশন সিনেমাগুলোতে অনেক দেখেছি। ব্যাস হবে সাত আট ফিটের মতো। উপরে কাচের গোলাকার ঢাকনা। 

‘এ – এ কি!’ 
অনীক ভাই ততক্ষণে মহাকাশযানের উপরে গোলাকার দরজাটা খুলে ফেলেছেন। আমার কথায় কান না দিয়ে প্রথমে সুড়ুত করে ঢুকে পড়লেন ভেতরে, তারপর আমাকে হাত নেড়ে ডাক দিলেন। যাব কি যাব না – দোটানায় পড়ে গেলাম। ভাইয়ের সাথে আমি আর শুভ অনেকবার বিদঘুটে এডভেঞ্চারে গিয়েছি ঠিক, কিন্তু তার কোনোটাতেই দৈত্যাকার গোল্ডফিশ আর পিরিচাকৃতি মহাকাশযান ছিল না অন্তত। 

‘তাড়াতাড়ি আয়!’ দরজা দিয়ে মুখ বের করে আবার ডাকলেন অনীক ভাই। ‘ভয় নেই, এই স্পেসশীপও আমিই বানিয়েছি!’
হঠাৎ করে পুরো বাড়িটা থরথর করে কেঁপে উঠল। তারপরেই খেয়াল করলাম, ফাটল ধরেছে আমার পায়ের নিচের মেঝেতে। 
অনীক ভাইয়ের মহাকাশযান (পরে জেনেছি এর নাম নেলাবুলা) ততক্ষণে কেটলীর মতো তীক্ষ্ম শোঁ শোঁ শব্দ করতে শুরু করেছে। লাল নীল আলো জ্বলছে চারপাশে। যে কোনো মূহূর্তে উড়াল দেবে। আমার সিদ্ধান্ত নিতে আর বেশি দেরী হলো না। কোনোমতে হাচড়ে পাচড়ে ভেতরে ঢুকে দরজাটা আটকে দিলাম। কয়েকবার এদিক ওদিক দোল খেল নেলাবুলা, তারপর আকাশে উঠে এল। 

নিচের দিকে তাকালাম একবার। অবাক হয়ে দেখলাম, বাড়িটা ধসে পড়তে শুরু করেছে। অতিকায় কোনো এক প্রাণি লেজের ঝাপটায় গুড়িয়ে দিচ্ছে দেয়ালগুলো। ফ্যাকাসে মুখে অনীক ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ঘটনা কিভাবে ঘটল?’
‘আর বলিস না,’ চার হাত পায়ে কণ্ট্রোল সামলাতে সামলাতে জবাব দিলেন অনীক ভাই। ‘এক সপ্তাহ আগে স্বপ্নে পেয়েছিলাম কৃষ্ণগহবর বটিকার সন্ধান। কিন্তু তখন শুধু প্রস্তুতপ্রণালীই পেয়েছি, এ দিয়ে কি হবে তা বুঝতে পারিনি। গত কয়েক দিন হাতে কোনো কাজ ছিল না, তাই বানিয়ে ফেললাম জিনিসটা। সকালবেলা শুভ এসেছিল। আমি তখন রান্নাঘরে, নাস্তা বানাচ্ছি। ঘরে ঢুকে দেখি, বটিকার শিশিটা নিয়ে গাবলুর জারের মধ্যে খালি করছে গাধাটা। গাবলু দেখি রাক্ষসের মতো চেটেপুটে খেয়ে নিল। তারপর থেকেই সাইজে বাড়তে শুরু করেছে। বড় হচ্ছে, আর সামনে যা পাচ্ছে তাই গিলে ফেলছে।’

অনীক ভাই মাঝেমাঝেই স্বপ্নে নানা রকম বটিকার সন্ধান পান, এই খবর আমি জানি। কিন্তু তার কোনোটাই এমন বিধ্বংসী জিনিস ছিল না। এর আগে একবার শুধু উড্ডয়ন বটিকা বানিয়ে আকাশে উড়তে গিয়ে তিন মাস পা ভেঙে হাসপাতালে পড়ে ছিলেন। আকাশে উড়েছিলেন ঠিকই, তবে সতেরো সেকেণ্ডের জন্য। তারপর নাকি তার বটিকার এক্সপায়ারি ডেট ফুরিয়ে গিয়েছিল। 
‘শুভ কই?’
‘কোথায় আর,’ বিরক্ত মুখ করে জবাব দিলেন অনীক ভাই। ‘গাবলু গিলে ফেলেছে। তারপর আর ঘরে থাকার সাহস পাইনি, নিচে নেমে এসে তোকে ফোন দিয়েছি।’

প্রিয় বন্ধুর এমন করুণ পরিণতিতে হাসব না কাঁদব বুঝে পেলাম না। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, অনীক ভাইয়ের কথাই ঠিক। আগে যেখানে অনীক ভাইয়ের বাড়িটা ছিল, এখন সেখানে মাছটা পড়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন প্রলয় নাচন জুড়েছে। ইয়া বড় হাঁ করে এদিক ওদিক ফিরে বাতাস গিলছে, আর সামনে যা দেখছে – গিলে ফেলার মতো সাইজ হলেই গিলে ফেলছে। আমার চোখের সামনেই হঠাৎ ধাই করে দেড়গুণ বেড়ে গেল গাবলুর আকৃতি। আকারে এখন একটা তিনতলা বাড়ির সমানই হবে ওটা। কতক্ষণ ধরে চলবে এই বৃদ্ধি?

স্পেসশীপটা এতক্ষণ আকাশের পঞ্চাশ ফিট মতো উঁচুতে ভেসে ছিল। হঠাৎ মাছটা আমাদের দেখতে পেল বোধহয়, লেজে ভর দিয়ে তড়াক করে উঁচু হয়ে গিলে ফেলার চেষ্টা করল। ‘ভাই-ই-ই…’ সাবধান করলাম আমি। একদম শেষ মুহূর্তে সাঁই করে আকাশের আরও উপরে উঠে এল নেলাবুলা। 
‘এখানে থাকা নিরাপদ হবে না,’ বললেন অনীক ভাই। ‘বড় বাড় বেড়ে গেছে ব্যাটার!’

নিচের দিকে তাকিয়ে তার সাথে একমত না হয়ে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় যাবেন?’
‘বুঝতে পারছি না,’ অসহায় মুখ করে জবাব দিলেন অনীক ভাই। ‘আপাতত কিছুক্ষণ চক্কর মারা যাক। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।’ 

কিন্তু বেশিক্ষণ সেই সুযোগ পাওয়া গেল না। অবাক এবং অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখলাম, কিভাবে প্রায় প্রতি মুহূর্তে বড় হচ্ছে গাবলু। আশেপাশের তিন চারটে বাড়ি গিলে ফেলেছে ইতোমধ্যে। মনে হলো, কোনো কিছু খাওয়ার সাথেই ওটার আকার আরও বেড়ে যাচ্ছে। সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছে গায়ের লালচে আঁশগুলোতে। এক একটা আঁশের আকৃতি হবে আমাদের স্পেসশীপের সমান। মানে, ওটার সামনে এখন আমরা একটা মাছি ছাড়া কিছুই নই!

‘শাহেদ,’ হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন ভাই। ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হয়েছে ভাই?’
‘গাবলুর বাড় থামানোর কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছি না। পালাতে হবে, আর কোনো পথ নেই।’
‘পালিয়ে যাবেন কোথায়? ও ব্যাটা যেভাবে বাড়ছে, তাতে কিছুক্ষণ পরে পুরো ঢাকা শহরই গিলে ফেলবে।’
‘তাতেও থামবে না। এখন বুঝতে পারছি কৃষ্ণগহবর বটিকার নামের মানে।’
‘কি বুঝতে পারছেন?’
‘যে ওই ওষুধ খাবে, সে নিজেই জলজ্যান্ত ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে! সামনে যা পড়বে তাকেই গিলে খাবে!’
‘ব-বলেন কি ভাই…’ 
‘হ্যাঁ!’ বলেই একটা সুইচে চাপ দিলেন অনীক ভাই। সাথে সাথে মনে হলো একটা ভারী হাত আমাকে চেপে ধরেছে সিটের সাথে। দুই সেকেণ্ডের মধ্যে চারপাশে অন্ধকার নেমে এল। বুঝতে পারলাম, মহাকাশের উদ্দেশ্যে উড়াল দিচ্ছে স্পেসশীপ। 

ছয় সেকেন্ডের মাথায় পৃথিবী পরিণত হলো আমাদের নিচে ভেসে থাকা এক বিশাল নীলচে গোলকে, গায়ে সাদা সাদা মেঘের আবরণ। মাথার উপর অন্ধকারে ভেসে আছে অজস্র তারার দল। ডানপাশে দেখতে পাচ্ছি সূর্যটাকে। চোখ গোল গোল করে চারপাশে দেখতে দেখতে হঠাৎ অনুভব করলাম, খুব খিদে পেয়েছে আমার। 
‘অনীক ভাই?’
‘বল।’
‘আপনার স্পেসশীপে খাবার দাবারের কি ব্যবস্থা?’
‘ওই ড্রয়ারে দেখ একটা মিস্টার টুইস্ট আছে।’

চিপস খেতে খেতে বাইরে তাকিয়ে মহাকাশের শোভা দেখছিলাম। চারপাশে কোনো শব্দ নেই, খালি একটা নীল বাতি মাথার উপর টুই টুই আওয়াজের সাথে জ্বলছে আর নিভছে। পৃথিবীটা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে আমাদের নিচে। 

হঠাৎ একটা সম্ভাবনা মাথায় আসতে চমকে নিচে তাকালাম। চিন্তায় যে ভুল হয়নি, তা বুঝতে পারলাম সাথে সাথেই। পৃথিবীটাকে এখন একটা নীল ফুটবলের মতো দেখাচ্ছে। আর তার পাশে, অতিকায় পুটি মাছের মতো ভেসে আছে গাবলু! আমাদের চোখের সামনেই হাঁ করে গোলকটাকে গিলে ফেলল সে!
‘ভাই…’ আর্তনাদ করে উঠলাম আমি। ‘খেয়ে ফেলল তো…!’
‘দেখেছি,’ শান্ত গলায় জবাব দিলেন অনীক ভাই। ‘এটা যে হবে আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। তাই দেরি না করে মহাকাশে চলে এসেছি। এখন দেখার বিষয় এটাই যে কতক্ষণে ওর খিদে মেটে।’

কিন্তু গাবলুর খিদে মেটানোর মতো কোনো খাবার কি এই মহাবিশ্বে আছে?
মহাকাশযানটা একজায়গায় স্থির করলেন অনীক ভাই, তারপর ঘুরে তাকালেন পৃথিবীটা একটু আগে যেখানে ছিল, সে দিকে। এখন সেখানে গাবলুর ক্রমাগত ছটফট করতে থাকা দেহটা ছাড়া আর কিছুই নেই। দেখতে পেলাম, আরও বড় হয়ে উঠল মাছটার শরীর। চারপাশে যা পাচ্ছে সব গিলে ফেলছে। মঙ্গল গ্রহটাও গিলল, তারপর গিলল বৃহষ্পতি গ্রহটা। শনিগ্রহটাও গেল এরপর, বলয়সমেত। এবার সূর্যটা জ্বলছে আগুনের গোলার মতো। ওটাকেও কি…?

‘অনীক ভাই, ভাগেন…’ কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম আমি। 
মহাকাশযান আবার গতি ফিরে পেল। তীরগতিতে ছুটে চলেছি আমরা নিঃসীম মহাশূন্যের মধ্য দিয়ে, দুই পাশ দিয়ে লম্বাটে আলোর বলের মতো ছুটে গিয়ে পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে অজস্র গ্রহ নক্ষত্র। কিন্তু পেছনে তাকালে মনে হচ্ছে যেন একই জায়গায় থেমে আছি আমরা, কারণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাবলুর আকৃতি! প্রতি মুহূর্তে সব কিছু ছাড়িয়ে বড় হচ্ছে তার শরীর। সূর্যটাকে গিলে ফেলল এইমাত্র…

কিছুক্ষনের মধ্যেই বোঝা গেল, এক অসম্ভব প্রতিযোগীতায় নেমেছি আমরা। অনীক ভাইয়ের মহাকাশযানের গতি নির্দিষ্ট। অন্য দিকে গাবলু গায়েগতরে বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এক সময় আমাদের হার মানতেই হবে, ওর পেটে ঢুকতেই হবে। কি হবে তারপর? জানি না। এমন অদ্ভুত পরিণতি হবে আমাদের এত সাধের পৃথিবীর, সেই সাথে আমাদের – কে জানত?

আমার আশঙ্কা সত্যি হতে বেশি সময় লাগল না। সর্বোচ্চ গতিতে ছুটেও গাবলুর সর্বনাশা হাঁ থেকে বেশি দূরে যেতে পারছি না আমরা, বরং ক্রমেই আরও কমে আসছে আমাদের দূরত্ব। সামনে যা কিছু পাচ্ছে তাই গিলে ফেলছে গাবলু, ফলে আমাদের পেছনে এক বিশাল শূন্যতা। এই মুহূর্তে যদি পৃথিবী বলে কিছু থাকত, আর সেখানে দাঁড়িয়ে কেউ রাতের আকাশের দিকে তাকাত, নিশ্চয়ই দেখতে পেত যে একটা সরলরেখা ধরে একের পর এক তারা মুছে যাচ্ছে আকাশের গা থেকে। 

‘আর পারলাম না রে,’ হতাশ গলায় বলে কপাল থেকে ঘাম মুছলেন অনীক ভাই। 

আমি কিছু বলতে পারলাম না। সম্মোহিতের মতো কেবল তাকিয়ে রইলাম কয়েকশো আলোকবর্ষ সমান লম্বা এক মাছের দিকে। যে মাছ কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গিলে ফেলবে। 
আরও কাছে চলে আসছে গাবলু। আরও কাছে… আরও কাছে… পেছনে তাকালে এখন আর এক ক্রমবর্ধমান অন্ধকার মুখগহবর ছাড়া আর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, যার কোনো শুরু নেই, শেষ নেই… চারপাশ থেকে অন্ধকার হয়ে আসছে সব…

তারপর হঠাৎ খেয়াল করলাম, ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে মুখটা। এটা কিভাবে সম্ভব!
এক জায়গায় থেমে গেছে গাবলু। কেন? 

যথেষ্ট দূরত্ব তৈরি হতে বেশি সময় লাগল না। পেছনে ফিরে তাকাতেই এবার বুঝতে পারলাম কারণটা। আরও বিশাল এক বোয়াল মাছ কামড়ে ধরেছে গাবলুর লেজ। গাবলুর সাথে পাল্লা দিয়ে সে-ও বড় হচ্ছে, সেই সাথে গাবলুকে টেনে নিচ্ছে নিজের মুখের মধ্যে। আমাদের চোখের সামনেই এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় গোল্ডফিশটা হারিয়ে গেল তার চাইতেও বড় এক বোয়াল মাছের মুখের মধ্যে। 
‘আহারে,’ ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন অনীক ভাই। ‘গাবলুটাকে খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম।’
বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করতে পারলাম না আমি।

আরও পড়ুনঃ

গরুর হাটে একদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *