ছোট গল্প রম্য

একটি পাগলাগারদ ও কয়েকটি পাগলের গল্প

এক দেশে ছিল বিশাল এক পাগলাগারদ। দেশ বিদেশ থেকে নানা কিসিমের পাগলেরা সেই পাগলাগারদে চিকিৎসা নিতে আসত। চারদিকে অনেক নামডাক ছিল সেই পাগলাগারদের।

পাগলাগারদের মূল দায়িত্বে ছিলেন এক নামজাদা চিকিৎসক। দুষ্ট লোকেরা বলত, পাগলের চিকিৎসা করতে করতে তিনিও নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তবে দুষ্ট লোকের মিষ্ট কথায় ভুলতে নেই। পাগলরাও ভুলত না। তাদের ভেতর যারা শিক্ষিত পাগল ছিল তারা বলত, ওস্তাদের মাথায় গ্যাস্ট্রিক থাকতে পারে, তয় ওস্তাদ পাগল না। অশিক্ষিত পাগলরা তাদের কথা শুনে ঠিক ঠিক বলে ঘাড় নাড়ত।

এইভাবে সবকিছু ভালই চলছিল। কিন্তু একটা ছোট্ট সমস্যা ছিল। সেটা হচ্ছে, পাগলাগারদের চিকিৎসা খরচ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু পাগলেরা কিছু বলতে সাহস পেত না। কেউ কিছু বললেই তাকে মানসিক ভাবে সুস্থ বলে বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হত। আর পাগলরাও কেউ সুস্থ না হয়ে বাইরে যেতে চাইত না। ফলে মুখ বুজে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। প্রধান পাগল, থুক্কু, প্রধান চিকিৎসক এর অধীনে যে সমস্ত পাগলরা, থুক্কু, চিকিৎসকরা কাজ করতেন তাদের ভিতর একজন একটি অমর বাণী প্রসব করেছিলেন। তার সেই বাণী গারদের প্রধান ফটকে সোনার অক্ষরে বাধিয়ে রাখা হয়েছিল। বাণীটি ছিল- ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা গরীব পাগলদের জন্য নয়। আর পাগল হলে কি হবে, সবার প্রেস্টিজ জ্ঞান ছিল সেই মাপের উঁচু। সুতরাং কেউই নিজেকে গরীব প্রমাণ করতে চাইত না।

তবে গন্ডগোল একদিন একটা বাধল। এক পাগলের মাথায় কিভাবে যেন ঢুকে গেল, এত খরচ দিয়ে চিকিৎসা করানোটা একটা পাগলামীর পরিচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সে আস্তে আস্তে বাকি পাগলদের সংগঠিত করতে লাগল। ওস্তাদ আমাগোরে পাগল পাইয়া আমাগো পয়সা হাতায়া নিতাছে- এই বলে সবাইকে ক্ষেপিয়ে তুলল। বাকিরাও তখন চিন্তা করল, সত্যিই তো, আমরা তো আসলেই অনেক খরচ দিই। যে করেই হোক এই খরচ কমাতে হবে। এই ভেবে তারা একদিন প্রধান চিকিৎসক এর চেম্বার ঘেরাও দিল। তারা দাবি করল, খরচ কমাতেই হবে। ওস্তাদের পাগলামী, মানি না মানব না; পাগলামীর কোন ধনী-গরীব নাই ইত্যাদি ইত্যাদি স্লোগানে তারা আকাশ বাতাস ভারি করে তুলল।

ওস্তাদ, অর্থাৎ প্রধান চিকিৎসক তখন নিজের চেম্বারে বসে ছিলেন। বাইরে চিল্লাপাল্লার আওয়াজ শুনে তিনি জানালা দিয়ে উকি দিলেন। এত পাগল একসাথে দেখে তার গলা শুকিয়ে গেল। তিনি তার অধীনস্ত চিকিৎসক দের নিয়ে বাইরে এসে হুমকি ধামকি দিয়ে পাগলদের নিরস্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পাগলরা শুনল না, বরং আঁচড়ে কামড়ে দেয়ার ভয় দেখাতে লাগল। প্রধান চিকিৎসক এর দীর্ঘ চল্লিশ বছর পাগল সামলানোর অভিজ্ঞতা। পাগলরা যে একবার কামড়ালে আর ছাড়ে না তা তিনি ভালই জানেন। উপায়ন্তর না দেখে তিনি পাগলদের দাবি মেনে নিলেন।

পাগলরা তো দারুণ খুশি। সবাই নাচানাচি করে গান গেয়ে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করতে লাগল। পাগলাগারদের প্রধান পাহারাদারের আবার এইসব নাচানাচি একটুও সহ্য হচ্ছিল না। কারণ বাড়তি যে খরচ পাগলাগারদের তহবিলে জমা হত, তার একটা ভাগ সেও পেত। কিন্তু এখন আর সেই ভাগ পাবে না, এই ভেবে তার মাথায় আগুন ধরে যাচ্ছিল। সে কয়েকটা পাগলকে ডেকে বলল, তোগো পাগলামি ক্যামনে ছুটাইতে হয় আমি জানি। ঠ্যাং ভাইঙ্গা হাতে ধরাইয়া দিলেই তোরা সোজা হইয়া যাবি।

তার এই হুমকি শুনে পাগলরা আবার ক্ষেপে গেল। তারা সবাই মিলে এক হয়ে পাহারাদারকে তাড়া করল। পাহারাদার যে গাধায় চড়ে পাহারাদারি করে বেড়াত সেটার পাছায় লাথি মেরে এলাকা থেকে ভাগিয়ে দিল। গাধাটা ছিল পাহারাদারের খুব আদরের। প্রিয় গাধার এই হাল দেখে পাহারাদার দারুণ রেগে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে প্রধান চিকিৎসকের কাছে নালিশ দিল। বলল, আমার গাধা ফিরায়ে দেন। না হইলে আপনে কেমনে পাগলাগারদ চালান আমি দেইখা নিমু।

সবেমাত্র পাগলদের একটা পাগলামির কাছে হার মেনে প্রধান চিকিৎসকের মাথা এমনিতেই গরম হয়ে ছিল। তার উপর পাহারাদারের এহেন নালিশ শুনে তার আর সহ্য হল না। তিনি ঠিক করলেন পাগলের ডাক্তারী ছেড়ে দেবেন। যতদিন না পাহারাদারের গাধা খুঁজে আনতে না পারছেন ততদিন পাগলাগারদ বন্ধ।

সাথে সাথে পাগলাগারদের প্রধান ফটকে এই নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়া হল। হঠাৎ করে পাগলাগারদ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাগলরা পড়ল বিপদে। তারা কোথায় যাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। শেষে যে যার মত দেশের বিভিন্ন যায়গায় চলে গেল। কিন্তু তাতে কি হবে, তাদের পাগলামি তো ঠিক হল না। তারা এক এক জন এক এক রকম পাগলামি করতে লাগল। আর নানা রকম স্লোগান ছড়াতে লাগল। সুস্থ থাকা সমাধান নয়, চল সবাই পাগল হই; পাগলামির কোন বয়স নাই, পাগল হওয়ার লাইসেন্স চাই- আরো অনেক রকম স্লোগান। তাদের স্লোগান আর পাগলামির ঠেলায় দেশের বাকি লোকজনেরও পাগল হওয়ার দশা হল।

শেষ পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে দেশের রাজা প্রধান চিকিৎসককে তলব করলেন। তিনি তখন পাহারাদারের গাধা কোথায় খুঁজবেন এই চিন্তায় মাথার অবশিষ্ট চুলগুলো ছিড়ছিলেন। রাজার তলব পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে হাজির হলেন। রাজা তাকে এয়সা ধমক দিয়ে বললেন, এক্ষুনি তোমার পাগলাগারদ চালু কর। না হলে কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে পাগলদের রাজা হতে হবে। তখন কিন্তু তোমার খবর আছে বললাম! রাজার ধমক খেয়ে প্রধান চিকিৎসক গাধা খোঁজা বাদ দিলেন। তিনি আবার রাজ্যে ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন, পাগলাগারদ আবার খোলা হবে। পাগলরা যে যেখানে আছে, সবাই যেন পাগলাগারদে ফিরে আসে।

এই খবরে পাগলদের মাঝে খুশির বন্যা বয়ে গেল। সবাই শুভদিন দেখে আবার পাগলাগারদে ফিরে এল। পাগলাগারদের পাহারাদার তাদের দেখে মনে মনে দারুন বেজার হলেও মুখে কিছু বলার সাহস পেল না। সব পাগল আবার সুখে শান্তিতে পাগলামির চিকিৎসা নিতে লাগল।

সুখে থাকতে পারলেন না কেবল প্রধান চিকিৎসক। তিনি নাকি মাঝে মাঝেই দুঃস্বপ্ন দেখেন, একটা গাধা তার দিকে তাকিয়ে বড় বড় দাঁত বের করে হাসছে। আর সুখে থাকল না সেই পাহারাদার। পাগলরা তাকে দেখলেই ঢিল মারে। সে কারও কাছে কিছু বলতেও পারে না, কিছু করতেও পারে না। কি বলবে, সব তো পাগল! পাগলদের কি কিছু বলা যায়, না তারা কারও কথা শোনে!!!

(এই গল্পের সকল স্থান, কাল, পাত্র এবং বর্ণিত সমস্ত ঘটনা একেবারেই কাল্পনিক। জীবিত, মৃত বা ভবিষ্যতে জন্ম নেবে এমন কারও সাথে এই গল্পের কোন কিছু মিলে গেলে তা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র।)

আরও পড়ুনঃ

শমশের বখশ এবং একটি প্রতিবেদন

ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ফেসবুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *