ছোট গল্প ভৌতিক

জোবেদ আলির ভুল

কাদামাখা পায়ে লেগে থাকা সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে বাড়ি ফিরছিল জোবেদ আলি। নতুন ফসল লাগানো জমিতে সারাদিন নিড়ানি দিয়েছে সে। সামান্য দু’বিঘে জমি তার, সারাবছরের খোরাকি জোগাতে গিয়ে চাষি আর জমি-দু’জনেই হাঁপিয়ে ওঠে। বুড়ো বুড়ির সংসার, দিনমানে ভিটেয় কাকপক্ষীর অবাধ আনাগোনা আর রাতে শেয়ালের হুক্কাহুয়া।

একটা মেয়ে ছিল, তিন বছর আগে বড় ঘর দেখে অনেক শখ করে বিয়ে দিয়েছিল। গেল বছর এই সময়েই তো? হ্যাঁ, খবর এল মেয়ে ডুবে মরেছে। তড়িঘড়ি করে গিয়েও মরা মেয়ের মুখটা দেখতে পায়নি জোবেদ আলি। গ্রামের লোকজন কানাঘুষো করত মেয়েটাকে নাকি শশুরবাড়ির লোকজন খুন করেছে, তারপর লোক জানাজানি হওয়ার ভয়ে তাড়াহুড়ো করে মাটিচাপা দিয়েছে।

এসব খবর বা কথাবার্তা কোনটাই ইদানীং জোবেদ আলিকে স্পর্শ করে না। ভোরে উঠে পান্তা খেয়ে মাঠে যায়, সারাদিন মাঠের ভাঙ্গাচোরা শ্যালো মেশিনটার মত মুখ বুজে কাজ করে। দুপুরে কোনদিন খায়, কোনদিন খায় না। খাওয়া না খাওয়ার তফাত বুঝে উঠতে পারে না তার শরীর ইদানীং।

মাঠ পেরিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় উঠে এল জোবেদ আলি। সন্ধ্যার পর এখন রসুলপুর বেশ নির্জন। অন্যান্য দিন দু’এক জন মুসল্লীকে মাটির মসজিদটায় নামায পড়তে যেতে বা নামায পড়ে ফিরে আসতে দেখা যায়। সহানুভূতিশীল গলায় কেউ কেউ জোবেদ আলিকে ডেকে বলে বসে, ‘আর কত? এইবার এট্টু আল্লাখোদার নাম লও মিয়া। মাইয়াডার লাইগা দোয়া-খায়েরও তো করন লাগে, না কি মিয়া?’
জোবেদ আলি জবাব দেয় না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মুসল্লী কাঁধ ঝাকিয়ে আবার হাটা ধরলে সেও নিজের পথ ধরে।

কিন্তু আজ রাস্তায় জনমানুষের কোন চিহ্ন নেই। আবছায়া সন্ধ্যের আলোয় পথের পাশে দু’একটা খেজুরের চারা, আঁশশ্যাওড়া, ভেটুল আর ফণীমনসা ভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকে। ধূলোমাখা পথে জোবেদ আলির শির বের করা পায়ের ছাপ পড়ে কি পড়ে না।

তেরাস্তার মোড়ে বিশাল বটগাছটার নিচে এসে জোবেদ আলি একটু দাঁড়ায়। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে এখানে। হাটুরে আর বিক্রেতাদের কেনাবেচা আর হইহল্লায় দুপুর আর সন্ধ্যের মাঝামাঝি সময়টা সরগরম থাকে। আজ কি বার মনে করার চেষ্টা করে জোবেদ আলি। হাটবার তো অবশ্যই নয়। কিন্তু মাথাটাও হঠাৎ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে, কিছুতেই মনে মনে হাঁতড়ে বেড়ানো প্রশ্নটার জবাব দিতে চায় না।

বটগাছের পেছনে প্রায়ান্ধকার ঝোপঝাড় থেকে হঠাৎ করে উদয় হয় কয়েকটা কুকুর। গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা কিছু নেড়ি কুকুর আছে। হাত নেড়ে চুক চুক করে ডাকলে ল্যাজ নেড়ে ছুটে আসে, লাথি মারলে কেউ কেউ করে অভিযোগ জানিয়ে দূরে পালায়। জোবেদ আলি ঠাহর করার চেষ্টা করে এরা সেই কুকুরগুলো কিনা, বুঝতে পারে না। কুকুরগুলো কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে জোবেদ আলির দিকে তাকিয়ে থাকে। জোবেদ আলিও তাকিয়ে থাকে। তার মাথায় ছেঁড়া ক্যাসেটের ফিতের মত আজ কি বার বিষয়ক প্রশ্নটা ঘুরপাক খায়। মানুষ আর সারমেয়’র মধ্যে নীরব দৃষ্টি বিনিময় চলতে থাকে।

একটা কুকুর হঠাৎ ঘেউ ঘেউ শব্দে সন্ধ্যার নীরবতা চিরে দিয়ে জোবেদ আলির দিকে ছুটে আসে। সেটার দেখাদেখি বাকিগুলোও। জোবেদ আলি আতকে উঠে পিছু হটে। কুকুরগুলোর চোখে শূন্য দৃষ্টি পিদিমের নিষ্প্রভ শিখার মত জলজল করে, তারা চিৎকার করতে করতে জোবেদ আলির দিকে ছুটে আসে।

জোবেদ আলি ঘুরে একটা দৌড় লাগায়। কুকুরগুলো পিছু ছাড়ে না, ফলে জোবেদ আলির দৌড়ও শেষ হয় না। জোবেদ আলির একবারও মনে হয় না কুকুরগুলোর তাকে ধাওয়া করার ভেতর অস্বাভাবিক কিছু আছে। সে প্রাণপনে মসজিদটার দিকে ছুটতে থাকে। মসজিদের ভেতর আশ্রয় নিয়ে হয়তো কুকুরগুলোর হাত থেকে বাঁচা যাবে। সে মনে মনে গালি দেয়, শালার কুত্তার বাচ্চা!

দৌড়াতে দৌড়াতে জোবেদ আলির হঠাৎ খেয়াল হয়, এ তো মসজিদের রাস্তা নয়? পথ ভুল করে গ্রামের উল্টোদিকে শ্মশানঘাটের রাস্তায় চলে এসেছে সে। রাস্তার পাশে হঠাৎ একটা ডোবাপুকুর দেখা যায়। জোবেদ আলি ভাবে পুকুরটায় নেমে দাঁড়িয়ে থাকবে। কুকুরগুলো নিশ্চই পানিতে নামবে না।

পুকুরের পাড়ে এসে দাঁড়াতেই উল্টোদিকে ঝপাস করে একটা শব্দ হয়, মনে হয় কে যেন লাফ দিল, বা ভারি কিছু একটা পানিতে পড়ল। জোবেদ আলি ঘোর লাগা মানুষের মত পুকুরের পাড়ে কাঁটাঝোপ ঠেলে অপর পাড়ের দিকে এগিয়ে যায়। পেছনের কুকুরগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে ইতোমধ্যে, কিন্তু জোবেদ আলির খেয়াল সেদিকে যায় না।

পুকুরের উল্টোদিকে এসে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার আবছায়া অন্ধকারে জোবেদ আলি দেখতে পায়, লাল ডুরে শাড়ির মত কিছু একটা ভাসছে পানিতে। তার মাঝে ওই মুখটা, খুব চেনা চেনা লাগে তার। বিমূঢ় গলায় সে প্রশ্ন করে, ‘ক্যাডা? আমিনা রে, মা আমার?’

ডুরে শাড়ি পরা পরিচিত মুখের মালিক প্রথমে কোন জবাব দেয় না। জোবেদ আলি অসংলগ্ন পায়ে পানিতে নামতে থাকে। এক পা দু’পা করে। এই ভর সন্ধ্যেয় তার মেয়ে আমিনাকে এই পুকুরে কেন দেখা যাবে, সে যে এক বছর আগেই মারা গেছে এসব প্রশ্নের কোনটাই উঁকি দেয় না তার মনে। তার ঘোর লাগা মস্তিষ্কে একটা কথা ঘুরতে থাকে শুধু, মেয়েটাকে তার শশুরবাড়ির লোকজন মেরে ফেলার আগেই বাঁচাতে হবে।

ডুরে শাড়ি জড়ানো মুখটা হঠাৎ খুব পরিচিত, ব্যাকুল গলায় বলে ওঠে, ‘বাজান, ওরা আমারে মাইরা ফালাইবো। তুমি আমারে বাঁচাও!’

জোবেদ আলি আর দেরি করে না। ঝপ ঝপ করে পুকুরের পানি ঠেলে নেমে যায়। সন্ধ্যের অন্ধকারে তার রোদে পোড়া হাড় জিরজিরে পাকানো দড়ির মত শরীরটা ধীরে ধীরে পুকুরের পানিতে অদৃশ্য হয়ে যায়।

পরদিন সকালে ফজরের আজান শুনে মসজিদের দিকে যাওয়া একদল মুসল্লীর চোখে পড়ে জোবেদ আলির লাশটা। দু’হাত দুদিকে ছড়িয়ে উপুড় হয়ে ডোবার পানিতে ভাসছে। তারা তাড়াতাড়ি করে পানিতে নেমে লাশটা তুলে আনে। চোখ দুটো মাছ বা অন্য কিছুতে ঠুকরে খেয়ে ফেলেছে।

গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার আফসার এসে সব দেখে শুনে বিজ্ঞের মত একবার ভাঙ্গা ডাঁটির চশমাটা চেপেচুপে নাকের উপর বসায়। ‘সইন্ধ্যাবেলা মনে হয় হাত মুখ ধুইতে পুকুরে নামছিল। এই সময় করছে হার্ট ফেল। ব্যস, জায়গাতেই শ্যাষ।’

গ্রামের তরুণ যুবকেরা আফসারের কথা শুনে নিজেদের মধ্যে মাথা নাড়ানাড়ি করে। মুরব্বীরা গম্ভীর হয়ে যায়, কেউ কেউ কাঁচা পাকা দাড়িতে আঙ্গুল চালিয়ে ইন্নালিল্লাহ পড়ে। জোবেদ আলির বিধবা বুড়ি স্বামীর লাশের পাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদে। গ্রামের লোকজন নির্লিপ্ত চোখে সেদিকে চেয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *