ফিচার

মির্জা গালিবঃ চিরবিরহকাতর কবি

২২০ বছরে পা দিলেন মির্জা গালিব।
ব্রাউজার ওপেন করতে ভেসে উঠল গুগলের একটা ডুডল। লম্বা টুপি আর আলখাল্লা পরা একটা লোক পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে আছে, পাশের আকাশে চাঁদ বা সূর্য – কিছু একটা হবে। বেশ কৌতুহল হলো – কে লোকটা? কাকে নিয়ে গুগলের আয়োজন আজকে? ছবিটার উপর ক্লিক করতেই পরের পেজে বেশ কিছু সার্চ রেজাল্ট ভেসে এল, তার মধ্যে প্রথমটা মির্জা গালিবের উইকিপিডিয়া পেজের। বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। আজ এই প্রিয় কবির জন্মদিন, অথচ আমি ভুলেই বসে আছি।

কাকতালীয়ভাবে কয়েকদিন আগেই মির্জা গালিবের উপর একটা ছোট্ট বই পড়লাম – গালিবিয়াৎ। লিখেছিলেন শেখ মিরাজুল ইসলাম নামের একজন লেখক। ছোট পরিসরে লেখা বইটিতেই তিনি তুলে এনেছেন গালিবের জীবন, উত্থান এবং পতন, কবিতা এবং জীবন দর্শনের সারাংশ। সেই বইটি থেকে জানা তথ্যগুলো, সেই সাথে বিভিন্ন সময়ে অন্তর্জাল এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্যগুলো মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে লিখতে বসলাম গালিবের প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলী।

গালিবের জন্ম হয়েছিল ১৭৯৭ সনের আজকের এই দিনে, মির্জা মুহম্মদ আসাদুল্লাহ খান নাম নিয়ে – গালিব ছিল তার পরবর্তীতে গৃহিত নাম। তার মৃত্যু হয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহের ১২ বছর পর, ১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। সেটা ছিল এমন এক সময় যখন বৃটিশ রাজ ধীরে ধীরে জেঁকে বসছে উপমহাদেশে, মুঘল শাসন অস্তগামী, আর বিশাল ভারতের টুকরো টুকরো রাজ্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিবদমান। পরিত্যক্ত শহর আগ্রার কালা মহল এলাকায় জন্মেছিলেন তিনি। খুব সহজেই আন্দাজ করে নেয়া যায় যে এমন সময় কখনও কবি বা শিল্পীদের অনুকূলে থাকতে পারে না। মানুষ তখন সবাই নিজের পেটের চিন্তায় ব্যস্ত, মন বা মস্তিষ্কের খোরাক বলেও যে একটা ব্যাপার থাকতে পারে তা সবাই ভুলতে বসেছে। তবুও তখনও ক্ষয়িষ্ণু প্রদীপের শিখার মতো একটা শিখা জ্বলছিল – দিল্লীতে, মুঘল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের আস্তানায়। তিনি তখনও কবি সাহিত্যিকদের সাধ্যমতো সমাদর করার চেষ্টা করেন। নিজের কবিতা নিয়ে গালিব ছিলেন খুবই অহংকারী – অন্য কোনো পথে তাকে দিয়ে উপার্জন করা সম্ভব হবে না – এই ছিল তার বিশ্বাস। তাই তিনি করলেন কি, তল্পি তল্পা গুছিয়ে হাজির হলেন দিল্লীতে। সেখানে বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে সম্রাটের দরবারে জায়গায় পেয়ে গেলেন। এখানে কিছুকাল তিনি সুখের দেখা পেয়েছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত মদ্যপান এবং জুয়ার অভ্যাস তাকে দীর্ঘ সময়ের স্বস্তি দেয়নি কখনই। সাংসারিক জীবনেও একান্ত অসুখী ছিলেন তিনি, তেরো বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু সাত সন্তানের কেউই খুব বেশি দিন বাঁচেনি। তার জীবনের এই বিয়োগান্তক, বেদনাবিধূর দিকগুলোর কারণেই খুব সম্ভব তার কবিতা এমন মর্মস্পর্শী, হৃদয়গ্রাহী।

বলা আছে যে গালিব কবিতা লিখতে বসতেন সন্ধ্যার পর, মদ্যপানরত অবস্থায়। একটি করে লাইন লেখা শেষ হওয়ার পর একটি করে গিঠ দিতেন, সকালে উঠে সেগুলো গুনে দেখতেন কতখানি লিখেছেন। প্রথম দিকে তার কবিতা হতো খুবই দুর্বোধ্য। এর একটি কারণ ছিল যে তার প্রিয় ভাষা ছিল ফার্সি, আর দিল্লীর মানুষের কথ্য ভাষা এবং সাহিত্যের সাধারণ মাধ্যম ছিল উর্দু। পরে তিনি উর্দুতেও অনেক লিখেছেন, কিন্তু সেই স্বাথে এটাও স্বীকার করেছেন যে ফার্সিই তার প্রথম প্রেম। সমালোচকদের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই কড়া ভাষায় আক্রমণ করে গেছেন, বলেছেন – আমার কবিতার যদি কোনো অর্থ না থাকে তাহলে তা নিয়ে আমি তোয়াক্কা করি না। কিন্তু আজও মানুষ তার কবিতায় নিজেদের অন্তরের হারানো ভাষা খুঁজে পায়, পথ দেখতে পায়।

গালিবকে একবার জিজ্ঞেস করা হলো, তার সকল লেখার সারাংশ কি? তিনি বললেন, তার কাব্যসমগ্রের সম্পূর্ণ নির্যাস কেবল এই দুটি লাইনেই নিবদ্ধ –
তুম মেরে পাস হোতে হো গ্যায়ে
যব কোই দুসরা নেহি হোতা
অর্থাৎ,
তুমি আমার সঙ্গেই থাকো, যখন
আর কেউ থাকে না পাশে।

গালিব আমার প্রিয় এই জন্য যে তার কবিতায় কেবল প্রেম ভালবাসা নয়, বরং দার্শনিক প্রশ্ন উঠে এসেছে একের পর এক। তার কবিতাগুলো থেকে বিভিন্ন স্তরের অর্থ আলাদা করা যায় – যেমন প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, ঈশ্বরের স্বরূপ সন্ধান ইত্যাদি। তাকে নাস্তিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলেও তিনি বলেছেন, যদি ঈশ্বর দুজন হতে পারে, তাহলে চারজনও হতে পারে। অর্থাৎ, ঈশ্বর যে এক এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

আজীবন নিজের জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগে গেছেন গালিব। ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত বংশের মানুষদের মতো তারও ছিল সম্পদের প্রাচুর্যে অবগাহন করার সুতীব্র ইচ্ছা, কিন্তু সময় এবং জীবন তাকে সেই সাধ পূর্ণ করতে দেয়নি।

হাজারো খোয়াইশে এ্যায়সে কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে
বহত নিকলে মেরে আরমাঁ লেকিন ফির ভি কম নিকলে
অর্থাৎ,
কত না বাসনা মনের গভীরে, প্রতিটিই যার সুতীব্র
কতগুলো তার পূরণ হলো ঠিক, তবুও তো সাধ মিটল না

গালিবকে কেউ বলেন নাস্তিক কবি, কেউ বলেন মদ্যপ কবি, কেউ বলেন ব্যর্থ কবি। যদিও শেষোক্ত উক্তিটি এখন আর শোনা যায় না, কারণ তিনি আর যাই হোন না কেন, কবি হিসেবে যে সফল – সে কথা এখন পুরো পৃথিবীর সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছেই স্বীকৃত। তা না হলে সে ব্যক্তির পক্ষে কি করে এমন কথা বলা সম্ভব ছিল?
না থা কুছ তো খুদা থা, কুছ না হোতা তো খুদা হোতা
ডুবায়া মুঝ কো হোনে নে, না হোতা ম্যায় তো কিয়া হোতা?
……
যখন আর কিছুই ছিল না তখন স্রষ্টা ছিল, যদি কিছু
না-ও থাকত তবু স্রষ্টা থাকত
আমার অস্তিত্বই আমাকে ডোবাল,
যদি আমার অস্তিত্ব না থাকত তবে কি হতো?

অথবা,
গম-এ হাসতি কা আসাদ কিস সে হো জুয মার্গ ইলাজ
শামা হার রাঙমে জ্বলতি হ্যায় শেহের হোতে তক
……
মৃত্যু ছাড়া হে আসাদ, আর কিসে এই দুঃখময় জীবন থেকে মুক্তি মেলে?
ভোর হওয়ার আগ পর্যন্ত হাজার রঙে জ্বলে যেতে হয় মোমের বাতিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *