ছোট গল্প

মুক্তিপিপাসা

ঝকঝকে রোদে ধুয়ে যাওয়া পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকিয়ে যদি কারও সেখানে মাথা পেতে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে তাহলে কি তাকে পাগল বলা উচিত?

রাস্তার দুই ধারে যত দূর চোখ যায় দাঁড়িয়ে আছে সবুজ গাছের সারি। কি নাম গাছগুলোর? জানা নেই। জানতে ইচ্ছাও করছে না। আশেপাশে কেউ থাকলে জিজ্ঞেস করে নেয়া যেত। না থাকায় অবশ্য ভালই হয়েছে। মানুষ থাকলে এখন আমার ইচ্ছাটা পূরণ করতে দিত না নিশ্চয়ই। রাস্তার উপর মাথা পেতে শুয়ে থাকার ইচ্ছা।

উপরে তাকালাম একবার। মেঘমুক্ত ঝলমলে নীল আকাশ। কিনারগুলোতে ভেসে আছে দুই এক টুকরো তুলোর মতো সাদা মেঘ। মেঘের সাথে যে মানুষের মনের মিল আছে সেটা কি কেউ খেয়াল করে? সাদা রঙের পেজা তুলোর মতো মেঘগুলো দেখলে মন হালকা হয়ে যায়। বর্ষার কালো মেঘের প্রভাবটা আবার অন্য রকম, দেখলেই মন ভারি হয়ে আসে। কি অদ্ভুত! যে প্রাণীর জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সব কিছুই মাটির বুকে, তার মন আকাশের মেঘ দেখে প্রভাবিত হবে কেন?

দুই বিভাগীয় শহরের মধ্যে যোগাযোগের মূল ধমনী এই হাইওয়ে। এখানে যে গাড়িগুলো চলাচল করে তার কোনোটারই গতি আশির নিচে থাকে না। একটানা বহু দূর চলে গেছে পথ, কোথাও একচুল বাঁকও নেই। চালকরা তাই মনের সুখে গতি তোলে। দ্রুত গতি একটা নেশার মতো। ছোট ছোট বাচ্চাদেরও দুই হাতে আকাশের দিকে ছুড়ে দিলে আনন্দে খলখল করে হেসে ওঠে, সেটাও কি গতির আনন্দ নয়? আমার বেশ অসুস্থ একটা আনন্দের মতো অনুভূতি হচ্ছে। একটু পরেই এমন গতি-আসক্ত কোনো এক ড্রাইভারের আনন্দে এক পোচ দুঃখের কালি লাগিয়ে দেবো। তারপর তার চেহারাটা কেমন হবে সেটা দেখার অবশ্য সুযোগ হবে না, কিন্তু অসুবিধে কি? কল্পনাশক্তি নামের ক্ষমতাটা মানুষকে কি শুধু শুধু দেয়া হয়েছে?

ওই দেখা যায়, দূরে, একটা বাস ছুটে আসছে। কি দ্রুত, অথচ নিশ্চিত গতিতে। ঠিক মৃত্যুর মতো। তফাতটা হলো, মৃত্যুকে দেখা যায় না। এই বাসটাকে দেখা যাচ্ছে। আমি যদি ধরে নিই যে ওই বাসটাই আমার মৃত্যু, তাহলে কি দাঁড়াল? মৃত্যুকে আমি দেখতে পাচ্ছি। বাহ! কোথায় যেন পড়েছিলাম যে এক একটা মানুষ নাকি এক এক রূপে মৃত্যুকে দেখে। আমার জন্যে কি এই চেহারাই বরাদ্দ করেছে সে? একটা চার চাকার গাড়ি, যার কপালের উপর বড় বড় অক্ষরে একটা বাস কোম্পানির নাম লেখা? একটু পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে সেটা। এই পৃথিবীর সব কিছু দেখা হয়ে গেছে, এবং বুঝে গেছি যে মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ একা, যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের, মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা… আবুল হাসান আর জীবনানন্দকে একই পঙক্তিতে গাথার এই আস্পর্ধাকে কি দুই কবি ক্ষমা করবেন? একটু পরেই নিশ্চয়ই তাদের সাথে দেখা হবে। তখন না হয় সরাসরিই জিজ্ঞেস করে নেবো?

শেষবারের মতো একবার তাকিয়ে দেখে নিলাম চারপাশটা। আকাশ, গাছপালা, মরা সাপের মতো সুদীর্ঘ শরীর নিয়ে শুয়ে থাকা আন্তঃবিভাগীয় মহাসড়ক, আকাশের কোণে কোণে ভেসে বেড়ানো টুকরো টুকরো মেঘ… এবং উপলব্ধি করলাম, সব কিছু কি অসহ্য রকমের একঘেয়ে! বিরক্তিকর! এই সব কিছুই নাকি একজনের সৃষ্টি? তার সাথেও কি দেখা হবে মরার পর? তাকে কি জিজ্ঞেস করতে পারব, আরেকটু যত্নে এসব কিছু গড়তে কি তিনি পারতেন না? তেমন কিছু না হলেও অবশ্য সমস্যা নেই। এই শরীরের বন্ধন, ত্রিমাত্রিক জগতে আটকে থাকার দুর্বিষহ যন্ত্রণা থেকে তো মুক্তি পাওয়া যাবে। আর যন্ত্রণা কেবল বন্দী হয়ে থাকার – তা বললে কিছুই বলা হবে না। এই যন্ত্রণা নিজেকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা, নিজের অস্তিত্ব আরেকজনের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার যন্ত্রণা। আরেকজনের চিন্তাকে নিজের মধ্যে ধারণ করা, নিজের চিন্তাগুলোর রূপ চোখের সামনে বদলে যেতে দেখার কষ্ট কতখানি, সেটা কি নশ্বর মানুষ কোনো দিন বুঝতে পেরেছে? এই যে কবিতার লাইনগুলো একটু আগে ঘুরে গেল মাথার মধ্যে, কোথা থেকে এল ওরা? ওরা আমার কারাগারের এক একটা দেয়াল তৈরির ইট, লোহার এক একটা শিক।

কাছে চলে এসেছে বাসটা। গতি কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না – ঠিক যেমনটা আমি চেয়েছি। আরও দুই মুহূর্ত অপেক্ষা করলাম, তারপর হঠাৎ করেই একটা লম্বা পা ফেলে এসে দাঁড়ালাম কালো পিচের উপর। চোখের নিমিষে আমার কাছাকাছি চলে এল বাসটা। ড্রাইভারের চেহারাটাও স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি। বড় বড় হয়ে উঠেছে চোখগুলো, এই উপলব্ধি সবে ভর করতে শুরু করেছে যে একটা জলজ্যান্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার উপর, এবং এখনই তাকে পিষে দিয়ে চলে যাবে বাসের চাকাগুলো, এবং তাকে বাঁচানোর কোনো উপায়ই নেই, যদি তেমন কোনো চেষ্টা করা হয় তাহলে ঝুঁকির মুখে চলে যাবে বাসের সবগুলো যাত্রীর প্রাণ, সেই সাথে ড্রাইভারের নিজের প্রাণটাও… এ এক অদ্ভুত দোলাচল, এক দুরূহ অংক, যার কোনো সমাধান নেই… তাই নিয়তি নির্ধারিত “অমীমাংসিত” উত্তরটাই শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়ে সব কিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে হবে…

তীব্র এক ধাক্কা অনুভব করলাম আমি, তারপরই দেখলাম শূন্যে ভাসছি। এক মানবাকৃতি মিসাইলের মতো উড়ে যাচ্ছে আমার দেহটা, দুই হাত ছড়িয়ে গেছে দু দিকে। কোনো অদৃশ্য ফটোগ্রাফার যদি এই মুহূর্তে আমার একটা পোর্ট্রেট ছবি তুলত, তাহলে সেখানে দেখা যেত হাসি ফুটেছে আমার মুখে, যেন বিজয়ের আনন্দে। সেই হাসিটা ধরে রেখেই অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমি।

কতক্ষণ পর, কত দিন পর বা কত মুহূর্ত পর – মনে নেই – মনে থাকার কথাও নয়, এখন তো সময়ের হিসাব অর্থহীন হয়ে গেছে আমার কাছে। তাই যদি এক মুহূর্তের কথা বলি, তাহলে ভুল হবে না, আবার যদি বলি যে অযুত নিযুত কোটি বছর পেরিয়ে গেছে এর মধ্যে, তাহলেও তা সঠিক। সেই অপরিমেয়, অন্তহীন সময় সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এক সময় আবিষ্কার করলাম, এক পাশে দেখা যায় এক টুকরো আলো। এ কি? এ তো সূর্য। আমার চেনা গ্রহ পৃথিবীর প্রাণদাতা, সূর্য নামের এক নক্ষত্র। কেন আমি সূর্যকে দেখতে পাচ্ছি এখানে? পার্থিব জগতের কিছুই তো এখানে থাকার কথা নয়?

আমার বিস্মিত চোখের সামনে – চোখ বলা ভুল হলো, কারণ এখন আমার শরীর বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই – কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি ঠিকই। তাই বলা যায় আমার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে দিগন্ত রেখার সৃষ্টি হলো, তার উপর দিয়ে উঠে এল সূর্য, তারপর অবিশ্বাস্য গতিতে উপরে উঠে স্থির হলো ঠিক সেই জায়গায়, বাসের নিচে ঝাপ দেয়ার আগে আকাশের যেখানে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। তার উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল দশ দিকে, তীব্র সাদাটে আলোতে আলোকিত হলো নিকশ কালো অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্য দিয়ে যে জায়গাটা বেরিয়ে এল, তা আমার খুব চেনা। গাঢ় নীল রঙের মেঘশূন্য আকাশের নিচ দিয়ে মরা সাপের মতো দুই দিকে চলে গেছে আন্তঃবিভাগীয় হাইওয়ে, তার উপর দিয়ে হুঁশহাশ করে ছুটে যাচ্ছে দূর পাল্লার বাসগুলো। পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে নাম না জানা গাছের সারি, মাথা দোলাচ্ছে বাতাসের ঝাপটায়। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আবারও রূপ বদলেছে আমার কারাগার। মাথার চুলগুলো ছোট ছিল, এখন কোমর পর্যন্ত লম্বা। শরীর কমনীয় হয়েছে আগের চাইতে, পেশীগুলোও দুর্বল। বদলে গেছে পোশাকের রঙ, ধরন। আগে ছিলাম পুরুষ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত, এখন হয়েছি নারী। কিন্তু এই রূপ বদল কেবল বাইরে, আমার জানা আছে খুব ভাল করে। আমার জন্য সবই এক বন্দীশালার নামান্তর।

তীব্র ভয়ের অনুভূতি নিয়ে দিকবিদিক ছুটতে শুরু করল আমার সমস্ত অস্তিত্ব, চেষ্টা করলাম যত দূর সম্ভব নিজেকে বিস্তৃত করার, অস্তিত্বকে জালের মতো ছড়িয়ে দেয়ার। কিন্তু পারলাম না। টের পাচ্ছি, সেই অতি পরিচিত, অতি ঘৃণিত একটা মাংসপিণ্ডের মধ্যে আটকা পড়ে যাচ্ছি আমি, যেখান থেকে মুক্তির কোনো উপায় আমার জানা নেই। অনন্তকাল ধরে এভাবে এক দেহ থেকে আরেক দেহে কেবল ঘুরে মরছি, আটকে রয়েছি এক চক্রের মধ্যে। প্রতিবারই মনে হয় এবারই শেষ, এবার নিশ্চয়ই মিলবে বহু আকাঙ্খিত মুক্তির স্বাদ। আর প্রতিবারই ফিরে ফিরে আসে সেই অসহ্য বন্দীজীবনের ভার। তিন মাত্রার শিকল, আর সময়ের বেড়িতে বন্দী হয়ে থাকা আমার অন্তহীন কষ্ট কি এভাবেই চলতে থাকবে? এর শেষ কোথায়? কিভাবে?

আর কতবার নিজেকে ফিরে পাওয়ার জন্য নিজেকে ধ্বংস করব আমি?

আরও গল্পঃ

পার্থক্য

থুথু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *