ছোট গল্প

নিয়তি

১।

‘এই জায়গায়টায় এসে দাড়ালে গা’টা কেমন ছমছম করে ওঠে, তাই না?’

খন্দকার সাহেব চমকে পিছন ফিরে তাকালেন। একজন মানুষ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। পরনে ধবধবে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী। বৃদ্ধ মানুষটার মুখে স্মিত হাসি।

খন্দকার সাহেব সরকারী চাকুরীজীবি ছিলেন। রিটায়ার করেছেন বছর দুয়েক হল। বিয়ে’থা করেন নি, কাছের কোন আত্নীয়স্বজনও নেই। একা মানুষ, পেনশনের টাকা দিয়ে দিব্যি চলে যায়। ষাটের মত বয়েস হয়েছে তার। ডাক্তারের পরামর্শে হাওয়া বদল করতে বেরিয়েছেন।

খন্দকার সাহেবের প্রিয় শখ হচ্ছে মানুষের চেহারা দেখে তার চরিত্র আন্দাজ করা। দীর্ঘদিন চর্চার মাধ্যমে তিনি শখটাকে জিইয়ে রেখেছেন। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ চোখ তার, এক নজরেই যেকোন মানুষের খুঁটিনাটি দেখে নিতে পারেন। শুনেছেন পরিচিত লোকজন তাকে আড়ালে শার্লক হোমস বলে ডাকে। খন্দকার সাহেবের অবশ্য ব্যাপারটা ভালোই লাগে। বৃদ্ধকে দেখার পরেও তিনি লোকটা সম্পর্কে আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন। তবে খুব একটা সফল হলেন না। একেবারেই সাধারন চেহারার মানুষটির মধ্যে বিশেষত্ব বলতে তেমন কিছুই নেই।

অফিসের এক কলিগ বন্ধু তাকে কক্সবাজারের এই জায়গাটার কথা বলেছিলেন। লোকালয় থেকে বেশ দূরে জায়গাটা। খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে অবিরাম। প্রায় শ’দুয়েক ফুট উঁচু পাহাড়ের কিনার। পিছনে ঝাউবন, আর পাথুরে বালিয়াড়ী। সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র, আর চারদিকে নির্জনতা। কক্সবাজার এসেছেন এক সপ্তাহ হল। প্রতিদিন বিকেলে তিনি চলে আসেন এখানে। বুক ভরে টেনে নেন সমুদ্রের লোনা বাতাস। উপভোগ করেন একাকীত্ব।

আজ বিকেলেও তিনি সেই ইচ্ছাতেই এসেছিলেন। এই বৃদ্ধের আগমনে তার নির্জনতার মাঝে ছেদ পড়ল। কিছুটা বিরক্ত হলেও মুখে প্রকাশ করলেন না। তার বদলে বললেন, ‘তা যা বলেছেন। এখান থেকে একবার পা ফসকে পড়ে গেলেই হল। নিশ্চিত মৃত্যু।’

‘ঠিক বলেছেন। এমনকি আত্মহত্যা বা খুনের জন্যেও আদর্শ জায়গা।’ আবার হাসলেন বৃদ্ধ।

এবার একটু অবাক হলেন খন্দকার সাহেব। বললেন, ‘আপনি এদিকেই থাকেন নাকি?’

‘তা বলতে পারেন। আপনার পরিচয়?’

‘আমার নাম খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ঢাকায় থাকি। কক্সবাজার এসেছি সপ্তাহখানেক হল। আপনি?’

‘তা আপনি তো এদিকে প্রায়ই আসেন বোধহয়। আর কাউকে দেখেছেন নাকি?’ মনে হল খন্দকার সাহেবের শেষ প্রশ্নটা শুনতে পাননি বৃদ্ধ।

‘কই, না তো। কেন?’

‘আজ সকালে এখানে এক লোককে দেখেছিলাম দাঁড়িয়ে থাকতে। ভাবসাব সুবিধার মনে হল না। মনে হচ্ছিল ঝাপ দেয়ার চিন্তা করছে। আমাকে দেখেই তড়িঘড়ি করে চলে গেল।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যা। তাই বলছিলাম, অমন কাউকে দেখেছেন নাকি?’ বললেন বৃদ্ধ।

‘নাহ। আমার তেমন কাউকে চোখে পড়েনি। এখানে কখনোই কাউকে দেখিনি। আজ আপনাকে দেখলাম শুধু।’ জবাব দিলেন খন্দকার সাহেব।

‘বেশ, আপনাকে আর বিরক্ত করবনা। আসি।’ উল্টোদিকে ঘুরে দাড়ালেন বৃদ্ধ। চলে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েও কি মনে করে থমকে দাড়ালেন। ‘ওই দিকটায় একটা পুরনো বাংলো আছে। চেনেন?’

‘বাংলো? কই, তেমন কিছু তো দেখিনি?’ অবাক হওয়ার মাত্রা বাড়ছেই খন্দকার সাহেবের। কে এই লোক?

‘সময় পেলে একবার দেখে আসবেন। পাকিস্তান আমলে এক কোটিপতির বানানো। এখন খালি পড়ে আছে। দারুণ স্থাপত্য।’

‘দেখি, সময় পেলে হয়ত যাব। কিন্তু আপনার পরিচয় তো জানা হল না।’

‘আসি।’ হেসে ঝাউবনের মাঝে হারিয়ে গেলেন বৃদ্ধ।

২।

পরদিন সকালে বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠলেন খন্দকার সাহেব। গতকাল বিকেলের বৃদ্ধের কথা কেন জানি কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছেন না তিনি। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে হাটতে বেরিয়ে পড়লেন। সেই পাহাড়ের ধারে আরেকবার যাবেন আজ।

ভোরের ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সূর্যোদয় হল মাত্র। স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। হাটতে হাটতে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলেন খন্দকার সাহেব। কাত হয়ে পড়ে থাকা একটা ঝাউগাছের গুড়ির উপর বসলেন। অদ্ভুত সেই বৃদ্ধের কথা ভাবছেন।

‘ধুত্তরী!’ পিছন থেকে অচেনা এক গলার স্বরে ঘোর কাটল খন্দকার সাহেবের। ঘুরে তাকালেন তিনি।

বছর চল্লিশেক বয়সের এক লোক দাঁড়িয়ে আছে কিছুদূরে। পরনে বেশ দামি পোশাক, তবে অগোছালো। গলায় পেচানো মাফলার। চোখে রিমলেস চশমা। সুদর্শন, একহারা গড়ন। এলোমেলো চুল, আর কুঁচকানো কাপড়চোপড়। দেখে মনে হচ্ছে রাতে ভাল ঘুম হয় নি।

মানুষ দেখে তার সম্পর্কে ধারনা করার একটা অভ্যাস আছে খন্দকার সাহেবের। এখানেও তার ব্যাতিক্রম হল না। লোকটা সামর্থবান। পোশাকআশাক দেখে বোঝা যায়। তবে চেহারা বলছে মানসিক অশান্তিতে আছে। কি হতে পারে? ব্যাবসা বা পরিবার সংক্রান্ত কিছু হতে পারে। এখানে কিজন্যে? হয়ত পালিয়েই এসেছে ঝামেলা থেকে বাঁচতে, কে জানে!

উঠে দাড়ালেন খন্দকার সাহেব। ‘কিছু বললেন?’

‘না না, কিছু না। এমনিই। এত সকালে কাউকে দেখবো বলে আশা করিনি, তাই…’ কথা শেষ করল না লোকটা।

‘আমিও সাধারনত এত সকালে আসি না। আজ কি মনে করে হাটতে হাটতে চলে এলাম। তা আপনিও যখন চলে এসেছেন, ইচ্ছে করলে বসতে পারেন। অবশ্য যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে।’ মৃদু হেসে আমন্ত্রন জানালেন খন্দকার সাহেব।

লোকটা দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ, যেন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। তারপর একসময় এগিয়ে আসল। খন্দকার সাহেব আবার বসলেন ঝাউএর গুড়িটার উপর। লোকটা তার পাশে বসলো। আলাপ শুরু করলেন খন্দকার সাহেব।

‘আমার নাম খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। আপনি?’

‘আমার নাম সাজেদুল করিম।‘

‘কোথায় থাকেন আপনি?’

‘আমার বাড়ি ঢাকায়, তবে এখন আমি আমেরিকায় থাকি। দেশে ফিরেছি গত পরশু।’

দেশে ফিরেই এখানে চলে এসেছে? আত্মীয়স্বজন নেই কেউ? মনে মনে ভাবলেন খন্দকার সাহেব। তার বদলে বললেন, ‘ভালোই হল। কথা বলার একজন সঙ্গী পাওয়া গেল আজ। এমনিতে তো কাউকে আসতে দেখি না। অবশ্য গতকাল বিকেলে বুড়ো এক লোকের সাথে দেখা হয়েছিল। অদ্ভুত লোক!’ শেষ কথাটা নিজের মনেই বললেন তিনি।

‘আমিও, গতকাল সকালে এক লোককে দেখেছিলাম। সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরা।’ বললেন সাজেদুল করিম।

‘হ্যা হ্যা, সেই তো। আপনিও দেখেছেন তাহলে তাকে? অদ্ভুত লোক, তাই না?’

‘হুম।’ চুপ করে গেলেন সাজেদুল করিম।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। চারদিকে শুধু সাগরের ঢেউএর অবিশ্রান্ত গর্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।

‘কিছু মনে করবেন না, আপনাকে দেখে কেন জানি মনে হচ্ছে বেশ দুশ্চিন্তার ভেতর আছেন। কি ব্যাপার, খুলে বলবেন?’ খানিক দ্বিধার পর প্রশ্ন করলেন খন্দকার সাহেব।

‘তাই নাকি? এ কথা কেন মনে হল আপনার?’

‘আপনার চেহারায় স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। কোন সমস্যায় আছেন?’

‘কেন জানতে চাচ্ছেন?’ কন্ঠস্বরে যেন কিছুটা বিরক্তি।

‘আপনার ব্যাক্তিগত কোন ব্যাপার যদি হয়, বা আপনি যদি বলতে না চান তাহলে ঠিক আছে। তবে জানেন তো, এসব ব্যাপার কারও সাথে ভাগাভাগি করে নিলে কষ্ট কিছুটা কম হয়। সে চিন্তা করেই বললাম আর কি।’ বললেন খন্দকার সাহেব।

‘আমার যে কষ্ট, তা কিছুতেই কমবে না।’

‘চেষ্টা করেই দেখুন না একবার?’ খন্দকার সাহেব নাছোড়বান্দা।

‘আপনি যখন জোর করছেন, তা হলে শুনুন। তবে একটা ব্যাপার বলে দিচ্ছি, শোনার পর আমার ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না।’

‘ঠিক আছে।’

‘গোড়া থেকেই শুনুন তবে। বাবা মার একমাত্র সন্তান আমি। আমার বাবা ছিলেন বিশাল ধনী লোক। গুলশান এলাকায় আলিশান বাড়ি ছিল আমার। আর বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান হলে যা হয়, অল্প বয়সেই বখে গিয়েছিলাম আমি। আমার এমন কোন সাধ-আহ্লাদ ছিল না যা আমার বাবা পূরণ করেন নি। বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা আর হই-হুল্লোড়ে দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিল।’

‘তারপর?’

‘আমার যখন বাইশ বছর বয়স, তখন একদিন আমার বাবা হার্ট এটাক করে মারা গেলেন। তার কয়েক মাস পরে মারা গেলেন আমার মা। হঠাত করেই এভাবে বাবা মা কে হারিয়ে আমি তখন চোখে অন্ধকার দেখছি। তার উপর বাবা মারা যাওয়ার পর আমি একদিন জানতে পারলাম, ব্যাংকে বিশাল অঙ্কের দেনা রেখে গেছেন তিনি। সেসব দেনা মেটাতে গিয়ে, আর সুযোগসন্ধানী লোকজনের পাল্লায় পড়ে বাবার বিশাল সম্পত্তি নিঃশেষ হতে খুব বেশি দেরি হল না। আমার সুপরামর্শদাতা বা শুভাকাংখী বলতে তখন কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত সহায় সম্পত্তি সামান্য যা কিছু বাকি ছিল তা বিক্রি করে দিয়ে পাড়ি জমালাম আমেরিকায়। দেশ তখন আমার কাছে এক দুঃস্বপ্ন।’ একটু থামলেন তিনি।

‘আমার এক দুরসম্পর্কের চাচা থাকতেন আমেরিকায়। সেখানে গিয়ে তার ফার্মে ছোট্ট একটা চাকরী নিলাম। বছর দশেক পর চাচা মারা গেলেন। বিপত্নীক এবং নিঃসন্তান হওয়ায় তার সবকিছুর একমাত্র উত্তরাধিকারী হলাম আমি। দিন ভালোই কাটছিল আমার। তবে এবার আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছিল। আর অপব্যায়ী হলাম না। ব্যাবসা দারুণ চলছিল। কিন্তু আমার কপালে বোধহয় এত সুখ নেই। একদিন আমার ঘুম ভাংলো প্রচন্ড মাথাব্যাথা নিয়ে।’

‘তারপর?’

‘মাথাব্যথার পরিমান দিন দিন বাড়তেই থাকল। শেষে উপায় না দেখে একদিন ডাক্তারের কাছে গেলাম। সব শুনে কিছু টেস্ট লিখে দিল ডাক্তার। সেগুলোর রেজাল্ট দেখে ডাক্তার কি বলল জানেন?’

‘কি?’

‘ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে আমার। কোন চিকিৎসা নেই। যদি সবকিছু ঠিক থাকে তবে আর ছয়মাস বাঁচব আমি।’

দুঃখ হল লোকটার জন্যে খন্দকার সাহেবের। কিন্তু কিই বা করতে পারেন তিনি? বললেন, ‘সত্যিই খুব খারাপ লাগছে আপনার জন্যে। কিন্তু তারপর কি হল?’

‘সাত বছর আগে বিয়ে করেছিলাম আমি। সুসান আমেরিকান মেয়ে। বড় ভালবাসতাম ওকে আমি। দুটো ছেলেমেয়ে হয়েছিল আমাদের। ইকবাল আর জেনিফার। আমার চোখের মনি ওরা।’ মৃদু হাসি সাজেদুল করিমের মুখে, যেন বাচ্চাদুটোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার খেই ধরলেন সাজেদুল করিম। ‘এতবড় একটা দুঃসংবাদ পাওয়ার পরেও, জানেন, একটুও ভেঙ্গে পড়িনি আমি। ভেবেছিলাম, কাউকে জানাব না। কি লাভ, বলুন? জীবনের শেষ ছয় মাস মানুষের সমবেদনা আর ফিসফিসানি নিয়ে আমি বাঁচতে চাইনি। তবে সুসানের কাছে লুকোলাম না। একদিন ওকে ডেকে সব খুলে বললাম আমি।

‘খুব কেঁদেছিল সুসান। কিন্তু অদ্ভুত  ব্যাপার কি জানেন? ঠিক সাতদিন পর এক সকালে আমাকে সে জানাল, আমার সাথে সে আর থাকতে রাজি নয়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে সে বাবা মার কাছে চলে যাচ্ছে, আমি যেন ওর পাঠানো ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিই।

‘কি অদ্ভুত, তাই না? সাত বছরের সম্পর্ক, সাত দিনেই ভেঙ্গে গেল।’ বিষাদের সুর সাজেদুল করিমের কন্ঠে।

‘কেন সে আপনাকে ছেড়ে চলে গেল, জানতে চাননি?’ জিজ্ঞেস করলেন খন্দকার সাহেব।

‘চেয়েছিলাম। ও বলেছিল, যে মানুষটা আর কিছুদিন পরে মারা যাবে, তার সাথে থাকার টেনশন নিতে রাজি নয় সে। আমিও আর বোঝানোর চেষ্টা করিনি ওকে। যে সম্পর্ক একবার ভেঙ্গে যায়, তা কি আর জোড়া লাগে?

‘এক সপ্তাহ পর দেশে ফেরার প্লেনে চড়লাম আমি। সব কিছু আমার দুই ছেলেমেয়ের নামে লিখে দিয়ে এসেছি। যে দেশে আমার আর কিছু থাকল না, সেখানে থেকে কি লাভ?’

‘আপনাকে সান্তনা দেয়ার কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না আমি। বিধাতা মানুষকে নিয়ে কেন এসব খেলা খেলেন, তা তিনিই ভাল জানেন। কিন্তু একটা ব্যপার বুঝলাম না, দেশে ফিরে আপনি এখানেই আসলেন কেন? আপনার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব? তারা কোথায়?’ বললেন খন্দকার সাহেব।

‘তেমন কেউ অবশিষ্ট নেই। আর বাবা মারা যাওয়ার পরে এমনিতেও ওদের সবার পরিচয় জেনে গেছি আমি। আর এখানে আসার কারন যদি জানতে চান, তবে বলব জীবনে এখানেই একটু ভালবাসার দেখা পেয়েছিলাম আমি।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন সাজেদুল করিম। তারপর, অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই জায়গাটা কেমন লাগে আপনার?’

হঠাত এভাবে প্রসঙ্গ পাল্টানোয় কিছুটা অবাক হলেন খন্দকার সাহেব। তবে সেটা গোপন রেখে বললেন, ‘ভালোই তো। বেশ নির্জন।’

‘আত্মহত্যার জন্যেও বেশ চমৎকার।’

চমকে উঠলেন খন্দকার সাহেব। তবে কি এই লোক এখানে আত্মহত্যা করতেই এসেছে? ঝট করে সাজেদুল করিমের চোখের দিকে তাকালেন তিনি।

‘ঠিক ধরেছেন। আত্মহত্যা করতেই এখানে এসেছি আমি।’ তার চোখের দৃষ্টি বুঝে নিয়েছেন সাজেদুল করিম।

‘কিন্তু কেন? আত্মহত্যা তো মহাপাপ। জেনেশুনে এই পাপ করবেন আপনি? জীবনে তো দুঃখ আসবেই। সেজন্যে একেবারে শেষ করে দেবেন নিজেকে?’

‘জ্ঞান দেবেন না দয়া করে। তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে একেবারে তাকে আলিঙ্গন করে নেয়াই আমার কাছে শ্রেয়। এভাবে মরে মরে আমি বেঁচে থাকতে পারবনা।’

‘জ্ঞান দিচ্ছি না। তবে আপনাকে একটা কথা বলি, এই ছয়মাস কিন্তু আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হতে পারে, যদি আপনি চান। জীবনে প্রতি মুহুর্তে কত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়, আত্মহত্যা করা মানে তো সেগুলো সব বন্ধ করে দেয়া। এই ভুল কেন করবেন আপনি?’

‘বলেছিলাম না আপনাকে, আমার কথা শোনার পর কোন মন্তব্য করতে পারবেন না? আপনি ঠিক সেই কাজটাই করছেন। এটা শোভন নয়। তাছাড়া, আমি যদি সত্যি আত্মহত্যা করতে চাই আপনি আমাকে ঠেকাতে পারবেন? কি করবেন আপনি?’ সাজেদুল করিমের কন্ঠে বিরক্তি।

‘সেটা ঠিকই বলেছেন। তবে দয়া করে এই মুহুর্তে কাজটা করবেন না। তাতে আমি খুনের দায়ে পড়ে যেতে পারি। পুলিশ ভাবতে পারে আমি আপনাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি।’ হার মেনে নিলেন খন্দকার সাহেব। বুঝতে পেরেছেন তিনি, এই লোক তার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।

‘গতকাল একবার ওই বুড়োর জন্যে ঝাপ দিতে গিয়েও পারি নি। আজ আবার আপনি বাগড়া দিলেন। আপনি যখন বললেন, তখন আপনার কথা মেনে নিচ্ছি।তবে আশা করি পরেরবার যখন আসব, আপনার সাথে আর দেখা হবে না।’ উঠে দাড়ালেন সাজেদুল করিম।

‘কোথায় যাচ্ছেন?’

‘হোটেলে ফিরে যাচ্ছি।’

‘কোন হোটেলে উঠেছেন আপনি?’

‘হোটেল সীগাল।‘ পেছনে না তাকিয়েই জবাব দিলেন সাজেদুল করিম, ইতিমধ্যে হাটতে শুরু করেছেন তিনি।

৩।

কিছুক্ষণ বসে থাকার পর খন্দকার সাহেবও উঠে দাড়ালেন। ফিরে যাওয়া দরকার। হাটতে শুরু করলেন তিনি ঝাউবনের মাঝ দিয়ে। সাজেদুল করিমের কথাগুলো এখনও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার। কি অদ্ভুতই না হতে পারে মানুষের জীবন!

অন্যমনস্ক হয়ে হাটতে হাটতে কখন যে অন্যদিকে চলে এসেছেন বুঝতে পারেননি খন্দকার সাহেব। হঠাত করে খেয়াল হল, রাস্তা অচেনা লাগছে তার। কি করা যায়?শেষ পর্যন্ত যা হয় হোক ভেবে আবার হাটতে থাকলেন তিনি।

কিছুদুর যাওয়ার পরেই গাছপালার ভেতর একটা ফাকা জায়গার আভাস দেখা গেল। সেদিকটায় এগিয়ে গেলেন তিনি।

ফাকা জায়গা নয়, আসলে পুরনো এক বাংলোর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন খন্দকার সাহেব। যেটাকে ফাকা জায়গা ভেবেছিলেন, সেটা আসলে বাংলোর উঠোন। এই বাংলোর কথাই তাহলে সেই বৃদ্ধ বলেছিল? পায়ে পায়ে সামনে এগিয়ে গেলেন খন্দকার সাহেব।

বাংলোতে যে কেউ থাকে না, সেটা বাইরে থেকেই বোঝা যায়। তবে একথা ঠিক, বৃদ্ধ মিথ্যে বলেনি। এমন অসাধারন গঠনশৈলী খন্দকার সাহেব আগে দেখেননি। পুরনো আমলের কাঠের তৈরি বিশাল দোতলা বাড়ি। বাড়ির পিছনে একটা পুকুরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগাছা বেয়ে উঠেছে সর্বত্র। বিশাল বিশাল সব গাছ বাড়িটার চারদিকে একটা রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। সূর্য ইতিমধ্যে বেশ ভালভাবে আলো ছড়াতে শুরু করেছে, কিন্তু এই সকালবেলায়ও বাংলোর আশেপাশে সম্পুর্ন অন্ধকার। মাঝে মাঝে দু’একফালি সূর্যকিরণ আলোআঁধারি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

হাটতে হাটতে বাংলোর সামনে এসে দাড়ালেন খন্দকার সাহেব, যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। কিছু যেন টানছে তাকে। মোহাবিষ্টের মত হাত তুলে নিচতলার একটা জানালায় ধাক্কা দিলেন তিনি।

ভেবেছিলেন বন্ধ থাকবে, কিন্তু না। ধাক্কা দিতেই ক্যাচকোচ শব্দ করে জানালাটা খুলে গেল। ভিতরে উকি দিলেন খন্দকার সাহেব।

ঘোলাটে অন্ধকার ভেতরে। চোখে একটু সয়ে আসতে তিনি দেখতে পেলেন, পুরনো আমলের কিছু আসবাব রয়েছে ভেতরে। সবকিছুর উপর ধুলোর পুরু আস্তরন। দেয়ালের সর্বত্র মাকড়সার জাল আর ময়লায় ভর্তি। কতদিন ধরে এগুলো এখানে পড়ে আছে, কে জানে!

তারপরেই হঠাত করে আঁতকে উঠলেন খন্দকার সাহেব। আলোআঁধারির মাঝে জানালার সামনে এসে দাড়িয়েছে এক তরুণী!

নিজের অজান্তেই দুই-তিন পা পিছিয়ে এলেন খন্দকার সাহেব। ভূতপ্রেতে কোনদিনই তার বিশ্বাস নেই। কিন্তু এই মুহুর্তে প্রচন্ড ধাক্কা খেয়েছেন তিনি। প্রায় দৌড়ে সরে আসতে শুরু করলেন তিনি পুরনো বাড়িটার কাছ থেকে।

ফাকা জায়গাটার প্রায় শেষ মাথায় চলে এসেছেন তিনি, এই সময় তীক্ষ্ণ এক কণ্ঠস্বরের চিৎকার ভেসে এল তার কানে। ‘শুনুন!’

থমকে দাড়ালেন তিনি। পা দুটো কেউ যেন পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে। দরদর করে ঘামতে শুরু করেছেন তিনি। তারপর, খুব আস্তে আস্তে তিনি ঘুরে দাড়ালেন।

বাংলোর সামনে এসে দাড়িয়েছে সেই তরুণী। পরনে সাদা শাড়ী। খন্দকার সাহেব ঘুরে দাড়াতেই হাত নেড়ে ডাকল সে। ‘এদিকে আসুন।’

একটু দ্বিধা করে ধীর পায়ে হাটতে শুরু করলেন খন্দকার সাহেব। মাথার ভিতর চিন্তার ঝড় বইতে শুরু করেছে তার। এই মেয়ে যে ভূতপ্রেত নয়, সে ব্যাপারে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত। নিজের বোকামির কথা ভেবে নিজের উপরেই রাগ হচ্ছে তার এখন। কিন্তু মেয়েটা এই জনমানবহীন পুরানো বাংলোয় কি করছে? ভূত হিসেবে ধরে নেয়া ছাড়া আর কোন ব্যখাও তো মিলছে না। ভাবতে ভাবতে মেয়েটার সামনে এসে দাড়ালেন খন্দকার সাহেব।

‘পালাচ্ছিলেন কেন? আমাকে দেখে ভয় পেয়েছিলেন?’ মেয়েটার গলার স্বর কেমন যেন নিষ্প্রাণ।

‘না, মানে, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি এখানে কেউ আছে। হঠাত করে আপনাকে দেখে তাই চমকে গিয়েছিলাম। এই বাংলোয় কাউকে দেখতে পাব বলে আশা করিনি।’ জবাব দিলেন খন্দকার সাহেব।

‘ঠিকই বলেছেন। কেউই বলতে গেলে এই বাংলোর কথা জানে না, আর এখানে মানুষ বসবাস করার কথা জানা তো আরও পরের ব্যাপার। তবে আপনাকে পেয়ে ভালই হল। ভিতরে আসুন। গল্প করি। অনেকদিন কোন মানুষের সাথে কথা বলা হয় না।’

‘আমি, মানে… ভেতরে আসব?’ কি বলবেন বুঝতে পারছেন না খন্দকার সাহেব।

‘অবশ্যই। ভয় পাবেন না, আমি ভূতপ্রেত নই।’ একটু হাসল মেয়েটা। ‘আসুন।’

ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলোর ভিতরে ঢুকল মেয়েটা। একটু দ্বিধা করে মেয়েটার পিছন পিছন খন্দকার সাহেবও পা বাড়ালেন। ‘আপনি কি এখানেই থাকেন?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

‘হ্যা।‘ জবাব দিল মেয়েটা। ‘দোতলায় আসুন। নিচতলাটা আমি ব্যবহার করি না।’

মেয়েটার পিছু নিয়ে সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলেন খন্দকার সাহেব। যে রুমটায় তিনি ঢুকলেন সেটা বেশ পরিস্কার। কিছু সাধারন আসবাব পাতা ভেতরে। একটা সোফায় বসলেন তিনি। মেয়েটা বসল তার সামনে। ‘চা খাবেন?’ মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি দিলেন খন্দকার সাহেব।

‘রাবেয়া!’ ডাক দিল মেয়েটা। একটু পরেই আরেকটা দরজা দিয়ে এক কিশোরী উকি দিল। ‘চা দিয়ে যা।‘ নীরবে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল কিশোরী, তবে যাবার আগে খন্দকার সাহেবের দিকে একটা কৌতূহলী দৃষ্টি দিয়ে গেল।

এই প্রথমবারের মত খন্দকার সাহেব মেয়েটাকে ভালভাবে দেখার সুযোগ পেলেন। এবং বুঝতে পারলেন, প্রথমবারেই তার ভুল হয়েছিল। এ মেয়ে কোনভাবেই তরুণী নয়, বরং যৌবনের প্রান্তসীমায় পৌঁছেছে অনেক আগে। বয়স চল্লিশের কম হবে না কোনভাবেই। তবে কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের দেখলে বয়স তাদের স্পর্শ করে না, এই মেয়ে তাদের একজন। এবং সে অসাধারন সুন্দরী। যদিও তাকে মেয়ে না বলে মহিলা বলাই ভাল। চোখের নিচে আর কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা আঁচড় কাটতে শুরু করেছে, তবে দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।

ইতিমধ্যে খন্দকার সাহেব তার প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছেন। রাবেয়া চা দিয়ে গেল। চায়ে চুমুক দিলেন তিনি। এত ভাল চা অনেকদিন খাননি। প্রশ্ন করলেন, ‘কতদিন ধরে থাকেন আপনি এখানে?’

‘সঠিকভাবে বলতে গেলে একুশ বছর হতে চলল।’ বললেন মহিলা।

‘সে তো অনেক লম্বা সময়। আমি তো ভেবেছিলাম কেউ থাকে না এখানে।’

‘আমি খুব একটা বাইরে বেরোই না, আর একান্তই বাধ্য হলে রাতের বেলায় বেরোই। রাবেয়া আছে, ওই আমার সব কাজ করে দেয়।’

‘আপনি একাই থাকেন?’

‘হ্যা।’

‘কিছু মনে করবেন না, আপনি একা একজন মহিলা বনের ভিতর এই জনমানবহীন বাংলোয় কি কারণে রয়েছেন? খুব কৌতূহল হচ্ছে আমার।’

মহিলা হাসলেন। ‘একটা গল্প শুনুন তাহলে।’

‘বলুন?’

‘ভাবুন তো, কিশোরী একটা মেয়ে। কলেজে পড়তে পড়তে প্রেমে পড়েছিল এক যুবকের। পাগলের মত। শেষে বাবা মা কে না জানিয়ে দুইজন একদিন পালিয়ে গেল অনেকদূরে। সমুদ্রের ধারে, বনের ভিতর দু’জন সুখের সংসার পাতল। স্বপ্নের মত দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু সুখ বেশিদিন সইল না মেয়েটার কপালে। ছেলেটা একদিন সাগরে হারিয়ে গেল। শুধু অসহায় চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার সাধ্য ছিল না মেয়েটার।‘ একটু থামলেন মহিলা। ‘খুব করুণ গল্প, তাই না?’

‘আসলেই। কিন্তু অর্থ কি এই গল্পের?’ বললেন খন্দকার সাহেব।

‘যদি বলি, গল্পের এই মেয়েটা আমি?’ মহিলার দৃষ্টি দূরে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

‘সে কি, আপনি…’ কথা শেষ করতে পারলেন না খন্দকার সাহেব, তার আগেই তীব্র হাসিতে ভেঙ্গে পড়লেন মহিলা। ‘হ্যা, আমি। আর শুনুন, এটা মোটেই করুণ কোন কাহিনী নয়। অন্তত আমার জন্য। বিশ বছর আগে ও যখন মারা গেল, আমি যে কি খুশি হয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কেন জানেন?’

‘কেন?’ খন্দকার সাহেব অবাক।

‘একুশ বছর আগে যখন ওকে ভালবেসে পালিয়ে এসেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল ওকে ছাড়া এক মুহুর্তও বাঁচতে পারব না। অথচ, এখানে এসে দেখলাম এক সম্পুর্ন ভিন্ন চেহারা। ওর হাসিখুশি, উচ্ছল যে চেহারাটা দেখে আমি ওকে ভালবেসেছিলাম সেটা ছিল শুধু একটা মুখোশ। ওই মুখোশের আড়ালে একটা পশু বাস করত। প্রচন্ড অত্যাচার শুরু করেছিল আমার উপরে। দিনের পর দিন আমাকে ধরে মারত, সামান্য কারণে। মাঝে মাঝে খেতে দিত না। আমি কোনদিন কিছু বলিনি, শুধু মুখ বুজে সহ্য করেছি। কারন মুখ খুললেই ওর অত্যাচারের মাত্রা যেত দ্বিগুন হয়ে। শুধু কেঁদে কেঁদে ঈশ্বরকে ডাকতাম। এখন বুঝতে পারি, নিষ্ঠুরতার মাঝেই ও আনন্দ পেত। স্যাডিস্ট ছিল একটা।’ গলা কেমন ধরে এসেছে মহিলার।

‘আমার পেটে একটা বাচ্চা এসেছিল, জানেন? শুধু আমার অনাগত সন্তানের দিকে চেয়ে ওর অত্যাচার সইতাম। ও কিভাবে যেন বুঝে ফেলল। তারপর একদিন…’ থেমে গেলেন হঠাত।

খন্দকার সাহেব চাপ দিলেন না। একই দিনে দু’দুটো নাটকীয় ঘটনার মাঝে পড়ে গেছেন তিনি। প্রথমে ওই সাজেদুল করিম, তারপর এই মহিলা। তবে তিনি জানেন, একটু পরেই মহিলা আবার শুরু করবেন। হলোও তাই।

‘আমার বাচ্চাটা জন্ম নিয়েছিল ঠিকই, তবে মৃত অবস্থায়। ওর অত্যাচারের ফল। আমি প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম তারপর। একদিন ও আমাকে একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রেখে চলে গেল। দু’দিন কোন খবর পেলাম না। তিনদিনের দিন সকালবেলা হঠাত বাইরে হইচই শুনলাম। কিছুক্ষণ পর ঘরের তালা ভেঙ্গে আমাকে বের করল কিছু লোকজন। দেখলাম, উঠোনে আমার স্বামীর লাশ। শুনলাম, সাগরে ডুবে মারা গেছে।

‘আমি নাকি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। সবাই ভেবেছিল, শোকের ধাক্কা সহ্য করতে পারিনি। আসলে উল্টোটা। এতই খুশি হয়েছিলাম যে আমার দুর্বল শরীর সে উত্তেজনা নিতে পারেনি।

‘তারপর থেকে শুরু হল আমার সুখের দিন। একাই থাকতাম, আর সারাদিন নিজের মনে ঘুরে বেড়াতাম। যখনই মনে হত, আমার উপর অত্যাচার করার জন্য সে আর ফিরে আসবে না, বুকের ভেতর যেন খুশির ঢেউ উঠত।

‘কিন্তু মানুষ কি একা একা থাকতে পারে, বলুন? কিছুদিন পরেই আমার নিঃসঙ্গ লাগতে শুরু করল। কেবল বাচ্চাটার কথা মনে পড়ত আমার। মনে হত, ও থাকলে আমার আর কিছু লাগত না। সারাদিন ওকে নিয়েই কাটিয়ে দিতে পারতাম।চিন্তাটা ধীরে ধীরে আমার মনে শিকড় গাড়তে লাগল। আমি আবার পাগলের মত হয়ে যাচ্ছিলাম।

‘এইসময়, একদিন বিকেলবেলা বনের ভেতর আমার সাথে এক তরুণের দেখা হল। ছেলেটা বোধহয় প্রথম দেখাতেই আমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। ভাবলাম, একটু মজা করি না কেন? ওর সাথে পরিচয় হল। ভান করলাম, আমি এখানে থাকি না। বেড়াতে এসেছি। সারাদিন একসাথে ঘুরলাম আমরা। সন্ধ্যার সময় যেন ভুল করে চলে এসেছি এমন একটা ভাব করে ওকে নিয়ে আসলাম আমার বাংলোর সামনে। ও অবাক হয়ে গেল বাড়িটা দেখে। আমরা ঠিক করলাম, আজ রাতটা আমরা হব রাজারানী, আর এই বাংলো হবে আমাদের রাজপ্রাসাদ।

‘আপনি কি বলবেন আমি জানি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। একটা সন্তানের জন্যে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। ওই ছেলেটাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল যেন আমার যন্ত্রণা দূর করার জন্যেই ঈশ্বর ওকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন।

‘পরদিন সকালে ও বিদায় নিল। বলল, পরদিন ও ফিরে যাবে, যাওয়ার আগে আরেকবার আমার সাথে দেখা করতে চায়। বিকেলে একই জায়গায় দেখা করব বলে ঠিক করলাম আমরা। তবে ওকে কথা দিলেও তা রাখার কোন ইচ্ছেই আমার ছিল না। ঝামেলা বাড়াতে চাইনি আমি। বিকেলবেলা ও যখন বাংলোর সামনে এসে দাড়াল, আমি আমার জানালা দিয়েই দেখছিলাম ওকে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। আশাহত হয়েছিল বোধহয় খুব, সেদিনের পর আর ওকে দেখিনি আমি।

‘নয়মাস পরে আমার ছেলের জন্ম হল। চাঁদের মত ফুটফুটে, নিষ্পাপ একটা শিশু। ওর মুখ দেখে সব দুঃখ ভুলে গেলাম আমি। ওর বাবার নামটা আমি জেনে রাখিনি। তবে রাখলেই ভাল হত। অন্তত আমার সন্তানের নামটা ওর বাবার নামে রাখতে পারতাম। তাহলে তার প্রতি আমার ঋণ কিছুটা হলেও লাঘব হত। আমার মাতৃত্বের স্বাদ তো আমি তার জন্যেই পেয়েছিলাম। কিন্তু তা তো আর হল না। তাই আমার ছেলের নাম রাখলাম অর্ক।’ থামলেন মহিলা।

‘কোথায় আপনার ছেলে এখন?’ জানতে চাইলেন খন্দকার সাহেব।

‘ও ঢাকায় থাকে। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে।’ জবাব দিলেন মহিলা।

‘তারমানে তার পর থেকে এই দীর্ঘ সময় আপনি এখানে একাই ছিলেন? আপনার যদি মনে হয় আমি অনধিকার চর্চা করে ফেলছি তবে ক্ষমা করবেন, কিন্তু আপনার জীবনে কি আর কোন পুরুষের আগমন ঘটেনি?’

এবার মহিলার মুখটা কেমন যেন রক্তিম হয়ে উঠল, যেন কিশোরী মেয়েদের মত লজ্জা পাচ্ছেন তিনি।

‘আশ্চর্য, কিভাবে বুঝলেন আপনি? অর্কর বাবার প্রতি আমি কোন আকর্ষণ অনুভব করিনি, জানেন? শুধু একটা সন্তানের আশায় ওর সাথে একটু অভিনয় করেছিলাম মাত্র। ভেবেছিলাম, আমার ছেলে আমার মতই হবে। কিন্তু না। ও হল ওর বাবার মত। অবিকল ওর বাবার চেহারা। ওর বাবার সাথে আমার পরিচয় ছিল মাত্র একদিনের, তার সম্পর্কে কিছুই আমি জানতাম না। অর্ককে দেখে আমি ওর বাবাকে চিনলাম। আর সেই প্রায় অচেনা মানুষটাকে ভালবাসতে শুরু করলাম।

‘ভেবেছিলাম, এ জীবনে আমার আর কাউকে ভালবাসার শক্তি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার সে ধারনা ভুল ছিল। আপনি হয়ত ভাবছেন এটা শুধুই আমার কল্পনা, আমি নিজের মত করে একটা কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করে তাকে ভালবেসেছি। বিশ্বাস করুন, এটা মোটেই তেমন নয়। তার সবকিছু আমি জানি। এতদিন পরেও যদি আজ তার সাথে আমার আবার দেখা হয়, তবে আমি তাকে চিনে নিতে পারব, একটুও অসুবিধা হবে না। এতদিন তাকে আমি ভালবেসেছি, মরার আগ পর্যন্ত তাকেই ভালবাসব।‘ কথাগুলো বলতে বলতে মহিলার চোখে ফুটে উঠেছে অপার্থিব এক আভা।

হঠাত করেই যেন সম্বিত ফিরে এল তার। খন্দকার সাহেবের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার এসব উল্টোপাল্টা কথা শুনে আপনি নিশ্চয়ই আমাকে পাগল ঠাউরে বসে আছেন?’

‘না। আপনার কথাগুলোতে অবিশ্বাস করার কোন কারন খুঁজে পাইনি আমি। তবে কেন জানি মনে হচ্ছে, আপনার গল্প আপনি শেষ করছেন না। কোথায় যেন সুর মিলছে না। আমি কি ঠিক ধরেছি?’ বললেন খন্দকার সাহেব।

‘আপনাকে দেখলে যতটা মনে হয়, আপনি তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান। আন্দাজ করুন তো, কি লুকাচ্ছি আপনার কাছে আমি?’

‘আসল খটকাটা লাগছে যেখানে, সেটা হচ্ছে আপনার কথা অনুসারে এখন আপনি সুখী। আর কোনকিছুর অভাব নেই আপনার। কিন্তু আপনার চেহারা তা বলছে না। মনে হচ্ছে কোন একটা ব্যাপার আপনাকে পীড়া দিচ্ছে। সমস্যাটা কোথায়? দাঁড়ান, বলবেন না… সম্ভবত আপনার ছেলে। তাছাড়া আর কোন ব্যাপারে আপনি এতোটা উদ্বিগ্ন হবেন না। ঠিক ধরেছি?

‘ঠিক।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মহিলা। ‘অর্ককে এতদিন ওর বাবা সম্পর্কে কিছু জানতে দিইনি আমি। জিজ্ঞেস করলে বলেছি ওর জন্মের আগেই ওর বাবা মারা গেছে। এর বেশি কিছু জানতে চাইলে আমি চুপ করে থাকতাম।’

‘সমস্যাটা তাহলে কোথায়?’ জানতে চাইলেন খন্দকার সাহেব।

অর্ক একটা মেয়েকে ভালবাসে। ও আমাকে জানিয়েছে ওই মেয়েটাকেই বিয়ে করতে চায়। আমি আপত্তি করিনি, কারন ওর সুখেই আমার সুখ। মেয়েটার বাবা মা’ও আপত্তি করেনি। কিন্তু তারা অর্কের পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। তাই অর্ক আসছে আগামী পরশু আমার কাছে। ওর বাবার পরিচয় জানতে। কি জবাব দেব ওকে আমি?’ দু’হাতে মুখ ঢাকলেন মহিলা।

চুপ করে থাকলেন খন্দকার সাহেব। কি বলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত জানতে চাইলেন, ‘এখন তাহলে কি করবেন ঠিক করেছেন?’

মুখ থেকে হাত সরালেন মহিলা। মৃদু স্বরে বললেন, ‘শুধু একটাই সমাধান আছে এর।’

‘কি সেটা?’

‘মূল সমস্যা হচ্ছি আমি নিজে। আমি না থাকলেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়। অর্ক আর জানতে পারবে না ওর বাবা কে ছিল।’ মহিলার চোখে বিচিত্র দৃষ্টি কেমন যেন পরিচিত লাগল খন্দকার সাহেবের চোখে। এই একই দৃষ্টি তিনি আজ সকালে দেখেছিলেন সাজেদুল করিমের চোখে।

‘কিন্তু, তার মানে কি? আপনি কি আত্মহত্যা করার কথা ভাবছেন?’ খন্দকার সাহেব চমকানো গলায় প্রশ্ন করলেন।

‘এছাড়া আর কি করার আছে আমার?’

‘অদ্ভুত!’

‘কি অদ্ভুত? এটাই একমাত্র সমাধান। অর্ক আমার একমাত্র সন্তান, আমার সব। ওর সুখের জন্য আমি এটুকু করতে পারব না? আমি না থাকলে ও কষ্ট পাবে ঠিকই, কিন্তু ভালবাসা হারানোর কষ্ট ওকে পেতে হবে না। যে কষ্ট আমি পেয়েছি তা ও পাক সেটা আমি চাই না।’

চুপ করে থাকলেন খন্দকার সাহেব। কি বলার আছে তার?

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে বসে থাকলেন। বাড়ছে অস্বস্তিকর নীরবতা। একসময় মহিলা বললেন, ‘আপনার সাথে কথা বলে ভাল লাগল। চলুন, আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’

খন্দকার সাহেব বুঝতে পারলেন, তার যাওয়ার সময় হয়েছে। উঠে দাড়ালেন তিনি।মহিলাও উঠে দাড়ালেন তার সাথে।

বাংলোর গেটের সামনে এসে হঠাত খন্দকার সাহেব ঘুরে দাড়ালেন। ‘শেষ একটা কথা বলতে চাই আপনাকে।’

‘বলুন।’

‘আপনার জীবন একান্তই আপনার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। তবুও, আরেকবার ভেবে দেখুন। একজন মানুষের জীবনের সাথে আরও অনেক মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে। সে হয়তোবা বুঝতে পারে না, তবে এটাই সত্যি। আজ আপনি চলে গেলে যে আর কারও জীবনে তার প্রভাব পড়বে না, তা কি আপনি জোর দিয়ে বলতে পারেন? অন্তত আপনার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও, সিদ্ধান্ত বদল করার চেষ্টা করুন।’

‘আমার ছেলের জন্যেই তো এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি, বদলানোর কিছু নেই।’ বললেন মহিলা।

‘বেশ। আমি তবে আসি।’ ঘুরে দাঁড়িয়ে হাটতে শুরু করলেন খন্দকার সাহেব।

৪।

ফেরার পথে খন্দকার সাহেবের মন জুড়ে রইল দু’জন মানুষ। কি বিচিত্র জীবন! দুজনেরই কত সমস্যা, আর তার থেকে বাঁচার জন্যে দুজনেই একই পথ বেছে নিয়েছে। বড় অদ্ভুত!

ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। হঠাত করেই খেয়াল করলেন, তার পাশে কেউ একজন হাটছে। ঘাড় ঘোরাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। সাদা পাজামা পাঞ্জাবী। মুখে স্মিত হাসি। সেই বৃদ্ধ। খন্দকার সাহেব তাকাতেই বললেন, ‘কি ব্যাপার, এত দেরি হল আপনার ফিরতে? পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন নাকি?’

‘আরে, আপনি? কোথা থেকে এলেন? খেয়াল করিনি তো?’ বিস্ময় প্রকাশ করলেন খন্দকার সাহেব।

‘আমিও এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালই হল। গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।’

‘হ্যা, সেই ভাল। চলুন। আর ভাল কথা, আপনার সেই লোকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল।’

‘কোন লোক?’

‘ওই যে, পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল, আপনাকে দেখে পালিয়ে গেল। বলেছিলেন না?’

‘হ্যা, মনে পড়েছে। কথা হয়েছে নাকি তার সাথে আপনার? কি বলল সে?’

‘আপনি ঠিকই ধরেছিলেন। আত্মহত্যা করতেই এসেছিল সেই লোক।’

‘তাই নাকি? কিজন্যে, জিজ্ঞেস করেননি?’

‘সে এক লম্বা কাহিনী। তবে আমার কাছে খটকা লাগল এক জায়গায়।’

‘কোন জায়গায়?’

লোকটা এতদিন ছিল আমেরিকায়। আজ এতদিন পর আত্মহত্যা করার জন্যে এতদুরে ছুটে আসল কেন? আমেরিকায় কি আত্মহত্যা করার জায়গা নেই?’

‘তাই তো? বেশ সন্দেহজনক ব্যাপার বলতে হবে।‘ হাসলেন বৃদ্ধ। ‘তবে এমনটা হতেও পারে। মানুষ কিছু কিছু জায়গার মায়া ছাড়তে পারে না। বারবার ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে।’

‘তারমানে আপনি বলতে চাইছেন ওই লোকটাও এই জায়গার সাথে কোন মায়ায় জড়িয়ে পড়েছে?’

‘হতেও পারে, অসম্ভব কি?’

কথাগুলো ভাবতে শুরু করলেন খন্দকার সাহেব। লোকটা যদি বহুদিন পরে এখানে ফিরে এসেই থাকে, তবে তা কিসের টানে? কেন? ভালবাসার কথা বলেছিল না লোকটা? তবে কি এখানে কি কাউকে ভালবেসেছিল সে? হঠাত করেই মাথায় একটা সম্ভাবনা উকি দিল তার। একেবারেই অবাস্তব, তবুও তার মনে হল, একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি?

‘আচ্ছা, বাংলোর কথা বলেছিলেন না আপনি?’ বলতে বলতে বৃদ্ধের দিকে ফিরলেন খন্দকার সাহেব। কিন্তু কেউ নেই তার সাথে। কখন যে হারিয়ে গেছে মানুষটা, চিন্তায় ডুবে থাকার কারনে খেয়ালই করেননি।

কাঁধ ঝাকিয়ে বৃদ্ধের কথা মাথা থেকে বাদ দিলেন তিনি। তারপরে জোর কদমে হোটেল সীগালের দিকে হাটতে শুরু করলেন। হাতে সময় বেশী নেই।

হোটেলে পৌছাতে তার বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল। কপাল ভাল, প্রায় সাথে সাথেই সাজেদুল করিম কে পেয়ে গেলেন তিনি। হোটেলের সামনে একটা টেবিলে বসে আছেন কুঁজো হয়ে। খন্দকার সাহেব সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

মুখ তুলে দেখলেন সাজেদুল করিম। ‘আপনি? আবার?’

‘হ্যা। একবার দেখা করে যেতে ইচ্ছে হল। পাহাড়ের চূড়ায় বসে থাকতে থাকতে সময় যে কোনদিক দিয়ে পার হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। ভাবলাম, আপনি এখনও আছেন কিনা একবার দেখে যাই।’

উঠে দাঁড়ালেন সাজেদুল করিম। ‘দেখুন, আমি বাইরে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই? দয়া করে আমার পিছু নেবেন না।’ বললেন তিনি।

‘না না, সেরকম কোন ইচ্ছে আমার নেই। এখনই যাবেন আপনি?’

‘দেরি করে লাভ নেই।‘

‘আমি কি আপনার সাথে কিছুদূর আসতে পারি?’

ভ্রু কুঁচকে খন্দকার সাহেবের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সাজেদুল করিম। তারপর বললেন, ‘চলুন।’

দুজন একসাথে হাটতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর খন্দকার সাহেব বললেন, ‘আপনি কি আগেও এসেছিলেন এখানে?’

‘হ্যা। কেন?’

‘এমনিতেই। তা আপনি কি আপনার সিদ্ধান্ত কোনভাবেই পাল্টাবেন না?’

‘আপনি কি এই কথা বলার জন্যেই আবার ফিরে এসেছেন? তাহলে এখন আমার সাথে আর না থাকলেই আমি খুশি হব।’

‘বেশ, এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলছিনা। বরং অন্য কোন বিষয় নিয়ে কথা বলি আসুন। যেমন ধরুন জঙ্গলের ভিতরে ওই বাংলোর কথা। এখানে একটা পুরানো বাংলো আছে, জানেন?’

হুট করে থেমে গেলেন সাজেদুল করিম। ‘কোন বাংলো?’

‘আজ সকালে হাটতে হাটতে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। জঙ্গলের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে একটা পুরানো বাংলো দেখলাম।  তবে অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন, দেখে মনে হল কেউ জায়গাটায় বসবাস করে। বহুদিন খালি পড়ে থাকলে যেমন হয়, তেমন নয় একেবারেই।‘

হা করে খন্দকার সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন সাজেদুল করিম, যেন ভূত দেখছেন।

‘নিচের একটা জানালায় ধাক্কা দিয়ে দেখলাম, ভেবেছিলাম বন্ধ থাকবে। কিন্তু না, ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। মানুষ বসবাসের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, বুঝলেন? খুবই ইন্টারেস্টিং!’

কিছু বললেন না সাজেদুল করিম। এখনও এক দৃষ্টিতে খন্দকার সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন।

‘আপনাকে আর বিরক্ত করব না। আসি।’ সাজেদুল করিমকে হতভম্ব অবস্থায় রেখেই হাটতে শুরু করলেন খন্দকার সাহেব।

বিকেলের পড়ন্ত আলোয় খন্দকার সাহেব হাটতে হাটতে হোটেলের দিকে ফিরছেন। মাথায় চিন্তা চলছে তার। বাংলোটার কথা শোনার পর সাজেদুল করিমের প্রতিক্রিয়া দেখে তিনি এখন নিশ্চিত, এখানে অবশ্যই কোন গড়বড় আছে। আর তার সন্দেহ যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে আত্মহত্যা করতে যাওয়ার পথে সাজেদুল করিম অবশ্যই একবার ওই বাংলোয় উঁকি মেরে যাবে। বিশ বছর আগের এক বিকেলে যে সন্দেহ, যে ভালবাসা তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, সেটাই তাকে আজ আবার এই নির্জন সৈকতের শহরে টেনে নিয়ে এসেছে। আর ভালবাসার শক্তি যদি সত্যিই তেমন হয়ে থাকে, তবে তা আরেকবার কাজ না করার কোন কারণ নেই।

আর, তারপর? তারপরে আর কোন পর নেই। আনমনেই একটু হাসলেন তিনি। মানুষের মন বড় বিচিত্র, কখন যে মস্তিস্কের কোন গহিন অলিগলি থেকে কোন ধূসর স্মৃতি বের করে নিয়ে আসে, আর মানুষকে বাধ্য করে তার হাতের সুতোর অদৃশ্য টানে পুতুল হয়ে নাচতে, মানুষ তা আজও বুঝতে পারেনি। কোনদিন পারবে বলেও মনে হয় না।

কিন্তু, তার সন্দেহ যদি সত্যি না হয়? তাহলে হয়ত এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছে একটি প্রাণ, অথবা কে জানে, দু’টি। তবে নিজেকে জোর দিয়ে বললেন খন্দকার সাহেব, সত্যি হতেই হবে। সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাময় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি বুঝতে পারেন, মানুষ যদিও নিজের ভাগ্যের নিয়ন্তা হিসেবে নিজেকেই ভেবে নেয়ার বড়াই করে, তবুও দিনের শেষে নিয়তির হাতে সে একান্তই অসহায়। অদৃশ্য সুতোর বাঁধনে বাঁধা সে, আর কোথাও বসে কোন এক অদৃশ্য কারিগর তার খেয়ালখুশি মত মানুষকে বাধ্য করে হাসতে, কাঁদতে। হঠাত করেই নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় খন্দকার সাহেবের।

৫।

পরদিন সকালে অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল খন্দকার সাহেবের। কক্সবাজারে আজই তার শেষ দিন। বিছানা থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে প্রাতঃরাশ সেরে নিলেন তিনি। একটু ঘুরে আসবেন, তারপর ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দেবেন ঢাকার উদ্দেশ্যে।

হোটেল থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলেন তিনি। এবং পৌঁছেই থমকে দাঁড়ালেন। আজ তার আগেই সেখানে বসে আছে দুজন মানুষ। সাজেদুল করিম, আর… আর বাংলোর সেই মহিলা!

আস্তে আস্তে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন খন্দকার সাহেব। তাকে দেখেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন দু’জন। তাদের কাউকেই যেন চেনা যাচ্ছে না, গতকালের সাথে আজ তাদের চেহারায় আকাশপাতাল ব্যবধান। গতকাল যেখানে দু’জনেই ছিল জীবন যুদ্ধে নিয়তির অমোঘ বিধানে হার মানা দুই সৈনিক, আজ সেখানে তারা যেন পরিনত হয়েছে আঠার-উনিশ বছর বয়সের উচ্ছল দুই তরুণ-তরুণীতে। খুশির ঝরনা যেন উপচে পড়ছে দু’জনের চোখ থেকে।

‘আপনি কে, বলুন তো?’ বললেন মহিলা, গলায় এক রাশ বিস্ময় নিয়ে।

‘আমার পরিচয় তো আমি আগেই দিয়েছি। কিন্তু আপনারা দু’জন এখানে, একসাথে? কি ব্যাপার বলুন তো?’ মৃদু হাসলেন খন্দকার সাহেব, যদিও প্রশ্নটার উত্তর তিনি জানেন।

‘ন্যাকামী করবেন না, বুঝলেন? আপনি তো সবই জানতেন, শুরু থেকেই। আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু, কিভাবে?’ মহিলার উচ্ছসিত প্রশ্ন।

‘বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই জানতাম না। কিছুই করিনি আমি, যদি কিছু ঘটে থাকে তবে তা হয়েছে একান্তই নিয়তির ইচ্ছায়। আমরা সকলেই তো ভাগ্যের হাতে ক্রীড়নক মাত্র।’

এতক্ষণ মুখে মৃদু হাসি নিয়ে সব শুনছিলেন সাজেদুল করিম। এবার বললেন, ‘তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, কাল সকালে আমাকে আত্মহত্যা থেকে বিরত করা, বাংলোতে গিয়ে শায়লার সাথে দেখা করা, তারপর বিকেলে হুট করেই আমাকে বাংলোর কথা বলা, এসবের কিছুই আপনি নিজের ইচ্ছাতে করেননি? সবই নিয়তির খেলা?’

‘আমি শুধু কিছু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কাজ করেছি মাত্র।’ বললেন খন্দকার সাহেব।

‘আর আপনার সন্দেহটা জন্মাল কিভাবে?’

একটু ভাবলেন খন্দকার সাহেব। ‘এই সন্দেহের জন্যে প্রকৃতপক্ষে যিনি দায়ী, তাকে আমি নিজেই চিনি না। তবে এটা বলতে পারি, নিয়তি, ঈশ্বর, ভাগ্য বা প্রকৃতি যাই বলুন না কেন, তিনি কখনও নিজ হাতে কাজ করেন না। তৃতীয় কোন মাধ্যমের আশ্রয় নেন। ধরে নিন আপনাদের ক্ষেত্রে নিয়তি আমাকেই সেই তৃতীয় মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল? তবে যাই হোক, আপনাদের দুজনকে একসাথে দেখে আমার সত্যিই খুব ভাল লাগছে।’

‘আরে দেখুন তো, আপনাকে আমার পরিচয়ই দেয়া হয়নি। আমি শায়লা, শায়লা করিম।’ হাত বাড়িয়ে দিলেন মহিলা। তারপর একটু লাজুক গলায় বললেন, ‘আজই বিয়ে করছি আমরা। আপনি কিন্তু অবশ্যই আসবেন।’

‘থাকতে পারলে আমি খুবই খুশি হতাম, কিন্তু সেটা বোধহয় সম্ভব হবে না। আজই ঢাকায় ফিরতে হবে আমাকে।’ বললেন খন্দকার সাহেব। ‘তবে মিস্টার করিম, আপনি কি আপনার সব কথা খুলে বলেছেন ওকে?’

‘আপনি ওর অসুখের কথা বলছেন নিশ্চয়ই? ও সব বলেছে আমাকে। আপনার কি ধারনা, আমি ওকে মরতে দেব? এতদিন পর ফিরে পেয়েছি কি হারিয়ে যেতে দেবার জন্যে? শোনেননি, ভালবাসা পৃথিবীর সবচেয়েবড় ওষুধ? আমার ভালবাসা দিয়ে ওকে বাঁচিয়ে রাখব আমি।’ ভালবাসার মানুষটির দিকে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছেন মহিলা। ‘আর অর্ক আসলে ওর বাবাকে দেখে কি খুশি হবে বলুন তো?’

‘কিন্তু ওর কাছে ব্যাপারটা কিভাবে ব্যাখা করবেন আপনি? ও তো জানে ওর বাবা মারা গেছে।‘ জানতে চাইলেন খন্দকার সাহেব।

‘ভুল বোঝাবুঝির কারণে কি স্বামী স্ত্রীর মাঝে ছাড়াছাড়ি হয়ে যেতে পারে না? আর তার অবসানও তো হতে পারে, তাই না? ও সব বুঝতে পারবে। আমি জানি, আমার ছেলে না ও?’ হাসলেন শায়লা করিম।

কিছুক্ষণ তিনজনেই চুপচাপ। একসময় সাজেদুল করিম নীরবতা ভাংলেন। ‘খন্দকার সাহেব, যদি কিছু মনে না করেন তবে আমরা এবার উঠব। আমাদের অনুষ্ঠানের সময় হয়ে আসছে।’

‘আপনাদের শুভক্ষণের আর দেরি করাব না। আসুন তাহলে। আপনাদের জীবন সুখের হোক।’ মৃদু হেসে বললেন খন্দকার সাহেব।

উঠে দাঁড়ালেন সাজেদুল করিম ও শায়লা করিম। খন্দকার সাহেবও দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আমি এখানে আর কিছুক্ষণ বসতে চাই।’

হঠাত করেই তার হাতটা ধরলেন শায়লা করিম। ‘আপনি কি রূপকথার সেই জাদুকর? আপনি না আসলে হয়তোবা এই জীবনে আমাদের দু’জনের আর দেখাই হত না। আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।’ তার চোখে চিকচিক করছে অশ্রু। খন্দকার সাহেব কি বলবেন, ভেবে পেলেন না। শেষবারের মত বিদায় নিয়ে হাত ধরাধরি করে ঝাউবনের মাঝে হারিয়ে গেলেন জীবনের হারানো মানে খুঁজে পাওয়া দু’জন মানুষ।

৬।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরানো সেই ঝাউগাছের গুড়িটার উপর বসলেন খন্দকার সাহেব। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে গল্পের এখানেই শেষ, তবু মনের ভিতর কোথায় যেন খচখচ করছে তার। কেন? এতদিন পর কিসের ইশারায়, কোন মায়াজালে কিভাবে দু’জন দু’জন কে ফিরে পেল? সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনদিনই জানা হবে না। প্রকৃতি তার সব রহস্য মানুষের সামনে কোনদিনই প্রকাশ করে না। সেজন্যেই হয়তো পৃথিবীটা এত সুন্দর, বেঁচে থাকা এত অর্থময়!

‘কি ভাবছেন?’ পেছন থেকে কারও গলার আওয়াজে চমক ভাংলো খন্দকার সাহেবের। পেছনে ফিরে তাকালেন তিনি।

কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন সেই বৃদ্ধ।

‘আপনি? কখন এলেন?’ উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন খন্দকার সাহেব।

‘এই মাত্র। অবশেষে তবে দুজনার মিলন হল?’ রহস্যময় হাসি বৃদ্ধের মুখে।

‘তাই তো দেখছি।‘ বলেই চমকে উঠলেন খন্দকার সাহেব। এই বৃদ্ধ জানল কিভাবে সেকথা? অবাক চোখে তাকালেন তিনি। ‘আপনি কিন্তু আপনার পরিচয়টা এখনও দেননি।’

‘আমি? আমার পরিচয় জেনে আপনার খুব একটা প্রয়োজন আছে কি? আমাকে বরং আপনি একজন বার্তাবাহক বলতে পারেন।’তার পাশে বসতে বসতে বললেন বৃদ্ধ। খন্দকার সাহেবও বসলেন।

‘বার্তাবাহক? কিসের বার্তা নিয়ে এসেছেন আপনি?’

‘যে ভালবাসা আশ্রয় খুঁজে পায় না, কখনও কখনও তা যে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, জানেন?

‘একটা মানুষ তার স্ত্রীকে ভালবাসত অনেক। কিন্তু কোনদিন সে তার স্ত্রীর ভেতরের মানুষটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। তার স্ত্রীও তাই সে মানুষটাকে তার ভালবাসার প্রতিদান দিতে পারেনি। তার মত করে ভালবাসতে পারেনি। ওদিকে, সে লোকটা যখন তার ভালবাসার প্রতিদান পেল না, সে তীব্র ভালবাসার উত্তর পেল না, তখন সে অস্থির হয়ে উঠল। দিনে দিনে আরও তীব্র হল তার ভালবাসা, কিন্তু তার স্ত্রী তাকে বারবার ফিরিয়ে দিল। বলুন তো, এমনটা কি হতে পারে?’ বললেন বৃদ্ধ।

খন্দকার সাহেব বৃদ্ধের কথার অর্থ ঠিক বুঝতে পারলেন না। বললেন, ‘হতেও পারে। ভালবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস।‘

‘শেষ পর্যন্ত লোকটা যখন তার ভুল বুঝতে পারল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সে চলে গেছে না ফেরার দেশে। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা দিয়ে কি ভালবাসাকে বাঁধা যায়, বলুন? তীব্র ভালবাসার অস্তিত্ব যদি থেকে থাকে, তবে তার থেকেই জন্ম হয় দুঃখের। আর দুঃখ জন্ম দেয় অনুতাপের। অনুতাপ, সেই সাথে প্রায়শ্চিত্ত করার ইচ্ছা যদি প্রচন্ড হয়ে থাকে তবে কে জানে, মৃত্যুর পরেও তা পূর্ণ হবে না?’

‘আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ গম্ভীর গলায় বললেন খন্দকার সাহেব।

‘সেই মানুষটা চেয়েছিল তার স্ত্রী সত্যিকারের ভালবাসা খুঁজে পাক। তার যে ভালবাসা সে বোঝাতে পারেনি, অন্য কেউ সেই শূন্যস্থানটুকু পূরণ করুক। আমি সেই ভালবাসার বার্তা নিয়ে এসেছিলাম।’

‘তার মানে, আপনি…’

মৃদু হাসি নিয়ে খন্দকার সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন বৃদ্ধ লোকটি।

কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ালেন খন্দকার সাহেব। হ্যা, এবার সব বুঝতে পেরেছেন তিনি। খাপে খাপে মিলে গেছে সব।

বৃদ্ধও উঠে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, ‘আমার ফেরার সময় হয়েছে। আপনিও তো আজই ফিরে যাবেন, তাই না?’

‘হ্যা। কোনদিকে যাবেন আপনি?’ বললেন খন্দকার সাহেব। একবার মনে হল জিজ্ঞেস করেন, তার আজ ফেরার কথা বৃদ্ধ জানেন কিভাবে। কিন্তু তারপরে মনে হল, প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন।

‘যেদিক দিয়ে এসেছি, সেদিকেই।’ বললেন বৃদ্ধ।

পা বাড়ালেন খন্দকার সাহেব। কিছুদূর এসে পিছনে ফিরে তাকালেন। দেখলেন, বৃদ্ধ পাহাড়ের কিনারার দিকে হেটে যাচ্ছেন, ধীর পায়ে।

(শেষ)

*আগাথা ক্রিস্টি’র ‘The Mysterious Mr. Quin’ বইয়ের ‘The Man from the Sea’ গল্প অবলম্বনে লিখিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *