প্রতিক্রিয়া

নভেরাঃ সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক নারীর গল্প

বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোতে প্রায়ই চোখে পড়ে নানা রকম দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য এবং শিল্পকর্ম। কিন্তু এই শিল্পের এই নান্দনিক শাখাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় না, কারণটা আমার অজানা। দেশের অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম, শহীদ মিনারের স্থপতির নাম জিজ্ঞেস করলে তাই অনেকেই চুপ হয়ে যায়, কেউ কেউ একটু চিন্তা করে বলে – হামিদুর রহমান। কিন্তু মূল নকশাটা যে তার ছিল না, এটা কয়জন জানে?
নভেরা আহমেদ – নামটা কবে, কোথায় শুনেছিলাম ঠিক মনে নেই। কিন্তু মনে রেখেছিলাম, এটা মনে আছে। আস্তে আস্তে জানলাম, তিনি একজন ভাস্কর ছিলেন। বাংলাদেশের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর, নভেরা আহমেদ। বিভিন্ন উৎস থেকে তার সম্পর্কে ভাসা ভাসা আরও কিছু তথ্য জানা গেল – তার চালচলন ছিল বিদেশিনীদের মতো, আপাদমস্তক বোহেমিয়ান। খটকা লাগল – শহীদ মিনার তো যত দূর জানি, পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে তৈরি। সেই সময়ে একজন বাঙালী নারীর মাঝে এমন বৈশিষ্ঠ কি বিরল নয়? অনুভব করলাম, এই নারীর সম্পর্কে আরও জানতে হবে আমার। 


সতেরোর বইমেলার শুরুতে যখন বিভিন্ন প্রকাশনীতে ঘুরে ঘুরে লিস্ট বানাচ্ছি আর বই দেখে বেড়াচ্ছি, তখনই হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা একটা বইয়ের উপর চোখ আটকে গেল। নামঃ নভেরা। উপরে একটা পরিচিত মুখের ছবি। সাদা কালো ছবিটায় এক নারী ঈষৎ মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে ডান দিকে, কিছুটা রাগ আর অভিমান মেশানো মুখাবয়ব। কপালে হাতে আঁকা টিপ, চুল চুড়ো করে বাঁধা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। ইন্টারনেটে আগেই ছবিটা দেখেছিলাম, চিনতে একটুও দেরি হলো না – ইনিই নভেরা আহমেদ। বইটা কি গল্প না উপন্যাস না নন ফিকশন কিছুই দেখার প্রয়োজন বোধ করলাম না, কিনে ফেললাম। 


বইয়ের শেষে লেখক বলেছেন, এটি একটি জীবনীমূলক উপন্যাস। অর্থাৎ, নভেরা আহমেদের জীবনের বিভিন্ন সময়ের কথা উঠে এসেছে এখানে, গল্পের ঢঙে। হাসনাত আবদুল হাই এই বই লেখার সময় সাহায্য নিয়েছেন নভেরার পরিচিত বিভিন্ন কাছের এবং দূরের মানুষের, তাদের কাছ থেকে শোনা গল্পগুলোকে সহজ ভাষায় রূপ দিয়েছেন উপন্যাসে। কখনও নভেরার নিজের জবানিতে, কখনও হাসনাত ওরফে লেখকের বর্ণনায়, সেই সাথে মুর্তজা বশীর, খান আতা, শামসুর রাহমান সহ আরও অনেক ব্যক্তিত্ব স্ম্রৃতিচারণ করেছেন নভেরাকে নিয়ে। তাদের সেই বর্ণনার মনোমুগ্ধকর সংগ্রহ এই বইটি পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে লাগলাম এক অদ্ভুত নারীর সাথে। জন্ম তার ত্রিশের দশকে, কোলকাতায়। তবে নিবাস ছিল চট্টগ্রাম। তিন বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে মিশুক, এবং ডানপিটে। খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ করেছিলেন নিজের ইচ্ছা – ভাস্কর হবেন তিনি। ইংল্যান্ডে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে চলে গেলেন প্রিয় বিষয়ের উপর। সেখান থেকেই বোধ করি তার বোহেমিয়ান জীবনের শুরু।

আপাদমস্তক শিল্পী বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই ছিলেন তিনি – কখনও থিতু হতে পারেননি কোথাও, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লাহোর, করাচি, লন্ডন, প্যারিস, বোম্বে ঘুরে বেড়িয়েছেন যাযাবরের মতো। শিল্পকে নিজের সব কিছু উৎসর্গ করেছিলেন বলেই বোধহয়, স্বার্থপর বা উশৃঙ্খল ধরণের তকমাও জুটে গিয়েছিল কপালে। কিন্তু সে সবকে পায়ে দলে গেছেন বারবার। ভাস্কর্য শিল্প ছাড়াও গান এবং নাচের প্রতিও আগ্রহ ছিল তার, যেখানেই শিল্পকে ভালবাসার সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই ছুটে গেছেন।


প্রচণ্ড গুণী এই শিল্পি বাস্তবে ছিলেন মিশুক, কিন্তু নিজের কাছাকাছি আসতে দিতেন না কাউকে। যারাই তার কাছে এসেছে, তারা নাকি হতাশ হতে ভুলে গেছে – এমনি ছিল তার এক গুণমুগ্ধ বন্ধুর মন্তব্য। তার সম্পর্কে জয়নুল আবেদিন মন্তব্য করেছিলেন, নভেরা যে কাজ করছে তার মূল্য এই যুগের মানুষ বুঝতে পারবে না। কিন্তু একুশে পদক জয়ী এই শিল্পীর শেষ জীবন কেটেছে প্যারিসে, স্বেচ্ছা নির্বাসনে। সকলের প্রতি কোন এক অভিমান তাকে বাধ্য করেছিল পরিচিত মানুষের কাছ থেকে আড়ালে, প্যারিসে অজ্ঞাতবাস রচনা করতে। সেই প্যারিস, যা সকল শিল্পীর কাছে মায়ের মতো, যে সবাইকে হাত বাড়িয়ে ডাকে, আয়, আয়…


বইটি পড়ার পর কেমন এক বিষণ্নতা বোধে আক্রান্ত হতে হয়। কিছুটা কি প্রেমেও পড়ে গিয়েছিলাম নভেরার? হতে পারে! প্রেমের উলটো দিকেই তো বিষাদ লুকিয়ে থাকে। আর বইটি পড়ে যা বুঝলাম, নভেরার ব্যক্তিত্ব ছিল প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতোই। বইটিতে সকল তথ্য হয়তো সঠিক নেই, যেটা লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু এটি তো কোন জীবনী নয় যে দিন তারিখ বছর ঠিক থাকা লাগবে। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা বাস্তবের মিশ্রণে একটি উপন্যাস হিসেবেই ধরে নিলে ক্ষতি কি, যার মূল চরিত্র চির রহস্যময়, চির সবুজ?
সবাইকে বইটি পড়ার আমন্ত্রণ রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *