ছোট গল্প রম্য

ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ফেসবুক

মফিজ গত সপ্তাহে গ্রাম হইতে ঢাকায় আসিয়াছে। ঢাকায় সে উঠিয়াছে তার চাচার বাসায়। চাচাতো ভাই নাঈম সারাদিন একখানা চৌকোনা স্যুটকেসের মত বস্তু নিয়া টিপাটিপি করে। মফিজ দুই দিন ভয়ে ভয়ে নাঈমের ঘাড়ের উপর দিয়া উঁকি মারিয়া বুঝার চেষ্টা করিয়াছে জিনিসটা কি। শেষে তিন দিনের দিন সে ভয়ে ভয়ে নাঈমের পাশে বসিয়া জিজ্ঞেস করিল, নাঈম ভাইয়া নাঈম ভাইয়া, এই জিনিসটা কি বটে?

নাঈম তাহার সুগঠিত দন্ত বিকশিত করিয়া কহিল, ইয়ো মফিজ ব্রো, এইটা হইতেশে ল্যাপটপ। ই’নো হোয়াট আই মিন?

পুরা কথাটাই মফিজের মাথার উপর দিয়া গেল। সে কহিল, তা তুমি সারাদিন ইহাতে কি কর?

ওহ ব্রো, তুমি টো এখনও গাইয়া ড়য়ে গেসো দেখটেসি। আমি এইটাতে ফেসবুক ইউজ করি। ই’নো?

ইহার পর কথায় কথায় মফিজ নাঈমের কাছ হইতে ফেসবুক ব্যবহার শিখিয়া লইল। দিনের শেষে সে যখন একটি ফেসবুক একাউন্টের গর্বিত মালিকে পরিনত হইল তখন তার মনে হইল সে সত্যিই আশ্চর্য কিছু একটা করিয়া ফেলিয়াছে।

পরদিন সকালবেলা নাঈমের দেখানো পদ্ধতিতে ফেসবুকে লগিন করিতেই তার সামনে অত্যন্ত সুন্দরী এক ললনার ছবি ভাসিয়া উঠিল। ছবি দেখিয়া মফিজের বুকের মধ্যে কেমন চিনচিন ব্যাথা করিতে লাগিল, চোখ ঝাপসা হইয়া উঠিল, কান দিয়া গরম হাওয়া বের হইতে লাগিল। সে মনে মনে কহিল, পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম।

ছবিতে কি কমেন্ট করিবে তামফিজের মাথায় আসিতেছিল না। হঠাৎ তাহার মনে পড়িল, গতকাল নাঈমকে সে বিভিন্ন জায়গায় add me লিখিয়া কমেন্ট করিতে দেখিয়াছে। ইহার অর্থ সে জানে না, তবে তাহার মনে হইল ইহা নিশ্চয় অব্যর্থ কোন মন্ত্র হইবে, তা না হইলে নাঈম সব জায়গায় এই কথা লিখিবে কেন? এই ভাবিয়া সেও ললনার ছবির নিচে এই কমেন্ট লিখিয়া দিল। তারপর দুপুরে খাওয়া দাওয়া করিয়া দুই খিলি পান চিবাইতে চিবাইতে সেই ললনাকে লইয়া সুখস্বপ্ন দেখিতে লাগিল।

বিকালে সে আবার ফেসবুকে বসিল। বসিয়াই সে দেখিল সেই ললনা তাহাকে ফ্রেন্ড রিকু পাঠাইয়াছে। আনন্দে সে তিন পাক তুর্কি নাচন নাচিয়া লইল। আহা, কি অব্যর্থ মন্ত্রই না নাঈম ভাইয়া শিখাইল! সে তড়িৎ গতিতে রিকু একসেপ্ট করিল। আর সাথে সাথে পিড়িং করিয়া শব্দ হইল। শব্দের উৎস খুজিতে গিয়া সে বুঝিল ললনা, যাহার নাম গোলাপি পরী; সে তাহাকে মেসেজ পাঠাইয়াছে। সে তড়িঘড়ি করিয়া মেসেজ বক্স ওপেন করিল। দেখিল, মাত্র দুইটা অক্ষরের ছোট্ট বার্তা।

Hi…

মফিজের মনে হইল এই দুই অক্ষরের বার্তার ভিতর জন্ম জন্মান্তরের না বলা কথা লুকাইয়া আছে।কি বলিবে কিছুই ঠিক করিতে না পারিয়া শেষ পর্যন্ত সেও কম্পিত হস্তে লিখিল, hi…

এইবার জবাব আসিলঃ
ame ur sob istatas e laik dabo and u amer sob istatas e laik daben ok????lol

মফিজ কিছুক্ষণ হা করিয়া তাকাইয়া থাকিল। মেসেজের আগা মাথা কিছুই সে বুঝিতে পারে নাই। সুতরাং রাত্রে যখন নাঈম ফিরিয়া আসিল তখন সে তাহাকে মেসেজ খানা দেখাইল।

নাঈম চক্ষু এবং ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া কিছুক্ষণ মেসেজের পাঠোদ্ধার করিবার চেষ্টা করিল। মেসেজের অর্থ বুঝিয়া সে দড়াম করিয়া মফিজের পিঠের উপর এক থাবড়া লাগাইয়া কহিল, সাব্বাস ব্রো! তুমি টো দেখটেশি পুরাই ছুপ্পা মাল। প্রঠমদিনেই এমন একটা পার্টনাড় পেয়ে গেশো! এই বলিয়া সে মফিজকে মেসেজের অর্থ বুঝাইয়া দিল।

স্ট্যাটাসে লাইক কেন দিতে হইবে এই কথা মফিজের মাথায় ঢুকিল না। সে ভাবিল, ফেসবুকে হয়তো ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ এই রূপেই ঘটে। যে যাহাকে যতবেশি ভালবাসে সে তাহাকে ততবেশি লাইক দেয়। আর, লাইক মানেই তো পছন্দ করা, তাই না!

তাহার পর হইতে শুরু হইল ‘মনস্টার মফিজ’ এবং ‘গোলাপি পরী’র অমর ফেসবুকীয় প্রেম কাহিনী। পরীর সবকিছুতে মফিজ ভালবাসিয়া লাইক দেয়। পরীও তাহাকে উপর্যুপরি লাইকরূপ ভালবাসার বন্যায় ভাসাইয়া দেয়। আর আজ পর্যন্ত মফিজের কাভার ফোটোতে দেখা যায় বড় বড় অক্ষরে লেখা, add me! 🙂

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মফিজ ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গের আই ডি খুঁজিয়া  বাহির করিয়াছে। লাইক কেন একবারের বেশি দেয়া যাইবে না এবং লাইকের পাশাপাশি একটি ‘আলাবু’ বাটন কেন থাকিবে না এই মর্মে কৈফিয়ত দাবি করিয়া সে জুকার্বার্গের দফতর বরাবর একটি দীর্ঘ মেসেজ লিখিতেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *