ছোট গল্প

অবরোধের দিনগুলোতে প্রেম

অন্যান্য দিনগুলোর সাথে আজকের দিনটার কোন তফাত নেই। প্রতিদিনের মত বাবা আজকেও নাস্তার টেবিলে খবরের কাগজ নিয়ে বসে বসে রাগে গজগজ করছেন। রাগের কারণটা বোঝা যাচ্ছে না, তবে পৃথিবীর সবকিছুই তার রাগের উদ্রেক ঘটাতে পারে। রান্নাঘর থেকে মায়ের বাসনকোসন নাড়াচাড়ার আওয়াজ আসছে। আরাফ জানে একটু পরেই মা এক হাতে ঠান্ডা পানির গ্লাস আর আরেক হাতে গরম খুন্তি নিয়ে
তার ঘুম ভাঙাতে আসবেন। যেটায় কাজ হয় আরকি। তার আগে উঠে পড়াটাই বেটার।

ঘুম চোখে হাতড়ে হাতড়ে বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখলো আরাফ। ওরে সব্বনাশ! সাড়ে নয়টা! অবন্তীর সঙ্গে আজ সকাল দশটায় দেখা করার কথা। দেরি হলে খেপে বোম হয়ে যাবে মেয়েটা। এমনিতেই অবরোধ হরতাল বোমাবাজিতে দেশের অবস্থা খারাপ। এর ভিতরে বোমার সংখ্যা আরেকটা না বাড়ানোই ভাল।

বিছানা থেকে উঠে দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়ে মায়ের সাথে ধাক্কা খেল আরাফ। ভুল হয়নি, মায়ের হাতে পানির গ্লাস। ধাক্কা লেগে গ্লাসটা নিচে পড়ে গেল। ভাঙ্গা কাচ আর পানিতে মেঝে মাখামাখি। দিনটা শুরুই হল ভাংচুর দিয়ে। সারাদিন যে কেমন যাবে! মা’র চেচামেচি শুনতে শুনতে বাথরুমের দরজা বন্ধ করল আরাফ।

বাসা থেকে বের হয়ে আরেক ঝামেলা। কোথাও কোন গাড়িঘোড়ার দেখা মিলছে না। অস্থির হয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির পরে যাও বা একটা রিকশা পাওয়া গেল, দ্বিগুন ভাড়া হাঁকিয়ে বসে থাকল। কিছু করার নেই। ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর ছুঁইছুঁই করছে।

********

অবন্তীর মেজাজ প্রচন্ড খারাপ। রিকশা থেকে নামতে না নামতেই তার নতুন কেনা স্যান্ডেলটার ফিতে ছিঁড়ে গেছে। এখন সে এক হাতে স্যান্ডেল ধরে খালি পায় শাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে রাস্তার সব লোকজন তার দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছে। অন্যান্য দিন এখানে একটা পাগলকে দেখা যায়। সবাই বোধহয় ভাবছে আজ সে ওই পাগলটার জায়গায় প্রক্সি দিতে এসেছে। অবশ্য রাস্তায় লোকজন আজ বেশি নেই। দুইদিন আগেই এখানে একটা বাসে আগুন দেয়া হল, অবন্তীর সামনেই। সে কারণেই মনে হয় রাস্তায় লোকজন কম। পরে টিভিতে দেখাল চারজন আহত। একজনের অবস্থা আশংকাজনক। কত ডিগ্রি বার্ন যেন। এদিকে রাজপুত্তুরেরও দেখা নেই। কত রোমান্টিক সিনেমাতে দেখায় নায়ক আগেই এসে নায়িকার জন্যে ওয়েট করে। আর এখানে হচ্ছে উল্টাটা। সে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে, নায়কের দেখা নেই। আরে ধুর, তুই আবার নায়ক নাকি? আরাফের উদ্দেশ্যে মনে মনে বলল অবন্তী। তুই হচ্ছিস ভিলেন। শয়তানি একটা হাসি দিতে পারিস খালি। আর কোন কাজের খবর নেই। কয়টা মেয়েকে পটিয়েছিস ওই কেবলুসমার্কা হাসি দিয়ে?

প্রচন্ড রেগে গেলে মনে মনে কথা বলা অবন্তীর একটা অভ্যাস। এমনিতেও সে ঠান্ডা স্বভাবের মেয়ে, জোরগলায় কাউকে কিছু বলতে পারে না। তবে আরাফের সঙ্গে ভিন্ন কথা। একমাত্র আরাফের সাথেই সে মনের আশ মিটিয়ে রাগ ঝাড়তে পারে। এদিক ওদিক তাকিয়ে স্যান্ডেল ঠিক করতে পারে এমন কেউ আছে কিনা খুঁজল অবন্তী। নাহ, ধারে কাছে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আরাফ আসুক, তারপরে ওকেই স্যান্ডেল ঠিক করতে পাঠাবে বলে ঠিক করল সে। সবার সামনে মেয়েদের স্যান্ডেল নিয়ে হাটতে হাটতে যাবে, তাহলেই বাছাধনের উচিত শিক্ষা হবে।

ওইযে, অবশেষে রাজপুত্রের দেখা পাওয়া গেল। রিকশায় এমন একটা ভাব করে বসে আছে যেন দিন দুনিয়ার হালচাল কিছুই বোঝে না। আসুক আগে, তারপর মজা বোঝাব!

রিকশাটা অবন্তীর সামনে থামতেই বত্রিশটা দাঁত বের করে একটা হাসি দিল আরাফ। পনের মিনিট দেরি করে ফেলেছে সে, এর জন্যে তাকে যদি পনেরবার কান ধরে উঠবস করতেও বলে মেয়েটা তাতেও কিছু করার নেই। এই মেয়ের দ্বারা অসম্ভব এমন কোন কাজ নেই।

-‘হাসিস ক্যান, ব্যাটা ছাগল? আমি এই চৌরাস্তার মাঝখানে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি আর তোর এতক্ষণে আসার সময় হল? কয়টা বাজে এখন, হ্যা? ওখানে আসার আগে কয়টা ডেটিং মেরে আসলি যে এত দেরি হল?’ মেশিনগানের ব্রাশফায়ারের মত একগাদা ঝাড়িবর্ষন করল অবন্তী আরাফের দিকে।

-‘আরে না না, কি বল এইসব? আসলে সকালবেলা বের হয়েই সুমনের সাথে দেখা হয়ে গেছে, বুঝছ? ব্যাটা বলে কিনা, দোস্ত, আমার খুব বিপদ। আমারে বাঁচা। আমি বললাম বিপদ যাই হোক না কেন আমি কিছু করতে পারব না। আমার তাড়া আছে, অবন্তী ওয়েট করতেছে। তা ব্যাটা বলে কি, দোস্ত আমি বিয়া কইরা ফালাইছি। এখন বৌ নিয়া কি করি কই যাই? তারপরে আবার…’

-‘হইছে হইছে, তোর আর এইসব চাপাবাজি করতে হবে না।’ অবন্তী আরেক ঝাড়িতে আরাফকে চুপ করিয়ে দেয়। ‘আমি কি কচি খুঁকি, কিচ্ছু বুঝি না? এদিকে আয়। দূরে দাঁড়ায় আছিস ক্যান?’ স্যান্ডেল ধরা হাতটা নেড়ে আরাফকে কাছে আসতে ইশারা করল সে।

-‘এ কি, তুমি আবার জুতা হাতে নিছো ক্যান? একটু দেরি নাহয় হইছেই, তাই বলে জুতা মারবা নাকি আমাকে? তাও আবার এই লোকজনের মাঝখানে?’ আরাফের চোখে ভয়। এই ভরা রাস্তার মধ্যে জুতাপেটা? এর চাইতে কানে ধরে উঠবস করাই তো মনে হয় ভাল ছিল!

-‘জুতা তো তোরে মারব, তবে সেইটা এখন না। এই স্যান্ডেলটার ফিতা ছিঁড়ে গেছে। যেইখান থেকে পারিস এইটা ঠিক করে নিয়ে আয়। আপাতত এইটাই তোর শাস্তি। আমি এইখানেই দাঁড়াচ্ছি।’ আরাফের হাতে স্যান্ডেলটা ধরিয়ে দিতে দিতে বলল অবন্তী।

যাক বাবা, অল্পের উপর দিয়ে বাঁচা গেল। ভাবল আরাফ। কপাল ভাল স্যান্ডেলটা ছিঁড়েছে, নাহলে মনে হয় মেরেই বসত। ভাল রকমের খেপেছে মেয়েটা। আরেকটা কেবলুস হাসি উপহার দিয়ে চুপচাপ সরে এল সে।

********

স্যান্ডেল ঠিক করে ফিরতে ফিরতে আরাফের একটু দেরিই হয়ে গেল। মুচি খুঁজতে খুঁজতে বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছিল সে। এবার সদ্য ঠিক করা স্যান্ডেলটা একটা পলিথিনে ভরে খুশি মনে শিষ দিতে দিতে হাঁটতে লাগল সে।

শাহবাগ থেকে কিছুটা দূরে থাকতেই লোকজনকে হন্ত দন্ত হয়ে দৌড়ে আসতে দেখল আরাফ। একজনকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল সে, ‘কি হইছে ভাই?’

-‘আবার গ্যাঞ্জাম লাগছে, শাহবাগের মোড়ে। দ্যাশটা শ্যাষ কইরা ফালাইল শালারা!’ বলেই উল্টো দিকে ঝেড়ে দৌড় লাগালো লোকটা।

সর্বনাশ! অবন্তী তো শাহবাগেই দাঁড়িয়ে আছে। মাথা কাজ করতে চাইল না আরাফের, শাহবাগের দিকে দৌড়াতে শুরু করল সেও।

*******

শাহবাগ পৌছাতে না পৌছাতেই পরপর দুটো বোমা ফাটার বিকট শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড় হল আরাফের। রাস্তাঘাট ইতোমধ্যে জনশূন্য হয়ে পড়েছে। প্রায় সব দোকানের শাটার নামানো, যে দুই একটা বাকি আছে তারাও দ্রুত বন্ধ করে দিচ্ছে। মাথাটা কোনমতে একটু ঠান্ডা করে উ তাকাল সে। কোথায় অবন্তী?

ওইতো! রাস্তার মাঝখানে আইল্যান্ডের উপর দুই হাত কানে চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক দৌড়ে ছুটে গেল সে। অবন্তীর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, মুখ দেখে মনে হচ্ছে এখনি কেঁদে ফেলবে। একটা হাত ধরে কোনমতে টানতে টানতে তাকে রাস্তার আরেকপাশে নিয়ে এল আরাফ।

শেষ ফুলের দোকানের মালিক তড়িঘড়ি করে দোকানের সামনে রাখা ফুলগুলো ভিতরে ঢুকিয়ে শাটার লাগাতে যাচ্ছিল। আরাফ তাড়াতাড়ি তাকে থামিয়ে একেবারে শেষ মূহুর্তে অবন্তীকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। দোকানে আরও কিছু পথচারী আশ্রয় নিয়েছে। সবার মুখে ভীতসন্ত্রস্ত ভাব। তারপর, হঠাৎ করেই, অবন্তী ভেউ ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে আরাফের বুকে পিঠে দুম দুম করে কিল মারতে শুরু করল।

-‘শয়তানের বাচ্চা শয়তান, কই গেছিলি তুই? আমাকে এইভাবে একলা ফেলে কিভাবে গেলি? যদি আমার কিছু হয়ে যেত? কত্তবড় শয়তান! আমার প্রতি একটুও মায়াদয়া নেই, আমাকে একটুও ভালবাসেনা, একটুও না, একটুও না…’

দোকানের ভেতরের লোকগুলো প্রথমে অবন্তীর আচরণে অবাক হয়ে গেল, পরক্ষণেই অবশ্য বুঝে গেল কি হচ্ছে। ফিক করে সমঝদারের হাসিই দিয়ে দিল কেউ কেউ। এদিকে আরাফ বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে। এরকম দুম দাম কিল কতক্ষণ সহ্য করা যায়? কিছু বুঝে উঠতে না পেরে অবন্তীকে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে হঠাৎ। কিন্তু অবন্তীর কিল যে তাও বন্ধ হচ্ছে না!

দোকানী এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এবার সে আরাফের সাহায্যে এগিয়ে এল। একটা গোলাপ তুলে নিয়ে আরাফের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভাইজান, ভাবিরে দেন এইডা। কাম হইবো!’

গোলাপটা নিয়ে অবন্তীর সামনে তুলে ধরল আরাফ। কান্না ভুলে অবাক হয়ে তাকাল অবন্তী। তারপরে আস্তে আস্তে, তার মুখে লজ্জামাখানো একটা হাসি ফুটল।

বাইরে বুম করে আরেকটা বোমা ফাটল কোথাও। কিন্তু অবন্তী এবার আর ভয় পেল না। রাজপুত্তুর তো তার সাথেই আছে, ভয় কি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *