ছোট গল্প রম্য

স্টেশনে একদিন

আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি কমলাপুর রেল স্টেশনে। বেলা বাজে দুইটা। স্টেশনে মানুষ থই থই করছে। পা ফেলার জায়গা নেই। মনে হচ্ছে কোন এক রাজনৈতিক দলের নেত্রী জনসভা করার জন্যে ময়দানের বদলে এই জায়গাটাই বেছে নিয়েছেন।
প্রত্যেকটা কাউন্টারের সামনে আন্তঃনগর ট্রেনের মতই লম্বা এক একটা লাইন। এই ট্রেনের ইঞ্জিনে মনে হয় সমস্যা হয়েছে।
এক ইঞ্চিও এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
আমি স্টেশনে এসেছি ছোট মামার তাড়া খেয়ে। তিনি কয়েক মাস আগে আমেরিকা থেকে এসেছেন এবং আসার পর থেকেই বিয়ে করবেন বলে পাত্রী খুঁজছেন। মেয়ে দেখা হয়েছে ডজনখানেক। মামার কাউকেই পছন্দ হয়নি। আগামীকাল তিনি তেরোতম মেয়েটিকে দেখতে যাবেন চট্টগ্রামে। আমাকে পাঠিয়েছেন টিকিট করতে। তিনি নিজে আসতে পারেননি, কারণ তার আজ কোন এক জেন্টস পার্লারে এপয়েন্টমেন্ট আছে।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে ছোট মামাকে কিছুক্ষণ অভিশাপ দিলাম। কিন্তু কোন উপায় নেই। এই লাইনেই দাঁড়াতে হবে। অগত্যা কানে ইয়ারফোন গুঁজে মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করতে করতে লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে গেলাম।
দেড় ঘন্টা পরে।
এই দেড় ঘন্টায় আমি টেনেটুনে দেড় ফুটের মত এগিয়েছি কিনা সন্দেহ। সমস্যা আসলে লাইনে না, লাইন দেড়ঘন্টায় যতটা এগোনো উচিত ততটাই এগিয়েছে। কিন্তু প্রায়ই দুই একজন করে লাইনের মাঝখানে বেআইনি ভাবে ঢুকে পড়ছে। একটু হই চই হচ্ছে ঠিক। কিন্তু সেই হই চই এর ফাঁকে আরো দুই চার জন লাইনে ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।
আমার মাথায়ও যে এই বুদ্ধি আসেনি তা না। কিন্তু অপরিচিত লোকজনের সাথে আমি ভাব জমাতে পারি না একেবারেই। আর লাইনের সামনে যার দিকেই চোখ পড়ছে, সেই মনে হচ্ছে আমার দিকে চোখ রাঙ্গিয়ে তাকাচ্ছে। আমি বুঝে গেছি এই কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। বেশি তেড়িবেড়ি করলে যে দেড় ফুটের প্রমোশন পেয়েছি সেটাও হারাতে হতে পারে।
মানুষের চলমান ভীড়ের মধ্যে এক ললনার মুখ দেখা গেল। আমার দিকেই তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে। ধেত্তেরি, আমি কি শাহরুখ খান নাকি? নিজেকে ধমক দিলাম মনে মনে। এইসব ফাউল চিন্তা বাদ দেয়া দরকার। কিন্তু বয়সের ধর্ম বলে তো একটা ব্যাপার আছে। চোখ বার বার ঘুরে ওইদিকেই চলে যাচ্ছে। ভাবলাম, এই বোরিং সময় পার করার জন্য দুই একটা মেয়ে দেখা যেতেই পারে। এতে দোষের কিছু নাই।
মেয়েটা ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। এক চোখ দিয়ে মেয়েটাকে খুঁজছি, আরেক চোখ নতুন কোন ললনার আশায় জনসমুদ্র স্ক্যান করছে। এক ধরণের খেলা বলা যায়।
কে যেন কাঁধে টোকা দিল। তাকিয়ে দেখি সেই মেয়ে। চোখে অসহায় একটা ভাব। ঠোট নড়ছে, কিছু বলছে বোধহয়। আমার হার্ট কয়েকবার লাফ দিল। তবে মেয়েটাকে সেটা বুঝতে দিলাম না। কান থেকে ইয়ারফোন নামিয়ে যতটা সম্ভব গম্ভীর গলায় বললাম, কিছু বলছেন?
জ্বি ভাইয়া, আমি আসলে খুব সমস্যায় পড়েছি। আমার বাসা চিটাগং। আগামীকাল বাসায় যেতে হবে আমাকে। এই লাইনে দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছি না, আপনি কি আপনার টিকিটটা কেনার সময় আমাকে একটা টিকিট করে দেবেন? প্লীজ?
কোন নারীর অনুরোধে না বলার সাধ্য সর্বত্যাগী মুনি ঋষিদেরও নেই, আমি তো সাধারণ মানুষ। তার উপর আমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তাকে দেখে আমার ‘দিলমে বাজে গিটার’ অবস্থা হয়ে গেছে। বললাম, হ্যা, শিওর। কেন দেব না? আমি টিকিট পেলে আপনিও পাবেন। এমন ভাবে বললাম যেন এইটাই স্বাভাবিক। স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় অহরহ আমার কাছে মেয়েরা টিকিট করে দেয়ার অনুরোধ করে এবং আমিও তাদের অনুরোধ বিনাবাক্যব্যয়ে পালন করি।
থ্যাঙ্কস আ লট, ভাইয়া। মেয়েটা আমাকে ক্লোজ আপ মার্কা একটা হাসি দিল। মনে মনে ভাবলাম, এমন হাসির জন্যে অনন্তকাল লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব। মুখে বললাম, আরে এইটা কোন ব্যাপার না। ধন্যবাদ দেয়ার কোন প্রয়োজন নাই।
কিছুক্ষণ দুইজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। মেয়েটা দেখলাম উসখুস করছে। খালি খালি দাঁড়িয়ে থাকা যায় না, আবার চলেও যেতে পারছে না। আমিও কি বলতে কি বলে ফেলি এই চিন্তা করে মুখ বন্ধ রেখেছি। এমন সময় দেখি মেয়ে আবার উধাও। ভীড়ের মধ্যে কোনদিকে গেল বুঝে উঠতে পারলাম না।
এই যে, এইটা ধরেন। দেখি মেয়েটা কখন যেন দুইটা আইসক্রিম নিয়ে এসে একটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরেছে। ভালই হল। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু লাইন থেকে নড়তে সাহস পাচ্ছিলাম না। আইসক্রিম খেতে খেতে গল্প শুরু করলাম। সময় কাটানোর জন্যে সুন্দরী ললনার চাইতে উপকারী আর কিছুই নেই। আর সেই ললনার দেয়া আইসক্রিম সাথে থাকলে তো সোনায় সোহাগা। সারাজীবন পার করে দেয়া যায়।

*****

অবশেষে টিকিট পাওয়া গেছে। আমি এবং সেই মেয়ে, দুজনেই পেয়েছি। মেয়েটা যাওয়ার সময় তার টিকিট করে দেয়ার পারিশ্রমিক স্বরূপ আমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং তার সেই ভুবনভোলানো হাসি উপহার দিয়ে গেছে। কিন্তু আমার মনটা তারপরেও খারাপ।
কারণ গল্পে গল্পে মেয়েটা একসময় আমাকে বলেছে, তার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। পরশুদিন ছেলেপক্ষ দেখতে আসার কথা। তার বাবা অনেকটা জোর করেই তাকে ঢাকা থেকে চিটাগাং আসতে বলেছেন এবং এজন্যেই সে চিটাগাং যাচ্ছে। ছেলে নাকি আমেরিকার সিটিজেন, বিশাল টাকাপয়সার মালিক।
এই কথা শোনার পরে আমি কিছুতেই তাকে বলতে পারিনি যে আমার ছোট মামাও আগামীকাল চিটাগাং যাচ্ছেন পাত্রী দেখতে। আমার মন কিছুতেই মানতে রাজি হয়নি যে এই মেয়েটা ছাড়াও চিটাগাং এ অনেক মেয়েই আছে এবং ছোট মামা হয়তো তাদের ভেতরেই কাউকে দেখতে যাচ্ছেন।
মন বলছে, তেরোতম পাত্রী দেখা ছোট মামার জন্যে আনলাকি থার্টিনের বদলে লাকি হয়ে দাঁড়াবে। পাত্রীকে মামার পছন্দ হয়ে যাবে এবং তিনি একেবারে বিয়ে করেই ঢাকায় ফিরবেন। এই মেয়ের সাথে আমার আবার দেখা হবে, কিন্তু সে তখন সম্পর্কে হবে আমার মামী।
অনেক চেষ্টা করেও মাথা থেকে কিছুতেই চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। এত সুন্দর একটা মেয়ের সাথে কিনা বিয়ে হবে আমার মামার মত টাক মাথা, ভুড়িওয়ালা একটা লোকের সাথে? এ তো কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না!
সারা দুপুর পরিশ্রমের ফল মহামূল্যবান টিকিটটা পকেট থেকে বের করলাম। মাথার মধ্যে ঝড় চলছে। হয়তো কিছুই না, হয়তো অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে এই টিকিটটার কারণে। মেয়েটাকে মামার হাত থেকে বাঁচানোর একটা রাস্তাই খোলা আছে আমার সামনে। আরও কয়েক মূহুর্ত দ্বিধার মধ্যে কাটালাম। তারপরে মন স্থির করে টিকিটটা ছিড়ে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দিলাম বাতাসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *