ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – প্রথম অধ্যায়

এখন থেকে শব্দমালায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে জে আর আর টোলকিনের কল্পকাহিনী দ্য হবিট-এর বাংলা অনুবাদ। বইটা বের হয়েছিল ২০১৫ এর একুশে বইমেলায়। কিন্তু বর্তমানে বাজারে না থাকায় অনেকেই জানতে চেয়েছিলেন বইটি কবে রিপ্রিন্ট হবে। সেই সব পাঠকের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি পাঠকের ভাল লাগবে! 

১।

যে হবিটের গল্প এখন শুরু হচ্ছে, সে বাস করত মাটির ভেতর এক গর্তে। যেনতেন গর্ত ভাবলে অবশ্য ভুল হবে। হবিটরা যেসব গর্তে থাকে সেগুলো মোটেই সাধারণ গর্তের মত নোংরা, কর্দমাক্ত বা ভেজা নয়। পোকামাকড় বা কেঁচোর কোন চিহ্ন ছিল না সেখানে, বরং আরাম আয়েশের সব সুব্যবস্থাই আছে।

গর্তের মুখে একটা গোলাকার সবুজ রঙের দরজা। হলুদ পিতলের নবটা ঠিক মাঝখানে লাগানো। দরজার পর শুরু হয়েছে বেশ চওড়া একটা সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গের দেয়ালে কাঠের প্যানেল, মেঝেতে নরম কার্পেট বিছানো। দুই পাশে বেশ কিছু পালিশ করা চেয়ার আর হ্যাট কোট ঝোলানোর আংটা। ওগুলো রাখা হয়েছে কারণ প্রায়ই হবিটের গর্তে অতিথির আনাগোনা থাকে। সুড়ঙ্গটা বেশ লম্বাও বটে, এঁকে বেঁকে পাহাড়ের ভেতর এক পাশ দিয়ে চলে গেছে। সুড়ঙ্গের ভেতর দুই পাশে কিছুদূর পর পর অনেকগুলো গোল গোল দরজা। সিঁড়ি ভেঙ্গে ওঠানামা করতে ভাল লাগে না হবিটের, দোতলা তিনতলা করার ঝামেলায় তাই যায়নি সে। সুড়ঙ্গের দুপাশের দরজাগুলোতেই তার বেডরুম, বাথরুম, সেলার, খাবার রাখার ঘর (অনেকগুলো), কাপড়চোপড় রাখার ঘর (সম্পূর্ণ ভর্তি), রান্নাঘর, খাওয়ার ঘর ইত্যাদি সবকিছু। তবে ভাল ভাল কামরাগুলো হচ্ছে সুড়ঙ্গে ঢোকার মুখে বাম দিকে, কারণ একমাত্র ওগুলোতেই জানালা আছে। জানালার বাইরে দেখা যায় হবিটের বাগান, আর একটু দূরে কুলকুল করে বয়ে চলা ছোট্ট নদীটার সবুজ তীর।

এই বিশেষ হবিট কিন্তু বেশ অবস্থা সম্পন্ন। ব্যাগিনস হচ্ছে তার পারিবারিক পদবি। এই পাহাড়ে ব্যাগিনস পরিবার কবে থেকে বসবাস করতে শুরু করেছিল তা এখন আর কারও মনে নেই। তবে আশেপাশের সবাই তাদের খুব সম্মান করে। শুধু যে তাদের আর্থিক অবস্থা ভাল সেটাই একমাত্র কারণ নয়, তাদের পরিবারে কেউ কখনও কোন অভিযানে বের হয়নি। সবাই তারা অত্যন্ত শান্তশিষ্ট, যে কোন প্রশ্নের জবাবে একজন ব্যাগিনস কি জবাব দিতে পারে সেটা অনায়াসে আন্দাজ করা যায়। কিন্তু এই গল্পটা এমন একজন ব্যাগিনসের, যে কিনা রোমাঞ্চকর এক অভিযানে বের হয়েছিল, নানা আশ্চর্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। তাতে হয়তো প্রতিবেশীদের কাছে তার সম্মানটা নষ্ট হয়েছিল, কিন্তু সে যা অর্জন করেছিল তার মূল্যও নেহাত কম নয়।

আমাদের এই হবিটের মায়ের নাম ছিল… আচ্ছা, হবিট কে বা কি- এই প্রশ্নটার জবাব আগে দেওয়া দরকার। আমরা যারা স্বাভাবিক মানুষ তাদেরকে ওরা একটু এড়িয়েই চলে, যে কারণে আজকাল ওদের দেখাই পাওয়া যায় না। কিছুটা বর্ণনা দিয়ে রাখলে ওদের বুঝতে সুবিধা হবে। হবিটরা আকৃতিতে বেশ ছোট, বামনদের চাইতেও তাদের উচ্চতা সামান্য কম। ওজনে হবে আমাদের অর্ধেক। ওদের দাড়ি নেই। কিছুটা অলৌকিক শক্তি বা জাদুকরী ক্ষমতা আছে। আমাদের মত বিশাল আকৃতির লোকজন যখন রাস্তা দিয়ে চলাচল করে তখন ওই জাদুর কারণেই ওরা কারও চোখে ধরা না পড়ে লুকিয়ে থাকে। খেতে এবং খাওয়াতে ভালবাসে। উজ্জ্বল রঙ, বিশেষ করে সবুজ এবং হলুদ রঙের জামাকাপড় পরে। ওদের জুতো পরার প্রয়োজন হয় না, কারণ ওদের পায়ের তলার চামড়া বেশ মোটা। সেই সাথে ঘন বাদামী পশম গজায় পায়ে, প্রাকৃতিক জুতোর কাজ করে। ওদের মাথাও ঘন, কোঁকড়া বাদামি চুলে ভর্তি। লম্বা লম্বা আঙুল, ভাল মানুষ চেহারা। রাতের খাবার দুই বার করে খেতে পছন্দ করে, পেট ভরা থাকলে গলা ছেড়ে হাসতে ভালবাসে। এতটুকু জানা থাকলেই বোধহয় যথেষ্ট।

তো যা বলছিলাম, আমাদের এই বিশেষ হবিট, অর্থাৎ বিলবো ব্যাগিনসের মায়ের নাম ছিল বেলাডোনা টুক। সে ছিল বিখ্যাত টুক বুড়োর তিন মেয়ের মধ্যে একজন। নদীর ওপারে যেসব হবিট বাস করে তাদের প্রধান ছিল টুক বুড়ো। অন্যান্য হবিট পরিবারের মধ্যে একটা গুজব প্রচলিত আছে, টুক বুড়োর পূর্বপুরুষদের কেউ একজন নাকি এক পরীকে বিয়ে করেছিল। কথাটা অবশ্যই গুজব, কিন্তু এমনিতেও টুক পরিবারের ভেতর এমন একটা ব্যাপার ছিল যেটাকে হবিটদের সাথে একেবারেই মেলানো যায় না। কয়েকদিন পর পরই ওদের পরিবারের কোন একজন উধাও হয়ে যেত, অর্থাৎ অভিযানে বের হত। টুক পরিবারের বাকিরা ব্যাপারটা সাধ্যমত ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলেও ব্যাগিনস পরিবারের মত সুনাম ছিল না তাদের। তবে তাদের সম্পত্তির পরিমাণ অবশ্যই ব্যাগিনসদের চাইতে বেশি ছিল। আর বেলাডোনা টুক বিলবোর বাবা বুংগো ব্যাগিনসকে বিয়ে করার পর কখনও অভিযানে বের হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বেলাডোনার জন্য পাহাড়ের নিচে বিশাল এক গর্ত তৈরি করেছিল বুংগো ব্যাগিনস, আশেপাশের অন্যান্য গর্তের সাথে এখনও তার কোন তুলনা হয়না। তবে জীবনের শেষ দিনটা পর্যন্ত তারা সেই গর্তে জীবন কাটিয়ে দিলেও বিলবো ব্যাগিনস যে তার মায়ের দিক থেকে কিছুটা উল্টোপাল্টা বৈশিষ্ঠ উত্তরাধিকারসূত্রে পায়নি সেটা বলা বোধহয় ঠিক হবে না। অপেক্ষা ছিল শুধু একটা সুযোগের। সেই সুযোগটা আসল বিলবোর পঞ্চাশ বছর বয়সে, যখন সে পূর্ণ যুবক। ততদিনে তার বাবার তৈরি বিলাসবহুল গর্তে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে সে।

ঘটনাটা ঘটেছিল অনেক অনেক দিন আগের এক সকালে। বিলবো ব্যাগিনস সেদিন সকালে তার দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল। একটু আগেই সকালের নাস্তা শেষ করেছে সে, লোমশ পায়ের পাতা ছুঁই ছুঁই এক ইয়া বড় কাঠের পাইপে করে ধূমপান করছে এখন। ঠিক এই সময় গ্যান্ডালফের আগমন ঘটল।

গ্যান্ডালফ! তার সম্পর্কে আমি যা শুনেছি তার চার ভাগের এক ভাগ লিখতে গেলেও মহাকাব্য হয়ে যাবে, অথচ তার সম্পর্কে আমি বলতে গেলে কিছুই জানি না। আশ্চর্য সব অভিযান আর দুঃসাহসিক গল্পরা ঘোরাফেরা করে তাকে ঘিরে। তিনি যেখানেই যান সেখানেই জন্ম হয় অদ্ভুত সব ঘটনার। পুরনো বন্ধু টুক বুড়ো মারা যাওয়ার পর অনেকদিন এই দিকে পা রাখেননি তিনি। হবিটরাও তার চেহারা প্রায় ভুলতে বসেছিল।

সেদিন সকালে বিলবো দেখল লাঠি হাতে লম্বা, বুড়ো একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। মাথায় একটা নীল রঙের টুপি, উপর দিকটা চোখা। গায়ে লম্বা ধূসর আলখাল্লা, গায়ে জড়ানো ভারি চাদর। তার উপর দিয়ে নেমে এসেছে কোমর পর্যন্ত লম্বা সাদা দাড়ি। পায়ে কাল রঙের ভারি বুট জুতো।

‘শুভ সকাল!’ আন্তরিক সম্ভাষণ জানালো বিলবো। সকালটা আসলেই সুন্দর। সূর্যের উজ্জ্বল আলো খেলা করছে চারদিক, ঘন সবুজ ঘাসের মাথায় ঢেউ তুলছে মৃদু বাতাস। কিন্তু গ্যান্ডালফ যখন তার মিশমিশে কাল ভ্রূ জোড়ার আড়াল থেকে বিলবোর দিকে চাইলেন তখন তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।

‘কি বলতে চাও তুমি?’ প্রশ্ন করলেন তিনি, ‘আমাকে শুভ সকাল জানাতে চাও, নাকি বলতে চাও যে আমি না চাইলেও আজকের সকালটা শুভ? নাকি আজ সকালে বেশ ফুর্তিতে আছ তুমি? নাকি ধরে নেব যে ফুর্তিতে থাকার জন্য আজকের সকালটা শুভ?’

‘সবকটাই,’ জবাব দিল বিলবো। ‘দরজার বাইরে আরাম করে দাঁড়িয়ে পাইপে কষে দুটো টান দেওয়ার জন্যেও আজকের সকালটা এক কথায় দারুণ! আপনার কাছে যদি পাইপ থাকে তো আমার সঙ্গে বসে খেতে পারেন যত খুশি। তাড়াহুড়োর কিছু নেই, পুরো দিনটা পড়ে আছে সামনে!’ কথাগুলো বলে দরজার সামনে একটা সমান পাথরের উপর বসল সে, তারপর ধূসর ধোঁয়ার একটা বিরাট রিং তৈরি করে পাহাড়ের উপর দিয়ে ভাসিয়ে দিল।

‘খুব সুন্দর তো!’ বললেন গ্যান্ডালফ। কিন্তু আজ সকালে যে ধোঁয়ার রিং বানানোর মত সময় আমার হাতে একেবারেই নেই। একটা অভিযানে বের হচ্ছি আমি। আমার সাথে যেতে পারে এমন একজনকে দরকার, কিন্তু তেমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

এদিকে তেমন কাউকে পাবেনও না।’ জবাব দিল বিলবো, ‘আমরা সবাই সাধারণ শান্তিপ্রিয় লোকজন, অভিযান টভিযানে যাওয়ার মত সময় বা ইচ্ছে কোনটাই নেই। লোকে যে অভিযানে গিয়ে কি মজা পায় কে জানে!’ আরেকটা রিং বানিয়ে ছাড়ল সে, এবার আরও বড়। তারপর সকালবেলায় আসা চিঠিপত্রগুলোর উপর চোখ বোলাতে শুরু করল, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো লোকটাকে গুরুত্ব দিতে চাইছে না আর। কিন্তু জায়গা থেকে নড়লেন না বৃদ্ধ। লাঠিতে ভর দিয়ে এক দৃষ্টিতে বিলবোর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকলেন যে অস্বস্তি বোধ করতে লাগল সে।

‘শুভ সকাল!’ এবার একটু জোরের সাথেই বলল বিলবো, তাড়াতে চাইছে বৃদ্ধকে। ‘ওসব অভিযানে বের হওয়ার কোন ইচ্ছা নেই আমাদের। আপনি বরং পাহাড়ের ওপাশে বা নদীর ওপারে চেষ্টা করে দেখতে পারেন।’ বোঝাতে চাচ্ছে যে তার কথা শেষ।

‘এই শুভ সকাল কথাটাকে মানুষ কতভাবেই না ব্যবহার করে!’ বললেন গ্যান্ডালফ। ‘এই যেমন এখন আমাকে তাড়াতে চাইছ তুমি, বলতে চাইছ যে আমি না যাওয়া পর্যন্ত সকালটা শুভ হবে না।’

‘না না, তা নয়।’ বলল বিলবো, বৃদ্ধের সোজাসাপ্টা কথায় একটু বিব্রত বোধ করছে। ‘আপনার নামটা কি জানতে পারি?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘আমার নাম তুমি জান, মিঃ বিলবো ব্যাগিনস, ঠিক যেমন ভাবে তোমার নামটাও আমি জানি। শুধু আমার চেহারার সাথে আমার নামটাকে মেলাতে পারছ না, এই আর কি। আমার নাম গ্যান্ডালফ, আর গ্যান্ডালফই হচ্ছি আমি। আর তুমি, বেলাডোনা টুকের ছেলে বিলবো ব্যাগিনস আমাকে শুভ সকাল বলে দরজা থেকেই বিদেয় করে দিতে চাইছ! যেন আমি সামান্য কোন ফেরিওয়ালা!’

‘আপনিই গ্যান্ডালফ! হায় ঈশ্বর!’ অবাক হয়ে বলে উঠল হবিট। ‘আপনিই তো সেই জাদুকর যে টুক বুড়োকে একটা জাদুর নেকলেস উপহার দিয়েছিল? যেটাকে আদেশ করার আগ পর্যন্ত কিছুতেই খোলা যাচ্ছিল না? আপনিই তো সেই বিখ্যাত জাদুকর যার গল্প জুড়ে থাকে ড্রাগন, গবলিন আর রাজপুত্র-রাজকন্যার দল? আমার এখনও মনে আছে, বুড়ো টুক যে পার্টিগুলো দিত সেখানে আপনি আতশবাজির খেলা দেখাতেন। দেখে মনে হত রাতের আকাশে জ্বলে আছে আগুনের তৈরি নানা রকমের ফুল! শুধু আপনার জন্যেই অনেক তরুণ আর যুবক যে ঘর ছেড়ে বিপজ্জনক সব অভিযানের পথে পা বাড়িয়েছে তাও আমি জানি। সত্যিই, জীবনটা সে সময় দারুণ রোমাঞ্চকর- মানে বিপজ্জনক করে তুলেছিলেন আপনি। মাফ করবেন, কিন্তু আপনি যে এখনও সেই সব কাজই চালিয়ে যাচ্ছেন তা তো জানা ছিল না!’ এক নিঃশ্বাসে বলে গেল বিলবো।

‘আর কিই বা করার আছে আমার? তবে আমার কথা তোমার কিছু কিছু মনে আছে দেখে সত্যিই খুব খুশি হলাম। তাছাড়া তুমি টুক বুড়োর বংশের সন্তান, বেলাডোনার ছেলে। সুতরাং তুমি এইমাত্র যা চাইলে তা খুব খুশি হয়েই তোমাকে দেব আমি।’

‘মাফ করবেন, কিন্তু আমি কিছু চেয়েছি বলে তো মনে পড়ছে না!’ অবাক হয়ে বলল বিলবো।

‘এই তো আবার চাইলে! এই নিয়ে দুই বার মাফ চাইলে আমার কাছে। তথাস্তু, তোমাকে মাফ করলাম আমি, এমনকি একটা অভিযানে পাঠানোরও ব্যবস্থা করে দিচ্ছি এখনই। চমৎকার একটা অভিযান, বুঝলে? তোমার লাভই হবে- শারীরিক, মানসিক এমনকি আর্থিক ভাবেও। অবশ্য যদি বেঁচে ফিরে আসতে পার তবেই!’

‘দুঃখিত, কিন্তু কোন অভিযানে যাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। অশেষ ধন্যবাদ! অন্তত আজ নয়। শুভ সকাল!’ আবার বলল বিলবো, ‘তবে চায়ের দাওয়াত রইল। আগামীকাল আসুন একবার আমার বাড়িতে, চা খেয়ে যান। ঠিক আছে? এই কথাই রইল তাহলে? আজকের মত বিদায়!’ কথাগুলো বলেই বিলবো সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

‘কি ভেবে যে চায়ের দাওয়াত দিতে গেলাম লোকটাকে!’ নিজের মনেই গজগজ করতে করতে খাবার রাখার ঘরে ঢুকল বিলবো। গ্যান্ডালফের সাথে কথা বলতে গিয়ে মাথা গরম হয়ে গেছে তার। এখন কিছু না খেলে মাথা ঠাণ্ডা হবে না। দুই টুকরো কেক আর কিছু পানীয় নিয়ে খেতে বসে গেল সে। ভাবছে, এবারের মত বোধহয় অভিযানে বের হওয়ার হাত থেকে বাঁচা গেল!

বন্ধ দরজার ওপাশে গ্যান্ডালফ তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। হাতের লাঠিটার মাথা থেকে বেরিয়ে থাকা একটা কাঁটার সাহায্যে বিলবোর সবুজ দরজার উপর একটা অদ্ভুত চিহ্ন আঁকলেন তিনি, তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বিলবোর আর কিছুই মনে রইল না। এমনিতেও বেশ ভুলোমন সে, দরকারি কথাবার্তা সবকিছু লিখে না রাখলে তার মনে থাকে না। গতকাল তার মাথা এমনই তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল যে গ্যান্ডালফের আসার কথা কিছুই লিখে রাখেনি সে। কিন্তু সবেমাত্র আয়েশ করে সকালের চায়ে প্রথম চুমুকটা দেবে, এই সময় দরজার বাইরে ঝোলানো ঘণ্টাটা প্রবল শব্দে বেজে উঠতেই সবকিছু মনে পড়ে গেল তার। তাড়াহুড়ো করে কেটলিতে আরেকটু চা চড়িয়ে দিল সে, তারপর একটা পিরিচে দুই টুকরো কেক সাজিয়ে রেখে পড়িমড়ি করে দরজার দিকে দৌড় দিল।

দরজাটা খুলতে খুলতে ‘অপেক্ষা করিয়ে রাখার জন্য দুঃখিত’ কথাটা মাত্র বলতে শুরু করেছে সে, এই সময় দেখতে পেল গ্যান্ডালফ নয়, অন্য একজন দাঁড়িয়ে আছে তার দরজায়। একজন বামন। মুখভর্তি নীলচে রঙের দাড়ি, সেটার শেষ অংশ আবার কোমরের সোনালী বেল্টের ভিতর গোজা। হুডের নিচ থেকে কুতকুতে, কিন্তু উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে বিলবোর দিকে। দরজা খোলার সাথে সাথে ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ল সে, বিলবোর ধার ধরল না।

হাতের কাছে একটা আংটায় নিজের হুডওয়ালা আলখেল্লাটা ঝুলিয়ে রাখল সে, তারপর মাথাটা সামান্য নুইয়ে নিজের পরিচয় দিল, ‘অধমের নাম ডোয়ালিন!’

‘আমি বিলবো ব্যাগিনস,’ বামনকে দেখে এমনই হকচকিয়ে গেছে বিলবো যে আর কিছু বলার কথা মাথায় এল না তার। কি বলবে বুঝতে না পেরে কয়েক মূহুর্ত চুপ করে রইল সে, তারপর বলল, ‘চা খাবেন?’ এ ছাড়া আর কিই বা বলার থাকতে পারে, বিশেষ করে যখন একজন বামন হুট করে ঢুকে পড়ে এমন আচরণ করতে শুরু করে যেন এটা তার নিজের বাড়ি?

চায়ের টেবিলে বেশিক্ষণ বসতে পারেনি তারা, এ সময় দরজার ঘন্টাটা বেজে উঠল আবার। তিন নম্বর কেকটায় সবেমাত্র কামড় বসিয়েছে তখন ডোয়ালিন। বিলবো আবার ছুটল দরজার দিকে। ‘অবশেষে আপনার আসার সময় হল!’ বলতে বলতে দরজা খুলল সে, আশা করছে গ্যান্ডালফকে দেখতে পাবে বাইরে। কিন্তু এবারও তাকে হতাশ হতে হল। আরেক জন বামন দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। এ একেবারে খুনখুনে বুড়ো, মুখে ধবধবে সাদা দাড়ি আর মাথায় লাল রঙের হুড। প্রথম জনের মতই দরজা খোলার সাথে সাথে লাফ দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।

‘ওরা তাহলে পৌছাতে শুরু করেছে?’ দেয়ালে টাঙানো প্রথম বামনের আলখেল্লার দিকে তাকিয়ে বলল দ্বিতীয় বামন, তারপর নিজের জামাটাও ঝুলিয়ে রাখল ওটার পাশে। ‘অধমের নাম বেলিন!’ এক হাত বুকে ঠেকিয়ে জানাল সে।

‘ধন্যবাদ!’ বিলবোর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। কথাটা সঠিক হল না, কিন্তু আগেই বলা হয়েছে যে বেশ হকচকিয়ে গেছে সে। এমন নয় যে সে অতিথি অপছন্দ করে, কিন্তু তারা যদি আসার আগে বিলবোকে জানান দিয়ে আসে শুধু তবেই। ভাঁড়ার ঘরে যথেষ্ট কেক আছে কিনা ভেবে হঠাৎ দুশ্চিন্তা বোধ করল সে। কিন্তু হাজার হোক ওরা তার অতিথি, আর তাদের আপ্যায়ন করাটা গৃহস্বামী হিসেবে তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল সে, তারপর বলল, ‘আসুন আসুন, একটু চা খান আমাদের সাথে।’

‘চায়ের বদলে একটু বিয়ার হলে ভাল হয়, বুঝলে? আর তার সাথে দুই এক টুকরো কেক- আছে নাকি তোমার ভাঁড়ারে?’

‘অ-অনেক আছে!’ নিজের মুখ থেকে বের হওয়া কথাটা শুনে নিজেই অবাক হয়ে গেল বিলবো। তাড়াতাড়ি ভাঁড়ার ঘরে ছুটে গেল সে, তারপর বড় এক মগ ভর্তি বিয়ার আর দুই টুকরো কেক নিয়ে ফিরে এল। ততক্ষণে বেলিন আর ডোয়ালিন টেবিলে বসে দুই পুরনো বন্ধুর মত (আসলে ওরা দুই ভাই) জমিয়ে গল্প শুরু করে দিয়েছে। বিয়ারের মগ আর কেকের প্লেটটা তাদের সামনে নামিয়ে রাখতে না রাখতেই বিলবো আবার শব্দ শুনতে পেল দরজায়।

‘এইবার নিশ্চয়ই গ্যান্ডালফ,’ ভাবতে ভাবতে দরজা খুলল সে। কিন্তু না, এবার দু’জন বামন দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। দুজনের পরনেই গাঢ় নীল হুডসহ আলখেল্লা, রুপালী বেল্ট। মুখভর্তি হলদে দাড়ি। দুজনের হাতেই একটা করে ব্যাগ, তাতে নানারকম যন্ত্রপাতির সাথে একটা করে কোদাল উঁকি মারছে। দরজা খোলার সাথে সাথে তারা যখন লাফ দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল তখন বিলবো খুব একটা অবাক হল না।

‘আপনাদের জন্য কি করতে পারি আমি, জনাব…?’ জিজ্ঞেস করল সে। প্রথম জন জবাব দিল, ‘অধমের নাম ফিলি!’ ‘আর আমার নাম কিলি,’ বলল দ্বিতীয়জন। তারপর দুজনেই হুড নামিয়ে দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান দেখাল বিলবোকে।

‘ডোয়ালিন আর বেলিন দেখছি চলে এসেছে,’ বলল কিলি। ‘চল তাহলে, জাঁকিয়ে বসে একটু আড্ডা মারা যাক!’

আড্ডা কথাটার সুর তেমন ভাল লাগল না বিলবোর কাছে। চার বামন বসে পড়ল টেবিল ঘিরে, ওদিকে দরজার কাছে একটা টুলে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল সে। বেশি চিন্তাভাবনা করা তার অভ্যাসে নেই, এখন না চাইতেও দুশ্চিন্তা চলে আসছে মাথায়। সেগুলোকে তাড়ানোর জন্য এক মগ বিয়ার ভরে নিল।

‘এরা কারা? কোথা থেকে এল? আমার বাড়িতে কেন? কি হচ্ছে এসব? এর পর কি হবে?’ ইত্যাদি নানা প্রশ্ন জটলা পাকাচ্ছে বিলবোর মাথায়। কিন্তু বেশিক্ষণ দুশ্চিন্তা করার সুযোগ পেল না সে। বিয়ারের মগে দুই চুমুক দিতে না দিতেই দরজায় শব্দ হল আবার। এক, দুই, তিন, চার বার। ‘আবার কে এল?’ বিড়বিড় করে বলল বিলবো। ‘শব্দ শুনে মনে হচ্ছে চার জন,’ বলল ফিলি। আরও একবার বেজে উঠল ঘন্টাটা, এবার আগের চেয়েও জোরে। দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠে দাঁড়াল বিলবো, দরজা খুলতে এগোল।

চার জন নয়, পাঁচ জন বামন দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। দরজা খুলতেই সবাই তাকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল, তার আগে ভেতরে ঢুকে পড়তে ভুল করেনি। একে একে নিজেদের নাম জানাল তারা। ডোরি, নোরি, ওরি, ওইন, আর গ্লোইন। আংটায় ঝুলতে থাকা আলখেল্লাগুলোর পাশে আরো দুটো বেগুনি, একটা ধূসর, একটা বাদামী আর একটা সাদা হুড যুক্ত হল। সবাই টেবিলে গিয়ে বসল। কেউ চাইল এল নামের মদ, কেউ কফি, কেউ কেক। আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল বিলবো।

মাত্র কফির পটটা চড়িয়েছে বিলবো, এ সময় দরজায় শব্দ হল আবার। তবে ঘন্টার শব্দ নয়, ঠক ঠক করে একটা শব্দ শুনতে পেল সে। কেউ একজন লাঠি দিয়ে বাড়ি মারছে দরজায়। গ্যান্ডালফ!

আরেক বার দরজা খুলতে এগিয়ে গেল বিলবো, মনে মনে বেশ রেগে গেছে। দরজাটা এক টানে খুলে ফেলল সে। সাথে সাথে প্রায় তার গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল আরও চার বামন! তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন গ্যান্ডালফ, লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন। লাঠির গুঁতোয় দরজার উপর বেশ ভাল রকমের একটা দাগ তৈরি হয়েছে। তবে সেই সাথে গতকাল রেখে যাওয়া চিহ্নটাও মুছে ফেলতে ভোলেননি তিনি।

‘আস্তে আস্তে, বিলবো! এত তাড়াহুড়ো করে দরজা খোলার কোন প্রয়োজন নেই,’ বললেন গ্যান্ডালফ। ‘এসো, তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেই। এ হচ্ছে বাইফুর, বোফুর আর বোম্বার। আর এই হচ্ছে থোরিন!’

বাইফুর, বোফুর আর বোম্বার সাথে সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালো বিলবোকে, তারপর দুটো হলুদ আর একটা হালকা সবুজ রঙের হুড ঝুলিয়ে রাখল। সেই সাথে একটা আকাশী নীল হুড, যেটার সাথে ঝুলছে একটা রুপালী রেশমের তৈরি বল। এই হুডের মালিক হল থোরিন। সে কিন্তু খুবই সম্মানিত একজন বামন, যার পুরো নাম থোরিন ওকেনশিল্ড। বিলবোর দরজার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া বাকি তিন বামনের তলায় চাপা পড়েছিল সে, ব্যপারটা যে তার একেবারেই পছন্দ হয়নি সেটা তার ভ্রুকুটিতেই বোঝা গেল। তবে বিলবো এতবার দুঃখ প্রকাশ করল যে শেষ পর্যন্ত ভ্রুকুটিটা মুখ থেকে মুছে ফেলতে বাধ্য হল সে।

‘দেখা যাচ্ছে আমরা সবাই উপস্থিত!’ খুশি খুশি গলায় বললেন গ্যান্ডালফ, নিজের চোখা হ্যাটটা বাকি হুডগুলোর পাশে ঝুলিয়ে রাখছেন। ‘আশা করি খাবার দাবার এখনও কিছুটা অবশিষ্ঠ আছে! কি বললে? চা? না না, চা খাব না। যদি পার তো আমার জন্য কিছুটা রেড ওয়াইনের ব্যবস্থা কর।’ ‘আমার জন্যেও,’ থোরিন জানাল। বাকি তিন বামনও তাদের চাহিদার কথা জানিয়ে দিল। র‍্যাস্পবেরী পাই, আপেলের পিঠা, মাংসের কেক, পনীর, সালাদ ইত্যাদি। সেই সাথে ভেতর থেকে আরও কেক আর এল আর কফির জন্য আবেদন ভেসে এল। হুড়মুড় করে ভাঁড়ার ঘরের দিকে ছুটল বিলবো। পেছন থেকে গ্যান্ডালফ গলা চড়িয়ে বললেন, ‘তাহলে কিছু ডিম আর মুরগীর মাংসেরও ব্যবস্থা কর!’

‘আমার ভাঁড়ারে কি আছে না আছে তার সবই দেখছি এরা জানে,’ গজগজ করতে করতে বলল বিলবো। খাবার দাবার সব গুছিয়ে যখন সে একগাদা প্লেট, বোতল, কাপ ইত্যাদিতে করে বয়ে নিয়ে আসছে ততক্ষণে তার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। ‘কেমন অসভ্য বামনরে সব, বাবা! একটু সাহায্য করলেও তো পারে! বিড়বিড় করে বলতে বলতে ভাঁড়ার থেকে বের হল সে, তারপরেই দেখল বেলিন, ডোয়ালিন, ফিলি আর কিলি দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। বিলবো কিছু বলার আগেই চার জনে মিলে তার হাত থেকে সব কিছু নিয়ে নিল, তারপর সুন্দর করে খাওয়ার ঘরে সাজিয়ে ফেলল সবকিছু।

তেরো জন বামনের মধ্যমনি হয়ে বসলেন গ্যান্ডালফ, আর বিলবো বসল ফায়ারপ্লেসের সামনে ছোট্ট একটা টুলে। একটা বিস্কিটে অল্প অল্প কামড় দিচ্ছে, কারণ খিদে প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে তার। বামনেরা খাওয়া শুরু করল। সে কি খাওয়া, শেষই যেন হয় না! তারপর একসময় তাদের খাওয়া শেষ হলে বিলবো উঠে দাঁড়াল।

‘আপনারা রাতে খেয়ে যাবেন নিশ্চয়ই?’ প্লেট আর গ্লাস গোছাতে গোছাতে প্রশ্ন করল সে, সতর্ক থাকল যাতে ভদ্রতা আর ঠান্ডা সুরের পরিমাণটা ঠিক থাকে। কিন্তু তার গলার সুর বুঝল না কেউ, অথবা বোঝার চেষ্টা করল না। ‘অবশ্যই!’ সবার হয়ে জবাব দিল থোরিন। ‘অনেক কিছু আলোচনা করতে হবে আমাদের, সময় লাগবে তাতে। তবে তার আগে একটু গানবাজনাও দরকার। টেবিল পরিষ্কার করে ফেল তাহলে সবাই!’

শেষ কথাটা শোনার সাথে সাথে বারো জন বামন চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। তারপর সবকিছু একটার উপর আরেকটা লম্বা লম্বা সারিতে সাজিয়ে হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ব্যপারটা দেখে বিলবোর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল, ফেলে দিলেই তো তার সব বাসনকোসনের দফারফা! ‘একটু সাবধানে, একটু সাবধানে!’ মিনমিন করে বলল সে। ‘আমিই নিয়ে যেতাম, আপনাদের কষ্ট করার দরকার ছিল না…’

কিন্তু বামনেরা তার কথায় কান দিল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিলবো দেখল সবগুলো বাসনকোসন ধুয়ে মুছে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নির্দিষ্ট জায়গায়। অগত্যা বামনদের সাথে টেবিলে ফিরে এল সে। সেখানে থোরিন তখন বসে বসে বিরাট এক পাইপে ধূমপান করছে। ইয়া বড় বড় ধোঁয়ার রিং বানিয়ে ছাড়ছে সে, তারপর যেদিকে যেতে বলছে সেদিকে চলে যাচ্ছে রিংগুলো। কোনটা চিমনি দিয়ে বেরিয়ে গেল, কোনটা টেবিলের তলায় সেধোল, কোনটা ঘুরে বেড়াতে লাগল ছাদের কাছাকাছি। কিন্তু গ্যান্ডালফও কম যান না, তার তৈরি রিংগুলো থোরিনের মাথার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন। নিজের বানানো রিংগুলোর কথা চিন্তা করে বেশ লজ্জা পেল বিলবো।

‘এবার তোমাদের যন্ত্রপাতিগুলো বের কর,’ বামনেরা ফিরে আসতে তাদের বলল থোরিন। ‘একটু গানবাজনা হোক!’ সাথে সাথে ডোরি, নোরি আর ওরি তাদের ব্যাগ থেকে তিনটে বাঁশি বের করে আনল। বোম্বার বের করল একটা ড্রাম, বাইফুর আর বোফুর বের করল একটা করে ক্ল্যারিনেট। ডোয়ালিন আর বেলিন বলল, ‘আমাদের গুলো তো বাইরে রেখে এসেছি!’ থোরিন জবাব দিল, ‘তাহলে নিয়ে এস ওগুলো। সাথে আমারটাও।’ একটু পরেই ফিরে এল তারা। হাতে দুটো বেহালা, আর সবুজ কাপড়ে মোড়ানো থোরিনের হার্প। বাজাতে শুরু করল থোরিন, এত সুন্দর সুর বেরিয়ে এল যন্ত্রটা থেকে যে মুহুর্তে সব কিছু ভুলে গিয়ে বহু দূরের এক জগতে হারিয়ে গেল বিলবো।

আঁধার নেমে এল এক সময়। ফায়ারপ্লেসের আগুন নিভে এল আস্তে আস্তে, দেয়ালের গায়ে পড়ল বামনদের কিম্ভুতকিমাকার ছায়া। কিন্তু বাজানো থামাল না তারা। তারপর, হঠাৎ করেই ভারি গলায় এক জন গান গেয়ে উঠল। তার সাথে তাল মেলাল বাকিরা।

বহুদূরের দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া পর্বতের গান গাইল বামনরা, তাদের গানে উঠে এল দূরদুরান্তে অভিযানে বের হয়ে হারিয়ে যাওয়া দুঃসাহসী সব অভিযাত্রীদের বীরত্বগাথা। জাদুর মায়াজালে সুরক্ষিত সোনার পাহাড়, আর তার পাহারায় থাকা এক ভয়ঙ্কর ড্রাগনের কথা গাইল তারা। গান শুনতে শুনতে বিলবোর মনের ভেতর কেমন একটা পিপাসা জেগে উঠল, দিগন্তের ওপারে তাকিয়ে বুকের ভেতর যেমন খা খা করে ওঠে অনেকটা তেমনি। হঠাৎ করে এই ঘর থেকে বের হয়ে দুর্গম পৃথিবীর আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানোর একটা দুর্দমনীয় ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তার ভেতর।

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল সে। তার মনে হচ্ছে কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকে, যতক্ষণ না এই বামনেরা চলে না যায়। কিন্তু হঠাৎ করে তার খেয়াল হল, গান থামিয়ে সব বামনেরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

‘ইয়ে মানে, আলো জ্বালতে হবে না?’ কৈফিয়ত দেয়ার সুরে বলল সে।

‘অন্ধকারই ভাল লাগে আমাদের!’ বলল বামনেরা।

‘অবশ্যই, অবশ্যই!’ বলতে বলতে আবার বসে পড়ল বিলবো।

‘অনেক গান হল। এবার থোরিন কিছু কথা বলবে,’ সবাইকে চুপ করতে ইশারা করলেন গ্যান্ডালফ।

একবার গলা খাকারী দিয়ে গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল থোরিন।

‘আমার প্রিয় বামনরা, মিঃ ব্যাগিনস এবং জাদুকর গ্যান্ডালফ! আজ এক বিশেষ উপলক্ষে আমরা উপস্থিত হয়েছি আমাদের অত্যন্ত উদার বন্ধু, সমব্যথী এবং সহযাত্রী হবিট মিঃ বিলবো ব্যাগিনসের বাড়িতে। তিনি দীর্ঘজীবি হোন, সেই সাথে চিরস্থায়ী হোক তার এল, বিয়ার এবং ভাঁড়ার ঘরের অন্য সব সুস্বাদু খাবার!’ একটু থামল সে, দেখতে চাইছে তার প্রশংসার জবাবে বিলবো কিছু বলে কিনা। কিন্তু বিলবো তখন অবাক হয়ে থোরিনের দিকে তাকিয়ে আছে। সমব্যথী এবং সহযাত্রী কথাটা শুনে তার মাথায় তালগোল পাকিয়ে গেছে। অগত্যা আবার বলতে শুরু করল থোরিনঃ

‘আজ এখানে আমরা একসাথে হয়েছি আমাদের অভিযানের সকল খুঁটিনাটি পরিকল্পনা, সম্ভাব্য চলার পথ এবং অন্যান্য বিষায়দি আলোচনা করার জন্য। আগামীকাল সকালে দিনের আলো ফোটার আগেই রোমাঞ্চকর এক অভিযানে রওনা হব আমরা, যেখান থেকে ফেরার পথে কে আমাদের সাথে থাকবে আর কে থাকবে না সেটা একমাত্র অদৃষ্টই বলতে পারে, যদিও ক্ষমতাধর জাদুকর গ্যান্ডালফের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়। আশা করি আমাদের লক্ষ্য সম্পর্কে সকলেই অবগত আছেন, শুধু মিঃ বিলবো ব্যাগিনস এবং আমাদের মাঝে দুই অপেক্ষাকৃত অল্পবয়েসী বামন ফিলি এবং কিলি ছাড়া। তবে অসুবিধে নেই, আজ রাতেই সবার সব অপেক্ষার অবসান হবে। আর সেজন্য আমাদের যেতে হবে একটু গভীর ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনার মধ্য দিয়ে, যার শুরুতে-

থোরিন যে কথা বলতে ভালবাসে সেটা বেশ ভালভাবেই বোঝা যাচ্ছে। কতক্ষণ ধরে তার এই “জ্ঞানগর্ভ আলোচনা” চলত তা বলা মুশকিল, তবে অপ্রত্যাশিত ভাবে বাধা পড়ল তার বক্তৃতায়। হঠাৎ আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠল বিলবো। থোরিনের কথার কিছুটা শুনেই ভয় পেয়ে গেছে সে, বিশেষ করে কে থাকবে আর কে থাকবে না- এই কথাটা শোনার পরেই বুক কেঁপে উঠেছে তার। চিৎকারের শব্দে সবাই সচকিত হয়ে উঠল। গ্যান্ডালফ তাড়াতাড়ি তার লাঠির মাথা থেকে একটা নীলচে আলো তৈরি করলেন, সে আলোয় দেখা গেল কার্পেটের উপর কুঁকড়ে পড়ে আছে বিলবো। বামনরা সবাই মিলে তাকে মেঝে থেকে তুলে নিল, তারপর বেডরুমে নিয়ে গেল। বিছানায় আরাম করে শুইয়ে দেওয়া হল তাকে, তারপর সবাই মিলে ফিরে গেল নিজেদের আলোচনায়।

‘একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছে আর কি,’ বললেন গ্যান্ডালফ। ওদিকে বিলবো কিন্তু বিছানায় উঠে বসেছে। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর চুপি চুপি নেমে গিয়ে দরজায় কান পাতল সে। গ্লোইন তখন বলছে, ‘গ্যান্ডালফের কথায় না হয় মেনে নিলাম মিঃ বিলবো ব্যাগিনস অত্যন্ত সাহসী, শক্তিশালী। কিন্তু কি হবে, ভাবুন তো, যখন কোন সতর্ক মূহুর্তে ওইভাবে চিৎকার করে উঠবে সে? সাথে সাথে ড্রাগনের ঘুম ভেঙে যাবে, সবাই ধরা পড়ে যাব আমরা। আর একটু আগে যে চিৎকারটা আমি শুনলাম সেটা উত্তেজনার নয়, বরং ভয়ার্ত চিৎকার বলেই মনে হয়েছে। আজ সকালে যদি গ্যান্ডালফের আঁকা চিহ্নটা এই বাড়ির দরজায় না দেখতাম তাহলে তো ধরেই নিতাম যে ভুল জায়গায় এসেছি আমরা। মিঃ ব্যাগিনসকে তো চোর নয়, বরং সাদামাটা গেরস্থ বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে!’

দরজা খুলে বেরিয়ে এল বিলবো। যথেষ্ট শুনেছে সে। টুক বংশের রক্ত এতক্ষণে জেগে উঠতে শুরু করেছে তার ভেতর। যদিও পরবর্তীতে অনেক বার নিজের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস হয়েছে তার।

‘মাফ করবেন,’ বলল সে। ‘কিন্তু আপনাদের কিছু কথা কানে গেছে আমার, তাই আবার না এসে পারলাম না। আপনারা আমাকে নিয়ে কি বলাবলি করছেন আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, তবে এটুকু বুঝেছি যে আমাকে কোন একটা কাজের যোগ্য বলে মনে করছেন না। আজ সকালে যখন আপনারা এক এক করে আসতে শুরু করলেন তখন আমারও মনে হয়েছিল কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল আছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে দরজায় রঙ করিয়েছি আমি, সেখানে কোন চিহ্ন থাকার প্রশ্নই আসে না। তবে যাই হোক, আমি বলব যে আমাকে একটা সুযোগ দেয়া হোক। কি করতে হবে আমাকে বলুন, সেটা করে দেখানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমি, কিছুতেই পিছপা হব না। আমার নানার নানার নানার এক চাচা ছিলেন, তার নাম-’

‘হ্যা হ্যা, বুঝতে পেরেছি,’ গ্লোইন থামিয়ে দিল তাকে। ‘তোমার কথাই বলছিলাম আমি। যে চিহ্নের কথা আমি বলছিলাম সেটা সাধারণত চোরদের দরজায় আঁকা থাকে। কেউ কেউ অবশ্য নিজেকে দক্ষ গুপ্তধন শিকারী হিসেবেও পরিচয় দেয়। তবে সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। গ্যান্ডালফ আমাদের বলেছিলেন এদিকে নাকি এমন একজন লোক বাস করে, কাজ খুঁজছে সে। ওদিকে আমাদের অভিযানেও এমন একজন লোক দরকার। আজ আমাদের এখানে জমায়েত হওয়ার সিদ্ধান্তও গ্যান্ডালফের পরামর্শেই নেয়া।’

‘আগেও বলেছি, এখনও বলছি আমি।’ বললেন গ্যান্ডালফ, তোমাদের অভিযানের চতুর্দশ সদস্য হিসেবে বিলবোর চাইতে উপযুক্ত আর কেউ নেই। এখন আমার কথা তোমরা শুনবে কি না সেটা তোমাদের ইচ্ছা।’ গ্লোইনের দিকে তাকিয়ে এমন এক ভ্রুকুটি করলেন তিনি যে আর কিছু বলতে সাহস পেল না সে। ‘আর কোন তর্কাতর্কির প্রয়োজন নেই। আমি যদি বলে থাকি যে মিঃ বিলবো ব্যাগিনস একজন দক্ষ চোর তবে সে তাই। দরকারের সময়েই সেটা সবাই বুঝতে পারবে। তোমরা কেউ, এমন কি বিলবো নিজেও সম্পূর্ণ জানে না ওর ক্ষমতা সম্পর্কে। এবার বিলবো, একটা বাতি জ্বালিয়ে ফেল চটপট!’

কেউ কিছু বলার সাহস পেল না। গ্যান্ডালফকে সবাই কমবেশি ভয় পায় বা শ্রদ্ধা করে। বিলবো তাড়াতাড়ি একটা বাতি জ্বালিয়ে নিয়ে এল। টেবিলের উপর পার্চমেন্টের উপর আঁকা একটা ম্যাপ বিছালেন গ্যান্ডালফ।

‘থোরিন, এই মানচিত্র এঁকেছিলেন তোমার দাদা থ্রর। পর্বতমালার সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া আছে এতে।’

ভাল করে দেখল থোরিন। ‘এটা আমার খুব একটা কাজে আসবে না। ওই পাহাড়ি এলাকার সবকিছু খুব ভাল করেই চিনি আমি।

‘থোরিন ঠিকই বলেছে। পাহাড়ের কোন জায়গায় ড্রাগনের অবস্থান সেটা মানচিত্রে চিহ্নিত করা রয়েছে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু একবার পাহাড়ে পৌছাতে পারলে মনে হয় না ওটাকে খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হবে।’ বলল বেলিন।

‘একটা ব্যাপার তোমরা সবাই ভুলে যাচ্ছ। সেটা হচ্ছে ড্রাগনের আস্তানায় ঢোকার গোপন রাস্তা। মানচিত্রের দুই পাশে প্রাচীন ভাষায় লেখা ওই কথাগুলো দেখেছ? একটা গোপন পথের নির্দেশ দিচ্ছে ওগুলো, যেটা অনুসরণ করে ভেতরে ঢোকা যাবে।’

‘হয়তো ভিতরে ঢোকা যাবে ওটা দিয়ে, কিন্তু এত বছর পরে যে ওটা এখনও গোপন আছে তার নিশ্চয়তা কি? ড্রাগনটা এতদিন ধরে আছে ওখানে, নিশ্চয়ই দরজাটা আবিষ্কার করা হয়ে গেছে তার।’

হয়তো, কিন্তু ড্রাগনের জন্য ওই দরজা ব্যবহার করা অসম্ভব। দরজাটা খুব ছোট, এখানে লেখা আছে যে উচ্চতায় মাত্র পাঁচ ফিট, চওড়ায় তিন। ওই দরজা দিয়ে ড্রাগনের মত একটা বিশালাকৃতি প্রাণীর চলাচল করা সম্ভব নয়।’

‘ঠিক আছে, মানলাম ড্রাগন ওই দরজা ব্যবহার করে না। কিন্তু বাইরে থেকে আমরা কিভাবে চিনব দরজা? নিশ্চয়ই কোন ভাবে গোপন করে রাখা আছে, না হলে এত দিনে মানুষ জেনে যেত ওটার কথা।’ বলে উঠল বিলবো।

‘অবশ্যই। দরজাটা এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যে বাইরে থেকে ওটাকে চেনার কোন উপায় নেই, স্রেফ পাহাড়ের একটা অংশ বলে মনে হবে। আরেকটা কথা, ম্যাপের সঙ্গে একটা চাবিও আছে।’ আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা চাবি বের করে থোরিনের হাতে দিলেন তিনি। রুপার তৈরি লম্বা, সুন্দর একটা চাবি। গায়ে নানারকম জটিল অলঙ্করণ।

নিজের গলায় একটা চেইনের সাথে ঝুলিয়ে রাখল থোরিন চাবিটা। তারপর বলল, ‘এতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কপাল তো ভালই বলতে হবে। আমরা ঠিক করেছিলাম পূবে যাত্রা করব, লং লেকে পৌছানোর আগ পর্যন্ত থামব না। আসল ঝামেলা শুরু হবে তার পর থেকেই। হ্রদে যে নদীটা এসে পড়েছে সেটার পাড় ঘেষে উজানে এগিয়ে যাব সামনে, যতক্ষণ না ডেল শহরের ধ্বংসস্তুপে না পৌছাই। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শহরটা। আর নদীটা নেমে এসেছে পাহাড়ের দক্ষিণ পাশ দিয়ে, শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে সামনে। শুনেছি ড্রাগনটা ওই দিক দিয়েই বের হয়ে আসত, হামলা চালাত শহরের উপর। পুরো শহরটাই মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।’

‘ওভাবে কাজ হবে না, থোরিন,’ বললেন গ্যান্ডালফ। ড্রাগনের মুখোমুখি হতে পারে এমন সাহসী যোদ্ধা নেই তোমার দলে, আর তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়াও কঠিন। সেজন্যেই আমি একজন চোরের দক্ষতার উপর নির্ভর করতে চেয়েছি। সবার চোখে ধুলো দিয়ে কাজ হাসিল করা একমাত্র আমাদের বিলবোর মত দক্ষ চোরের পক্ষেই সম্ভব।’

‘উত্তম,’ বলল থোরিন। ‘দেখা যাক আমাদের দক্ষ চোর মহাশয় কোন উপদেশ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন কিনা?’ ছদ্ম-সম্মানের সাথে বিলবোর দিকে তাকাল সে।

‘অবশ্যই। কিন্তু তার আগে আমার কিছু ব্যাপার জানা দরকার,’ কথা বলার সুযোগ পেয়ে খুশি হল বিলবো। ‘সোনা, ড্রাগন, অভিযান- ইত্যাদি কথাগুলো আমার মাথায় ঢুকছে না। কার সোনা, ড্রাগনটা কোথা থেকে আসল এই কথাগুলো আমাকে একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলে খুশি হই।’ বলল সে।

‘অদ্ভুত!’ বলল থোরিন। ‘ম্যাপ দেখনি তুমি? আমাদের গান শোননি? তাহলে তো সব পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত তোমার কাছে!’

‘তারপরেও, সব কিছু শুনতে চাই আমি। একেবারে গোড়া থেকে।’ গলায় কিছুটা জেদ এনে বলল বিলবো। ‘তাছাড়া কাজটায় ঝুঁকির পরিমাণ কেমন, খরচ আর সময় কত লাগবে এগুলোও জানা দরকার।’ আসলে বলতে চাইছে যে এখান থেকে তার পকেটে কোন টাকা-পয়সা আসবে কিনা, আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে কিনা।

‘শোন তাহলে,’ বলল থোরিন। ‘অনেক বছর আগে, আমার দাদা থ্রর যখন বেঁচে ছিলেন তখন উত্তরের এক দেশ থেকে চলে আসেন তারা, তাদের সকল সয়সম্পত্তি নিয়ে ম্যাপে দেখানো ওই পাহাড়ে বসবাস করতে শুরু করেন। পাহাড়ের মধ্যে অনেক গুলো সুড়ঙ্গ তৈরি করেন তারা, সেই সাথে বিশাল সব হলঘর আর কল-কারখানা। সেখানে প্রচুর পরিমাণে সোনা আর মূল্যবান পাথরের সন্ধান পাওয়া যায়। কিছুদিনের মধ্যেই অনেক ধনী হয়ে উঠলেন তারা, পাহাড়ের নিচে সেই রাজ্যের রাজা হলেন আমার দাদা। ডেল নামে সেই বিশাল শহরের গোড়াপত্তনও তারাই করেছিলেন। পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তৃত উপত্যকা পর্যন্ত তাদের রাজত্ব ছড়িয়ে পড়ে। বামনদের কারিগরী দক্ষতার কথা নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে, আশেপাশের রাজ্য থেকে রাজারা আমাদের কাছে লোক পাঠাতেন কাজ শেখার জন্য, তাদের নানা রকম যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্রও আমরা তৈরি করতাম। অবশ্যই মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। সেইসব রাজ্য থেকে খাবার দাবারের সরবরাহও আসত প্রচুর পরিমাণে। সোজা কথায় আমাদের জন্য সেই দিনগুলো ছিল চমৎকার। গরীব বলতে কেউ ছিল না, সব কাজ শেষ করেও হাতে প্রচুর অবসর থাকত আমাদের। অচিরেই আমার দাদা হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ঐশ্বর্যশালী রাজাদের একজন।

‘তবে সন্দেহ নেই যে ওই সম্পদের লোভেই ড্রাগনটা হানা দিয়েছিল। তুমি নিশ্চয়ই জান যে ড্রাগনরা ধনসম্পদ পছন্দ করে, সোনাদানায় ওদের কোন উপকার না হলেও ওসবের প্রতি ওদের আসক্তি প্রচুর। মরার আগ পর্যন্ত যখের ধনের মত নিজের ঐশ্বর্য আগলে রাখতে পছন্দ করে ওরা। সেই সময় উত্তরের ওই এলাকায় ড্রাগন দেখা যেত অনেক। তবে সবগুলোকে লোভ, নিষ্ঠুরতা আর হিংস্রতায় ছাড়িয়ে গিয়েছিল এই ড্রাগনটা, যার নাম ছিল স্মগ। যেদিন সকালে সে আমাদের রাজ্যে হামলা চালাল সেদিন আমি সৌভাগ্যক্রমে পাহাড়ের বাইরে ছিলাম। তখন আমি একেবারেই বাচ্চা ছেলে, খেলছিলাম বন্ধুদের সাথে। হঠাৎ শোঁ শোঁ করে বাতাসের শব্দ শুনলাম। মনে হল সাইক্লোন আসছে। তারপর ড্রাগনটাকে দেখতে পেলাম। দেখলাম, আগুনের প্রবল নিঃশ্বাসে পুরো পাহাড় জ্বালিয়ে দিচ্ছে ড্রাগনটা। পাহাড়ের ভিতর যারা ছিল তারা বের হয়ে আসার চেষ্টা করল, কিন্তু ড্রাগনের নিঃশ্বাসে পুড়ে ছাই হয়ে গেল সবাই। পাহাড় ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হল না স্মগ, উপত্যকায় গড়ে ওঠা ডেল শহরকেও মিশিয়ে দিল ধুলোর সাথে।

‘ধ্বংসযজ্ঞ শেষ হলে পাহাড়ে ফিরে গেল ড্রাগন, যেখানে যা মূল্যবান সম্পদ পেল সব কুড়িয়ে নিয়ে এক জায়গায় জড়ো করল। শুনেছি এখন সে পাহাড়ের ভেতর সেই বিশাল হল ঘরে বাস করে, বিছানা হিসেবে ব্যবহার করে সোনা দানা আর মূল্যবান পাথরের তৈরি সেইসব সম্পদের পাহাড়।

‘আমি তখন আমার বন্ধুদের সাথে পাহাড়ের বাইরে এক জায়গায় লুকিয়ে আছি। ধরে নিয়েছি আমার স্বজনদের মধ্যে আর কেউ বেঁচে নেই। এই সময় হঠাৎ আমার বাবা আর দাদাকে দেখতে পেলাম। বিষন্ন মুখে আমাদের কাছে আসলেন তারা। আমি জিজ্ঞেস করলাম তারা কিভাবে পালিয়ে আসলেন, কিন্তু আমাকে ধৈর্য ধরতে বললেন তারা। বললেন, সময় হলেই আমি সব জানতে পারব। তারপর বেঁচে যাওয়া সঙ্গী সাথীদের নিয়ে সেখান থেকে চলে আসি আমরা। নিজেদের দক্ষতা আর কারিগরী জ্ঞান দিয়ে জীবিকা উপার্জন করতে শুরু করলাম, সম্রাট থেকে পরিনত হলাম পথের ভিখারীতে। কিন্তু আমাদের লুন্ঠিত সম্পদের কথা কোন দিন ভুলিনি। আজ এতদিন পর সুযোগ এসেছে ঐ খুনী ডাকাত ড্রাগনটাকে উচিত শিক্ষা দেয়ার।

‘আমার বাবা আর দাদা কিভাবে পালিয়ে এসেছিলেন সেটা নিয়ে আমার মনে সবসময়েই একটা কৌতুহল ছিল, কিন্তু কোন দিন উত্তর পাইনি। আজ এই ম্যাপটা দেখে বুঝতে পারছি পাহাড়ে ঢোকা বা বের হওয়ার একটা গোপন রাস্তা আছে, যেটা ব্যবহার করে বের হয়ে এসেছিলেন তারা। কিন্তু ম্যাপটা আপনার হাতে কিভাবে গেল, গ্যান্ডালফ? ওটা যদি আমার দাদার আঁকা হয়, তাহলে তো উত্তরাধিকার সূত্রে আমারই পাওয়ার কথা, তাই না?’ গ্যান্ডালফের দিকে তাকাল থোরিন।

‘তোমার দাদা কিভাবে মারা গিয়েছিলেন নিশ্চয়ই জানা আছে? অ্যাজগ নামের গবলিনের হাতে খুন হয়েছিলেন তিনি, মোরিয়ার খনিতে। আর তোমার বাবা আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে এপ্রিলের একুশ তারিখ উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, আর কখনও তার দেখা পাওনি তুমি। তাই না?’ প্রশ্ন করলেন গ্যান্ডালফ।

‘হ্যা,’ সায় দিল থোরিন।

‘তোমার বাবাই আমাকে ম্যাপটা দিয়ে বলেছিলেন তোমার কাছে পৌঁছে দিতে। অনেক আগেই কাজটা করতাম আমি, কিন্তু তোমাকে খুঁজে বের করতে গিয়ে অনেক সময় লেগে গেল। তোমার বাবা যখন ম্যাপটা দিলেন তখন তার অবস্থা খুবই খারাপ, এমনকি নিজের নামটাও মনে করতে পারেন না। শুধু এই ম্যাপ আর চাবিটার কথা কোনভাবে আমাকে জানান তিনি, বলেন তার ছেলেকে দিতে। কিন্তু তোমার নামটাও আমি তার কাছ থেকে জানতে পারিনি। তবে যাই হোক, এখন তুমি ম্যাপটা তোমার কাছেই রেখে দিতে পার।’

‘বাবার অবস্থা খারাপ ছিল বললেন? কি হয়েছিল তার?’

‘তোমার বাবা ম্যাপটা পেয়েছিলেন তার বাবার কাছ থেকে। স্মগের কাছ থেকে নিজের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে বের হন তিনি, কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, তার ভাগ্যটা ভাল ছিল না। পাহাড়ের কাছাকাছিও পৌছাতে পারেননি তিনি, তার আগেই ধরা পড়ে যান নেক্রোম্যান্সারের হাতে। আমি যখন তাকে খুঁজে পাই তখন তিনি নেক্রোম্যান্সারের দূর্গে বন্দী। আমি তাকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যর্থ হই।’

‘গবলিনদের উপর প্রতিশোধ নিয়েছি আমরা,’ বলল থোরিন। ‘নেক্রোম্যান্সারকেও ছাড়ব না।’

‘বোকার মত কথা বোলো না থোরিন,’ তীরস্কার করলেন গ্যান্ডালফ। ‘পৃথিবীর সব বামন এক হলেও নেক্রোম্যান্সারের জাদুর শক্তির সাথে পেরে উঠবে না। এমনকি এই আমি পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোন রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। তোমার বাবার ইচ্ছা ছিল তার ছেলে যেন ম্যাপ আর চাবিটার সদ্ব্যবহার করে, তার অসমাপ্ত কাজ শেষ করে। ড্রাগনের মোকাবেলা করাই তোমার জন্য অনেক কঠিন একটা কাজ।’

‘ঠিক বলেছেন!’ বিলবোর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কথাটা। সাথে সাথে বাকি বামনরা মারমুখী হয়ে তাকাল তার দিকে। ‘কি বললে তুমি?’ জানতে চাইল তারা।

‘না মানে, আমি বলতে চাইছিলাম যে আমাদের হাতে তো ম্যাপ আর চাবিটা আছেই,’ আমতা আমতা করে বলল বিলবো। ‘ড্রাগনটা নিশ্চয়ই সারাক্ষণ জেগে থাকে না? তার ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত গোপন দরজার সামনে অপেক্ষা করতে পারি আমরা, তারপর সেখানেই পরবর্তী করনীয় ঠিক করে নিতে পারি। তাছাড়া রাতও তো অনেক হয়েছে, কাল ভোরে যদি আপনারা যাত্রা করতে চান তাহলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া উচিত।’

‘আপনারা মানে? তুমিও যাচ্ছ আমাদের সাথে, মনে রেখ!’ বলল থোরিন। ‘আর দরজার সামনে অপেক্ষা করবে নাকি ভেতরে ঢুকবে সেটা ঠিক করার দায়িত্বও তোমার, মহামান্য চোর মহাশয়।’ বিদ্রুপের সুরে বলল সে। ‘তবে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার কথাটা একেবারে মন্দ বলনি। শোন, সকালের নাস্তায় ডিম চাই আমার। পোচ নয়, ভাজি করা, সেই সাথে হ্যাম।’

তার সাথে সাথে বাকি বামনেরাও উঠে দাঁড়াল, এবং একই রকম চাছাছোলা গলায় নিজেদের চাহিদার কথা জানিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কেউ একটু প্লীজ বলারও প্রয়োজন বোধ করল না। বাড়তি রুমগুলোর প্রত্যেকটায় তাদের জন্য বিছানা করে দিল বিলবো, তারপর নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়ল। মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিল সে। সকালে এত গুলো মানুষের জন্য নাস্তা বানানোর কোন ইচ্ছা নেই তার।

তার ঠিক পাশের ঘরটাতেই রয়েছে থোরিন। রাতে তারা দলবেঁধে যে গানটা গাইছিল সেটার সুর গুনগুন করছে সে, শুনতে পেল বিলবো। কেমন যেন শিউরে উঠল সে।

দ্বিতীয় অধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *