ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – দশম অধ্যায়

পুরো দিন এবং রাত ধরে এগিয়ে চলল অভিযাত্রীদের ব্যারেলগুলো। নদীর বাঁকে কয়েক জায়গায় লম্বা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে ছিল এলফরা, ব্যারেলগুলো আটকে গেলে সেগুলোকে ঠেলে ভাসিয়ে দিয়েছে আবার। এমনই এক জায়গায় বেশ খানিকটা সময় ব্যারেল আটকে থাকার সুযোগে তীরে নেমে কিছুটা খাবার আর ওয়াইন সংগ্রহ করেছে বিলবো। তবে সমস্যা হয়েছে আরেক জায়গায়, নদীর ঠান্ডা পানিতে ভিজে ভয়াবহ সর্দি লেগেছে তার। অদৃশ্য হয়ে থাকার পরও বেমক্কা হাঁচির দমকে প্রায় ধরাই পড়ে যাচ্ছিল সে!

নদীটা বেশ চওড়া একটা মোড় নিল একসময়। মোড়টা ঘোরার সাথে সাথে অসাধারণ এক দৃশ্য চোখে পড়ল বিলবোর। নদীর দুই তীর বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে এখানে, আর মাঝখানে জালের মত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট বড় ধারা। তাদের মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে ছোট বড় অজস্র জলাধার, আর পাথরের চাঙড়। তবে এ সবের মাঝ দিয়েই বয়ে চলেছে নদীটা। আর সবকিছু ছাড়িয়ে, আরও দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই নিঃসঙ্গ পর্বত! আশেপাশের পাহাড়গুলোকে নিতান্তই শিশু মনে হচ্ছে সেটার তুলনায়।

নদীর পাশে বসবাসকারী লোকগুলোর কিছু কিছু টুকরো কথাবার্তা শোনার সুযোগ হয়েছে বিলবোর, তাতে সে বুঝতে পেরেছে যে এ পর্যন্ত আসতে পারাটাই তাদের অনেক বড় সৌভাগ্য। এদিকে আসার যে কয়েকটা পথ ছিল তার প্রায় সব কয়টাই বিলুপ্ত হয়েছে, বা ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র নদীপথে যাতায়াত করাটাই এখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। আর সেই পথেই এসেছে তারা, ব্যারেলের উপর বসে কাঁপতে কাঁপতে ভাবল বিলবো।

কিছুক্ষণ পর নদীটা আবার মোড় নিল, ফলে পাহাড়টা হারিয়ে গেল দৃষ্টির আড়ালে। দুই তীর আবার পরস্পরের কাছাকাছি এগিয়ে আসল, ফলে নদীর স্রোত তীব্র হয়ে উঠল। তারপর যখন সূর্য ডুবতে শুরু করেছে, এই সময় আবার মোড় নিল নদীর প্রবাহ, যেন হঠাৎ করেই ঝাঁপিয়ে পড়ল লং-লেকের বুকে।

এই তাহলে সেই লং-লেক! হা করে তাকিয়ে রইল বিলবো। সাগর ছাড়া আর কোন কিছু যে এত বড় হতে পারে তা তার ধারনাতেও ছিল না। হ্রদের দুই তীর আবছা আবছা বোঝা যায়, কিন্তু সামনের দিকে যেন কোন শেষ নেই, যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। তবে ম্যাপটা দেখেছে বিলবো, জানে যে আরও সামনে লেকের পানি পরিনত হয়েছে বিশাল এক জলপ্রপাতে, সেখান থেকে আবার নদীতে পরিনত হয়ে হারিয়ে গেছে অজানা সব দেশের বুকে। এমনকি এখান থেকেও সেই বিশাল জলপ্রপাতের শব্দ কান পাতলে শোনা যায়, যেন বহুদূরে অবিশ্রান্ত গর্জে চলেছে কোন দানব।

নদীর মুখ থেকে একটু সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই অদ্ভুত শহরটা, যার কথা বিলবো সেলারে থাকতে এলফদের মুখে শুনেছিল। হ্রদের তীরে নয়, বরং পানির উপরেই কাঠের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে শহরটাকে। নদীর স্রোত থেকে রক্ষা করার জন্য পাথর দিয়ে বাধ দেয়া হয়েছে শহরের চারদিকে। লম্বা, কাঠের তৈরি একটা সেতু তীর থেকে শহরের মাঝে যোগাযোগ রক্ষা করছে। এলফরা নয়, এই শহরের বাসিন্দারা সবাই মানুষ। নদীপথে বানিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করে তারা, তবে শহরের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভাল নয় সেটা এক নজরেই বোঝা যায়। সব সময় হয়তো এমন ছিল না, বিশেষ করে স্মগ নামের ভয়ঙ্কর ড্রাগনটা এসে পাহাড়ে আস্তানা গাড়ার আগ পর্যন্ত, তবে সেই সমৃদ্ধি এখন ইতিহাস মাত্র। কেবল শহরের বুড়ো বুড়ো লোকগুলোর মুখে ভাঙা ভাঙা গল্প আর গানের আকারে সেই কথা কিছু শুনতে পাওয়া যায়। পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী বামন-রাজার কথা বলে তারা, এমনকি এও বলে যে তার বংশধরেরা একদিন ফিরে আসবে হারানো সাম্রাজ্যের দখল নিতে।

ব্যারেলগুলো হ্রদের বুকে পৌছানো মাত্রই লেক-টাউন থেকে লোকজনের হাঁকডাক ভেসে এল। একটু পরেই ভেলা নিয়ে বেরিয়ে এল কয়েকজন, লম্বা লাঠির সাহায্যে ব্যারেলগুলো একত্র করে বাঁধল তারা, তারপর ব্রীজের গোড়ায় শহরের ঠিক বাইরে বেঁধে রাখা হল সেগুলোকে। আবার বিভিন্ন জিনিসপত্র ভরা হবে ব্যারেলগুলোয়, পাঠানো হবে উড-এলফদের রাজ্যে। কাজ শেষ হতে শহরে ফিরে গেল লোকগুলো।

মানুষের গলার আওয়াজ পেতেই ব্যারেলের ভিতর গিয়ে লুকিয়েছিল বিলবো। এবার সুযোগ বুঝে বের হয়ে এল সে, তারপর সাবধানে একটা ব্যারেলের মুখ খুলল। ভেতর থেকে বের হয়ে এল থোরিন। তবে তাকে আর চেনার উপায় নেই, নাকানি চুবানি খেয়ে আর ময়লা মেখে তার চেহারা কিম্ভূতকিমাকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচন্ড তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বাইরে বের হল সে, তারপর বিলবোকে বকল বেশ কিছুক্ষণ।

‘বেশ,’ মন খারাপ করে বলল বিলবো। ‘তোমার কষ্ট হয়েছে সেটা আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু আর কিই বা করার ছিল? হাজার হোক এখন তুমি মুক্ত, এলফ-রাজার গুহায় আর বন্দী হয়ে থাকতে হচ্ছে না তোমাকে। সে জন্যে কি আমার একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য নয়?’

মাথা ঠান্ডা হয়ে এল থোরিনের, ভুল বুঝতে পারল সে। আসলে এই কয়েকদিন না খেয়ে থেকে আর পানিতে ভাসতে ভাসতে প্রায় পাগল হয়ে উঠেছিল সে। এবার দুজনে মিলে বাকি ব্যারেলগুলো থেকে অন্যান্য অভিযাত্রীদের বের করে আনল। সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে ততক্ষণে বেশ ভালভাবেই, সঠিক ব্যারেলগুলো খুঁজে বের করতে বেশ বেগ পেতে হল দুজনকে। তবে কিছুক্ষণ চেষ্টার পর অবশেষে সবাইকেই খুঁজে পাওয়া গেল।

সবার অবস্থাই কমবেশি খারাপ। কেউ কেউ বের হয়ে এসে ধপাস করে মাটিতে শুয়ে পড়ল, আর এক পাও নড়তে রাজি নয়। বোম্বারকে দেখে মনে হল হয় ঘুমিয়ে পড়েছে, নাহয় অজ্ঞান হয়ে আছে। ডোরি, নোরি, ওরি, ওইন আর গ্লোইনের নড়াচড়ার কোন শক্তি নেই, তীরে বয়ে আনতে হল তাদের। ফিলি আর কিলির বয়স অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় তারাই সাহায্য করতে এগিয়ে এল বিলবোকে।

‘শেষ পর্যন্ত ব্যারেলে চড়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেল!’ বলল থোরিন। ‘তবে এই অবিশ্বাস্য সুযোগের জন্য বিলবো ব্যাগিনসকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমি। তো এখন আমাদের কি করনীয়, মিঃ ব্যাগিনস?’

‘লেক-টাউনে যাব আমরা,’ জবাব দিল বিলবো। তবে সবার যাওয়ার মত অবস্থা নেই, সুতরাং থোরিন, ফিলি, কিলি আর বিলবো রওনা দিল ব্রিজের দিকে। ব্রিজের মুখে পাহারায় আছে গার্ডরা, তবে কেউই খুব একটা সতর্ক নয়। সতর্কতার প্রয়োজনও পড়ে না, কারণ বাইরের শত্রুর আগমন এ শহরে নেই বললেই চলে। থোরিন ওকেনশিল্ড যখন গার্ডদের ছোট্ট ঘরটার দরজায় এসে দাঁড়াল তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল তারা।

‘কে তুমি? কি চাও?’ লাফিয়ে উঠে প্রশ্ন করল তারা, হাত বাড়িয়েছে অস্ত্রের দিকে।

‘পাহাড়ের বামন-রাজা থ্ররের ছেলে থ্রেইনের ছেলে থোরিন ওকেনশিল্ড আমি!’ গুরুগম্ভীর গলায় বলে উঠল থোরিন। ছেঁড়া কাপড় আর উস্কোখুস্কো চেহারা সত্বেও তার চোখের দৃষ্টি আর কথার সুরে এমন কিছু একটা ছিল যে থমকে যেতে বাধ্য হল গার্ডরা। ‘ফিরে এসেছি আমি, যেমন কথা ছিল! তোমাদের নেতার কাছে নিয়ে চল আমাকে।’

প্রহরীদের নেতা এবার এগিয়ে এল সামনে। ‘আর এরা?’ থোরিনের পাশে এসে দাঁড়ানো বাকি তিন জনের দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করল সে।

‘আমার আত্মীয় এবং সঙ্গী,’ জবাব দিল থোরিন। ‘ফিলি, কিলি এবং বিলবো ব্যাগিনস।’

‘বেশ,’ বলল প্রহরী। ‘তোমাদের উদ্দেশ্য যদি সৎ হয়ে থাকে তবে অস্ত্রশস্ত্র এখানেই রেখে দাও।’

‘কোন অস্ত্র নেই আমাদের কাছে, আর থাকলেও তোমাদের সাথে লড়াই করে আমরা পেরে উঠতাম না।’ বলল থোরিন। সতিই তাই, তাদের কারও কাছেই কোন অস্ত্র নেই। যা ছিল সব কেড়ে নিয়েছে উড-এলফরা। বিলবোর ছোটখাট তলোয়ারটা অবশ্য এখনও তার জামার ভেতর লুকানো আছে, তবে সেটার কথা বলার কোন প্রয়োজন বোধ করল না সে।

‘আমাদের মেয়র এখন ভোজসভায় আছেন,’ বলল প্রহরী প্রধান।

‘তাহলে তো অবশ্যই যেতে হয় সেখানে,’ ফিলি সামনে এগিয়ে এসে বলল। এইসব ভারিক্কি কথাবার্তা ভাল লাগছে না তার। ‘দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি আমরা, অত্যন্ত ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত। তাড়াতাড়ি আমাদের নিয়ে চল তার কাছে, নাহলে পরে আফসোস করবে।’

‘তাহলে এস আমার সাথে।’ বলে ব্রিজের উপর দিয়ে এগোতে শুরু করল প্রহরী প্রধান, অভিযাত্রীরা অনুসরন করল তাকে। ছয় জন গার্ড তাদের সঙ্গে চলল। ব্রিজ পার হয়ে শহরের মাঝে এসে পৌছাল তারা। জায়গাটা বৃত্তাকার, চারদিকে লম্বা লম্বা গাছের উপর তৈরি করা হয়েছে কাঠের বাড়িঘর। মাঝখানে শান্ত পানি, সেখানে বাঁধা রয়েছে ছোট বড় নানা আকারের নৌকা। এক পাশে বিশাল এক হলঘর, সেখান থেকে ভেসে আসছে অনেকগুলো গলার আওয়াজ। হলঘরের দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢুকল সবাই, মশালের উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল যেন সাথে সাথে। আলো চোখে সয়ে আসতে দেখতে পেল লম্বা লম্বা টেবিল পাতা রয়েছে ভেতরে, সেখানে পানভোজনে ব্যস্ত অনেক মানুষ।

‘পাহাড়ের বামন-রাজা থ্ররের ছেলে থ্রেইনের ছেলে থোরিন ওকেনশিল্ড আমি। ফিরে এসেছি, যেমন কথা ছিল!’ উঁচু গলায় ঘোষনা করল থোরিন। সাথে সাথে জাদুর মত কাজ হল, চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল সবাই, এমনকি শহরের মেয়র পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে অবাক হল হলঘরের শেষ প্রান্তে বসে থাকা কিছু উড-এলফ, যারা এই শহরে এলফদের প্রতিনিধিত্ব করে। মেয়রের দিকে এগিয়ে এসে চিৎকার করে উঠল তারাঃ

‘এরাই আমাদের রাজার সেই পালিয়ে যাওয়া বন্দী! ভবঘুরে বামনের দল, জঙ্গলের ভেতর ঘুরে ঘুরে আমাদেরকে হয়রানি করে বেড়াচ্ছিল!’

‘ওদের কথা কি সত্যি?’ জিজ্ঞেস করল মেয়র। সত্যি কথা বলতে থোরিনের কথার চাইতে উড-এলফদের দাবিটাই বেশি যৌক্তিক মনে হয়েছে তার কাছে।

‘এ কথা সত্যি যে এলফদের রাজার সাথে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল আমাদের, ফলে আমাদের বন্দী করেছিলেন তিনি,’ জবাব দিল থোরিন। ‘তবে প্রাচীন রূপকথায় যাদের ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে তাদের আঁটকে রাখার সাধ্য নেই কারও। তাছাড়া আমার জানামতে এই শহরে উড-এলফ নয়, বরং মানুষের রাজত্ব। একমাত্র এই শহরের মেয়রের কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য আমরা, আর কারও কাছে নয়।’

দ্বিধায় পড়ে গেল মেয়র, ভাবছে তার কি করা উচিত। এই শহরে এলফদের রাজত্ব না থাকলেও তাদের রাজা অনেক শক্তিশালী, তাকে চটানো কোনভাবেই উচিত হবে না। তাছাড়া প্রাচীন রূপকথা বা গানে বিশ্বাস করার ইচ্ছেও নেই তার। তবে হলঘরে উপস্থিত বাকিদের ভেতর থোরিনের কথায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সারা শহরে অভিযাত্রীদের আগমনের কথা ইতোমধ্যে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে আস্তে আস্তে বাইরে জড়ো হতে শুরু করেছে শহরের বাসিন্দারা। তাদের উত্তেজিত চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছে, কেউ কেউ আবার পুরনো গানগুলো গাইতে শুরু করেছে। তাদের সাথে তাল মেলাচ্ছে বাকিরা। এই শহরে এমন উত্তেজনার মূহুর্ত বহুকাল আসেনি। কারণ রূপকথায় বলা আছে পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী বামন-রাজা আবার ফিরে আসবে, তখন তার ধনসম্পদে ভরে যাবে চারদিক। আসলে যে রাজা নয়, বরং ফিরে এসেছে তার নাতি, তাতে কারও খুব একটা বিকার নেই।

সুতরাং মেয়র সিদ্ধান্ত নিল যে এই মূহুর্তে বাকিদের সাথে তাল মেলানো ছাড়া তার কিছু করার নেই। চেয়ার থেকে উঠে থোরিনের দিকে এগিয়ে এল সে, তারপর মহাসমারোহে তাদের আপ্যায়ন করে টেবিলে বসাল। কিছুক্ষণ পরেই থোরিনের কথায় বাকি বামনদেরও শহরে নিয়ে আসা হল, মহা উৎসাহে তাদের বরন করে নিল শহরবাসী। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল, তারপর খাওয়ানো হল পেট ভরে। খাওয়া দাওয়া শেষে বিশাল একটা বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করা হল তাদের জন্য। ওদিকে শহরবাসীর উৎসাহে কোন ঘাটতি নেই, বামনদের কাউকে দেখলেই উল্লাসে চিৎকার করে উঠছে তারা, কারণ মেয়র গোপনে রটিয়ে দিয়েছে যে লেক-টাউনের অধিবাসীদের জন্য অঢেল সম্পদের পাহাড় বয়ে আনবে অভিযাত্রীরা। কথাটা কানে গেল অভিযাত্রীদের, তারা যে খুব একটা খুশি হল না তা বলাই বাহুল্য। তবে সব দিক বিবেচনা করে চুপ করে থাকাটাই সমীচিন মনে করল তারা।

ওদিকে বামনদের কথা উড-এলফদের রাজার কানে ঠিকই পৌঁছে গেল। ‘তাহলে এই ছিল ওদের উদ্দেশ্য!’ মনে মনে ভাবলেন তিনি। ‘বেশ, যদি তাই হয় তবে কি করে সম্পদের ভাগ না দিয়ে আমার রাজ্যের ভেতর দিয়ে এগোয় ওরা দেখে নেব আমি!’

লেক-টাউনে দুই সপ্তাহ থাকল অভিযাত্রীরা। ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে সবাই, নতুন করে অভিযানে বের হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ তৈরি। থোরিন বুঝতে পারল, আর দেরি করা ঠিক হবে না। শহরবাসী এখনও তাদের নিয়ে উত্তেজিত হয়ে আছে বটে, তবে বেশি দেরি করলে তা ঠান্ডা হতে সময় লাগবে না। যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য চাইবার এখনই সময়। সুতরাং দুই সপ্তাহ পর একদিন মেয়রের সাথে দেখা করল সে।

‘স্যার মেয়র, আপনার আতিথেয়তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আর আপনাদের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না, আগামীকালই নিঃসঙ্গ পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে চাই আমরা।’

বেশ অবাক হল মেয়র। সে ভেবেছিল অভিযাত্রীরা জোচ্চোর ছাড়া কিছুই নয়। সে শুধু অপেক্ষা করছিল কিভাবে ধরা পড়ে তারা সেটা দেখার জন্য। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সত্যিই তারা নিঃসঙ্গ পর্বতে যেতে চায়, স্মগের মোকাবেলা করতে চায়! মনে মনে বেশ ভয় পেল সে। হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করার জন্য একজন বামন কতদূর যেতে পারে তা কেউ বলতে পারে না। তবে অভিযাত্রীদের সেবা করতে হবে না আর ভেবে খুশিও হল সে।

‘অবশ্যই, অবশ্যই! আপনাকে আঁটকে রাখার ধৃষ্টতা আমার নেই, হে থ্ররের ছেলে থ্রেইনের ছেলে থোরিন ওকেনশিল্ড!’ ছদ্ম সম্মান দেখিয়ে বলল সে। ‘আপনার যাত্রায় যে কোন সাহায্য করতে পারলে আমরা ধন্য হব। আশা করি রাজ্য পুনরুদ্ধার করার পর আপনিও আমাদের ভুলে যাবেন না!’

সুতরাং শরতের শেষে একদিন, যখন বাতাসে শীতের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে, নানারকম মালপত্র, খাবার, অস্ত্রশস্ত্র আর অভিযাত্রীদের নিয়ে তিনটে বড় নৌকা পাড়ি জমাল লেক-টাউন থেকে। ডাঙার উপর দিয়ে বেশ কিছু ঘোড়া আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, নির্দিষ্ট জায়গায় অভিযাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করবে তারা। লেকের উপর দিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলল অভিযাত্রীদের নৌকাগুলো, সবাই নতুন উৎসাহ আর সাহসে ভরপুর।

শান্তি নেই কেবল বিলবোর মনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *