ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – দ্বাদশ অধ্যায়

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ তর্ক করল বামনরা। অবশেষে থোরিন বলে উঠলঃ

‘এখন সময় এসেছে মিঃ বিলবো ব্যাগিনসের জন্য তার সত্যিকারের দক্ষতা এবং নৈপুণ্য প্রকাশ করার, যে তার অপরিসীম সাহস এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বার বার আমাদের মুগ্ধ করেছে। যে জন্য আমাদের সাথে এসেছে সে সেই সময় এখন আমাদের সামনে। আমি আশা করি সে আমাদের নিরাশ করবে না, এবং আরও একবার তার দক্ষতার পরিচয় দিয়ে নিজের পুরষ্কার আদায় করে নেবে।’

সুযোগ পেলেই লম্বা চওড়া বক্তৃতা দেওয়া থোরিনের অভ্যাস সেটা আগেই একবার বলা হয়েছে, সুতরাং আরও কি কি কথা বলল সে তার বর্ণনা না দিলেও বোধহয় চলবে। একটু পরেই অধৈর্য হয়ে উঠল বিলবো। আর থাকতে না পেরে থোরিনের কথার মাঝে বাঁধা দিয়ে কথা বলে উঠল সে।

‘থোরিন, তোমার যদি মনে হয় যে সবার আগে আমারই এই দরজা দিয়ে ঢোকা উচিত, তাহলে বলে ফেল সেটা। ইতোমধ্যেই দুইবার তোমাদের বিপদ থেকে বাঁচিয়েছি আমি, আরও একবার সাহায্য করতে কোন আপত্তি নেই আমার। আর কে কে যেতে চাও আমার সাথে?’

কেউ যেতে চাইবে বলে আশা করেনি বিলবো, ফলে খুব একটা হতাশ হতে হল না তাকে। ফিলি আর কিলিকে একটু অস্বস্তিতে ভুগতে দেখা গেল, তবে বাকিদের দেখে মনে হল বিলবোর কথা কানেই যায়নি তাদের। তবে আর কেউ রাজি না হলেও বেলিন এগিয়ে এল। দীর্ঘ যাত্রায় ধীরে ধীরে বিলবোকে পছন্দ করতে শুরু করেছে সে। বিলবোর সাথে অন্তত কিছুটা দূর যেতে রাজি হল সে।

অবশ্য এতে যে বামনদের স্বার্থপরতার পরিচয় ফুটে উঠল তা কিন্তু নয়। বিলবোকে মূলত এই কাজটার জন্যেই সাথে এনেছে তারা, সেই সাথে উদ্ধারকৃত সম্পদের সমান ভাগ দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাকে। কাজটা করতে গিয়ে যদি সে কোন সমস্যায় পড়ে তবে অবশ্যই তাকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে তারা। বামনদের মহানুভব বলা যায় না, বরং একটু হিসেবী বললেই বোধহয় ঠিক হয়। কেউ কেউ খুবই চালাক এবং স্বার্থপর হয় সেটা ঠিক, তবে বিলবোর সঙ্গীরা তাদের ভেতর পড়ে না।

দরজার ভেতর যখন পা রাখল বিলবো তখন আকাশে তারা ফুটে উঠতে শুরু করেছে একটা একটা করে। ভেতরে ঢুকতেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার যেন গিলে নিল তাকে। তবে দরজাটা বামনদের তৈরি, ফলে গবলিন বা উড-এলফদের গুহার তুলনায় ভেতরটা অনেক মসৃণ এবং সুগম। ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে সামনে এগিয়ে গেছে পথটা।

কিছুক্ষণ পর বেলিন বিদায় নিল। তখনও দরজা দিয়ে আসা আলোর হালকা রেখা মিলিয়ে যায়নি, এমনকি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি অভিযাত্রীদের কথাও আবছা শোনা যাচ্ছে। বেলিন চলে যাওয়ার পর আংটিটা পরে নিল বিলবো, তারপর কোন শব্দ না করে এগোতে শুরু করল সামনে। বাইরে থেকে আসা শব্দ শুনতে পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে যে এই গুহার ভেতর অনেকদূর যায় শব্দ, ফলে সামান্যতম আওয়াজও বিপদ ডেকে আনতে পারে। বুকের ভিতর দুরু দুরু করে কাঁপলেও চেহারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় শক্ত হয়ে আছে তার, নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে যে হবিট অজানা অভিযানে যাত্রা শুরু করেছিল তার সাথে আজকের বিলবোর অনেক তফাত। কোমরের খাপে তলোয়ারটার বাঁটে হাত রাখতে সাহস ফিরে পেল সে, অন্ধকারের ভেতর এগোতে শুরু করল সামনে।

আরও কিছু দূর যাওয়ার পর দরজার চিহ্ন মুছে গেল পিছনে, বিলবোর মনে হল একেবারেই একা হয়ে গেল সে। কিন্তু থামল না সে, এগিয়ে চলল সামনে। এক সময় তার মনে হল কিছুটা উষ্ণ হয়ে উঠছে গুহার আবহাওয়া। আর সামনে কি দেখা যাচ্ছে ওটা? লালচে আলোর একটা আভা মনে হচ্ছে যেন?

সত্যিই, কিছুক্ষণ পর গুহার ভেতরের বাতাস সত্যিই বেশ গরম হয়ে উঠল। যত সামনে এগিয়ে চলল বিলবো ততই বাড়তে লাগল আলোর আভা, ধীরে ধীরে আরও লাল হয়ে উঠছে। কিছুক্ষণ পর পর গরম বাস্পের মেঘ এসে ঝাপটা দিচ্ছে বিলবোর গায়ে, ঘামতে শুরু করল সে। তারপর একটা শব্দ এসে আঘাত করল তার কানে। শব্দটা অনেকটা বড় কোন পাত্রে ফুটন্ত পানি আর বিশাল কোন বেড়ালের গলা থেকে বেরিয়ে আসা গরগর শব্দের মত। কল্পনার চোখে দেখতে পেল বিলবো, গুহার গভীরে ঘুমিয়ে আছে বিশালাকার কোন বিভৎস প্রাণী, আর তার নাক থেকে ভেসে আসছে শব্দটা!

এবার থমকে দাঁড়াল বিলবো। এই মূহুর্তটার আগে এবং পরে অনেক সাহসিকতার কাজ করেছে সে, যার কিছু বর্ণনা আগে দেওয়া হয়েছে, কিছু পরে দেওয়া হবে। কিন্তু গুহার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, সামনেই স্মাউগ নামের বিশাল ড্রাগনটা ঘুমিয়ে আছে জেনেও সামনে এগিয়ে যাওয়াটাই ছিল তার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। কয়েক মূহুর্ত দাঁড়িয়ে থেকে সাহস সঞ্চয় করল সে, তারপর পাথরের মত ভারি মনে হওয়া পা দুটো টেনে এগিয়ে গেল সামনে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল গুহার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে সে। ভেতরের দিকের দরজাটাও আকারে সামনের দরজাটার মতই। তার সামনে উন্মুক্ত হল বামন রাজাদের বিশাল আবাসস্থল, পাহাড়ের সবচেয়ে নিচের হলঘর। প্রায় অন্ধকারে ঢেকে আছে পুরো জায়গাটা, ফলে জায়গাটা কত বিশাল সে সম্পর্কে আন্দাজই করা যায় কেবল। কিন্তু একটু সামনেই মেঝে থেকে ভেসে আসছে আলোর আভা। স্মগ শুয়ে আছে সেখানে!

ওই তো দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ের মত লালচে-সোনালী রঙের শরীর নিয়ে শুয়ে আছে ড্রাগনটা, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নাকের ফুটো থেকে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়ার রেখা। তার শরীরের নিচে, আর আশে পাশে যতদূর চোখ যায়, অবহেলায় পড়ে আছে সাত রাজার ঐশ্বর্য! সোনার তৈরি মহামূল্যবান জিনিসপত্র, আর ছোট বড় সোনার তাল, সেই সাথে নানারকম মূল্যবান মনি-মুক্তো। ড্রাগনের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা হালকা লালচে আলো পড়েছে তাদের উপর, কেমন যেন অপার্থিব লাগে দেখতে।

স্মগের বিশাল ডানাদুটো কোন অতিকায় বাদুড়ের মত ভাঁজ করে রাখা, ফলে তার পেটের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। নানারকম মূল্যবান পাথর আর সোনার টুকরো লেগে আছে সেখানে, দীর্ঘসময় একভাবে শুয়ে থাকার ফল। তার পিছনে গুহার দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে কুঠার, তলোয়ার, বর্শা সহ আরও অনেক রকমের অস্ত্রশস্ত্র, সেই সাথে অগুনতি পাত্র থেকে উপচে পড়ছে অপরিমেয় সম্পদের পাহাড়। রুদ্ধশ্বাসে দেখতে লাগল বিলবো, সেই সম্পদের বর্ণনা দেওয়া শুধু তার পক্ষে নয়, যে কারও জন্যেই অসম্ভব। তার বিস্ময়ের বর্ণনা দিতে পারে এমন কোন শব্দ আজও তৈরি হয়নি মানুষের ভাষায়। এর আগে ড্রাগনদের সম্পদের পাহাড়ের কথা শুনেছে বিলবো, কিন্তু চোখের সামনে দেখার পর বুঝতে পারছে যে প্রাচীন ওইসব গান আর রূপকথায় কিছুই বলা হয়নি। এখন সে বুঝতে পারছে কেন বামনরা এত দূর থেকে এত কষ্ট আর ঝুঁকি স্বীকার করে এই সম্পদ পুনরুদ্ধার করতে এসেছে!

মনে হল অনন্তকাল ধরে জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রয়েছে বিলবো। তবে এক সময় অনেকটা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সেই তুলনাহীন সম্পদের পাহাড় থেকে চোখ সরিয়ে আনল সে, তারপর নেমে এসে স্বর্ণমুদ্রার একটা ছোটখাট টিলার পিছনে দাঁড়াল। তার সামনেই পাহাড়ের মত দেহ নিয়ে ঘুমিয়ে আছে বিশাল ড্রাগনটা, এমনকি ঘুমের ভেতরেও ভয়ঙ্কর লাগছে তাকে দেখতে। হাতের কাছে একটা দুই হাতলওয়ালা সোনার কাপ দেখতে পেল সে, কোনমতে দুই হাতে উপরে তুলতে পারল সেটাকে। একবার উপরের দিকে তাকাল সে, দেখতে পেল নড়েচড়ে উঠেছে ড্রাগনটা!

দৌড় দিল বিলবো। তবে ড্রাগনটা জেগে ওঠেনি, ঘুমের ভেতর একটু নড়ে উঠেছে মাত্র। তবে আর দেরী করা সমীচিন বোধ করল না বিলবো, গুহায় ফিরে এল সে এক দৌড়ে, তারপর কম্পিত পদক্ষেপে ফিরে এল গুহার বাইরে, যেখানে আর সবাই অপেক্ষা করছে তার জন্য। ‘এবার দেখা যাক কি বলে ব্যাটারা!’ মনে মনে ভাবল সে। ‘আমার কাজ ভালভাবেই করেছি আমি, এবার নিশ্চয়ই ওদের আর কোন সন্দেহ থাকবে না!’

সত্যিই তাই। বিলবোকে দেখতে পেয়েই উল্লসিত হয়ে উঠল বেলিন, গুহার মুখেই দাঁড়িয়ে ছিল সে। বিলবোর হাত ধরে তাকে টেনে তোলা হল উপরে। গুহার অন্ধকার থেকে বাইরের খোলা বাতাসে এসে বিলবোর মনে হল সকল শক্তি ফুরিয়ে গেছে তার, মাটিতে শুয়ে পড়ে চোখ বুজে হাঁপাতে লাগল সে। অনেকটা সময় কেটে গেছে সে গুহায় প্রবেশ করার পর, আকাশে মধ্যরাতের তারারা জ্বলজ্বল করছে। তার চারদিকে ভীড় জমালো বামনরা, উচ্ছসিত প্রশংসাবাক্য ভরিয়ে দিতে লাগল তাকে, কিন্তু সেদিকে কোন খেয়াল করার মত অবস্থা নেই তার।

বামনদের হাত থেকে হাতে ঘুরছে বিলবোর নিয়ে আসা কাপটা, এই সময় হঠাৎ পাহাড়ের গভীর থেকে একটা গুরুগম্ভীর গর্জন ভেসে এল, যেন জেগে উঠেছে বহুকালের পুরনো কোন সুপ্ত আগ্নেয়গিরি! তাদের পায়ের নিচে কেঁপে উঠল মাটি, গুহার ভেতর থেকে ভেসে এল গর্জনের প্রতিধ্বনি, যেন তান্ডবনৃত্য জুড়েছে কোন দানব।

একটু আগে জেগে ওঠা উল্লাস আর উত্তেজনা ভুলে ভয়ে কেঁপে উঠল অভিযাত্রীরা। অভিযানের সবচেয়ে কঠিন অংশটাই যে এখনও বাকি! স্মগের হাত থেকে কিভাবে তাদের সম্পদ উদ্ধার করবে তারা? অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে, উপলব্ধি করল সবাই। ওই বিশাল ড্রাগনটার মোকাবেলা কিভাবে করা হবে তার কোন পরিকল্পনা করা হয়নি।

সোনাদানা আর ধনসম্পদের কোন ব্যবহার জানে না ড্রাগনরা, কিন্তু আজীবন সেগুলো যখের ধনের মত আগলে রাখে। স্মগও তার ব্যতিক্রম নয়। বেশ খারাপ একটা স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে সে, ছোটখাট কিন্তু সাহসী এক যোদ্ধাকে দেখতে পেয়েছে স্বপ্নে। আর ঘুম ভেঙেই টের পেয়েছে কিছু একটা পরিবর্তন এসেছে গুহার বাতাসে, অচেনা একটা গন্ধ পেয়েছে তার নাকে। ওই ছোট্ট গর্তটা থেকে কিছু কি প্রবেশ করল ভেতরে? তার সবসময়েই মনে হয়েছে গর্তটা বন্ধ করে দেয়া দরকার, সন্দেহের চোখে ছোট্ট ফুটোটার দিকে তাকিয়ে ভাবল স্মগ। মাথা তুলে চারদিক তাকিয়ে গন্ধ শুকল সে। তারপরেই টের পেল, অদৃশ্য হয়েছে একটা কাপ!

চোর ঢুকেছে তার গুহায়! প্রচন্ড ক্রোধে প্রায় অন্ধ হয়ে উঠল স্মগ, নাক আর মুখের বিশাল গহ্বর থেকে বেরিয়ে এল আগুনের ঝলক, মনে হল পুরো পাহাড়টাকেই তুলে ছুঁড়ে ফেলবে সে। ছোট্ট ফুটোটার ভেতর দিয়ে মুখ ঢোকানোর চেষ্টা করল সে, কিন্তু তার বিশাল মাথার তুলনায় একেবারেই জায়গা হল না সেখানে। ব্যর্থ হয়ে বিশাল ডানায় ঝড়ের মত শব্দ তুলে শূন্যে উড়াল দিল সে, পাহাড়ের প্রকান্ড সব গুহার অলিগলি পেরিয়ে বের হয়ে এল বাইরে।

ক্রোধ চড়ে গেছে স্মগের মাথায়, চোরটাকে খুঁজে বের করে তাকে ছিঁড়ে ফেলতে মন চাইছে তার। প্রকান্ড ডানায় ভর দিয়ে পাহাড়ের মাথায় এসে বসল সে, তার ডানার শব্দ শুনতে পেল বামনরা, পাহাড়ের গায়ে সেঁটে গেল তারা, প্রার্থনা করছে যেন তাদের দেখতে না পায় ড্রাগনটা।

আরেকবার বিলবোর উপস্থিত বুদ্ধি বাঁচিয়ে দিল তাদের। ‘জলদি!’ দরজাটা দেখিয়ে বলল সে। ‘ভিতরে ঢুকে পড় সবাই!’

সাথে সাথে হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকতে চেষ্টা করল সবাই। কিন্তু বাইফুর হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ‘বোম্বার আর বোফুর? ওদের কি হবে? নিচে রয়ে গেছে ওরা!’

গুঙিয়ে উঠল বাকিরা। ‘ওদের মনে হয় আর বাঁচানো গেল না! আমাদের ঘোড়া আর মালপত্রগুলোও বোধহয় গেল এবার!’

‘বোকার মত কথা বলবে না!’ গর্জে উঠল থোরিন। ‘মিঃ ব্যাগিনস, বেলিন, ফিলি আর কিলি- তোমরা ভেতরে ঢুকে পড়, সবাইকে একসাথে হারাতে চাই না আমি! আর বাকিরা দড়ি বের কর!’

এই সময়টাই ছিল অভিযাত্রীদের জন্য সবচেয়ে আতঙ্কের। মাথার উপর থেকে ভেসে আসছে স্মগের রাগান্বিত গর্জন, যে কোন সময় নিচে নেমে আসবে সে। নিচে দড়ি ফেলে বোফুরকে তুলে আনা হল প্রথমে, তারপর বোম্বারকে। এবার কিছু যন্ত্রপাতি আর মালপত্র তুলে আনা হল, এবং নেমে আসল বিপদ। চলে এসেছে ড্রাগনটা। কোনমতে হুড়োহুড়ি করে গুহার ভেতর ঢোকার সাথে সাথে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এল আগুনের ঢেউ, দরজার সামনে গজিয়ে ওঠা ঘাসগুলো পুড়ে কুঁকড়ে গেল সাথে সাথে। আর এক মূহুর্ত দেরি হলে অভিযাত্রীদের অবস্থাও ওই ঘাসগুলোর মতই দাঁড়াত! কয়েক মূহুর্তের জন্য দিনের আলোর মত আলোকিত হয়ে উঠল গুহার ভেতরটা, তারপর আবার নেমে এল অন্ধকার। চলে গেছে স্মগ, নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াগুলোর আতঙ্কিত চিৎকার শুনতে পেয়েছে নিশ্চয়ই!

‘গেল আমাদের ঘোড়াগুলো!’ বলল থোরিন।

‘একবার স্মগের চোখে পড়ে গেলে কিছুই বাঁচতে পারে না তার হাত থেকে। এখানেই থাকতে হবে আমাদের, যদি না কেউ স্মগের নাকের সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরতে চায়!’ জবাব দিল বেলিন।

চিন্তাটা খুব একটা সুখকর নয়। অগত্যা আরও সামনে এগিয়ে গেল সবাই, ভয়ে আর আতঙ্কে কাঁপছে, যদিও স্মগের আগুনের উত্তাপে উষ্ণ হয়ে আছে জায়গাটা।

একসময় ভোরের আলো দেখা গেল দরজার ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে। সারা রাত ড্রাগনের গর্জন শুনতে পেয়েছে তারা, পাহাড়ের চারদিকে ঘুরে ঘুরে তাদের খুঁজে বেড়িয়েছে ড্রাগনটা। ঘোড়াগুলো চোখে পড়েছে স্মগের, সেই সাথে মালপত্রগুলো। লেক-টাউন থেকে লোকজন এসে আস্তানা গেড়েছে নিশ্চয়ই, ধারনা করেছে সে। তবে খোলা দরজাটা তার নজরে পড়েনি। সারা রাত অনুসন্ধান চালিয়েছে সে, তারপর ভোরের আলো ফুটে উঠলে ফিরে গেছে তার সোনালী বিছানায়। ক্লান্ত সে, নতুন করে অনুসন্ধানে নামার আগে শক্তি সঞ্চয় করা দরকার।

তবে চোরের কথা ভোলেনি সে। হাজার বছর কেটে গেলেও ভুলবে না, তবে কিছুটা অপেক্ষা করতে রাজি আছে। নিজের গুহায় ফিরে আধবোজা চোখে শুয়ে পড়ল সে।

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে অভিযাত্রীদের সাহসও ফিরে এল কিছুটা। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা শুরু করল তারা, বুঝতে পারল যে ড্রাগনের সাথে মোকাবেলা করতে গেলে এ ধরনের বিপদ আসবেই, তাতে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কোন মানে হয় না। তাছাড়া তাদের ঘোড়াগুলোও নেই আর, এ অবস্থায় পালাবেই বা কিভাবে? তবে সাথে নিয়ে আসা খাবারের কিছুটা উদ্ধার করা গেছে, ফলে কয়েকদিন খাবারের চিন্তা অন্তত করা লাগবে না।

এবার কি করনীয় তাই নিয়ে তর্ক শুরু হল বামনদের মাঝে। কোন সমাধান বের হল না। স্মগের চোখ এড়িয়ে কি করে ওই বিশাল সম্পদের পাহাড় উদ্ধার করা যায় তার কোন উপায় আসল না কারও মাথায়। শেষে বিলবোর উপরেই ক্ষেপে উঠল সবাই, এত তাড়াতাড়ি ড্রাগনটাকে জাগিয়ে তোলার জন্যে দোষারোপ করতে শুরু করল তাকে। অথচ বিলবো যখন কাপটা নিয়ে ফিরে এসেছিল তখন যে দারুন খুশি হয়ে উঠেছিল সবাই সে কথা মনে থাকল না কারও।

‘আমার কাজ ছিল চুরি করে ভেতরে ঢোকা, সেটাই করেছি আমি,’ রেগে উঠল বিলবো। ‘ড্রাগন মারা আমার কাজ নয়, তোমাদের মত যোদ্ধাদের কাজ সেটা। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি আমি। তোমরা কি ভেবেছিলে, ঘাড়ে করে সব সোনাদানা নিয়ে ফিরে আসব আমি? রাগ তো আমার করা উচিত তোমাদের উপর। অন্তত পাঁচশ চোরকে সাথে করে নিয়ে আসা উচিত ছিল তোমাদের। রাজা থ্রর বিশাল এক সম্পদের পাহাড় তৈরি করেছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু সেটা যে এত বিশাল তা কি আমাকে কখনও বলেছ তোমরা? একা একা এই কাজ করতে কয়েকশ বছর লেগে যাবে আমার, সন্দেহ নেই!’

নিজেদের ভুল বুঝতে পারল বামনরা, ক্ষমা চাইল বিলবোর কাছে। তারপর থোরিন জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে আমাদের কি করা উচিত বলে তোমার ধারনা?’

‘যদি ওই সোনাদানা কিভাবে বের করে নিয়ে আসা যায় সেটা জানতে চাও তবে তার কোন জবাব নেই আমার কাছে। সেটা করতে হলে সবার আগে স্মগের হাত থেকে বাঁচতে হবে, আর ড্রাগনের মোকাবেলা করার কোন অভিজ্ঞতা নেই আমার।’

‘তাহলে কি করব আমরা?’

‘সত্যিই যদি আমার পরামর্শ চাও তোমরা, তবে বলব যে এখন যেখানে আছি সেখানেই থাকা উচিত আমাদের। দিনের বেলায় গুহা থেকে বের হয় না ড্রাগনটা, সে সময় কয়েকজন বাইরে গিয়ে বাকি খাবারগুলো নিয়ে আসতে পারবে, যাতে আরও কয়েকদিন টিকতে পারি আমরা। তবে রাত নামার আগেই সবাইকে এই গুহায় ফিরে আসতে হবে। আজ দুপুরে আংটিটার সাহায্যে অদৃশ্য হয়ে আমি আরেকবার যাব স্মগের আস্তানায়, দেখব কোন উপায় খুঁজে বের করা যায় কিনা।’

স্বাভাবিকভাবেই সবাই বিলবোর কথা মেনে নিল। মনে মনে বিলবোকেই নেতা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে সবাই। সেদিন দুপুরে আরেকবার স্মগের গুহায় ঢোকার জন্য প্রস্তুত হল বিলবো। কাজটা করতে খুব একটা ইচ্ছে নেই তার, তবে এটাও ঠিক যে সামনে কি অপেক্ষা করছে সেটা এখন জানে সে, অন্তত অজানাকে ভয় পেতে হবে না তাকে। তাছাড়া ড্রাগনটা নিশ্চয়ই এখন ঘুমাচ্ছে। তবে ড্রাগনদের সম্পর্কে যদি আরেকটু ভালভাবে জানত সে তাহলে এতটা নিশ্চিন্ত হত না সে।

বাইরে যদিও সূর্যের আলো ঝলমল করছে, তবে গুহার ভেতর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। চলতে শুরু করার একটু পরেই গুহার দরজা দিয়ে যে হালকা আলো আসছিল সেটাও মুছে গেল বিলবোর সামনে থেকে। নিঃশব্দে এগিয়ে চলল সে, এমনকি নিজের সতর্কতায় নিজেই একটু একটু গর্ব বোধ করতে লাগল।

‘বুড়ো স্মগ নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে,’ মনে মনে ভাবল সে। ‘আমাকে দেখতেও পাবে না, শুনতেও পাবে না। সাবাস বিলবো!’ নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিতে ইচ্ছা করল তার, কিন্তু ড্রাগনদের তীক্ষ্ম ঘ্রাণশক্তির কথা হয় সে জানে না, নাহয় ভুলে গেছে। তাছাড়া অদ্ভুত একটা ক্ষমতা রাখে ড্রাগনরা, ইচ্ছে করলে ঘুমের সময় একটা চোখ অর্ধেক খোলা রাখতে পারে তারা।

বিলবো যখন ভেতরের দিকের দরজাটা দিয়ে উঁকি দিল তখন স্মগকে দেখে মনে হল মরার মত ঘুমাচ্ছে সে, এমনকি নাক ডাকার শব্দ বা ধোঁয়ার রেখাও দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার শরীর থেকে বের হওয়া হালকা আলোর আভায় আলোকিত হয়ে আছে চারদিক। পা টিপে টিপে নিচে নেমে আসতে যাবে বিলবো, ঠিক এই সময় স্মগের আধবোজা চোখের দিকে চোখ পড়ল তার, মনে হল একটা লালচে আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে সেখান থেকে। ঘুমাচ্ছে না স্মগ, ঘুমের ভান করে গুহার প্রবেশদ্বারের দিকে চোখ রেখেছে সে! সাথে সাথে পিছিয়ে এল বিলবো, আংটিটা পরে থাকায় ধন্যবাদ দিল নিজের ভাগ্যকে। তারপরেই গুরুগম্ভীর গলায় গুহা কাঁপিয়ে কথা বলে উঠল স্মগ।

‘এই যে, চোর আবার এসেছে! তোমার গন্ধ পাচ্ছি আমি বাতাসে, নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সামনে এগিয়ে এস, যা লাগে নিয়ে যাও! অনেক আছে আমার কাছে!’

তবে বিলবো যে ড্রাগনদের সম্পর্কে একেবারেই কিছু জানে না তা নয়, স্মগের কথায় ভোলার মত বোকা নয় সে।

‘ধন্যবাদ, হে মহাশক্তিশালী স্মগ!’ জবাব দিল বিলবো। ‘আপনার সম্পদে ভাগ বসাতে আসিনি আমি, শুধু একবার আপনাকে নিজ চোখে দেখতে এসেছিলাম। আপনার অনেক গল্প শুনেছি আমি, দেখতে চেয়েছিলাম যে সত্যিই আপনি তেমন বিশাল কিনা।’

‘তা কি দেখলে?’ স্মগের গলা শুনে মনে হল বেশ খুশি হয়েছে সে।

‘দেখলাম, গান আর রূপকথা দিয়ে আপনার বিশালত্ব আর মহিমা বর্ণনা করার কোন উপায় নেই! সত্যিই আপনি কল্পনার চাইতেও বিশাল, হে স্মগ!’ জবাব দিল বিলবো।

‘চোর হিসেবে তোমার আদবকায়দা বেশ ভালই বলতে হবে,’ বলল স্মগ। ‘তোমার গন্ধ আমার নাকে আগে গেছে বলে মনে হচ্ছে না। কি নাম তোমার, আর কোথা থেকে এসেছ তুমি জানতে পারি কি?’

‘অবশ্যই! পাহাড়ের নিচ হতে এসেছি আমি, আর পাহাড়ের উপর-নিচ সর্বত্র আমার চলাফেরা। আমি সেই যে চলে অদৃশ্য হয়ে!’

‘সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি,’ বলল স্মগ। ‘কিন্তু তোমার নামটা কি?’

‘আমি তথ্য-অনুসন্ধানকারী, জাল-কর্তনকারী, হুল ফোটানো বোলতা। সৌভাগ্য-সংখ্যার প্রতিনিধি আমি!’

‘সুন্দর উপাধি বলতে হবে,’ ব্যঙ্গের হাসি হাসল স্মগ। ‘আরেকটু বুঝিয়ে বল?’

‘আমি সেই যে তার বন্ধুদের পানিতে ডোবায়, তারপর আবার টেনে তোলে!’

‘এটা শুনতে খুব একটা ভাল লাগল না,’ বলল স্মগ।

‘আমি ভালুকের বন্ধু, ঈগলের অতিথি। আমি আংটির মালিক, সৌভাগ্যের ধারক, ব্যারেলের আরোহী!’ বলে চলল বিলবো, নিজের হেয়ালিতে নিজেই সন্তুষ্ট বোধ করছে।

‘এই তো, এবার ভাল লাগছে শুনতে,’ বলল স্মগ, ‘চালিয়ে যাও!’

ড্রাগনদের সাথে কথা বলার অবশ্য এটাই নিয়ম। আসল নাম জানানো ঠিক নয় তাদের কাছে, আবার জানাতে সরাসরি অস্বীকার করলেও বিপদ হতে পারে। তাছাড়া হেয়ালি বা ধাঁধা ভালবাসে ড্রাগনরা, সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে পছন্দ করে। বিলবো যা বলল এতক্ষণ সেগুলোর অর্থ বুঝতে পাঠকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, তবে ড্রাগনটা বিলবোর অভিযান সম্পর্কে জানে না, ফলে তার হেয়ালির অর্থ নিজের মত করে সাজিয়ে নিচ্ছে সে, আর তৃপ্তির হাসি হাসছে মনে মনে।

‘ঠিকই ধরেছিলাম তাহলে,’ মনে মনে ভাবল ড্রাগনটা। ‘লেক-টাউন থেকেই এসেছে চোরটা। নোংরা ব্যারেল ব্যবসায়ীগুলো নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছে মরে গেছি আমি। ঠিক আছে, বহু দিন ওদিকটায় যাওয়া হয়নি, সে সময় চলে এসেছে মনে হচ্ছে!’

‘তাহলে ব্যারেলের আরোহী তুমি,’ মুখে বলল সে। ‘ব্যারেল নিশ্চয়ই তোমার ঘোড়ার নাম! গত রাতে ছয়টা ঘোড়া ধরে খেয়েছি আমি, বাকিগুলোকেও খাব খুব তাড়াতাড়ি। দারুন একটা ভোজের ব্যবস্থা করে দিয়েছ তুমি, সুতরাং বিনা পয়সায় একটা উপদেশ দিচ্ছি তোমাকে। যত দ্রুত পার বামনদের সঙ্গ ত্যাগ কর!’

‘বামন?’ ছদ্ম-বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল বিলবো।

‘মিথ্যে বোলো না আমার কাছে!’ ধমকে উঠল স্মগ। ‘বামনদের গন্ধ চিনি আমি। যে ঘোড়াগুলো খেয়েছি সেগুলোর গায়ে বামনের গন্ধ পেয়েছি আমি। ওদের সাথে চলাফেরা করলে তার পরিণতি ভাল হবে না তোমার জন্য!’ তবে এটা বলল না যে আরও একটা অপরিচিত গন্ধ পেয়েছে সে, আর সেটা চিনতে না পারায় বেশ অস্বস্তি বোধ করছে। গন্ধটা হবিটের।

‘চুরি করা কাপটার জন্য বেশ ভাল দাম পেয়েছ নিশ্চয়ই?’ বলে চলল স্মগ। ‘পাওনি? এই তো, এটাই বামনদের স্বভাব, বুঝলে? এখন নিশ্চয়ই বাইরে নিরাপদে বসে আছে ওরা, আর তোমাকে পাঠিয়েছে বিপজ্জনক কাজগুলো করার জন্য। তোমাকে সমান ভাগ দেয়ার কথা বলেছে ওরা, তাই না? খবরদার, বিশ্বাস কোরো না ওদের কথা! এখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারলে সেটাই তোমার সৌভাগ্য, সম্পদের আশা ছেড়ে দাও!’

‘না, হে মহাপরাক্রমশালী স্মগ!’ জবাব দিল বিলবো। ‘শুধু সোনার জন্য এখানে আসিনি আমরা।’ মুখে এ কথা বললেও ভেতরে ভেতরে কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু করেছে তার, মনে হচ্ছে আংটিটা খুলে ফেল স্মগের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, সবকিছু খুলে বলে তাকে। জানে না, এটা ড্রাগনের জাদুর ফলাফল।

‘হা হা হা, সত্যি কথা বের হয়ে গেছে তোমার মুখ দিয়ে! ‘আমরা’ বলেছ তুমি, তার মানে তোমার সাথে সত্যিই আরও কেউ আছে। কত জন তারা? চোদ্দ জন নিশ্চয়ই, নিজেকে সৌভাগ্য-সংখ্যার প্রতিনিধি বলছ যখন? তবে একটা ব্যপার নিশ্চয়ই ভেবে দেখনি তোমরা। সেটা হচ্ছে গুহা থেকে সোনাদানা নাহয় চুরি করলে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে যাবে কিভাবে? তোমাদের ঘোড়াগুলো তো খেয়ে ফেলেছি আমি! মোট সম্পদের চোদ্দ ভাগের এক ভাগ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তোমাকে, আন্দাজ করছি, কিন্তু পৌঁছে দেয়ার ব্যপারে কি কিছু বলেছে ওরা?’ গলা ছেড়ে হেসে উঠল স্মগ।

বিশ্বাস করতে হয়তো কষ্ট হবে, কিন্তু সত্যিই সন্দেহে ভুগতে শুরু করল বিলবো। সত্যিই তো, এই বিশাল সম্পদ কি করে বাড়ি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাবে সে? অভিযানে বের হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তার চিন্তা ছিল শুধু কিভাবে পাহাড়ের ভেতর প্রবেশ করবে তাই নিয়ে, নিজের লাভ নিয়ে চিন্তা করেনি সে। এখন চিন্তাটা ঢুকল তার মাথায়, এবং তার পরেই মনে হল, বামনরাও কি তার মত ব্যপারটা নিয়ে চিন্তা করতে ভুলে গেছে? নাকি এতদিন তার নির্বুদ্ধিতা দেখে গোপনে হেসেছে তারা? সে জানে না, পুরো চিন্তাটাই ড্রাগনের সাথে আলাপচারিতার ফল।

‘শুনুন, মহামান্য স্মগ,’ বলল বিলবো। ‘সত্যি বলছি, সোনাদানা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি আমরা শুধু প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে! নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, এই বিশাল সম্পদের মালিক হওয়ার সাথে সাথে কিছু ভয়ানক শত্রুও তৈরি করেছেন আপনি?’

এবার এত জোরে হেসে উঠল স্মগ যে বিলবোর মনে হল কেঁপে উঠল পুরো গুহাটা। ওদিকে গুহার বাইরে বসে বামনরাও শুনতে পেল সেই হাসির শব্দ, ভাবল, নিশ্চয়ই ধরা পড়ে গেছে বিলবো!

‘প্রতিশোধ!’ হাসির দমক থামতে বলে উঠল স্মগ। ‘কে নেবে প্রতিশোধ? এই পাহাড়ে বসবাসকারী বামন-রাজার পুরো বংশের নামনিশানা মুছে দিয়েছি আমি। ডেল শহরের রাজা গিরিয়নও মারা গেছে, তার লোকজনকে আমি ভেড়ার পালের মাঝে নেকড়ের মত ধরে ধরে খেয়েছি। আমি যেখানে খুশি সেখানেই তাণ্ডব চালাই, কারও সাধ্য নেই আমার সামনে দাঁড়ায়! ছায়ায় লুকিয়ে থাকা চোর, শুনে রাখ,’ গর্বমিশ্রিত গলায় বলে চলল সে, ‘আমার চামড়া দশটা বর্মের সমান পুরু, আমার দাঁতে তলোয়ারের ধার! আমার নখে বর্শার তীক্ষ্মতা, আমার লেজের ঝাপটায় বজ্রের ক্ষমতা, আর আমার নিঃশ্বাসে মৃত্যু!’

‘ইয়ে মানে, আমি ভাবতাম ড্রাগনদের বুক আর পেটের চামড়া বেশ নরম হয়,’ প্রচন্ড ভয় পেয়েছে এমন গলায় বলল বিলবো।

থমকে গেল স্মগ। ‘ভুল শুনেছ তুমি! অমন কোন দুর্বলতা নেই আমার শরীরে। চিত হয়ে শুল সে, মনিমুক্তায় ঢাকা বুক আর পেট দেখা গেল তার। ‘এই দেখ! এবার কি বলবে তুমি?’

‘সত্যিই আপনি অপরাজেয়! মহাপরাক্রমশালী! কারও সাধ্য নেই ওই চামড়া ভেদ করে আঘাত করে আপনার শরীরে!’ প্রচন্ড বিস্মিত হয়েছে এমন ভাবে বলল বিলবো, কিন্তু মনে মনে ভাবছে অন্য কথাঃ ‘ব্যাটা হাদারাম ড্রাগন! ওই তো দেখা যাচ্ছে বুকের বাম দিকে একটা জায়গায় নরম চামড়ায় ঢাকা!’

যা দেখার দেখে নিয়েছে বিলবো, এবার ঠিক করল অনেক হয়েছে, এবার পালাতে হবে এখান থেকে। ‘আপনার বিশ্রামের আর ব্যাঘাত ঘটাব না আমি, হে মহানুভব,’ বলল সে। ‘ছয় ছটা ঘোড়া ধরে খেয়েছেন আপনি, ধরতে নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়েছে? এখন আপনার বিশ্রাম দরকার। আর আমাকে ধরার আশা ছেড়ে দিন, কারন চোর ধরা খুব একটা সহজ কাজ নয়!’ শেষ কথাটা বলেই খিঁচে দৌড় দিল সে, ঢুকে পড়ল সরু গুহাটার ভেতর।

সাথে সাথে হিসিয়ে উঠে বিলবো যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিল সেদিকে এক ঝলক আগুন ছুঁড়ে মারল ড্রাগনটা, কিন্তু বিলবো ততক্ষণে গুহায় ঢুকে পড়েছে। এবার তার পিছু পিছু গুহার ভেতর মুখ ঢোকানোর চেষ্টা করল স্মগ, কিন্তু ব্যর্থ হল। তবে হাল ছাড়ল না সে, তার নাকের ফুটো দিয়ে আগুনের মতই গরম বাস্পের মেঘ ছুটে এল গুহার মাঝ দিয়ে ছুটতে থাকা বিলবোর দিকে। একটুর জন্য বেঁচে গেল বিলবো।

‘একটা বোকার হদ্দ তুমি, বিলবো ব্যাগিনস!’ ছুটতে ছুটতেই নিজেকে গালি দিল বিলবো। ‘জ্যন্ত ড্রাগনকে নিয়ে কখনও ঠাট্টা করতে নেই!’ পরবর্তীতেও কথাটা প্রায়ই বলত সে, একসময় জনপ্রিয় একটা প্রবাদে পরিনত হয় কথাটা।

দুপুরবেলা ভেতরে ঢুকেছিল সে, যখন বেরিয়ে আসল তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। বাইরে বেরিয়ে এসেই ধপাস করে পড়ে গেল সে বামনদের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে, তাড়াতাড়ি তার সেবাশুশ্রূষা করে জ্ঞান ফিরিয়ে আনল সবাই। একটূ সুস্থ হতে বিলবোকে ঘিরে ধরল তারা, কি ঘটেছে গুহার ভেতরে জানতে চাইল।

কিন্তু বিলবো বেশ চিন্তায় পড়ে গেছে এখন, বাইরের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ পরিবেশে এসে বুঝতে পারছে যে এমন কিছু তথ্য দিয়ে এসেছে সে স্মগকে যা একেবারেই উচিত হয়নি। সেই থ্রাশ পাখিটা এখনও বসে আছে একটা পাথরের উপর, হঠাৎ মেজাজ খারাপ করে একটা পাথর তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল সে পাখিটার দিকে। কিন্তু পালিয়ে গেল না পাখিটা, শুধু একটুখানি উড়ে আবার এসে বসল আগের জায়গায়।

‘শয়তান পাখি!’ বলল বিলবো। ‘আমাদের সব কথা আড়ি পেতে শুনছে ব্যাটা!’

‘ছেড়ে দাও ওকে,’ বলল থোরিন। ‘ওরা আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের প্রতিনিধি, এমনও হতে পারে যে আমার বাবা আর দাদারা যে পাখিগুলোকে পুষতেন এটা তাদেরই কেউ। ডেল শহরে যারা বাস করত তাদের কেউ কেউ থ্রাশ পাখিদের ভাষা বুঝতে পারত, এই পাখিগুলোকে ব্যবহার করেই বিভিন্ন খবর পাঠাতেন আমার পূর্বপুরুষরা। ওর উপর রাগ দেখিয়ে লাভ নেই।’

‘তাহলে এতক্ষণে অনেকগুলো খবরই সংগ্রহ করেছে ব্যাটা,’ বলল বিলবো, ‘অবশ্য ওর ভাষা বোঝার মত কেউ এখনও আছে বলে মনে হয় না!’

‘কিন্তু গুহার ভেতর কি ঘটল বল আমাদের, শোনার জন্য অধীর হয়ে আছি আমরা!’ চাপ দিল সবাই বিলবোকে।

সুতরাং সবকিছু খুলে বলল বিলবো, এটাও বলল যে তার ড্রাগনটা তার কথা থেকে অনেক কিছু আন্দাজ করে নিয়েছে বলে তার ধারনা। ‘আমরা যে লেক-টাউন থেকে এখানে এসেছি সেটা বুঝে ফেলেছে সে, এবং আমার মনে হয় এবার ওইদিকেই হামলা চালাবে সে।’

‘তুমি যা করেছ তা অত্যন্ত সাহসের কাজ,’ তাকে সান্তনা দিয়ে বলল বেলিন। ‘ড্রাগনের সাথে কথা বলতে গিয়ে মুখ ফসকায়নি এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। বরং দারুন একটা তথ্য জানতে পেরেছ তুমি, স্মগের দুর্বল জায়গাটা দেখে এসেছ। ভবিষ্যতে ওর বুকের নরম চামড়ায় ঢাকা জায়গাটার কথা জানা থাকায় সুবিধা হবে আমাদের!’

এই কথায় সবাই ড্রাগন হত্যার ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে শুরু করল, কিভাবে বিভিন্ন সময়ে নানা ভাবে নানা যন্ত্র আর কৌশলের সাহায্যে ড্রাগন মারা হয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হল। বহুক্ষণ ধরে চলল এই আলোচনা, আর পুরো সময়টা থ্রাশ পাখিটা ঘাড় কাত করে বসে থাকল তার জায়গায়, যেন মনোযোগ দিয়ে শুনছে সবকিছু। অবশেষে যখন আকাশে তারাগুলো উঁকি দিতে শুরু করেছে, নিঃশব্দে ডানা মেলে উড়ে গেল পাখিটা।

বিলবো এতক্ষণ সবার কথা শুনছিল। এবার বাঁধা দিয়ে বলল সে, ‘এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়। রাত নেমে আসছে, যে কোন সময় বেরিয়ে আসবে ড্রাগনটা। কোন দিক দিয়ে তার আস্তানায় ঢুকেছি আমি এখন সেটা জানে সে, এবার নিশ্চয়ই পাহাড়ের এদিকটা ভেঙে গুড়িয়ে দেবে! আমার মনে হয় তার আগেই গুহার ভেতর ঢুকে পড়া উচিত আমাদের।’

‘আমার তা মনে হয় না,’ বলল থোরিন। ‘স্মগ যদি আমাদের কথা জেনেই থাকে তবে ভেতরের দিকের মুখটা এখনও বন্ধ করে দেয়নি কেন সে?’

‘সেটা আমি জানি না। প্রথমবার হয়তো আমি আবার ভেতরে ঢুকব এই আশায় মুখটা খোলা রেখেছিল সে। আজ রাতে আবার বের হবে সে, তারপর কি করবে কে জানে? সে জন্যেই বলছি, তর্ক না করে আমার কথা শোনা উচিত তোমাদের, যদি স্মগের হাত থেকে বাঁচতে চাও।’

অবশেষে তার কথা শুনতে রাজি হল বামনরা, একে একে গুহার ভিতর ঢুকে পড়ল সবাই। তবে দরজাটা বন্ধ করে দিতে চাইল না কেউ, তাতে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে, কারন দরজাটা ভেতর থেকে কিভাবে খোলা যায় সেটা কেউ জানে না। ভেতরে ঢুকে চুপচাপ বসে থাকল সবাই, মাঝে মাঝে দুই একটা কথা বলছে কেউ কেউ। তারপর বামনদের সম্পর্কে যে কথাগুলো বলেছিল স্মগ সেটা উঠে আসল আলোচনায়। বিলবোর মনে হল কথাগুলো না শুনলেই ভাল হত, আরও ভাল হত যদি গুপ্তধন খুঁজে পাওয়ার পর সেটা কিভাবে বের করা হবে এই চিন্তা তাদের মাথায় আসেনি বলে যে দাবি করছে বামনরা সেটা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারত সে।

‘কাজটা অত্যন্ত বিপজ্জনক সন্দেহ নেই,’ বলল থোরিন, ‘কিন্তু সেটা জেনেই অভিযানে বের হয়েছি আমরা। একবার ড্রাগনটাকে মারতে পারলে কিভাবে ওই সম্পদের পাহাড় বের করা হবে সেটা নিয়ে চিন্তা করার অনেক সময় পাওয়া যাবে, সন্দেহ নেই। আর বিলবো, তোমাকে বলছি, নিজের ভাগ নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা কোরো না তুমি। নিজের ইচ্ছামত সম্পদের চোদ্দ ভাগের এক ভাগ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়া হবে তোমাকে। সেই সাথে পরিবহনের জন্যেও সমান সুবিধা পাবে তুমি।’

কথায় কথায় পাহাড়ের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সম্পদের বিশাল পাহাড়ের কথা উঠে এল এবার। থোরিন আর বেলিনের এখনও কিছু কিছু কথা মনে আছে, কে জানে সেগুলো এখনও আগের জায়গাতে আছে কিনা! রাজা ব্যালডোর্থিন এর সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি করা সোনায় মোড়ানো বর্শা আর ঢাল, রাজা থ্ররের বিশাল সোনার তৈরি কাপ, যার গায়ে খচিত ছিল অজস্র মূল্যবান পাথর, ঘাসের মত সবুজ পাঁচশ পান্না খচিত নেকলেস, যা তৈরি করা হয়েছিল ডেলের রাজা গিরিয়নের জন্য, নিজের ছেলের অভিষেকে অপূর্ব এক বর্মের সাথে নেকলেসটা উপহার দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এসব কিছু হার মেনে যায় এমন এক মহামূল্যবান রত্ন আছে পাহাড়ের নিচের ওই গুহায়, আর্কেনস্টোন তার নাম।

‘আর্কেনস্টোন!’ ফিসফিস করে বলল থোরিন, কোন সুদূরে যেন হারিয়ে গেছে তার দৃষ্টি। ‘অপূর্ব এক রত্ন সেটা, আজ পর্যন্ত তার সমকক্ষ কিছু আসেনি পৃথিবীতে। আগুনের আলোয় ঝলকানো রূপার মত তার চেহারা, সূর্যের আলোয় মনে হয় পাহাড়ি ঝর্ণার স্বচ্ছ পানির মত! পাহাড়ের নিচে সেই রত্ন খুঁজে পেয়েছিলেন আমার পূর্বপুরুষরা।’

তবে এসব কথায় মন নেই বিলবোর। দরজার সবচেয়ে কাছে বসে আছে সে, কান পেতে রেখেছে বাইরে থেকে কোন শব্দ শোনা যায় কিনা সেই আশাতে। বাইরে অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে এল, এক সময় বলে উঠল সে, ‘এবার বন্ধ করে দাও দরজাটা! এই নিস্তব্ধতা ভাল লাগছে না আমার, মনে হচ্ছে নতুন কোন মতলব ভাজছে ড্রাগনটা। দরজাটা খোলা রাখা উচিত হবে না আর!’

তার কথায় যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল বামনরা। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল থোরিন, তারপর এগিয়ে গিয়ে লাথি মেরে সরিয়ে দিল পাথরটা, যেটা দরজাটাকে খুলে রেখেছিল। তারপর সবাই মিলে ঠেলে বন্ধ করে দিল দরজাটা, একটা তীক্ষ্ম শব্দের সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল সেটা, আর কোন চিহ্নই রইল না তার। এবার পাহাড়ের ভিতর আটকা পড়েছে তারা!

প্রায় সাথে সাথেই সত্যি হল বিলবোর আশঙ্কা। দরজাটা মাত্র বন্ধ করে নিজেদের জায়গায় ফিরে এসেছে সবাই, এই সময় প্রচন্ড এক আঘাতে কেঁপে উঠল পুরো পাহাড়টা, যেন বিশাল কোন হাতুড়ি দিয়ে অভিযাত্রীদের বরাবর পাহাড়ের গায়ে বাড়ি মারছে কোন দৈত্য। মাথার উপর থেকে টুকরো টুকরো পাথর খসে পড়ল, থরথর করে কাঁপছে পুরো পাহাড়টা। দরজাটা খোলা থাকলে কি হত ভেবে শিউরে উঠল বিলবো। তাড়াতাড়ি গুহার আরও ভেতরে সরে গেল সবাই, ওদিকে বাইরে যেন উন্মাদ নৃত্য জুড়েছে স্মগ। বড় বড় পাথর এদিক ওদিক ছুঁড়ে ফেলছে সে, লেজের বাড়িতে ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে পাহাড়ের গায়ে। অভিযাত্রীরা যেখানে ক্যাম্প করেছিল সেই ছোট্ট সমতল জায়গাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল তার শক্তিশালী লেজের ঝাপটায়, তারপর পাথরের ধ্বস হয়ে আছড়ে পড়ল নিচের উপত্যকায়।

নিঃশব্দে কখন যেন নিজের আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসেছে ভয়ঙ্কর ড্রাগনটা, তারপর অন্ধকারে একটুও শব্দ না করে উড়ে এসেছে পাহাড়ের পশ্চিম দিকটায়। সে ভেবেছিল নিশ্চয়ই অসতর্ক অবস্থায় ধরে ফেলতে পারবে চোরগুলোকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে সে, তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ধরতে পারেনি কাউকে, ফলে প্রচণ্ড রাগে পাগল হয়ে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে।

কিছুক্ষণ পর রাগ পড়ে এল তার। এর পরেও আর চোরগুলো উৎপাত করতে আসবে বলে মনে হয়না, ভাবল সে। তবে লেক-টাউনের ছিঁচকে চোরগুলোকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার। ‘শয়তান ব্যারেলওয়ালা!’ গর্জে উঠল স্মগ, ‘তোর গন্ধ আমি চিনতে না পারলেও নিশ্চয়ই ওই লেক-টাউন থেকেই এসেছিস তুই, ওরাই সাহায্য করেছে তোকে। বেশ, এবার আমার রাগ টের পাবে ওরা। বুঝে যাবে, আমাকে চটানোর ফল কত ভয়ঙ্কর হতে পারে!’

বিশাল বাদুড়ের মত দুই ডানা মেলে শূন্যে উঠল সে, তারপর চলে গেল পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলা নদীটার দিকে। উদ্দেশ্য, লেকের গভীরে মিশিয়ে দেবে শহরটাকে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *