ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – ত্রয়োদশ অধ্যায়

ওদিকে গুহার অন্ধকারে বসে আছে অভিযাত্রীরা, কতক্ষণ কেটে গেল কেউ জানে না। খাবার ফুরিয়ে এসেছে, এখান থেকে কখন মুক্তি মিলবে জানা নেই। সময় গোনার কোন উপায় নেই, দিন কিংবা রাত সব সময়েই গুহার ভেতর নিকশ অন্ধকার। এক সময় মনে হতে লাগল ড্রাগনের ফিরে আসার শব্দ শুনতে পেলেও হত, প্রতি মূহুর্ত এই অজানা আশঙ্কায় কাটাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছে সবাই।

থোরিন কথা বলে উঠল এক সময়। ‘দরজাটা খোলার চেষ্টা করে দেখা যাক,’ বলল সে। এই নীরবতা অসহ্য লাগছে আমার কাছে, খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে না পারলে স্রেফ মারা পড়ব আমি।’

বামনদের কয়েকজন উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দরজাটার দিকে এগোল, কিন্তু হতাশ হতে হল তাদের। ড্রাগনের আক্রমণে ভেঙে চুরে পুরোপুরি গুড়িয়ে গেছে জায়গাটা, চাবি বা জাদু-কোনকিছুর সাহায্যেই আর খোলার কোন উপায় নেই। ‘ফাঁদে পড়েছি আমরা!’ গুঙিয়ে উঠল তারা। ‘আর বেরোতে পারব না এখান থেকে, এখানেই মরতে হবে আমাদের!’

সেই মূহুর্তে কোথা থেকে কে জানে, নতুন করে সাহস ফিরে পেল বিলবো। ‘আশা হারিও না কেউ,’ বলল সে। ‘শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করে যেতে হবে আমাদের। দুইবার ড্রাগনের গুহায় ঢুকেছি আমি, আরেকবার চেষ্টা করতে দোষ কি? তাছাড়া ড্রাগনটা ভেতরে নেই এখন, বের হতে হলে ওর গুহার ভেতর দিয়েই যেতে হবে আমাদের। সবাই এসো আমার সাথে।’

আর কিছু করার নেই বুঝতে পেরে বিলবোর কথায় রাজি হল সবাই। ধীরে ধীরে গুহার ভেতর দিকে এগোতে লাগল তারা, সবার আগে বিলবো, তারপর থোরিন, তারপর বাকি সবাই। বিলবোর মত নিঃশব্দে চলাফেরা করার ক্ষমতা নেই বাকিদের, কিছুক্ষণ পরপরই নানা রকম শব্দ হতে লাগল গুহার ভেতর। সাবধানের মার নেই ভেবে মাঝে মাঝে থেমে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করতে লাগল বিলবো, ড্রাগনটা ফিরে আসার কোন চিহ্ন পাওয়া যায় কিনা বোঝার চেষ্টা করছে। তবে তেমন কিছু শোনা গেল না। আংটিটা পরে নিয়েছে সে, তবে তারও দরকার ছিল না, কারণ গুহার ভেতর এমনই অন্ধকার যে এমনিতেই অদৃশ্য হয়ে আছে সবাই। তাই হঠাৎ করে যখন গুহার সীমানা শেষ হয়ে গেল, প্রায় হোঁচট খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিল বিলবো।

কয়েক মূহুর্ত নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল বিলবো, নড়তে সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু চারদিকে সবকিছু নিস্তব্ধ। আশে পাশে তাকাল সে, কোন চিহ্ন নেই স্মগের। তবে মাথার উপর অনেক উঁচুতে ফ্যাকাসে সাদা আলোর একটা আভা চোখে পড়ল। আলোর উৎসটা ধরার কোন উপায় নেই, তবে ড্রাগনের আগুন যে নয় তা নিশ্চিত।

সাহস ফিরে আসল বিলবোর বুকে। ‘স্মগ, কোথায় তুমি?’ গলা চড়িয়ে বলে উঠল সে। ‘আবার এসেছি আমি, যদি পার তো ধর আমাকে!’ বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল তার গলার আওয়াজ, প্রতিধ্বনি উঠল চারদিকে। কিন্তু স্মগের কোন চিহ্ন দেখা গেল না।

‘আবার কি নতুন মতলব আঁটছে ড্রাগনটা, কে জানে?’ বলল বিলবো। ‘বাড়িতে নেই সে, এই ফাঁকে চারদিকটা একটু ঘুরে দেখে নেয়া যাক। কিন্তু আলো কোথায়?’

গুহার বাইরে বের হয়ে আসতে সাহস পায়নি বামনরা, এখনও ভিতরেই রয়েছে তারা। বিলবোর কথায় ভয় কিছুটা কেটে গেল তাদের, আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে এল। ওইন আর গ্লোইন ফিরে গেল তাদের মালপত্রের কাছে, সেখান থেকে পাইন কাঠের কয়েকটা মশাল নিয়ে ফিরে এল আবার। সেগুলোর আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল চারদিক। কিন্তু বিলবো যখন বলল যে গুহার চারদিকটা ঘুরে দেখতে চায় সে, তখন আবার বেঁকে বসল সবাই। এই কাজটা বিলবোর একার, থোরিন জানাল তাকে।

সুতরাং একাই একটা জ্বলন্ত মশাল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল বিলবো, আর বাকিরা বসে থাকল গুহার মুখে। অন্ধকারের মাঝে মশালের আলোয় আলোকিত তার ছোট্ট অবয়বটা হারিয়ে যেতে দেখল বামনরা। কিছুক্ষণ পরেই একটা আলোর বিন্দুতে পরিনত হল বিলবোর হাতে ধরা মশালটা, ধীরে ধীরে উপরে উঠছে সেটা। একটা স্বর্ণমুদ্রার পাহাড়ের উপর উঠছে বিলবো। একবার থামতে দেখা গেল তাকে, মনে হল ঝুঁকে পড়ে তুলছে কিছু। কিন্তু জিনিসটা কি সেটা বুঝতে পারল না কেউ।

জিনিসটা আর কিছুই নয়, সেই আর্কেনস্টোন। থোরিনের কথা থেকে রত্নটা দেখতে কেমন সেটা আন্দাজ করে নিয়েছে বিলবো, এক নজরেই চিনতে পেরেছে সেটাকে। সত্যিই জিনিসটার জুড়ি নেই। স্বর্ণমুদ্রার স্তুপটায় উঠতে শুরু করার পরেই অদ্ভুত আভাটা নজরে আসে তার, ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায় রাশি রাশি সোনাদানার উপর অবহেলায় পড়ে আছে সাত রাজার ধন সেই মহামূল্যবান রত্ন।

বিলবোর এক হাতে আটল না পাথরটা, এত বড়। কোন মতে তুলতে পারল সে ওটাকে, তারপর একদম ভিতরের পকেটে রেখে দিল।

‘এতক্ষণে একটা কাজের মত কাজ করেছি,’ ভাবল বিলবো। ‘বামনদের তো এটার কথা বলতেই হবে। তবে ওরা যেহেতু বলেছে ইচ্ছেমত নিজের ভাগ বেছে নিতে পারব আমি, সেক্ষেত্রে আর্কেনস্টোনটাকেই আমার পারিশ্রমিক হিসেবে দাবি করলে কেমন হয়?’ তবে এটাও তার মনে হল যে কথাটা বলার সময় নিশ্চয়ই আর্কেনস্টোনের কথা মাথায় রেখে বলেনি থোরিন, সে এটাকে দাবি করলে ঝামেলা হতে পারে। যাই হোক, আবার সামনে এগোতে শুরু করল সে, নেমে এল স্তুপের ওপাশে। কিছুক্ষণ পর আবার তার মশালের আলো দেখতে পেল বামনরা, এবার আরও দূরে।

শেষে বিশাল হলঘরের আরেক মাথায় এসে পৌছাল বিলবো। হঠাৎ এক ঝলক তাজা বাতাস এসে লাগল তার মুখে! ভাল করে খেয়াল করতে সামনে প্রকান্ড সব পথ দেখতে পেল সে, পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে সেগুলো। চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে সেসব পথের মুখে। অনেক দেখা হয়েছে, সিদ্ধান্ত নিল বিলবো, এবার ফিরতে হয়। কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতেই কিছু একটা তার মুখে ঝাপটা মারল, চমকে উঠে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে। সাথে সাথে হাত থেকে পড়ে গিয়ে নিভে গেল মশালটা।

‘নিশ্চয়ই বাদুড়-টাদুড় হবে,’ ভাবল সে। কিন্তু এবার কোন দিকে যাবে? দিক হারিয়ে ফেলেছে সে!

‘থোরিন! বেলিন! ওইন! গ্লোইন! ফিলি! কিলি!’ গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল বিলবো। ‘মশালটা নিভে গেছে, পথ খুঁজে পাচ্ছি না আমি, সাহায্য কর আমাকে!’

হলঘরের ঠিক উল্টোদিকে থাকা বামনদের কানে কেবল সাহায্য কথাটা পৌছাল। ‘কি হল ওর?’ বলে উঠল থোরিন। ‘একটা আলো নিয়ে এস কেউ, মনে হচ্ছে আমাদের চোরকে উদ্ধার করে আনতে হবে।’

‘খুশিমনেই যাব আমি,’ জবাব দিল বেলিন। ‘বিলবোর কিছুটা উপকার ফিরিয়ে দেয়ার সময় হয়েছে।’

আরও কয়েকটা মশাল জ্বালাল গ্লোইন, তারপর এক এক করে বের হয়ে এল সবাই, এগোতে শুরু করল বিলবোর গলা যেদিক থেকে ভেসে এসেছে সেদিকে। তবে কিছুক্ষণ পরেই বিলবোর সাথে দেখা হয়ে গেল তাদের, ফিরে আসছে সে। দূর থেকেই বামনদের মশালের আলো দেখতে পেয়েছিল সে।

‘তেমন কিছু হয়নি, হাত থেকে পড়ে গিয়ে মশালটা নিভে গিয়েছিল শুধু,’ বামনদের প্রশ্নের জবাবে বলল সে। তবে আর্কেনস্টোনটা খুঁজে পাওয়ার কথা চেপে গেল। ভালই হল তাতে এক হিসেবে, কারন আসার পথে সম্পদের যেটুকু চোখে পড়েছে বামনদের তাতেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছে তারা। সোনাদানা আর মনিমুক্তার সামনে এলে এমনকি সবচেয়ে মহৎ আর উদার বামনদেরও চিত্তচাঞ্চল্য ঘটতে বাধ্য, কোন কোন ক্ষেত্রে এমনকি প্রচণ্ড হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে তারা।

এবার সবাই মিলে ঘুরে দেখতে লাগল প্রকান্ড হলঘরটা। বামনদের আগ্রহই সবচেয়ে বেশি, কারন এতক্ষণে তারাও নিঃসন্দেহ হয়েছে যে স্মগ নেই গুহাতে। ধীরে ধীরে ভয় আর সতর্কতার কথা ভুলে গেল সবাই, নীরবতার কথা মনে থাকল না কারও। একে অপরের সাথে জোরে জোরে হাসাহাসি করছে তারা, নানা রকম গহনা আর মূল্যবান ধাতুর তৈরি অস্ত্রশস্ত্র তুলে নিয়ে পরীক্ষা করছে। ফিলি আর কিলির আনন্দই সবচেয়ে বেশি। দেয়ালে ঝোলানো বেশ কিছু সোনার হার্প (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) খুঁজে পেয়েছে তারা, এখনও নিখুঁত সুরে বাজছে সেগুলো। একটু পরেই অন্ধকার গুহার মাঝে ছড়িয়ে পড়ল অপূর্ব সুন্দর বাজনা। তবে বাকিরা সময় নষ্ট করছে না, নানারকম পাথর তুলে নিয়ে পকেট বোঝাই করছে তারা। যেগুলো পকেটে নিতে পারছে না সেগুলো দীর্ঘশ্বাসের সাথে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। থোরিনও একই কাজে ব্যস্ত, তবে আশে পাশে আরও কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে তার চোখ। আর্কেনস্টোনটা খুঁজছে সে, তবে সে কথা বলল না কাউকে।

এবার দেয়ালে ঝোলানো অস্ত্রগুলো নামিয়ে দেখতে শুরু করল অভিযাত্রীরা। বিলবোকে রূপোর সরু জালে তৈরি একটা বর্ম পরিয়ে দিল থোরিন, বহু বছর আগে কোন এলফ রাজপুত্রের জন্য তৈরি হয়েছিল সেটা। পুরু চামড়া আর ইস্পাতের তৈরি একটা শিরস্ত্রান পরানো হল বিলবোর মাথায়।

‘দেখতে কেমন লাগছে কে জানে!’ ভাবল বিলবো। ‘একটা আয়না থাকলে ভাল হত!’

তবে বরাবরই নিজেকে এইসব সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত রেখেছে বিলবো, বামনদের মত ঘোর পেয়ে বসেনি তাকে। ‘থোরিন,’ ডাক দিল সে, ‘এবার কি করব আমরা? এখান থেকে বের হওয়ার পথ বের করতে না পারলে এসব সোনাদানা কোন কাজে আসবে না আমাদের।’

‘ঠিকই বলেছ তুমি,’ বাস্তবে ফিরে এল থোরিন। ‘এই গুহার ভেতরের পথ ভালই মনে আছে আমার। দেখা যাক বের হওয়ার কোন পথ খুঁজে পাই কিনা!’ বাকি সবাইকে ডাক দিল সে, তারপর মশালের আলোয় এগিয়ে চলল তার নির্দেশিত পথে। নিজেদের পছন্দ মত অস্ত্র আর বর্ম বেছে নিয়েছে সবাই, পরে নিয়েছে জামাকাপড়ের নিচে। চলার পথে ড্রাগনটা ফিরে আসার ভয় থাকলেও তেমন কিছু দেখা গেল না। বিশাল সব সিঁড়ি, ঢালু চওড়া পথ বেয়ে এগিয়ে চলল তারা, কখনও উপরে, কখনও নিচে।

দক্ষ হাতে পাহাড়ের ভেতর পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে পথগুলো, এক নজরেই টের পাওয়া যায়। এতদিন কেটে যাওয়ার পরেও সেগুলো সম্পূর্ণ মসৃণ, এক সাথে বহু লোক যাতায়াত করতে পারে তার উপর দিয়ে। তবে জায়গায় জায়গায় ড্রাগনের চলাচলের চিহ্ন দেখা গেল, ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে পাহাড়ের মত বিশাল সব থাম আর পাথরের টুকরো। সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল অভিযাত্রীরা।

তারপর এক সময় হঠাৎ করে সামনে থেকে আলোর রেখা দেখতে পেল বিলবো। এতক্ষণ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে, থোরিনের ইশারায় বেশ খুশি হয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল তাই। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখল বহু উপরে উঠে গেছে ছাদ, এত উপরে যে মশালের আলোয় তা দেখার কোন উপায় নেই। তারপর অন্ধকার সয়ে আসতে দেখল, বিশাল এক দরজা দাঁড়িয়ে আছে সামনে, আর তার ভাঙা, আধপোড়া পাল্লার মাঝ দিয়ে আলো এসে পড়ছে ভেতরে। হালকা বাতাসের ছোঁয়া লাগল তার মুখে।

‘এখানেই ছিল রাজা থ্ররের দরবার,’ বলল থোরিন। ‘আর সামনে দেখা যাচ্ছে সদর দরজা।’

দরবার কক্ষের ভেতর অবহেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ভাঙাচোরা টেবিল, চেয়ার আর নানারকম আসবাবপত্র, দীর্ঘকালের ধুলোর আবরনে ঢাকা সব। তার সাথে পরে আছে মাথার খুলি আর হাড়গোড়। সেগুলোর দিকে না তাকানোর চেষ্টা করল বিলবো। দরজার কাছাকাছি আসতে জলধারার গর্জন কানে গেল অভিযাত্রীদের, সেই সাথে আলোর পরিমাণও বৃদ্ধি পেল।

‘এখান থেকেই ওই নদীটার জন্ম,’ বলল থোরিন। ‘ওটাকে অনুসরণ করতে হবে আমাদের।’

একপাশে দেয়ালের গায়ে বিশাল এক অন্ধকার গহ্বর, আর তার মাঝ থেকে সগর্জনে বেরিয়ে আসছে স্রোতধারা। দেয়াল থেকে বের হয়ে মেঝেতে পাথর কেটে তৈরি করা একটা গভীর খালের মাঝ দিয়ে এগিয়েছে সেটা, আর তার পাশেই পাথরের তৈরি একটা উঁচু, চওড়া রাস্তা। পথটার উপর দিয়ে এগোতে শুরু করল সবাই, একটা মোড় নিতেই অকস্মাৎ প্রখর দিনের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল সবার। সামনেই অনেক উঁচু ধনুকাকৃতির একটা চওড়া খিলান, তার গায়ে এখনও প্রাচীন ভাষায় খোদাই করা লেখা আর কারুকাজ দেখা যাচ্ছে। দরজার বাইরে কুয়াশার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে সূর্য, তার ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিক।

মাথার উপর দিয়ে এক ঝাঁক বাদুড় উড়ে বেরিয়ে গেল গুহার বাইরে, মশালের আলো আর ধোঁয়ায় ভয় পেয়েছে খুব সম্ভব। তাদের সামনে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে গেছে স্রোতধারা, উপত্যকার মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেছে সামনে। সামনে দেখা যাচ্ছে ডেল শহরের ভগ্নস্তুপ। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সবাই।

‘এই দরজায় এসে দাঁড়াতে পারব বলে কখনও ভাবিনি আমি,’ বলল বিলবো। ‘সূর্যটাকে দেখতে পেয়ে কি যে ভাল লাগছে আমার! কিন্ত বাতাসটা খুব ঠান্ডা,’ শীতে কেঁপে উঠল সে।

সত্যিই, পূব দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসে যেন হাড় পর্যন্ত কেঁপে যাচ্ছে সবার। শীত আসছে, এটা তারই পূর্বাভাষ। হঠাৎ করে বিলবোর খেয়াল হল যে শুধু ক্লান্ত বা শীতার্ত নয় সে, একই সঙ্গে প্রচণ্ড ক্ষিদেও লেগেছে তার। অন্ধকার ওই গুহার ভেতর কতগুলো দিন বা রাত কেটে গেছে জানা নেই, কিন্তু এক সপ্তাহ হলেও অবাক হবে না সে। ‘নাস্তা করা উচিত আমাদের, সকাল হয়ে গেছে এখন।’ বলল সে, ‘তবে এখানে নয়, যে কোন সময় ফিরে আসতে পারে স্মগ।’

‘ঠিক বলেছ,’ সায় দিল বেলিন। ‘আমি জানি কোথায় যাওয়া উচিত আমাদের। পাহাড়ের দক্ষিণ দিকটায় টিলার উপর র‍্যাভেনহিল নামে সেই পুরনো ছাউনিটা আছে না? ওখানে কিছুটা নিরাপদ থাকতে পারব আমরা।’

‘কতদূরে ওটা?’ জানতে চাইল বিলবো।

‘হেঁটে গেলে ঘন্টা পাঁচেক তো লাগবেই, যতদূর মনে আছে। তবে পথটা ভাল নয় এদিকে, নদী পার হতে হবে আমাদের। এখান থেকে কিছু দূরে একটা পাথরের ব্রিজ ছিল, সেটা এখনও আছে কিনা কে জানে? নদী পার হয়ে ওপারে গেলে র‍্যাভেনহিলে পৌঁছানোর একটা রাস্তা পাওয়া যাবে।’

‘এত দূর!’ গুঙিয়ে উঠল বিলবো। ‘খালি পেটে আর এক পাও এগোতে পারব বলে তো মনে হচ্ছে না!’

হেসে তার পিঠে চাপড় মারল থোরিন। ‘চিন্তা কোরো না,’ বলল সে। ‘এখান থেকে সরে গেলেই সব উৎসাহ ফিরে আসবে তোমার মধ্যে।’ এদিক ওদিক তাকাল সে। ‘কিন্তু স্মগ গেল কোথায়? সে ফিরে আসার আগেই সরে পড়া উচিত আমাদের!’

একবাক্যে তার কথায় রাজি হল সবাই। বেলিন পথ দেখাল তাদের, আর তাকে অনুসরণ করে সামনে এগোল সবাই। দেখা গেল যে পাথরের ব্রিজটা অনেক আগেই ভেঙে পড়ে গেছে, তবে নদীটা এখানে বেশি গভীর নয়। পানির উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে জেগে থাকা পাথরগুলোর উপর দিয়ে সহজেই পার হওয়া গেল নদীটা। নদী পার হয়ে কিছুদূর হাঁটার পর একটা পুরনো রাস্তার সন্ধান পাওয়া গেল, সেটা ধরে চলার পর এক জায়গায় পাথরের আড়ালে বেশ গভীর একটা খাদ খুঁজে পেল অভিযাত্রীরা। এখানেই বিশ্রাম নিল সবাই, সাথে যে সামান্য খাবার ছিল তা দিয়ে হালকা নাস্তাও সেরে নেয়া হল।

নাস্তা শেষে আবার হাঁটতে শুরু করল সবাই, শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের দূরবর্তী প্রান্তের একটা অংশের উপর উঠে এল তারা। এখানে এক জায়গায় সমতল একটা জায়গার দেখা পাওয়া গেল। জায়গাটা ছোট্ট, আর তিন দিকে খোলা। তবে একদিকে দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের মত একটা অংশ, তার গায়ে ছোট্ট দরজার মত একটা খোলা জায়গা। থোরিনের কথায় জানা গেল যে ড্রাগনের আক্রমনের আগে এই জায়গাটায় পাহারাদাররা অপেক্ষা করত, বাইরে থেকে কোন শত্রু আসছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখত।

বেলিন যতটা বলেছিল তার চেয়েও বেশি সময় লাগল জায়গাটায় পৌছাতে। সব মালপত্র নামিয়ে রেখে সবাই যখন ছোট্ট জায়গাটার মধ্যে আরাম করে বসল তখন সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। সবাই অত্যন্ত ক্লান্ত, তবে ঘুম এল না কারও চোখে। এর পর কি হবে তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করতে লাগল তারা, কিন্তু সব আলোচনা কেবল একটা জায়গাতে গিয়েই শেষ হল, আর তা হচ্ছে-স্মগ এখন কোথায়?

মাঝে মাঝেই চারদিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল অভিযাত্রীরা, কিন্তু না, কোথাও সেই বিশাল ড্রাগনটার দেখা যাচ্ছে না। তবে দক্ষিণ দিকটায় দেখা গেল দিগন্তরেখার উপর ভিড় করে উড়ছে অনেক পাখি। কি হচ্ছে ওদিকে কেউ বুঝতে পারল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *