ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – চতুর্দশ অধ্যায়

আমাদের অভিযাত্রীদের মত পাঠকদেরও যদি স্মগের কি হল তা জানতে ইচ্ছা হয় তবে ফিরে যেতে হবে দুই দিন আগে, যেদিন গোপন দরজাটার উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সে উড়ে গিয়েছিল লেক-টাউনের উদ্দেশ্যে।

লেক-টাউনের প্রাচীন নাম এসগারথ। সেদিন বেশিরভাগ বাসিন্দাই ছিল ঘরের ভেতরে, কারণ পূব দিক থেকে বয়ে আসছিল কনকনে ঠান্ডা বাতাস। কয়েকজন ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাইরে, উদ্দেশ্যহীন ভাবে। এসগারথ থেকে নিঃসঙ্গ পর্বতটাকে মাঝে মাঝে দেখা যায়, যেদিন আকাশ পরিষ্কার থাকে। তবে কোন এক অজানা কারণে সেদিকে তাকানো এড়িয়ে চলে সবাই। সেদিনও ঘন কুয়াশার আড়ালে ঢেকে ছিল পাহাড়টা।

হঠাৎ এক মূহুর্তের জন্য সেদিকে আলো জ্বলে উঠল, স্পষ্ট দেখা গেল পাহাড়ের চুড়াটা।

‘আবার আলো জ্বলে উঠেছে পাহাড়ের চুড়ায়!’ বলে উঠল একজন। ‘গতরাতেও নাকি সারা রাত ধরে আলো জ্বলতে আর নিভতে দেখা গেছে ওখানে। কি হচ্ছে কে জানে!’

‘হয়তো বামন-রাজা ফিরে এসেছেন সত্যি সত্যি,’ আরেকজন বলল। ‘যারা এসেছিল তাদের কথা যদি সত্যি হয় তবে এতদিনে তাদের সোনা গলানো শুরু করে দেয়া উচিত, ওটা হয়তো তারই আলো।’

‘উঁহু,’ গম্ভীর গলায় তৃতীয় একজন বলে উঠল। ‘ওটা ড্রাগনের আগুন। জেগে উঠেছে সে।’

‘অশুভ কথা ছাড়া আর কিছু নেই তোমার মুখে, বার্ড,’ বাকিরা বলল। ‘ভাল কিছু চিন্তা করতে পার না?’

তারপর হঠাৎ পাহাড়ের নিচের অংশে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠল আলো, সে আলোয় পাদদেশে বয়ে যাওয়া নদীটার পানি হয়ে উঠল উজ্জ্বল সোনালী।

উত্তেজিত হয়ে উঠল সবাই। ‘রাজা সত্যিই ফিরে এসেছেন, রূপকথা সত্যি হয়েছে!’ বলল তারা। ‘নদীর পানি পরিনত হয়েছে সোনায়!’ কিন্তু বার্ড এক দৌড়ে শহরের শাসনকর্তার কাছে চলে গেল। ‘ড্রাগন জেগে উঠেছে আবার, এদিকেই আসছে সে!’ জানাল বার্ড। ‘প্রস্তুত হতে বলুন সবাইকে!’

তারপর হঠাৎ করে শহরের সতর্কতাসূচক ট্রাম্পেটগুলো বেজে উঠল একসাথে। আনন্দ উল্লাস এক নিমেশে পরিনত হল আতঙ্কে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল এক টুকরো আগুন যেন উড়ে আসছে আকাশ পথে শহরের দিকে, দ্রুত বড় হচ্ছে সেটা। স্মগ!

যত দ্রুত সম্ভব প্রস্তুতি নিতে লেগে গেল সবাই। যুদ্ধ করতে সক্ষম প্রতিটা পুরুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হল, পানি দিয়ে ভরে রাখা হল নৌকাগুলো। শহরের সাথে হ্রদের তীরের সংযোগকারী ব্রিজটা ভেঙে ফেলা হল। তার প্রায় সাথে সাথেই লোকজনের আতঙ্কিত চিৎকারের মাঝে শোনা গেল স্মগের বিশাল ডানার শব্দ। চলে এসেছে সে, হ্রদের পানিতে ঢেউ উঠেছে তার ডানার আলোড়নে।

ভয়াবহ গর্জন করে শহরের উপর দিয়ে একটা চক্কর দিল স্মগ, এক ঝাঁক তীর ছুটে গেল তাকে লক্ষ্য করে, কিন্তু একটা আঁচড়ও কাটতে পারল না কোনটা। ধনুকের ছিলার টঙ্কারে আর ট্রাম্পেটের তীক্ষ্ম শব্দে স্মগের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল, ক্রোধে উন্মাদ হয়ে উঠল সে। ভয়ে দিশাহারা হয়ে এদিক ওদিক পালাতে শুরু করল সবাই, শুধু একজন বাদে। তার নাম বার্ড, সবার আগে স্মগের আগমনের কথা বুঝতে পেরেছিল যে।

স্মগের দুই চোয়ালের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে এল আগুনের স্রোত, হ্রদের তীরে যা কিছু ছিল সব জ্বালিয়ে দিচ্ছে সে। জঙ্গলে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল, তাদের আলোতে রক্তের মত লাল হয়ে উঠল হ্রদের পানি। তারপর ঝড়ের মত ছুটে আসা তীরগুলোকে অগ্রাহ্য করে শিকারী বাজপাখির মত নিচে নেমে এল সে, উদ্দেশ্য পুড়িয়ে ছাই করে দেবে শহরটা।

কাঠ আর খড় দিয়ে তৈরি বাড়িগুলো জ্বলে উঠল এবার, স্মগের ক্রোধের সামনে কেউ যেন রেহাই পাবে না। আগুন জ্বলে ওঠার সাথে সাথে বালতি বালতি পানি ছিটানো হচ্ছে তার উপর, কিন্তু স্মগ যেন অপ্রতিরোধ্য। বিশাল ডানায় ভর দিয়ে শহরের এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে সে, প্রতিটা বাড়িকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা। ক্রোধের আতিশয্যে এমনকি নিজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল জায়গা বুক আর পেটও শহরের উল্টো দিকে ফিরিয়ে রাখতে ভুলে গেছে। বিশাল লেজের এক ঝাপটা মেরে শহরের হলঘরটা হ্রদের তলায় পাঠিয়ে দিল সে, যেখানে ভোজসভায় অংশ নিয়েছিল অভিযাত্রীরা। আবার নেমে এল সে, আবার, আর প্রতিবারে নতুন করে ক্ষত সৃষ্টি করল শহরের বুকে।

ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে শহরের বাসিন্দাদের মাঝে। এখনও প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে পুরুষরা, কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না তাতে। নারী আর শিশুদের নৌকাগুলোয় নামিয়ে দেয়া হচ্ছে, যাতে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারে তারা। শহরের মেয়র সবার অলক্ষ্যে একটা নৌকায় সটকে পড়ার তালে আছে, নিজের সোনাদানা আর টাকাপয়সা নিয়ে নৌকায় তুলছে সে।

উপর থেকে সবই দেখতে পাচ্ছে ড্রাগনটা, এমনকি নৌকা নিয়ে শহরের অধিবাসীদের সরে পড়ার দৃশ্যও তার চোখ এড়াল না। কিন্তু তাতে আরও খুশি হয়ে উঠল সে, ঠিক করল শহরটাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার পর লেকের পানিতে এক এক করে খুঁজে বের করে মারবে লোকগুলোকে। দারুন মজার একটা খেলা হবে সেটা!

পোড়া শহরের মাঝে এক দল তীরন্দাজ এখনও প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের নেতা বার্ড, যাকে অশুভ কথা বলার জন্য ভর্ৎসনা করছিল শহরের অধিবাসীরা। তবে তার সাহস আর শক্তি কারও অবিদিত নয়। ডেল শহরের শাসনকর্তা গিরিয়নের রক্ত বইছে তার শরীরে। তীর শেষ হয়ে আসছে তার তূনে, কিন্তু এ পর্যন্ত একটা তীরও ড্রাগনের শক্ত চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢোকাতে পারেনি সে। তার সঙ্গীরা হাল ছেড়ে দিয়ে পালাতে শুরু করেছে, কিন্তু প্রতিজ্ঞায় কঠোর হয়ে আছে তার চোখ মুখ। কিছুতেই হাল ছাড়বে না সে, মরার আগ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাবে!

শহরের শেষ মাথা থেকে আবার এদিকে ফিরে আসছে স্মগ। তূনের শেষ তীরটা বের করে আনল বার্ড, ছিলায় পরিয়ে এক টানে নিয়ে এল কানের কাছে। ছুঁড়তে যাবে, এই সময় তার কাঁধে একটা পাখি এসে বসল। চমকে উঠল বার্ড, তারপর দেখল, একটা থ্রাশ পাখি এসে বসেছে তার কাঁধে। উড়ে গেল না পাখিটা, বরং বার্ডকে চমকে দিয়ে তার কানে কানে কথা বলে উঠল। গিরিয়নের বংশধর সে, ফলে থ্রাশটার কথা বুঝতে কোন অসুবিধা হল না তার।

‘দাঁড়াও!’ বলল পাখিটা। ‘চাঁদ উঠেছে আকাশে। ড্রাগনটার বুকের বামপাশে একটা নরম চামড়ার আস্তরন আছে, ঠিক ওই জায়গায় লাগাতে হবে তীরটা! একমাত্র তাহলেই ওকে খুন করা সম্ভব।’ বিস্মিত বার্ডের কানে পাহাড়ে কি কি ঘটেছে সংক্ষেপে জানাল পাখিটা।

ততক্ষণে বার্ডের কাছাকাছি চলে এসেছে ড্রাগনটা, সাবধানে লক্ষ্যস্থির করল বার্ড। আর মাত্র একবার সুযোগ পাবে সে তীর মারার, ব্যর্থ হলে কি হবে সেই চিন্তাটা জোর করে সরিয়ে রাখছে মাথা থেকে। আলতো করে ছেড়ে দিল সে তীরটা, টঙ্কার উঠল ধনুকের ছিলায়। কুচকুচে কাল রঙের তীরটা তীব্রবেগে বেরিয়ে গেল ধনুক থেকে, সোজা ছুটল ড্রাগনটাকে লক্ষ্য করে। বামদিকের ডানাটা যেখানে ড্রাগনের শরীরের সাথে মিলিত হয়েছে, তার ঠিক উপরে খসে পড়েছে এক টুকরো আঁশ, ছোট্ট একটা গর্তের সৃষ্টি হয়েছে ড্রাগনের পুরু চামড়ায়। ঠিক সেই ফুটোটায় গিয়ে ঢুকল তীরটা, পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল ভেতরে। কান ফাটানো আর্তনাদ বেরিয়ে এল স্মগের গলা চিরে, আরও কয়েকটা বাড়ির দফারফা করে শহরের উপর আছড়ে পড়ল স্মগের পাহাড়ের মত বিশাল শরীরটা।

মরণযন্ত্রনায় মুচড়ে উঠল স্মগের শরীর, শক্তিশালী ডানা আর লেজের ঝাপটায় চারদিকে সমান হয়ে গেল সবকিছু। গর্জন উঠল লেকের পানিতে, বাস্পের ঘন মেঘে ঢেকে গেল চারদিক। ঘড়ঘড় শব্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল স্মগ, অটুট নীরবতা নেমে এল হঠাৎ করে লেক-টাউনের বুকে।

এতক্ষণ যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছিল, হঠাৎ করেই আবার বইতে শুরু করল কনকনে ঠান্ডা বাতাস। সে বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গেল বাস্পের মেঘ,  ধীরে ধীরে শোনা গেল আকস্মিক ভাবে স্বজন আর সহায় হারানো মানুষগুলোর কান্নাকাটির শব্দ। তবে সবকিছুর পরেও বলতে হবে যে ক্ষয়ক্ষতি কমই হয়েছে। শহরের চার ভাগের তিন ভাগ মানুষ বেঁচে গেছে, তাদের বেশিরভাগ ফসলের ক্ষেত, গবাদিপশু আর অন্যান্য যেসব সম্পত্তি ছিল হ্রদের তীরে সেগুলোও অক্ষত আছে এখনও। আর সবকিছুর উপরে, মারা পড়েছে ড্রাগনটা!

ধীরে ধীরে শহরের মাঝে জড়ো হতে শুরু করল মানুষগুলো, বিপর্যয়ের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠছে আস্তে আস্তে, শীতে কাঁপছে কেউ কেউ। প্রথমেই তাদের সব রাগ গিয়ে পড়ল শহরের মেয়রের উপর, কারন বিপদের সময় কাপুরুষের মত সবার আগে নিজের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছে সে। সেই সাথে বার্ডের প্রশংসাও ভাসছে সবার মুখে, তীর ছুঁড়ে ড্রাগনটাকে হত্যা করার দৃশ্য অনেকেই দেখেছে।

‘আমাদের মেয়র কোন কাজেরই যোগ্য নয়, শুধু পয়সার হিসেব বাদে,’ বলল কেউ একজন। ‘আফসোস, বার্ড বেঁচে থাকলে তাকেই আমাদের নেতা বানাতাম! গিরিয়নের বংশধর, ড্রাগন-শিকারী বার্ড হত এই শহরের মেয়র।’

সেই মূহুর্তে তাদের মাঝে এসে দাঁড়াল স্বয়ং বার্ড। সারা গা ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে তার, লম্বা কাল চুলের আড়ালে জ্বলছে দুই চোখ। ‘মরিনি আমি,’ বলল সে। ‘ড্রাগনটা শহরের উপর আছড়ে পড়ার আগেই পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সবাই জেনে রাখ, আমিই সেই বার্ড, গিরিয়নের বংশধর, আর ড্রাগনের হত্যাকারী!’

মূহুর্তে তার জয়ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠল চারদিক। শুধু একজন গলা মেলাল না সবার সাথে, সে হল শহরের মেয়র স্বয়ং।

‘গিরিয়ন ছিল ডেলের শাসনকর্তা, এই শহরের নয়,’ বলল সে। ‘বার্ডের যদি রাজা হওয়ার শখ হয়ে থাকে তবে ডেলে চলে যাক সে, সাথে করে নিয়ে যাক তার অনুসারীদের। লেক-টাউনের শাসনকর্তা হতে হলে শুধু যুদ্ধবিদ্যা নয়, আরও অনেক গুনের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। বার্ডের ভিতর তা আছে বলে আমি মনে করি না।’

প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল জনতা। ‘তোমার মত অর্থলোভী পিশাচ দরকার নেই আমাদের!’ চেঁচিয়ে উঠল তারা, এমনকি কেউ কেউ স্লোগান দিয়ে উঠল, ‘তীরন্দাজ বার্ডের জয় হোক! লোভী মেয়র নিপাত যাক!’

মেয়র দেখতে পেল, অবস্থা সুবিধার নয়। শহরের সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গেছে, বার্ডের বিরুদ্ধে কথা বললে এদের শুধু আরও ক্ষেপিয়ে তোলা হবে। তাড়াতাড়ি কথার সুর বদলালো সে, অভিযোগের সুরে বলল, ‘তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাচ্ছ। কিন্তু ভেবে দেখ তো, তোমাদের এই দুর্দশার জন্য কারা দায়ী? কারা জাগিয়ে তুলেছে ঘুমন্ত ড্রাগনটাকে? ওই বামনগুলো। আমাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে ওরা এই শহরের উপর বিপর্যয় নামিয়ে নিয়ে এসেছে, আমাদের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে দামি সব উপহার। এখন কি দিয়ে এই বিপদের ক্ষতিপূরন দেব আমরা?’

শুধু টাকাপয়সার হিসেব নয়, ধূর্ত বুদ্ধিতেও মেয়রের জুড়ি মেলা ভার। এমনি এমনি এ শহরের মেয়র পদে বসেনি সে। তার চতুর কথার গুনে সাথে সাথেই লেক-টাউনের অধিবাসীদের রাগ গিয়ে পড়ল থোরিন আর তার দলবলের উপর। জনতার মাঝ থেকে তাদের নামে শাপ-শাপান্ত উচ্চারিত হতে লাগল, এমনকি যারা জোরগলায় তাদের নামে বড়াই করে বেড়াচ্ছিল তারাই সবচেয়ে বেশি বদনাম গাইতে লাগল।

‘বোকার দল!’ বার্ড বলে উঠল হঠাৎ, থেমে গেল জনতার অভিশাপ বর্ষণ। বার্ড বলে চলল, ‘ওই দুর্ভাগা অভিযাত্রীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ড্রাগনের আগুনে হয়তো ওরাই সবার আগে পুড়ে মরেছে।’ তারপর হঠাৎ করেই মেয়রের কথাগুলো মনে পড়ল তার। সত্যিই তো, ড্রাগন যদি মরে গিয়ে থাকে তবে ওই বিশাল সম্পদের মালিক কে হবে? মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল সে, যারা তাকে সমর্থন করছে তাদের নিয়ে ডেল শহর আবার গড়ে তুলবে সে, সেখানে হবে তাদের নতুন আবাস।

‘আমাদের সামনে অনেক কাজ পড়ে আছে,’ বলল বার্ড। ‘শহরটা পুনরায় গড়ে তুলতে হবে আমাদের।’ সব কিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল সে, আহতদের শুশ্রূষার ব্যবস্থা করল, গৃহহীনদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করল। সবাইকে জানানো হল যে মেয়রের নির্দেশেই এ কাজের ভার নিয়েছে সে।

বার্ড আর শহরবাসীর আন্তরিক প্রচেষ্টার পরও হয়তো পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে আহতদের মধ্যে অনেকেই মারা যেত, অসুস্থ হয়ে পড়ত জীবিতদের মধ্যে প্রচুর মানুষ। শীত আসছে সামনে, এই আবহাওয়ায় খোলা পরিবেশে থাকতে বাধ্য হলে তেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু হ্রদের তীরবর্তী জঙ্গলের ওপাশে বসবাস করা উড-এলফদের রাজার কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তাবাহক পাঠাল বার্ড, দ্রুতই এসে পৌছাল সাহায্য। এলফ রাজা তার নিজের গুপ্তচর আর সংবাদবাহকদের মাধ্যমে প্রায় সাথে সাথেই স্মগের আক্রমণের কথা জানতে পেরেছেন। পাখিদের মাঝেও বার্তাবাহক আছে তার, স্মগের মৃত্যুতে বিশাল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে তাদের মাঝে। লেক-টাউনের উপর ভীড় করে উড়ছে তারা, সংবাদ নিয়ে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন দিকে। তাদের বদৌলতে মার্কউডের প্রত্যেকটা প্রান্তে বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে পড়ল খবরটাঃ স্মগ মৃত! এমনকি কুয়াশা পর্বতমালার পাদদেশে বসবাসকারী বিয়র্ন বা আরও দূরের গবলিনদের কানেও পৌঁছে গেল খবরটা।

‘মনে হচ্ছে থোরিন ওকেনশিল্ডের শেষ অধ্যায় রচিত হয়েছে স্মগের গুহায়,’ ভাবলেন এলফ রাজা। ‘আমার অতিথি হয়ে থাকলেই ভাল করত সে!’ তবে বিশাল ধন সম্পদের অরক্ষিত ভাণ্ডারের কথা তিনিও জানতে পেরেছেন। সাথে সাথে এলফ সেনাবাহিনী নিয়ে সেদিকে রওনা দিলেন তিনি, আর পথেই তার সাথে দেখা হল বার্ডের বার্তাবাহকদের। তাদের কাছ থেকে লেক-টাউনের দুরবস্থার কথা শুনলেন তিনি। দয়া হল তার, সেনাবাহিনীর মুখ ঘুরিয়ে হ্রদের দিকে মার্চ করার নির্দেশ দিলেন তিনি। তার নির্দেশে আগেই নদীপথে নৌকা দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হল প্রয়োজনীয় খাবার আর অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী। স্মগের মৃত্যুর ঠিক পাঁচ দিন পর লেক-টাউনে এসে উপস্থিত হল তার সেনাবাহিনী। শহরের লোকজন সাদরে তাদের সাহায্য গ্রহণ করল।

এলফ রাজার পরামর্শে খুব দ্রুত ঠিক করে ফেলা হল পরবর্তী কর্মপন্থা। নারী, শিশু আর আহতদের নিয়ে শহরে রয়ে গেল মেয়র, তার সাথে রইল নানা কাজে দক্ষ বহু সংখ্যক এলফ। হ্রদের তীর থেকে গাছ কেটে আনল তারা, সেগুলোর সাহায্যে আসন্ন শীতের মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে হ্রদের তীরে বেশ কিছু কাঠের বাড়ি তৈরি করা হল। সেই সাথে মেয়রের নির্দেশনায় আগের চাইতেও বড় আর সুপরিকল্পিত ভাবে শুরু হল নতুন লেক-টাউন তৈরির কাজ। তবে আগের জায়গায় নয়, হ্রদের তীরে তৈরি করা হবে এবার শহরটা। পুরনো শহরটা যেখানে ছিল সেখানে এখনও পড়ে আছে স্মগের প্রকাণ্ড মৃতদেহ। কিন্তু বহুকাল পরেও ওদিকটায় যেতে চাইত না কেউ, দূর থেকে কেবল দেখা যেত স্মগের বিরাট কঙ্কালটা।

সক্ষম এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী যেসব পুরুষরা ছিল বার্ডের নেতৃত্বে এলফ রাজার সেনাবাহিনীর সাথে যাত্রা শুরু করল তারা, উদ্দেশ্য স্মগের বাসস্থান সেই নিঃসঙ্গ পর্বত। লেক-টাউন ধ্বংস হওয়ার ঠিক এগারো দিন পর লেকের সীমানা পেরিয়ে স্মগের চিহ্নিত এলাকায় প্রবেশ করল তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *