ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – পঞ্চদশ অধ্যায়

এবার আমরা আবার ফিরে যাব বিলবো আর বামনদের কাছে। সারা রাত পাহাড়ের উপর পাহারায় কাটিয়েছে তারা, কিন্তু সকাল হওয়ার পরেও বিপদের কোন চিহ্ন দেখতে পায়নি। তবে অসংখ্য পাখি উড়ে আসছে দক্ষিণ দিক থেকে, গতকাল সন্ধ্যায় দেখতে পাওয়া পাখির ঝাকের সাথে মিলিত হচ্ছে তারা। সেই সাথে মাথার উপর উড়ে বেড়াচ্ছে একদল কাক, কর্কশ শব্দে চিৎকার করছে তারা।

‘অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে ওখানে,’ বলল থোরিন। ‘চিল আর শকুনের মত পাখিও দেখতে পাচ্ছি আমি ওই ঝাঁকে, মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধ চলছে জায়গাটায়!’

হঠাৎ করে বিলবো দেখল, সেই থ্রাশ পাখিটা ফিরে এসেছে আবার। তাদের দিকে উড়ে এল পাখিটা, একটা পাথরের উপর বসল। ডানা ঝাড়া দিয়ে সুরেলা গলায় ডেকে উঠল একবার, ঘাড় কাত করে তাদের দিকে চাইল, তারপর আবার ডাক দিল।

‘মনে হচ্ছে আমাদের কিছু একটা বলতে চাইছে পাখিটা,’ বলল বেলিন। ‘তবে ওর ভাষা বুঝতে পারছি না আমি। থ্রাশের বদলে একটা দাঁড়কাক হলে ভাল হত।’

‘আমি ভেবেছিলাম দাঁড়কাক পছন্দ কর না তুমি!’ অবাক হয়ে বলল বিলবো।

‘আমি কাক পছন্দ করি না। ওদের স্বভাব খুব নোংরা, আর নিচু। কিন্তু দাঁড়কাকের কথা আলাদা। আমরা যখন এখানে থাকতাম তখন ওদের সাথে বন্ধুত্ব ছিল আমাদের, আমাদের নানারকম খবর এনে দিত ওরা, পুরস্কার হিসেবে পেত মূল্যবান পাথর। ওরা অনেকদিন বাঁচে, আর স্মৃতিশক্তিও প্রখর। বংশানুক্রমে নিজেদের জ্ঞান বংশধরদের জানিয়ে যায় ওরা। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন দাঁড়কাকদের অনেকের সাথেই পরিচয় ছিল আমার। তাদের ভিতর বিশেষ করে বলতে হয় দুজনের কথা, বুড়ো দাঁড়কাক কার্ক আর তার সঙ্গিনী। তবে এখন তাদের কেউ এখানে আছে বলে মনে হয় না।’

বেলিনের কথা শেষ না হতেই আরেকবার ডেকে উঠল থ্রাশ পাখিটা, তারপর উড়ে চলে গেল।

‘আমরা হয়তো ওর কথা বুঝতে পারিনি, তবে আমাদের কথা ঠিকই বুঝতে পেরেছে পাখিটা,’ বলল বেলিন। ‘দেখ এবার কি ঘটে!’

একটু পরেই ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ শোনা গেল, ফিরে এসেছে থ্রাশ পাখিটা। আর তার সাথে এসেছে একটা বুড়ো পাখি, পালক জীর্ন হয়ে এসেছে তার। মাথার উপরটা টাক। একটা দাঁড়কাক। দেখে বোঝা যায় অনেক বয়স হয়েছে তার। আড়ষ্ঠ ভঙ্গিতে মাটিতে নেমে বসল সে, তারপর তাকাল থোরিনের দিকে।

‘থ্রেইনের সন্তান থোরিন, এবং ফান্ডিনের সন্তান বেলিন,’ বলে উঠল পাখিটা। ‘আমি হচ্ছি রাক, কার্ক ছিল আমার পিতা। সে মারা গেছে, তবে তার আগে তোমাদের কথা বলে গেছে আমাদের। একশ তিপ্পান্ন বছর বয়স হয়েছে আমার, তবে তোমাদের কথা ভুলিনি আমি। এই পাহাড়ে বসবাসকারী দাঁড়কাকদের নেতা আমি, তবে এখন এখানে কেউ নেই তারা। দক্ষিণে গেছে সবাই, নানা খবর আসছে সেদিক থেকে। তবে সবচেয়ে বড় খবর যেটা তা হচ্ছে, মারা গেছে স্মগ!

‘মারা গেছে? মারা গেছে?!’ অবিশ্বাসে চেঁচিয়ে উঠল অভিযাত্রীরা। ‘তারমানে এতক্ষণ শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিলাম আমরা!’

‘হ্যা, মারা গেছে সে।’ বলল রাক। ‘তোমাদের সামনে যে থ্রাশ পাখিটা বসে আছে স্মগের মৃত্যুর সাক্ষী সে। অ্যাজ থেকে তিন রাত আগে এসগারথের লোকজনের সাথে লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছে সেই ড্রাগনটা।’

উল্লসিত, উত্তেজিত বামনদের হইচই থামাতে থোরিনকে বেশ বেগ পেতে হল। রাকের কাছ থেকে যুদ্ধের পুরো বর্ণনা শুনল সে।

‘এখন তোমার আনন্দের সময়, থোরিন ওকেনশিল্ড। অবশেষে নিজের ঘরে ফিরতে পারছ তুমি, পাহাড়ের নিচে ওই বিশাল সম্পদের পাহাড় এখন তোমার, অন্তত এখন পর্যন্ত। কারন ড্রাগনের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে দূর-দূরান্তে, তার রেখে যাওয়া সম্পদে ভাগ বসাতে চায় এমন লোকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এলফদের বিশাল এক বাহিনী ইতোমধ্যেই পথে নেমেছে, এদিকেই আসছে তারা। তাছাড়া লেক-টাউনের লোকদের ধারনা তাদের শহরের উপর নেমে আসা ড্রাগনের ক্রোধের জন্য তোমরাই দায়ী। পাহাড়ের সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ চায় তারা।

‘তোমার বিবেচনার উপর পরিপূর্ণ আস্থা আছে আমার, কিন্তু সংখ্যায় মাত্র তেরো জন তোমরা। যদি আমার পরামর্শ চাও তবে বলব যে লেক-টাউনের মেয়রকে বিশ্বাস কোরো না, একমাত্র যার তীরে মারা গেছে স্মগ সেই তোমার বিশ্বাসের উপযুক্ত। তার নাম বার্ড, ডেলের রাজা গিরিয়নের বংশধর সে। মানুষ, এলফ আর বামনদের ভেতর হয়তো শান্তি নেমে আসবে এক সময়, কিন্তু তার দাম চুকাতে হবে তোমার সম্পদ দিয়ে। আর কিছু বলার নেই আমার।’

রাগে ফেটে পড়ল থোরিন। ‘কোন চোরকে ওই গুহার এক টুকরো সোনাও নিতে দেব না আমি!’ ঘোষনা করল সে। ‘এদিকে কাউকে আসতে দেখলে তা আমাকে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব, সেই সাথে আরও খুশি হব যদি তোমাদের মাঝে শক্তিশালী কাউকে উত্তরের পাহাড়ে পাঠাও। আমাদের স্বজনরা থাকে সেখানে। আমাদের বিপদের কথা জানাও তাদের। আয়রনহিলে থাকে আমার ভাই ডেইন, বিশাল সেনাবাহিনী আছে তার অধীনে, থাছাড়া এখান থেকে সবচেয়ে কাছে তার বাস। সবকিছু জানাও তাকে, তাড়াতাড়ি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে বল।’

‘তুমি যা করতে চাইছ তা ভাল হবে না খারাপ আমি জানি না,’ বলল রাক। ‘তবে আমি দেখব কি করা যায়।’ বলে উড়ে চলে গেল সে।

‘পাহাড়ে ফিরে চল সবাই,’ তাড়া দিল থোরিন। ‘হাতে সময় খুব বেশি নেই।’

অনিচ্ছাসত্বেও সবার সাথে উঠে দাঁড়াল বিলবো। খাবার ফুরিয়ে এসেছে, খিদেয় কষ্ট করার কোন ইচ্ছে নেই তার। তাছাড়া তার মনে হচ্ছে অভিযানের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে তারা, ড্রাগনের মৃত্যুর সাথে সাথে তার কাজও ফুরিয়েছে। এখন যদি ভালয় ভালয় নিজের বাড়িতে ফিরতে পারে সে তবে সেটাই অনেক বড় পাওয়া, তার জন্য এমনকি নিজের ভাগের ধনরত্ন দিয়ে দিতেও আপত্তি নেই তার।

এবার পাহাড়ের নিচে ছড়ানো গুহার জাল আর পথগুলো পর্যবেক্ষনে নামল অভিযাত্রীরা। দেখা গেল একমাত্র প্রধান দরজাটা বাদে আর সব প্রবেশপথই বন্ধ করে দিয়েছে ড্রাগনটা, আর কোন চিহ্ন নেই সেগুলোর। সুতরাং এবার সদর দরজাটা সুরক্ষিত করার কাজে লেগে গেল সবাই। পাহাড়ের নিচে শ্রমিকদের ব্যবহৃত নানারকম যন্ত্রপাতি পাওয়া গেল, সেগুলো ব্যবহার করা হল এবার।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়কাকদের কাছ থেকে পাওয়া খবরে জানা গেল, এলফ রাজা তার সেনাবাহিনীর মুখ ঘুরিয়ে লেক-টাউনের দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। তার মানে আরও একটু সময় পাওয়া গেল। আরও জানা গেল যে তাদের পালিয়ে যাওয়া ঘোড়াগুলোর ভেতর তিনটে ঘোড়াকে এখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে দেখা গেছে। ফিলি আর কিলিকে পাঠানো হল সেগুলোকে নিয়ে আসতে।

চার দিন কেটে গেল। লেক-টাউনের অধিবাসীরা এলফ রাজার সাথে মিলিত হয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে, সে খবরও জানা গেছে দাঁড়কাকদের মারফত। কিন্তু তাতে হতাশ হতে দেখা গেল না কাউকে, কারণ সাথে এখনও যে খাবার আছে তাতে আগামী কয়েক সপ্তাহ চলে যাবে। যদিও খাবারের বেশিরভাগই হচ্ছে ক্র্যাম, লেক-টাউন থেকে নিয়ে আসা বিস্কুটের মত এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদী বিস্বাদ খাবার। তবে একেবারেই কিছু না থাকার চেয়ে ক্র্যাম খাওয়া অনেক ভাল। ওদিকে ভারি পাথর ফেলে ব্যারিকেড দেয়া হয়েছে প্রধান ফটকের সামনে। ব্যারিকেডের নিচ দিয়ে নদীটা বের হওয়ার জন্য নিচু একটা মুখ রাখা হয়েছে, তবে সেখান দিয়ে ভেতরে ঢোকার উপায় নেই।

তারপর এক রাতে হঠাৎ করে নদীর ওপাশে ডেল শহরের ধ্বংসস্তুপের মাঝে জ্বলে উঠল আলো।

‘চলে এসেছে ওরা!’ বলে উঠল বেলিন। ‘আলো দেখে মনে হচ্ছে সংখ্যায় অনেক!’

সে রাতে বামনদের ঘুম হলই না বলতে গেলে। পরদিন কাকভোরে তারা দেখতে পেল ছোট্ট একটা দল এগিয়ে আসছে পাহাড়ের দিকে। প্রধান ফটকের সামনে গড়ে তোলা পাথরের প্রাচীরের পেছন থেকে তাদের দিকে চোখ রাখল তারা। কাছাকাছি আসার পর দেখা গেল এলফ আর মানুষ-উভয়েই আছে সেই দলে, সবাই যুদ্ধসাজে সজ্জিত। প্রাচীরের সামনে আসতে বোঝা গেল হঠাৎ করে এই নতুন গড়ে তোলা ব্যারিকেড দেখে বেশ আশ্চর্য হয়েছে তারা।

এবার প্রাচীরের উপর থেকে থোরিন কথা বলে উঠল। ‘কারা তোমরা?’ উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করল সে, ‘এই পাহাড় এবং আশেপাশের এলাকার রাজা আমি, থ্রেইনের সন্তান থোরিন। কি তোমাদের উদ্দেশ্য?’

কিন্তু কোন জবাব এল না। দলের ভেতর থেকে কয়েকজন ফিরে গেল সাথে সাথে, বাকিরাও ধীরে ধীরে তাদের অনুসরণ ক্করল। সেই দিন ডেল শহরের মাঝ থেকে ক্যাম্প সরিয়ে আনল আগন্তুকরা, পাহাড়ের ঠিক সামনেই নতুন করে ক্যাম্প করল তারা। রাতে তাদের কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা আর গানের আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠল জায়গাটা। বিলবোর মনে হতে লাগল এই ঠান্ডা, অন্ধকার গুহা ছেড়ে এক দৌড়ে তাদের মাঝে উপস্থিত হয়। বামনদের কয়েকজনের মাঝেও চাঞ্চল্য দেখা গেল, কিন্তু থোরিনের ভ্রুকুটির সামনে কেউ কিছু বলার সাহস পেল না।

অগত্যা গুহার ভেতর থেকে হার্প আর অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এল বামনরা, তারপর নিজেরাই সেগুলো বাজিয়ে গান শুরু করল। যদিও তা এলফদের মত সুন্দর হল না, তবে থোরিনের মেজাজ কিছুটা ভাল হল তাতে। আয়রনহিলের দূরত্ব হিসেব করতে বসল সে, দেখছে যে ডেইন তার দলবল নিয়ে কতদিনের ভেতর আসতে পারবে।

পরদিন ভোরে একদল বর্শাধারী সৈন্যকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল নদী পেরিয়ে, এদিকেই আসছে তারা। এলফদের সবুজ আর লেক-টাউনের নীল রঙের পতাকা বহন করছে তারা। ঠিক গুহার দরজার সামনে এসে থামল ছোট্ট সেনাদলটা।

গতকাল যে প্রশ্ন করেছিল থোরিন অ্যাজ সেই একই প্রশ্ন আবার করল সে। তবে আজ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল।

দলটা থেকে দীর্ঘদেহী, গম্ভীর চেহারার এক লোক বেরিয়ে গেল। ‘থোরিনের জয় হোক!’ প্রশ্নের উত্তরে বলল সে। ‘কিন্তু নিজেদের এভাবে বন্দী করে রেখেছ কেন তোমরা, যেভাবে ডাকাতরা তাদের লুন্ঠিত সম্পদ আগলে বসে থাকে? আমাদের মাঝে এখন পর্যন্ত কোন শত্রুতা নেই, তোমাদের জীবিত দেখতে পেয়ে অত্যন্ত খুশি হয়েছি আমরা। তাহলে কেন নিজেদের আলাদা করে রেখেছ?’

‘কারা তোমরা, আর কেন এসেছ এখানে?’ প্রশ্ন করল থোরিন।

‘আমি বার্ড, ডেলের শাসনকর্তা গিরিয়নের রক্ত বইছে আমার শরীরে। স্মগ নামের ওই ভয়ঙ্কর ড্রাগনটাকেও আমিই মেরেছি, যার ফলে নিজের সম্পদ ফিরে পেয়েছ তুমি। আর ওই সম্পদে ডেল শহরের অনেক অমূল্য ধনরত্নও মিশে আছে, যেগুলো চুরি করেছিল স্মগ। লেক-টাউনের মেয়রের প্রতিনিধিত্ব করছি আমি এখানে। মরার আগে লেক-টাউনকে হ্রদের পানিতে মিশিয়ে দিয়ে গেছে স্মপ, আশ্রয় আর স্বজন হারিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের অবস্থা এখন শোচনীয়। আমরা এটাই বলতে চাই যে ওই সম্পদ তোমার একার নয়, অনেকের অধিকার আছে তাতে। তোমাদের দুরবস্থায় যারা সাহায্য করেছিল, এখন তাদের বিপদে কি মুখ ফিরিয়ে নেবে তোমরা?’

কথাগুলো একেবারেই মিথ্যে নয়, বরং অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত। বিলবোর ধারনা হল বার্ডের প্রস্তাব এক কথায় মেনে নেবে থোরিন। কিন্তু গত কয়েকদিন দীর্ঘ সময় গুহার ভেতর কাটিয়েছে স্মগ, ড্রাগনের দখলে থাকা বিশাল ধনরত্নের স্তূপ ইতোমধ্যেই লোভের ছায়া ফেলেছে তার মনে। ড্রাগনের মায়াজাল বিস্তৃত হয়েছে ওগুলোর উপর, যেই ওর সংস্পর্শে আসবে তার মাঝেই সবকিছু নিজের দখলে রাখার এক অদ্ভুত আকাঙ্খা জাগ্রত হবে। অনেক বদলে গেছে থোরিন এই কয়েক দিনে, কতটা সে নিজেও জানে না।

‘ভুল করছ তোমরা,’ জবাব দিল থোরিন। ‘এই সবই আমার পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পদ, উত্তরাধিকার সূত্রে এগুলোর একমাত্র মালিক আমি, আর কারও অধিকার নেই এতে। স্মগ জোর করে দখল করেছিল এই সম্পদ, তাতে এগুলো তার হয়ে যায়নি। সুতরাং তার ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতিপূরণ যে এখান থেকে দেওয়া যাবে এ কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। লেক-টাউনের যারা আমাদের সাহায্য করেছিল তাদের উপযুক্ত মূল্য অবশ্যই চুকিয়ে দেব আমরা, এবং তা যথা সময়ে। কিন্তু একটা পয়সাও কাউকে জোর করে নিয়ে যেতে দেব না আমি এখান থেকে। যতক্ষণ তোমরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমার দরজার সামনে অবস্থান করছ, ততক্ষণ আমার কাছে তোমরা শত্রু ছাড়া আর কিছুই নও। তাছাড়া একটা প্রশ্নের জবাব দাও, এখানে এসে তোমরা যদি দেখতে যে আমরা মারা পড়েছি, আর এই বিশাল সম্পদ উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, তাহলে অন্যান্য বামনদের কতটুকু ভাগ দিতে তোমরা?’

‘যুক্তি আছে তোমার প্রশ্নে, সন্দেহ নেই,’ বলল বার্ড। ‘কিন্তু জীবিত আছ তোমরা, সেটাই বড় কথা। আর আমরাও ডাকাতি করতে আসিনি। তবে এটুকু বলতে পারি যে তেমন কোন পরিস্থিতিতে আমরা সেই কাজটাই করতাম যেটা যে কোন বিবেকবান ব্যক্তির করা উচিত। কিন্তু আমার বাকি প্রশ্নগুলোর জবাব দাওনি তুমি।’

‘আমি আবার বলছি, যতক্ষণ আমার দরজায় সশস্ত্র সেনাবাহিনী অবস্থান করছে ততক্ষণ কোন আলোচনায় বসতে রাজি নই আমি। তাছাড়া এলফ রাজার প্রতিও আমার কোন সহানুভূতি নেই। আমার কথা শেষ। আবার আমার সাথে কথা বলতে আসার আগে এলফদের জঙ্গলে ফেরত পাঠাতে হবে তোমাদের, সেই সাথে নিরস্ত্র অবস্থায় আসতে হবে এখানে। আর এখন, এই মূহুর্তে চলে যাও তোমরা, নাহলে আমার তীরন্দাজরা তীর ছুঁড়বে তোমাদের উপর!’

‘এলফ রাজা আমাদের বন্ধু, লেক-টাউনের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন তিনি,’ জবাব দিল বার্ড। ‘এখন চলে যাচ্ছি আমরা, তবে আবার আসব। ভেবে দেখ তোমার কথা ফিরিয়ে নেবে কিনা!’ বলে চলে গেল তারা।

কেটে গেল আরও কয়েক ঘন্টা। তারপর পতাকাবাহকরা ফিরে এল আবার। ট্রাম্পেট বাজিয়ে সামনে এগিয়ে এল একজন, তারপর ঘোষনা করলঃ

‘এসগারথ এবং মার্কউডের এলফদের পক্ষ থেকে থ্রেইনের সন্তান থোরিন ওকেনশিল্ডকে জানানো যাচ্ছে যে, হয় সে আমাদের দাবিগুলো মেনে নেবে, না হলে তাকে আমাদের শত্রু হিসেবে গন্য করব আমরা। আমাদের দাবি হচ্ছে, মোট সম্পদের বারো ভাগের এক ভাগ ড্রাগনের হত্যাকারী এবং গিরিয়নের বংশধর বার্ডের হাতে তুলে দেয়া হবে। নিজের ভাগ থেকে এসগারথের সাহায্যে বিতরন করবে বার্ড, তবে থোরিন যদি এসগারথের মিত্রতা চায় তবে নিজের ভাগ থেকে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে তাকে।’

কোন জবাব না দিয়ে একটা ধনুক তুলে নিল থোরিন, তারপর তীর ছুঁড়ল বার্তাবাহককে লক্ষ্য করে। তার হাতে ধরা ঢালে এসে বিঁধল তীরটা, মৃদু কাঁপছে।

‘এই যদি তোমার জবাব হয়ে থাকে, তবে জেনে রাখ, এই পাহাড়ের উপর অবরোধ ঘোষনা করছি আমরা! আমাদের দাবি না মেনে এখান থেকে কেউ বের হতে পারবে না! তোমাদের উপর আক্রমণ চালাব না আমরা, দেখি খাবারের বদলে শুধু সোনাদানা নিয়ে তোমরা কতদিন টিকতে পার!’ এই বলে চলে গেল তারা।

আবার গম্ভীর হয়ে উঠল থোরিন, তার ক্রুদ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে একটা কথাও বলার সাহস পেল না কেউ। বোম্বার, ফিলি আর কিলি ছাড়া বাকিদের মনোভাবও অনেকটা একই রকম বলেই মনে হল বিলবোর কাছে। পুরো ব্যাপারটা অবশ্য একটুও পছন্দ হয়নি তার, এই পাহাড়ের ভিতর অবরুদ্ধ হয়ে বসে থাকার চাইতে যে কোন উপায়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া তার কাছে অনেক শ্রেয়। অগত্যা একটা পরিকল্পনা আঁটতে বসল সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *