ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – ষোড়শ অধ্যায়

দিন যেন আর কাটতে চায় না। সম্পদের পাহাড় গুছিয়ে রাখার কাজে নেমে পড়ল বামনরা, মূল্য এবং আকার অনুযায়ী ভাগ করে রাখছে। সেই সাথে খুঁজছে আর্কেনস্টোনটা, থোরিন পই পই করে বলে দিয়েছে জিনিসটা খুঁজে বের করার জন্য।

‘ওই মহামূল্যবান পাথরটা আমার, শুধু আমার!’ বলেছে সে। ‘যদি দেখি যে কেউ ওটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে তবে তার উপর চরম প্রতিশোধ নেব আমি!’

কথাগুলো শুনে বেশ ভয় পেয়েছে বিলবো, ঘুমানোর সময় বালিশ হিসেবে ব্যবহার করা একটা পুরনো কাপড়ের পুঁটলির ভেতর লুকিয়ে রাখা পাথরটা থোরিন পেয়ে গেলে কি করবে ভেবে অস্থির হয়ে উঠেছে। তবে একটা বুদ্ধি এঁটেছে সে, কয়েক দিন চিন্তা করে সেটাকে আরও একটু শানিয়ে নিল, তারপর কাজে নেমে পড়ল।

ওদিকে দাঁড়কাকরা খবর এনেছে, আয়রনহিল থেকে পাঁচশ বামন যোদ্ধা নিয়ে এদিকেই আসছে ডেইন, আর মাত্র দুই দিনের দূরত্বে আছে সে।

‘থোরিন, তুমি যা করতে যাচ্ছ তার ফলাফল কি হবে ভেবে দেখেছ?’ আড়ষ্ট গলায় বলল রাক, একটু আগেই এক দাঁড়কাক এসে জানিয়ে গেছে ডেইনের খবর। ‘ডেইনের সেনাবাহিনী যদি পাহাড়ের বাইরে অবরোধকারীদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তবে তার ফলাফল ভাল হবে না। অনেক ক্ষয়ক্ষতির পর ডেইন যদিওবা জিততে পারে, আসন্ন শীতে তোমরা রসদ পাবে কোথায়? এলফ আর লেক-টাউনের লোকদের কথা মেনে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হচ্ছে আমার।’

কিন্তু থোরিনের মাঝে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। ‘শীতে শুধু আমরা নয়, ওদেরও কষ্ট হবে,’ বলল সে। ‘খোলা জায়গায় শীতের মাঝে দিনের পর দিন একই সাথে ডেইনের সাথে যুদ্ধ আর অবরোধ চালিয়ে যেতে গেলে হয়তো নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে ওরা।’

সেই রাতে ছিল অমাবস্যা, চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিলবোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য উৎকৃষ্ট সময়। সন্ধ্যায় পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসার পর প্রধান ফটকের এক কোণায় সরে এল সে। এদিক ওদিক তাকিয়ে একবার দেখে নিল কেউ দেখছে কিনা, তারপর একটা দড়ি বের করে সেটার সাহায্যে উঠে এল উঁচু প্রাচীরের উপর। আর্কেনস্টোনটা আগেই একটা কাপড়ে জড়িয়ে পকেটে নিয়ে নিয়েছে। প্রাচীরের উপর তখন পাহারা দিচ্ছে বোম্বার।

‘খুব শীত পড়েছে!’ বিলবোকে দেখে বলল বোম্বার। ‘নিচের ক্যাম্পের মত এখানেও একটা আগুন জ্বালাতে পারলে ভাল হত।’

‘গুহার ভেতর বেশ গরম,’ বলল বিলবো।

‘তা ঠিক, কিন্তু মাঝ রাত পর্যন্ত এখানেই পাহারা দিতে হবে আমাকে,’ গজগজ করে উঠল মোটাসোটা বামন।

‘তুমি চাইলে তোমার দায়িত্বটা নিতে পারি আমি,’ বলল বিলবো। ‘গুহার ভিতর বসে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে গেছি, একটু খোলা বাতাস দরকার।’

খুশিমনে রাজি হয়ে গেল বোম্বার। ‘ভাল লোক তুমি, মিঃ ব্যাগিনস,’ বলল সে। ‘আমি তাহলে একটু ঘুমিয়ে নিই গিয়ে। কোন ঝামেলা দেখলে সবার আগে আমাকে জাগিও!’

‘ঠিক আছে। ঠিক মাঝরাতে তোমাকে ডেকে দেব আমি।’ বলল বিলবো।

বোম্বার চলে যাওয়ার সাথে সাথে জাদুর আংটি পরে নিল বিলবো, তারপর দড়িটা প্রাচীরের বাইরে ঝুলিয়ে দিয়ে সেটা বেয়ে নেমে এল নিচে। মধ্যরাতের এখনও পাঁচ ঘন্টার মত বাকি, এর ভিতর কাজ সারতে হবে তাকে।  ঠান্ডার ভেতর বামনদের কেউ প্রাচীরের উপর উঠবে সে সম্ভাবনাও নেই বললেই চলে, সুতরাং ঠিক সময় ফিরে আসতে পারলে ধরা পড়ার ভয় নেই তার।

প্রাচীরের বাইরে সরু পথটার উপর নেমে এল বিলবো, তারপর হাঁটতে শুরু করল ক্যাম্পটার উদ্দেশ্যে। বাইরে বয়ে গেছে নদীটা, অন্ধকারে গভীরতা কম এমন একটা জায়গা বেছে নিল বিলবো, তারপর নেমে পড়ল নদীতে। নদীর ওপারেই ক্যাম্প। ভালভাবেই পার হয়ে এল সে, কিন্তু অপর তীরের কাছাকাছি আসতেই ঘটল বিপত্তি। অন্ধকারে না দেখে একটা পিচ্ছিল পাথরের উপর পা দিতেই ধপাস করে পানিতে আছড়ে পড়ল সে, ঠান্ডা পানিতে ভিজে হি হি করে কেঁপে উঠল সাথে সাথে।

সেই মূহুর্তে কাছেই দেখা গেল মশালের আলো, শোনা গেল উত্তেজিত গলার আওয়াজ। শব্দটা শুনতে পেয়েছে এলফ প্রহরীরা, কি হয়েছে দেখতে আসছে তারা।

‘মাছ নয় ওটা, বাজি ধরে বলতে পারি,’ বলল কেউ একজন। ‘নিশ্চয়ই থোরিনের চাকরটা বেরিয়ে এসেছে, কোন  বদমতলব নিয়ে ঢুকেছে আমাদের ক্যাম্পে!’

‘চাকর? আমি?’ ভ্রূ কুঁচকে ভাবল বিলবো, তারপর হঠাৎ বিকট এক হাঁচি দিয়ে বসল সশব্দে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে এলফরা।

‘কে তুমি? কি চাও এখানে? আমাদের চোখ এড়িয়ে এত দূর কিভাবে আসলে?’ প্রশ্ন করল একজন।

‘আমি বিলবো ব্যাগিনস, থোরিনের সঙ্গী,’ বলল বিলবো। বার্ডের সাথে দেখা করতে চাই আমি।’

‘বার্ড? কি দরকার তার কাছে?’

‘সেটা তাকেই বলবো,’ রেগে উঠে জবাব দিল বিলবো। ‘এই মূহুর্তে তার কাছে নিয়ে চল আমাকে, তবে তার আগে একটা আগুনের ব্যবস্থা করলে ভাল হয়। তাড়াতাড়ি যেতে হবে আমাকে, হাতে সময় বেশি নেই।’

ঘন্টা দুয়েক পর দেখা গেল শুকনো কাপড় পরে একটা বড় অগ্নিকুণ্ডের সামনে বসে আছে বিলবো, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আছে বার্ড আর এলফ রাজা। এলফদের বর্ম পরিহিত কোন হবিটকে এর আগে দেখেনি তারা।

‘সত্যি কথা বলতে,’ যতটা সম্ভব ভারিক্কী গলায় বলতে শুরু করল বিলবো, ‘পরিস্থিতি এখন খুবই খারাপ। যা হচ্ছে তাতে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে খুবই বিরক্ত আমি। সবকিছু বাদ দিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারলে খুবই ভাল হত, কিন্তু এই সবকিছুতে আমার নিজেরও একটা অংশ আছে-সঠিকভাবে বলতে গেলে সম্পূর্ণ সম্পদের চৌদ্দ ভাগের এক ভাগ আমার প্রাপ্য।’ বলতে বলতে পকেট থেকে থোরিন এবং তার দলবলের পক্ষ থেকে তার কাছে লেখা চিঠিটা বের করে দেখাল সে।

‘ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের দাবিদাওয়া মেনে নিতে কোন আপত্তি ছিল না আমার। তবে থোরিন ওকেনশিল্ডকে আমি যতটা চিনি ততটা তোমরা কেউ চেন না। না খেয়ে মরে গেলেও তোমাদের এক কানাকড়িও দেবে না সে।’

‘তাহলে মরুক সে,’ বলল বার্ড। ‘না খেয়ে মরাই ওর উপযুক্ত শাস্তি।’

‘খারাপ বলনি কথাটা,’ বলল বিলবো। ‘কিন্তু শীত এগিয়ে আসছে, সেটাও মনে রাখতে হবে তোমাদের। তুষার পড়তে শুরু করবে কয়েকদিন পর, রসদের সরবরাহ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। তাছাড়া ডেইন আর তার বাহিনীর কথা কি শুনেছ তোমরা?’

‘ডেইনের নাম শুনেছি আমরা,’ বললেন এলফ রাজা। ‘কিন্তু এসবের সাথে তার কি সম্পর্ক?’

‘থোরিনের কাছ থেকে খবর পেয়েছে সে, পাঁচশ বামন যোদ্ধার এক বাহিনী নিয়ে এদিকে রওনা দিয়েছে সে। দুই-এক দিনের ভেতরেই পৌঁছে যাবে। তখন অনেক বড় সমস্যায় পড়বে তোমরা, চাও বা না চাও।’

‘সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাদের এসব কথা কেন বলছ তুমি? নিজের সঙ্গীদের গোপন খবর ফাঁস করে তোমার লাভ কি?’

‘আমি শুধু যুদ্ধ আর রক্তপাত এড়ানোর চেষ্টা করছি,’ গম্ভীর গলায় বলল বিলবো। ‘এখন শোন, তোমাদের একটা প্রস্তাব দিতে চাই আমি।’

‘কি প্রস্তাব?’ সমস্বরে প্রশ্ন করল বার্ড আর রাজা।

‘এই যে, এটা,’ বলে পকেট থেকে আর্কেনস্টোনটা বের করে সামনে এগিয়ে ধরল সে।

বিস্ময়ের অস্ফুট একটা শব্দ করে উঠে দাঁড়ালেন এলফ রাজা। বার্ডের মুখে কোন কথা নেই, হাঁ করে কেবল তাকিয়ে থাকল সে অপূর্ব সুন্দর পাথরটার দিকে। আগুনের আলোয় মনে হচ্ছে চাঁদ আর তারার আলো পুঞ্জীভূত করে তৈরি করা হয়েছে পাথরটা, আলো ঝলকাচ্ছে তার শরীর থেকে।

এই হল আর্কেনস্টোন,’ বিস্মিত রাজা আর বার্ডকে বলল বিলবো। ‘এমনিতেই মহামূল্যবান একটা পাথর এটা, কিন্তু থোরিনের কাছে একেবারে অমূল্য। তোমাদের এটা দিয়ে দিচ্ছি আমি, আশা করি থোরিনকে নমনীয় করতে সাহায্য করবে পাথরটা।’ তারপর এমনকি একবারও চোখের পাতা না ফেলে, নিষ্কম্প হাতে পাথরটা বার্ডের হাতে তুলে দিল বিলবো।

কিছুক্ষণ বড় বড় চোখে পাথরটার দিকে তাকিয়ে রইল বার্ড। তারপর অবশেষে বিস্ময় কাটিয়ে উঠে প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু এটা তোমার কাছে এল কিভাবে?’

‘বলতে পার যে এই অভিযানে অংশ নেয়ার বদলে আমার যে ভাগটা প্রাপ্য ছিল তার বদলে আর্কেনস্টোনটা নিয়েছি আমি,’ জবাব দিল বিলবো। ‘আমার ফেরার সময় হয়ে গেছে। আশা করি পাথরটা কাজে লাগাতে পারবে তোমরা।’ বলে উঠে দাঁড়াল সে।

এমনভাবে বিলবোর দিকে তাকিয়ে রইলেন এলফ রাজা যেন তাকে প্রথমবার দেখছেন তিনি। ‘বিলবো ব্যাগিনস,’ বললেন তিনি। ‘এলফদের বর্ম পরার জন্য বহু এলফ রাজপুত্রের চাইতেও অনেক বেশি যোগ্য তুমি! তবে থোরিন ওকেনশিল্ড তোমাকে কি করবে ভেবে ভয় পাচ্ছি আমি। আমার মনে হয় আমাদের সাথে থেকে গেলেই ভাল হবে তোমার জন্য।’

‘ধন্যবাদ!’ মাথা নুইয়ে বলল বিলবো, ‘কিন্তু মাফ করবেন আমাকে। এত কিছুর পর আমার বন্ধুদের এভাবে ত্যাগ করতে পারব না আমি। তাছাড়া বোম্বারকে মাঝরাতে জাগিয়ে দেয়ার কথা আছে আমার! যেতেই হবে আমাকে।’

বার্ড আর রাজার মিলিত অনুরোধেও থামানো গেল না বিলবোকে। অগত্যা তাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য এক এলফকে সাথে দিলেন রাজা, সেই সাথে সম্মানের সাথে অভিবাদন জানিয়ে বিদায় দিলেন তাকে।

ক্যাম্পের মাঝ দিয়ে নদীর দিকে এগোচ্ছে বিলবো, এই সময় হঠাৎ গাঢ় রঙের আলখাল্লা পরিহিত দীর্ঘদেহী এক লোক এগিয়ে এল তার দিকে।

‘দারুণ দেখিয়েছ, বিলবো ব্যাগিনস!’ বিলবোর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল লোকটা। ‘এমনকি আমার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছ!’ লোকটা আর কেউ নয়, গ্যান্ডালফ।

অনেকদিন পর গ্যান্ডালফকে দেখে সত্যি সত্যি দারুণ খুশি হয়ে উঠল বিলবো। একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন বেরিয়ে আসতে চাইল তার মুখ দিয়ে, কিন্তু বাঁধা দিলেন গ্যান্ডালফ।

‘সব প্রশ্নের উত্তর পাবে, যথা সময়ে,’ বললেন গ্যান্ডালফ। ‘আর কয়েকদিনের মাঝেই সবকিছুর শেষ হতে চলেছে, যদি আমার হিসেব ঠিক থাকে। সামনে কিছুটা বিপদ আছে তোমার, তবে বুদ্ধি আর সাহস থাকলে সেটা কাটিয়ে আসতে পারবে তুমি। এমন কিছু খবর জানি আমি যা এমনকি দাঁড়কাকরাও জানে না! এখন যেখানে যাচ্ছিলে যাও, খুব শীঘ্রই দেখা হবে আমাদের। শুভ রাত্রি!’

গ্যান্ডালফের সব কথা বুঝতে না পারলেও খুশি মনে পা চালাল বিলবো। নিরাপদে নদী পার করে দেয়া হল তাকে, তারপর সাথে আসা এলফদের বিদায় জানিয়ে দড়ি বেয়ে উঠে পড়ল প্রাচীরের উপর। ইতোমধ্যে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে, কিন্তু মধ্য রাতের তখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি। অগত্যা প্রাচীরের উপর বসে বসে সময়টা পার করল সে, তারপর সময় হলে জাগিয়ে দিল বোম্বারকে।

নিজের ঘুমানোর জায়গায় ফিরে এল বিলবো। কাল ভোরে কি হবে তাই নিয়ে আকাশপাতাল চিন্তা করল কিছুক্ষণ, কিন্তু এতই পরিশ্রান্ত ছিল যে সব দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল সে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ডিম আর বেকনের স্বপ্ন দেখতে লাগল বিলবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *