ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – ঊনবিংশ অধ্যায়

মে মাসের প্রথম দিনে গ্যন্ডালফ আর বিলবো পা রাখল রিভেনডেল উপত্যকায়। দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি ভর করেছে দুজনের উপর, তাদের ঘোড়াগুলোও দারুণ ক্লান্ত। উপত্যকার মাঝে পায়ে চলা পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এলফদের গানের আওয়াজ শুনতে পেল বিলবো। কান পাতল সে, গানের দুই একটা কথা ভেসে এল তার কানে। তাদের অভিযানের কথাই গাইছে এলফরা।

দুই ক্লান্ত অভিযাত্রীকে স্বাগত জানাল এলফরা, তারপর নিয়ে গেল এলরন্ডের বাড়িতে। সেখানে তাদের অভিযানের কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সবাই। বিলবো দারুণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, পৌছেই ঘুমে ঢলে পড়ল সে। সুতরাং গ্যান্ডালফের মুখ থেকেই সব কথা শুনল এলফরা। মাঝে মাঝে তার দুই একটা কথা পাশে বসে ঝিমুতে থাকা বিলবোর কানে গেল, তখনও যে বিষয়গুলো সে জানত না সেগুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারনা পেল সে।

বিলবো আর বামনদের মার্কউডের জঙ্গলের সামনে ছেড়ে দিয়ে গ্যান্ডালফ গিয়েছিলেন জাদুকরদের এক সভায় যোগ দিতে। সেখান থেকে সফলভাবে নেক্রোম্যান্সারের দুর্গ থেকে তাকে বিতাড়িত করেন তারা।

‘আশা করি মার্কউডের জঙ্গলের উপর নেক্রোম্যান্সারের অশুভ প্রভাব আর থাকবে না এখন,’ এলরন্ডকে বললেন গ্যান্ডালফ। ‘তবে এই পৃথিবী থেকেই তাকে তাড়াতে পারলে খুশি হতাম আমি।’

‘সেটাই সবচেয়ে ভাল হত,’ বলল এলরন্ড। ‘তবে আপনি যা করেছেন তার মূল্যও কম নয়।’

রাতে একবার ঘুম ভাঙল বিলবোর, জেগে উঠে একটা আরামদায়ক সাদা বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করল সে। জানালা দিয়ে ভেসে আসছে এলফদের কথা বার্তা আর গানবাজনার আওয়াজ। বাইরে চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতি। কিছুক্ষণ সেই শব্দ শুনল বিলবো, তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে সম্পূর্ণ ক্লান্তি কাটিয়ে উঠল বিলবো, নিজেকে একেবারে নতুন মানুষ মনে হল তার। রিভেনডেলের এলফদের সাথে সারাটা দিন আনন্দ আর হাসিঠাট্টায় কাটালো সে। তবে নিজের বাড়ির কথা ঠিকই মনে আছে তার। এক সপ্তাহ রিভেনডেলে থাকল সে, তারপর এলরন্ডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথে নামল গ্যান্ডালফের সাথে।

অভিযানের শুরুতে যে নদীতে কয়েকটা ঘোড়া ভেসে গিয়েছিল তার কিনারে এসে দাঁড়াতেই বৃষ্টি শুরু হল। পানির তোড়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে ছোট্ট নদীটা, পার হতে দুজনকেই বেশ কষ্ট করতে হল। তবে নিরবেই পার হয়ে এল তারা। ট্রোলদের হাতে ধরা পড়ার কথা মনে পড়ল বিলবোর, মনে হল যেন কতদিন আগের কথা। নদীর কিনারে যেখানে ট্রোলদের গুহা থেকে উদ্ধার করা সোনাদানাগুলো পুঁতে রাখা হয়েছিল সেই জায়গাটা খুঁজে বের করল বিলবো, ঠিক আগে মতই আছে সেগুলো।

‘আমার কাছে যা আছে তা যথেষ্টরও বেশি,’ বলল বিলবো। ‘এগুলো আপনি নিন, গ্যান্ডালফ।’

কিন্তু সম্পূর্ণটা নিলেন না গ্যান্ডালফ, অর্ধেক তুলে দিলেন বিলবোর ঘোড়ার পিঠে।

চারদিকে সবুজ হয়ে উঠেছে প্রকৃতি, ঘাসে ঢাকা প্রান্তরের মাঝ দিয়ে চলতে চলতে আনন্দে ভরে উঠল বিলবোর বুক। তারপর একদিন একটা ছোট টিলার উপর উঠতেই বিলবোর চোখে পড়ল, দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছোট্ট পাহাড়টা, যার নিচে তার বাড়ি। অবশেষে ফিরে এসেছে সে! অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে উঠল তার মন।

দ্রুত পা চালাল বিলবো, পাহাড়ের সামনে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটা পেরিয়ে পা রাখল তার বাড়ির সামনে। কিন্তু সাথে সাথে বেশ অবাক হল সে। তার বাড়ির ছোট্ট সবুজ দরজাটা হাঁ করে খোলা, আর তার ভেতর দিয়ে যাওয়া আসা করছে নানা ধরনের লোকজন। সবার হাতে কিছু না কিছু মালপত্র। বিলবো লক্ষ্য করল, সবগুলোই তার নিজের!

‘অ্যাই! কি হচ্ছে এখানে?’ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল সে।

বিলবোর চাইতেও বেশি অবাক হল লোকগুলো। দরজার উপর একটা নোটিশ ঝুলছে দেখতে পেল বিলবো। তাতে লেখা রয়েছে, জুন মাসের বাইশ তারিখ সকাল দশটায় হবিটনের বাসিন্দা মৃত বিলবো ব্যাগিনসের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করা হবে!

দীর্ঘ দিন কাউকে কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল বিলবো, ফলে তার সুযোগসন্ধানী আত্মীয়রা মৃত বলে ধরে নিয়েছে তাকে, তারপর নিলামে তুলে দিয়েছে তার বাড়ির সবকিছু। আর ঠিক সেই নিলামের দিনেই বিলবোর ফিরে আসায় বেশ ভাল রকমের গণ্ডগোল তৈরি হল। যারা ইতোমধ্যেই সস্তায় বিলবোর বিভিন্ন জিনিসপত্র পেয়ে গেছে তারা কিছুতেই মালিকানা ছাড়তে রাজি নয়, ঝামেলার হাত থেকে বাঁচতে সেগুলো আবার তাদের কাছ থেকে কিনে নিতে হল বিলবোকে। এমনকি তার পরেও বিলবো আবিষ্কার করল যে ছোট ছোট অনেক কিছুই অদৃশ্য হয়েছে তার বাড়ি থেকে।

তবে সেগুলোর চাইতেও বড় একটা জিনিস হারাল বিলবো, সেটা হচ্ছে প্রতিবেশীদের মাঝে তার সম্মান। আগেই বলা হয়েছে ঘর থেকে বের হতেই পছন্দ করে না হবিটরা, নিস্তরঙ্গ, উত্তেজনাহীন ভাবে জীবন যাপন করাই তাদের কাছে গ্রহনীয়। সেখানে হুট করে মাসের পর মাস উধাও হয়ে থাকা একজন হবিটকে তারা কেমন চোখে দেখবে তা বলাই বাহুল্য। তবে বিলবো যে তাতে কিছু মনে করল তা কিন্তু নয়।

ছোট্ট তলোয়ারটা, যার নাম ‘স্টিং,’ সেটাকে ফায়ারপ্লেসের উপর ঝুলিয়ে রেখেছে বিলবো। থোরিনের কাছ থেকে পাওয়া বর্মটা দরজার পাশেই একটা আংটার সাথে ঝুলিয়ে রেখেছে সবার দেখার জন্য। অভিযান থেকে যে মূল্যবান জিনিসগুলো নিয়ে এসেছিল তার বেশিরভাগই খরচ হয়ে গেল আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবদের উপহার দিয়ে। জাদুর আংটিটার কথা সবার কাছে গোপন রাখল সে, অবাঞ্চিত কোন অতিথি এলে তখনই শুধু ব্যবহার করত জিনিসটা। এভাবেই বাকি জীবনটা অত্যন্ত আনন্দে কাটালো সে, ঠিক যেভাবে একজন আদর্শ হবিটের কাটানো উচিত।

অভিযান থেকে ফেরার কয়েক বছর পর এক বিকেলে নিজের ঘরে বসে ছিল সে। একটা আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করছে সে, সেটা নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ করে দরজায় টোকার শব্দ শুনে উঠে গিয়ে দরজা খুলল সে। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন গ্যান্ডালফ, আর তার সাথে একজন বামন। বেলিন!

‘ভেতরে এসো! ভেতরে এসো!’ দারুণ খুশি হয়ে উঠল বিলবো, তারপর ঘরের ভেতর আগুনের সামনে এনে বসাল দুজনকে। বিলবো বেশ মোটা হয়ে গেছে বলে খোঁচা দিল বেলিন, বিলবোও বেলিনের মনিমুক্তাখচিত বেল্ট নিয়ে ঠাট্টা করতে ছাড়ল না। বহুক্ষণ ধরে নানা গল্পে মশগুল রইল তারা। বেলিনের মুখ থেকে জানা গেল ডেল শহর আবার গড়ে তুলেছে বার্ড, তার অনুসারীরা ছাড়াও চারদিক থেকে আরও অনেক মানুষ এসে বসতি করেছে সেখানে। লেক-টাউনও নতুন করে গড়ে উঠেছে আবার, এখন আগের চাইতেও সমৃদ্ধ।

তবে লেক-টাউন গড়ে তোলার জন্য সম্পদের যে অংশটা মেয়রের হাতে তুলে দিয়েছিল বার্ড সেটা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল মেয়র। বিরান প্রান্তরে পরে তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়, না খেয়ে মরেছে।

‘নতুন মেয়র অবশ্য অনেক ভাল,’ বলল বেলিন। ‘সবাই বলাবলি করছে যে এত ভাল মেয়র আগে আসেনি লেক-টাউনে।’

‘তাহলে সবাই ভালই আছে বলতে হবে,’ বলল বিলবো।

‘হ্যা। রূপকথা অবশেষে সত্যি হয়েছে!’ বলল বেলিন।

‘আর তাতে অনেক বড় একটা ভূমিকা রেখেছে আমাদের হবিট!’ বিলবোর পিঠে হাত রেখে বললেন গ্যান্ডালফ।

হাসতে হাসতে তার কথায় সম্মতি জানাল সবাই।

(সমাপ্ত )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *