ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – অষ্টম অধ্যায়

এক সারিতে হেঁটে চলেছে অভিযাত্রীরা। পথটা যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে পরস্পরের দিকে ঝুঁকে পড়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটো প্রাচীন গাছ, তাদের সাথে আইভী লতা আর লাইকেন জড়িয়ে অনেকটা তোরণের মত তৈরি করেছে। সরু পথটা সেখান থেকে এঁকে বেঁকে চলে গেছে সামনে, হারিয়ে গেছে গাছের আড়ালে। একটা মোড় ঘুরতেই অন্ধকারের রাজ্যে প্রবেশ করল যেন সবাই, প্রবেশপথের আলো হঠাৎ করেই নেই হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে চোখ সয়ে আসল সবার, আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে চার দিক। মাঝে মাঝে ডালপালা আর পাতার ঘন আস্তরণ ভেদ করে সূর্যের দু’একটা রশ্মি ভেতরে ঢুকে পড়ে কিছুটা আলোর সন্ধান দিচ্ছে, কিন্ত কিছুক্ষণ চলার পর সেগুলোর সংখ্যাও কমে এল।

বেশ কয়েকবার কিছু কাল রঙের কাঠবেড়ালী চোখে পড়ল অভিযাত্রীদের। পথের উপর চলে আসছে তারা, তারপর লাফ দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে পাশের ঝোপে। দুই পাশের ঝোপঝাড় আর পাতার স্তুপ থেকে নানারকম শব্দ ভেসে আসছে, যদিও কিসে করছে তা দেখার উপায় নেই। তবে সবচেয়ে বিশ্রি যে জিনিসটা সেটা হচ্ছে মাকড়সার জাল। অত্যন্ত মোটা আর শক্ত সুতোয় বোনা, এক গাছ থেকে আরেক গাছ পর্যন্ত ঝুলছে। তবে কোন মাকড়সা চোখে পড়ল না, আর পথের উপরেও কোন জাল নেই।

এই রহস্যময়, চির-অন্ধকার অরণ্যকে খুব শীঘ্রিই অপছন্দ করতে শুরু করল অভিযাত্রীরা। গবলিনদের গুহাতেও একই অনুভূতি হয়েছিল তাদের, কিন্তু এই জঙ্গল মনে হচ্ছে তার চাইতেও খারাপ জায়গা। দিনের পর দিন কেটে গেলেও সূর্যের আলোর দেখা মিলছে না, এক ফোঁটা বাতাস বইছে না কোথাও। জঙ্গলের ভেতর সর্বক্ষণ কেমন একটা গুমোট আবহাওয়া। বামনরা গুহায় বাস করে অভ্যস্ত, কিন্তু এই জঙ্গল তাদের স্নায়ুর উপরেও চাপ ফেলছে। বিলবোর কথা তো বলাই বাহুল্য।

দিনের বেলায় যেমন তেমন, রাতগুলো আরও খারাপ। দিনের আবছা অন্ধকার রাতে পরিণত হয় মিশকালো আঁধারে, চোখের সামনে হাত নাড়লেও তা বোঝা যায় না, এমনই অন্ধকার সেখানে। তবে একেবারেই কিছু দেখা যায় না তা নয়, বরং জোড়ায় জোড়ায় চোখ দেখা যায় শয়ে শয়ে। অভিযাত্রীদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় সেগুলো, নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে, তারপর হারিয়ে যায়। অন্ধকারের ভেতর সেগুলো দেখতে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে।

আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করেছিল অভিযাত্রীরা প্রথম রাতে। কিন্তু সাথে সাথে মনে হল চারদিকে জ্বলন্ত চোখগুলোর সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে গেছে। চারদিক থেকে ভীড় করে তাকিয়ে থাকে চোখগুলোর মালিকরা, কিন্তু তাদের দেখা যাবে এতটা কাছাকাছি কখনই আসে না। তার সাথে যুক্ত হল হাতের তালুর সমান বড় বড় সব মথ, শয়ে শয়ে উড়ে এসে ভীড় জমাতে লাগল আগুনের চারপাশে। শেষ পর্যন্ত আগুন ছাড়াই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে বসে বসে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার থাকল না।

বিলবোর মনে হল অনন্তকাল ধরে চলছে এই মহড়া। প্রায় সারাদিনই পেটে ক্ষিদে থাকে তার, কারণ খাবারের মজুদ খুবই সীমিত। জঙ্গলের কোন সীমানা দেখতে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে উঠছে সবাই, কারণ খাবার ফুরিয়ে আসছে খুব দ্রুত। কাঠবেড়ালীগুলো মারার অনেক চেষ্টা করল অভিযাত্রীরা, কিন্তু খুবই চালাক সেগুলো। অনেকগুলো তীর নষ্ট করার পর যদিও একটা মারা গেল, কিন্তু রোস্ট করে দেখা গেল খুবই বাজে তার স্বাদ। সুতরাং কাঠবেড়ালী ধরার আশা বাদ দিতে হল।

এদিকে খাবার পানিও ফুরিয়ে আসছে খুব দ্রুত। পথে এখন পর্যন্ত কোন ঝর্ণা বা পানির উৎস চোখে পড়েনি। হঠাৎ একদিন দেখা গেল পথের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে বেশ চওড়া একটা খাল, পানির রঙ কুচকুচে কাল। অবশ্য সেটা জঙ্গলের ভেতরের আলোকস্বল্পতার কারণেও হতে পারে। তবে সবাই বুঝতে পারল, এটাই গ্যান্ডালফের সাবধান করে দেয়া সেই জলাধার, ফলে তার ধারেকাছেও যেতে চাইল না কেউ। কিন্তু এটা পার হওয়া যায় কিভাবে?

বিলবোর চোখের দৃষ্টি সবার চাইতে তীক্ষ্ণ। কিনারে দাঁড়িয়ে ওপারে কি আছে দেখার চেষ্টা করল সে, তারপর চেঁচিয়ে উঠল, ‘একটা নৌকা দেখা যাচ্ছে ওপারে!’

‘কত দূরে হবে আন্দাজ?’ পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল থোরিন।

‘প্রায় বার ইয়ার্ড (ছত্রিশ ফিট) তো হবেই,’ জবাব দিল বিলবো।

‘হুম… সাঁতরে পার হওয়া সম্ভব নয়, লাফও দেয়া যাবে না। কি করা যায় তাহলে?’

‘আমাদের মধ্যে দড়ি ছুঁড়তে পারে কে?’ প্রশ্ন করল বিলবো।

‘ডোরির গায়ে শক্তি সবচেয়ে বেশি, কিন্তু ফিলির চোখের দৃষ্টি সবচেয়ে ভাল, তাছাড়া ওর বয়সও সবচেয়ে কম। ফিলি, এদিকে এস!’

ফিলি এগিয়ে এল সামনে। বিলবো তাকে বুঝিয়ে দিল কি করতে হবে। অন্ধকারে অনেকক্ষণ চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করল ফিলি, যে নৌকাটা কত দূরে আছে। তারপর একটা লম্বা দড়ির মাথায় লোহার হুক বেঁধে ফিলির হাতে তুলে দেয়া হল। দড়ি ধরে হুকটা তুলে নিল ফিলি, হাতে ঝুলিয়ে ওজন আন্দাজ করার চেষ্টা করল, তারপর ছুঁড়ে মারল নৌকা লক্ষ্য করে। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হল।

‘আর দুই ফিট সামনে পড়লেই কাজ হত!’ বলল বিলবো। ‘হুকটা তুলে নাও দড়ি টেনে। আমার মনে হয় না সামান্য ভেজা দড়ি স্পর্শ করলে তোমার কোন ক্ষতি হবে!’

বিলবোর কথামত দড়ি টেনে হুকটাকে পানি থেকে তুলে আনল ফিলি, তারপর আবার ছুঁড়ে মারল, এবার আগের চাইতে জোরে।

‘পড়েছে!’ চেঁচিয়ে উঠল বিলবো। ‘জায়গামতই পড়েছে হুকটা। এবার সাবধানে টান দাও দড়িতে, যাতে নৌকাতে আটকে যায়!’

দড়িতে টান দিল ফিলি, হঠাৎ টানটান হয়ে গেল দড়ি। তার মানে নৌকার কোথাও আটকে গেছে হুক। গায়ের জোরে টান লাগাল ফিলি এবার, কিন্তু কাজ হল না। জায়গা থেকে নড়ছে না নৌকা। এবার কিলি, ওইন আর গ্লোইন এল ফিলিকে সাহায্য করতে। চারজন মিলে টান লাগাল, তারপর হঠাৎ লাফ দিয়ে এগিয়ে এল নৌকাটা। মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই। কিন্তু বিলবো তৈরি ছিল, স্রোতে ভেসে যাওয়ার আগেই দড়ি ধরে নৌকাটাকে টেনে তীরের কাছে নিয়ে এল সে।

‘বাঁধা ছিল নৌকাটা ওপারে,’ নৌকার সাথে বাঁধা একটা ছেঁড়া দড়ি দেখিয়ে বলল বেলিন। ‘কপাল ভাল যে আমাদের দড়িটা ওটার চাইতে শক্ত ছিল!’

ঠিক হল যে সবার প্রথমে যাবে থোরিন, তার সাথে বিলবো, ফিলি আর বেলিন। একবারে চারজনের বেশি ওঠা সম্ভব নয় নৌকাতে। তাদের পর পার হল কিলি, ওইন, গ্লোইন আর ডোরি। তারপর ওইন, নোরি, বাইফুর আর বোফুর, আর সব শেষে ডোয়ালিন এবং বোম্বার।

‘সবসময় সবার শেষে থাকি আমি,’ গজগজ করে উঠল বোম্বার। ‘আজ অন্য কেউ থাকুক?’

‘সবার চাইতে মোটা তুমি, সেকারণেই সবার শেষে যেতে হবে তোমাকে। তাছাড়া এটা থোরিনের নির্দেশ। দলনেতার নির্দেশ অমান্য করা ঠিক নয়।’ জবাব দিল ডোয়ালিন।

আরেকটা দড়ি আর হুক নিয়ে একই ভাবে অপর পারের দিকে ছুঁড়ে দিল ফিলি, অন্ধকারে দেখা না গেলেও বোঝা গেল যে কোন গাছের ডালে আটকেছে হুকটা। ‘এবার দুই দিক থেকেই নৌকাটা টেনে আনা-নেয়া করা যাবে,’ বুঝিয়ে বলল ফিলি। সত্যিই তাই, গাছের ডালে বাঁধা দড়িটা টেনে প্রথম চারজন খুব সহজে পার হয়ে গেল। তারা নেমে যেতেই নৌকায় বাঁধা দড়িটা টেনে অপর পারে নিয়ে যাওয়া হল, তারপর আবার আগের উপায়ে পার হল পরের চারজন। শেষ পর্যন্ত বাকি থাকল শুধু ডোয়ালিন আর বোম্বার। হঠাৎ একটা ঝামেলা হয়ে গেল এই সময়।

ডোয়ালিন সবে নৌকায় উঠে বসেছে, আর বোম্বার তার পেছন পেছন উঠতে যাবে- এই সময় হঠাৎ খুরের আওয়াজ শোনা গেল। সামনের পথের দিক থেকে অন্ধকারের মাঝে উদয় হল একটা হরিণ। তীরবেগে দৌড়াতে দৌড়াতে চমকিত অভিযাত্রীদের প্রায় ধাক্কা দিয়েই সরিয়ে দিল পথ থেকে, তারপর এক লাফে পার হয়ে গেল খালটা। কিন্তু নিরাপদে নামতে পারল না। তীরে নেমেই থোরিন সম্ভাব্য কোন শত্রুর আশায় ধনুকে তীর জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, হরিণটাকে দেখা মাত্র তীর মারল সে। হরিণটার এলোমেলো পদক্ষেপ আর ছটফটানির শব্দ শুনতে পেল সবাই, বোঝা গেল জায়গামতই লেগেছে তীর।

কিন্তু থোরিনের নামে জয়ধ্বনি করে ওঠার আগেই বিলবো চিৎকার করে উঠল। আর কেউ দেখতে না পেলেও সে ঠিকই দেখেছে ব্যপারটা। ‘বোম্বার ডুবে যাচ্ছে! পানিতে পড়ে গেছে ও!’ নৌকায় উঠতে যাচ্ছিল বোম্বার, এই সময় আহত হরিণটা এসে পড়ে তার উপর। তাল সামলাতে না পেরে পানিতে পড়ে গেছে সে।

তাড়াতাড়ি করে হুকসহ একটা দড়ি ছুঁড়ে মারা হল তার দিকে। কপাল ভাল যে মালপত্র বাঁধার জন্য বেশ কিছু দড়ি আর হুক সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছিল। দড়িটা ধরে ফেলল বোম্বার, টেনে তীরে তোলা হল তাকে। আপাদমস্তক ভিজে গেছে সে, তবে পরিস্থিতিত সে তুলনায় আরও খারাপ। তীরে তুলে মাটিতে শুইয়ে দেয়ার পর দেখা গেল ইতোমধ্যেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে সে। দড়িটা অনেক কষ্টে ছাড়ানো লাগল তার হাত থেকে। অনেক চেষ্টা করেও যখন তার ঘুম ভাঙান গেল না, তখন নিজেদের কপাল আর বোম্বারের বোকামীকে দোষারোপ করা ছাড়া কিছু করার থাকল না কারও। ওদিকে কখন যেন নৌকাটাও ভেসে গেছে, খেয়াল করেনি কেউ। ফলে ওপারে ফিরে গিয়ে হরিণটাকে নিয়ে আসারও কোন উপায় নেই।

হঠাৎ করে জঙ্গলের ভেতর থেকে শিঙার শব্দ, সেই সাথে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক ভেসে এল। চুপ হয়ে গেল সবাই, শব্দ শুনে বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে আশেপাশেই শিকারে বের হয়েছে কেউ। বেশ বড়সড় দল আছে তার সঙ্গে। হঠাৎ করে জঙ্গলের ভেতর থেকে পথে বেরিয়ে এল কয়েকটা সাদা হরিণ, তাদের সাথে কয়েকটা একই রঙের বাচ্চা। থোরিন নির্দেশ দেওয়ার আগেই তিন জন বামন তীর ছুঁড়তে শুরু করল তাদের লক্ষ্য করে, কিন্তু উত্তেজনার বশে একটাও লাগাতে পারল না। যেভাবে এসেছিল সেভাবেই গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল হরিণগুলো। তারপর খেয়াল হল, বেখেয়ালে শেষ তীরটাও হারিয়েছে তারা। ওদিকে এত সব হইচইয়ের মধ্যেও বোম্বারের ঘুমে ব্যঘাত ঘটেনি, যেন পৃথিবীর কোন কিছুতেই তার কিছু এসে যায় না।

সে রাতে সবার মেজাজই কমবেশি তিরিক্ষি হয়ে থাকল, পরের দিনগুলোতেও একই অবস্থা। জাদুর ঝর্ণাটা পার হয়ে এসেছে তারা, কিন্তু জঙ্গলের মনে হচ্ছে কোন শেষ নেই। মার্কউড সম্পর্কে অভিযাত্রীদের আরেকটু ভাল ধারনা থাকলে শিকার অভিযানের চিহ্ন দেখে তারা বুঝতে পারত যে প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছে তারা, আরেকটু সামনে থেকেই পাতলা হতে শুরু করেছে জঙ্গল। কিন্তু তাদের জানা নেই ব্যপারটা, সেই সাথে যোগ হয়েছে বোম্বারের ভারি শরীরের বোঝা। চার জন করে পালা করে বইতে হচ্ছে তাকে, তার সাথে খাবার আর পানির বোঝা তো আছেই। গত কয়েকদিনে এই বোঝাগুলো অনেক হালকা হয়ে এসেছে, তা না হলে কাজটা সম্ভব হত না কারও পক্ষে।

ঝর্ণা পার হওয়ার চারদিন পর জঙ্গলে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করল অভিযাত্রীরা। তাদের চার দিকে এখন শুধু বীচ গাছ, অন্যান্য গাছ নেই বললেই চলে। জঙ্গলও অনেক পাতলা হয়ে এসেছে, আগের মত ঘন অন্ধকার আর নেই, তার জায়গায় একটা সবুজাভ আলো পাওয়া যাচ্ছে। গাছের নিচেও আগাছা আর পচা পাতার স্তুপ এখানে অনেক কম।

জঙ্গলের এই পরিবর্তনে সবার মনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার হল। কিন্তু বোম্বারের মাঝে কোন পরিবর্তন নেই, এখন পর্যন্ত একবারও ঘুম থেকে জাগেনি সে। ওদিকে মাঝে মাঝে দূরাগত গানের শব্দ ভেসে আসছে অভিযাত্রীদের কানে, মনে হচ্ছে কেউ যেন হাসছে। গবলিনদের মত কুৎসিত নয় সে শব্দ, তবুও এই জঙ্গলের রহস্যময় পরিবেশে যে কোন অজানা জিনিসই ভীতির সঞ্চার করে।

দুই দিন পর পথ ঢালু হয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করল। কিছুদূর এগোনোর পর নিজেদেরকে একটা নিচু উপত্যকায় আবিষ্কার করল অভিযাত্রীরা। বিশাল সব ওক গাছে ছেয়ে আছে উপত্যকা, চার দিকে কেমন একটা গুমোট আবহাওয়া।

‘এই অভিশপ্ত জঙ্গলের কি কোন শেষ নেই?’ যেন নিজেকেই প্রশ্ন করল থোরিন।

‘আমাদের কারও উচিত গাছে উঠে জঙ্গলের চারদিকে নজর বোলানো।’ বামনরা বলল, তারপর সবাই মিলে বিলবোর দিকে তাকাল। গাছে ওঠার প্রশ্ন উঠলে তো অবশ্যই বিলবোর কথাই প্রথমে মনে আসবে, কারণ গাছের মগডালে চড়ার জন্য যে হালকা ওজন দরকার তা দলের মধ্যে একমাত্র বিলবোরই আছে। বিলবোর যদিও গাছে ওঠার অভ্যাস নেই তেমন একটা, কিন্তু সবাই অনেকটা জোর করেই তাকে একটা আকাশছোঁয়া ওকের নিচু ডালে তুলে দিল। অগত্যা ডাল বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল সে।

বেশ কয়েকবার হাত ফসকে পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল বিলবো, তবে শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই উঠে এল মগডালে। গাছের পাতার ঘন সবুজ চাঁদোয়া ভেদ করে মাথা গলিয়ে দিয়ে চারদিক তাকাল সে, সাথে সাথে সূর্যের আলোয় মনে হল চোখ ধাধিয়ে যাবে তার। আলো একটু সয়ে আসতে সবচেয়ে প্রথমে যে জিনিসটা চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে প্রজাপতি। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ প্রজাপতি তাদের মখমলের মত মসৃন, নিকশ কাল পাখার সাহায্যে উড়ে বেড়াচ্ছে যেন এক ঘন সবুজ মহাসমুদ্রের উপর। হ্যা, সমুদ্রই বলা যায়, কারণ যতদূর বিলবোর চোখ যায় ততদূর শুধু সবুজ আর সবুজ, বাতাসে ঢেউ খেলছে। অনেক দিন পর মুখে খোলা বাতাসের স্পর্শ পেয়ে দারুন ভাল লাগল বিলবোর।

প্রজাপতির খেলা আর বাতাস উপভোগ করতে করতে কতক্ষণ কেটে গেছে বলতে পারবে না বিলবো। নিচ থেকে বামনদের অধৈর্য চিৎকারে একসময় সম্বিৎ ফিরে পেল সে, তাড়াতাড়ি চারদিক তাকিয়ে সবুজের সমুদ্রে কোন ছেদ আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তেমন কিছুই তার চোখে পড়ল না। মনটা দমে গেল বিলবোর।

সত্যি কথা বলতে জঙ্গল শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। কিন্তু বিলবোদের ছোট্ট দলটা এমন একটা জায়গায় রয়েছে যেটা পাহাড়ের ঢালে একটা উপত্যকা, ফলে সেখান থেকে যেদিকেই তাকান হোক না কেন, মনে হবে যে চারদিকে উঠে গেছে অন্তহীন গাছের সারি। একটা বিশাল গামলার তলায় বসে চারদিকে তাকালে যেমন লাগে, বিলবোর অবস্থাও অনেকটা তেমন এখন। কিন্তু সেটা বুঝতে পারেনি সে। বিফল হয়ে বিরস বদনে নেমে এল নিচে, তার কথা শুনে বাকিদের মেজাজও তিরিক্ষি হয়ে উঠল।

সেদিন রাতে খাবারের শেষ অংশটাও ফুরিয়ে গেল। কারও পেটেই ঠিক মত খাবার পড়েনি বেশ কয়েক দিন যাবত, এমনকি পানিও কৃপণের মত পান করতে হচ্ছে। জঙ্গলের কোথাও খাবার পাওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। নিজেদের কপাল আর মার্কউডের জঙ্গলকে শাপশাপান্ত করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল সবাই।

পরদিন সকালে উঠে সবার আগে অভিযাত্রীরা যে জিনিসটা খেয়াল করল সেটা হল বৃষ্টি। রাতে কখন যেন বৃষ্টি শুরু হয়েছে, গাছের পাতায় পানি পড়ার একঘেয়ে শব্দে মুখরিত চারদিক। সাথ সাথে যেন পিপাসা চেগিয়ে উঠল সবার, উপরের দিকে তাকিয়ে মুখ হা করল সবাই। কিন্তু নিরাশ হতে হল একটু পরেই, কারণ গাছের পাতার ঘন চাঁদোয়া ভেদ করে বৃষ্টির পানি খুব কমই ভেতরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। তবে একটা ঘটনায় সবার ভিতর কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার হল, সেটা হচ্ছে, ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠল বোম্বার।

একেবারেই হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে উঠে বসল সে। কোথায় আছে বা কোথায় যাচ্ছে কিছুই মনে নেই তার, সবকিছু বেমালুম ভুলে গেছে। শেষ যে ঘটনাটা তার মনে আছে সেটা হচ্ছে বিলবোর বাড়িতে তাদের জমায়েত হওয়ার কথা। এটাও বুঝতে পারছে না যে কেন এত ক্ষুধার্ত সে।

যখন বোম্বার শুনল যে তাদের সাথে কোন খাবার নেই, তখন হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে বাচ্চাদের মত কাঁদতে শুরু করল সে। ক্ষিদেয় তার হাত পা অবশ হয়ে আসছে, খাবার ছাড়া এক পাও নড়তে রাজি নয়। ‘কেন যে ঘুম ভাঙল আমার,’ কাঁদতে কাঁদতে বলল সে। ‘ঘুমিয়ে থাকলেই ভাল করতাম। স্বপ্ন দেখছিলাম যে এই জঙ্গলের মতই একটা জায়গায় রয়েছি আমি, তবে এত অন্ধকার নয় সেখানে। গাছের ডালে ডালে মশাল জ্বলছে, চারদিকে প্রচুর মানুষ। জঙ্গলের রাজা সেখানে বিশাল এক ভোজসভার আয়োজন করেছে, কত রকমের খাবার সেখানে…’

‘থাক থাক, আর বলতে হবে না,’ বিরক্ত হয়ে তাকে থামিয়ে দিল থোরিন। ‘খাবার ছাড়া আর কোন কথা যদি তোমার বলার না থাকে তাহলে চুপ থাক। এমনিতেই তোমার উপর দারুণ ক্ষেপে আছি আমরা। আধপেটা খেয়েও তোমার যে ওজন, এত পথ বয়ে আনতে গিয়ে জান বেরিয়ে গেছে আমাদের।’

পেটে বেল্ট কষে বেঁধে নিয়ে পথ চলা ছাড়া কোন উপায় নেই, সুতরাং সেটাই করল অভিযাত্রীরা। জঙ্গল যে খুব শীঘ্রি শেষ হবে তেমন কোন আশা নেই, মনে হচ্ছে তার আগেই এই গহীন অরণ্যে ক্ষিদেয় মরে পড়ে থাকবে সবাই। তার উপর সারা দিন ধরে ঘ্যান ঘ্যান করল বোম্বার, আর এক পাও চলতে পারবে না, পথের উপরেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চায় সে।

বিকেল বেলা হঠাৎ করেই বেঁকে বসল বোম্বার, মাটিতে জেঁকে বসে পড়ে আর একটুও সামনে এগোতে অস্বীকার করল। ‘তোমরা যেতে চাইলে যাও,’ বলল সে, ‘আমি এখানেই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খাবারের স্বপ্ন দেখতে চাই!’

সেই মূহুর্তে বেলিন বলে উঠল, ‘সামনে কিসের যেন আলো দেখা যাচ্ছে!’

সবাই সচকিত হয়ে সামনে তাকাল। সত্যিই, কিছু দূরে গাছপালার আড়ালে যেন লালচে আলো দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে আগুন জ্বেলেছে কেউ। একটা, দুটো, তিনটে আলো! কাউকে কিছু বলতে হল না, এমনকি বোম্বারও নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে সেদিকে চলতে শুরু করল। কাছাকাছি আসার পর দেখা গেল সত্যিই কেউ যেন গাছের নিচে মশাল আর আগুন জ্বালিয়েছে। তবে পথ থেকে বেশ দূরে জায়গাটা।

‘মনে হচ্ছে আমার স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে!’ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল বোম্বার। তখনই সেদিকে ছুটে যেতে চাইল সে, তবে বাকিরা থামাল তাকে। গ্যান্ডালফের সতর্কবানীর কথা ভালভাবেই মনে আছে সবার। ‘আমরা নিজেরাই যদি খাবারে পরিনত হই তবে সেই ভোজসভা কোন কাজে আসবে না আমাদের!’ বলল থোরিন।

‘কিন্তু খাবার ছাড়া বেশিক্ষণ টেকা সম্ভব নয় আমার পক্ষে,’ জানাল বোম্বার। বিলবোও একমত হল তার সাথে। ওদিকে সন্ধ্যা নেমে আসছে দ্রুত, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। বেশ কিছুক্ষণ তর্ক হল কে আগে যাবে তাই নিয়ে। কোন সুরাহা হল না, অগত্যা সবাই একসাথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিল।

গাছের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে এগিয়ে চলল অভিযাত্রীরা, উদ্দেশ্য সামনের অগ্নিকুন্ড। কিছুক্ষণ পরেই জায়গাটার বেশ কাছাকাছি চলে এল তারা। দেখতে পেল, জঙ্গলের মাঝে বেশ বড় একটা গোলাকার জায়গার গাছ কেটে সাফ করা হয়েছে, তার ঠিক মাঝখানে জ্বলছে একটা আগুন। অগ্নিকুণ্ডের চার দিকে গাছের গুড়ির উপর বসে আছে বেশ কিছু মানুষ, দেখে মনে হল উড-এলফ, অর্থাৎ জঙ্গলে বাস করে এমন একটা এলফ উপজাতি। সবুজ আর বাদামী পোশাক তাদের পরনে, গল্প করতে করতে আর গান গাইতে গাইতে খাওয়া দাওয়া করছে সবাই। ঝলসানো মাংসের গন্ধে জিভে পানি এসে গেল সবার।

লোভনীয় সব খাবারের গন্ধে আর কারও মাথার ঠিক থাকল না, এক যোগে আড়াল থেকে খোলা জায়গাটায় এলফদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল সবাই। উদ্দেশ্য কিছু খাবার চেয়ে নেবে এলফদের কাছ থেকে। কিন্তু প্রথম জন সামনে এসে দাঁড়ানোর সাথে সাথে জাদুর মত নিভে গেল সবগুলো মশাল। কেউ একজন লাথি মেরে নিভিয়ে দিল মাঝখানের অগ্নিকুন্ডটা, নিকশ অন্ধকারে ঢেকে গেল পুরো জায়গাটা। এতই অন্ধকার যে এমনকি বামনরাও একজন আরেকজনকে দেখতে পেল না, অনেকটা সময় কেটে গেল পরস্পরকে খুঁজে বের করতে করতে। অন্ধকারে ডাকাডাকি করে, গাছের গুড়িতে হোঁচট খেয়ে যখন অবশেষে সবাই একসাথে হল ততক্ষণে এলফরা উধাও হয়ে গেছে। এবার অভিযাত্রীদের খেয়াল হল, পথ হারিয়ে ফেলেছে তারা। কোন পথে এসেছিল এখানে তার কিছুই মনে নেই।

ফলাফলস্বরুপ রাতটা এখানেই কাটানোর সিদ্ধান্ত হল। পাছে পরস্পরের কাছ থেকে আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এই ভয়ে মাটিতে পড়ে থাকা খাবার খুঁজতেও সাহস হল না কারও। একে অপরের হাতের কাছে থাকল সবাই, মাটিতে বসে বসে ঢুলতে শুরু করল। সবে ঝিমুনি লেগে এসেছে, এমন সময় ডোরি, যে পাহারার দায়িত্বে ছিল, মোটামুটি জোরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলঃ ‘ওই যে! আলো দেখা যাচ্ছে আবার!’

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সবাই। আসলেই, একটু দূরেই আবার সেই আলো জ্বলে উঠেছে। এমনকি হাসিঠাট্টা আর গল্পের আওয়াজও শোনা যাচ্ছে যেন। এবার খুব সাবধানে এগিয়ে গেল সবাই, এক সারিতে এগোচ্ছে যেন কেউ হারিয়ে না যায়। কাছাকাছি আসার পর থোরিন বলল, ‘কেউ তাড়াহুড়ো করবে না এবার! সবার প্রথমে মিঃ ব্যাগিনস যাবে ওদের সাথে কথা বলতে, আশা করা যায় ওকে দেখে ভয় পাবে না কেউ।’ সে নিজে যে ভয় পেতে পারে সে কথাটা কেউ ভাবল না, মনে মনে বলল বিলবো।

আলোকিত জায়গাটার কিনারে আসতেই বিলবোকে ঠেলে সামনে পাঠিয়ে দিল বামনরা, ফলে জাদুর আংটিটা পরার সময় পেল না বিলবো। কিন্তু ঠিক আগের মতই সব গুলো আলো নিভে গেল একসাথে, নিকশ অন্ধকার নেমে এল জায়গাটা জুড়ে। আগের বার সবাইকে একসাথে করতে যতটা কষ্ট হয়েছিল এবার তার চাইতেও বেশি কষ্ট হল। বিলবোকে তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না, বার বার তার নাম ধরে ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে গেল সবাই। অবশেষে নেহাতই ভাগ্যগুণে ডোরি খুঁজে পেল তাকে। অন্ধকারে কিসে যেন হোঁচট খেল সে, হাত দিয়ে ধরে দেখে বুঝতে পারল গাছের গুড়ি নয়, বিলবোর ঘুমন্ত দেহ ওটা!

ঠেলা ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগানো হল তাকে। গজ গজ করতে জেগে উঠল বিলবো, বলল, ‘চমৎকার সব খাবারের স্বপ্ন দেখছিলাম আমি। কেন যে আমার ঘুমটা ভাঙালে!’

‘এ যে দেখছি বোম্বারের মতই কথা বলছে!’ বলল সবাই। ‘স্বপ্নে খাবার খেয়ে লাভ কি? ওগুলো তো ভাগাভাগি করা যায় না!’

‘এই পোড়া জঙ্গলে স্বপ্নের খাবারের চাইতে ভাল কিছু জুটবে বলে মনে হয় না।’ জবাব দিল বিলবো, তারপর বাকি সবার সাথে শুয়ে পড়ল আবার। কিন্তু অনেক চেষ্টার পর একটু ঘুমাতে পারলেও সেই স্বপ্নটা আর ফিরে এল না তার চোখে।

রাত তখন বেশ গভীর হয়ে এসেছে। সবাই ঘুমে অচেতন, শুধু কিলি পাহারায় জেগে আছে। হঠাৎ সবাইকে ডেকে তুলল সে, বলল, ‘ওই যে! আরও একবার জ্বলে উঠেছে আলো! শুধু তাই নয়, গান বাজনার শব্দও শোনা যাচ্ছে!’

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে বসে সেই শব্দ শুনল সবাই, আলোর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল আরেকবার যাওয়া ঠিক হবে কিনা। শেষ পর্যন্ত ক্ষিদেরই জয় হল। আরও একবার চুপি চুপি আগুনের দিকে এগিয়ে গেল সবাই, কিন্তু ফলাফল হল আগের চাইতেও ভয়ানক।

এবারের ভোজসভাটা আগের চাইতেও বড় আর লোকজনে ভরা, তাদের ঠিক মাঝখানে বসে আছে ফুল আর লতাপাতার মুকুট মাথায় এক লোক। দেখে মনে হল এলফদের রাজা সে, ঠিক যেমনটা বোম্বার বলেছিল। সবাই গান গাচ্ছে, গল্প করছে, পানভোজনে ব্যস্ত। ঠিক এই সময় থোরিন এসে দাঁড়াল তাদের সামনে।

সাথে সাথে সব আলো নিভে গেল, অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা নেমে এল জায়গাটার মাঝে। এক মুহুর্ত পর নিস্তব্ধতা ভেঙে শোনা যেতে লাগল বামনদের হতাশ চিৎকার, পরস্পরকে ডাকাডাকির শব্দ। বিলবো সবার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগল, কিন্তু কাউকেই খুঁজে পেল না। বাকিদের অবস্থাও একই রকম। আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগল শব্দগুলো, একসময় নিজেকে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতার মাঝে আবিষ্কার করল বিলবো। সবাই এদিক ওদিক চলে গেছে তাকে রেখে!

সেই মুহুর্তটায় প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ বোধ করল বিলবো। তবে মাথা ঠান্ডা রাখল সে, সিদ্ধান্ত নিল যে ভোর হওয়ার আগে এভাবে ঘোরাঘুরি করে আর কোন লাভ নেই। একটা গাছের গুড়ির গোড়ায় বসে পড়ল সে, তার আরামদায়ক গর্ত আর লোভনীয় খাবারে ভর্তি ভাঁড়ার ঘরের কথা ভেবে আফসোস করতে করতে ঘুমে ঢুলে পড়ল একটু পরেই।

বেকন, ডিম, টোস্ট আর মাখনের স্বপ্ন দেখছিল বিলবো, হঠাৎ মনে হল আঠালো কিছু একটা স্পর্শ করছে তাকে। ঝাঁকি দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠে বসতে চাইল সে, কিন্তু পারল না। আঠালো সুতোর মত কিছু একটা বেঁধে রেখেছে তার দুই পা আর বাম হাত! উঠে দাঁড়াতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সে।

সেই মুহুর্তে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বিশাল একটা মাকড়সা। বিলবোর ঘুমের সুযোগে তাকে সুতো দিয়ে বেঁধে ফেলতে চাইছিল ভয়ঙ্কর প্রাণীটা। অন্ধকারে শুধু প্রাণীটার চোখগুলো দেখতে পাচ্ছিল বিলবো, কিন্তু লোমশ কিলবিলে পাগুলোর স্পর্শ খুব ভালভাবেই অনুভব করতে পারল সে। আঠালো সুতো দিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করছে মাকড়সাটা। বিলবো ছটফট করে ওঠায় তাকে কামড়ে দিতে চাইল, জালে আটকে পড়া মাছিকে যেভাবে বিষ দিয়ে নিস্তেজ করে ফেলে তেমন ইচ্ছা। অন্ধের মত হাত চালিয়ে প্রাণীটাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে রাখতে চাইল বিলবো, তারপর তলোয়ারটার কথা মনে পড়তেই এক টানে খাপ থেকে বের করে আনল ধারালো অস্ত্রটা। তাড়াতাড়ি সেটার সাহায্যে বন্ধনমুক্ত হল সে, তারপর আক্রমণ করল মাকড়সাটাকে। কিছুটা দ্বিধান্বিত পায়ে সরে গেল মাকড়সাটা, এর আগে নিশ্চয়ই এমন ‘হুল’ ওয়ালা কোন প্রাণীর মুখোমুখি হয়নি। আর সেই দ্বিধার সুযোগটাই নিল বিলবো, সরাসরি জ্বলন্ত হলুদ চোখগুলোর ঠিক মাঝখানে ঢুকিয়ে দিল তলোয়ারটা। সাথে সাথে যেন পাগল হয়ে গেল প্রাণীটা, ঝাঁকি খেতে লাগল ঘিনঘিনে পাগুলো। আবার তলোয়ারটা দিয়ে কোপ মারল বিলবো, স্থির হয়ে গেল মাকড়সার শরীর। ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল বিলবো।

কতক্ষণ পর মনে নেই, ভোরের আলো ফুটে উঠতে শুরু করল চারদিকে। হুঁশ ফিরে এল বিলবোর, চারদিকে তাকাল সে। পাশেই পড়ে আছে মরা মাকড়সাটা, তেলতেলে কাল এক ধরণের তরল লেপ্টে আছে বিলবোর তলোয়ারের ফলায়। নিজের ভেতর একটা অন্যরকম সাহস অনুভব করল বিলবো। কারও সাহায্য ছাড়াই এই ভয়ঙ্কর প্রাণীটাকে খুন করেছে সে, ব্যপারটা উপলব্ধি করে হঠাৎ করেই মনে হল সম্পূর্ণ নতুন একটা মানুষে পরিনত হয়েছে সে।

তলোয়ারটা ঘাসে মুছে নিয়ে খাপে ঢুকিয়ে রাখল সে। এটার নাম রাখব ‘স্টিং’, মনে মনে ভাবল বিলবো। তারপর মনে মনে পরবর্তী করনীয় ঠিক করে নিল। গতরাতে কোন দিক থেকে শেষবার বামনদের চিৎকার শুনতে পেয়েছিল আন্দাজ করার চেষ্টা করল, তারপর সেদিকে এগোতে শুরু করল। সহযাত্রীদের কি হয়েছে এখনও জানে না সে, কিন্তু মাকড়সাটাকে দেখার পর কিছুটা আঁচ করতে পারছে। সতর্ক থাকতে হবে, বুঝতে পারল সে, তারপর আংটিটা বের করে পরে নিল আঙুলে।

দেখা গেল সঠিক দিকেই চলছিল বিলবো, কারণ কিছুদূর যাওয়ার পর অন্ধকার একটা জায়গা চোখে পড়ল তার। মনে হল যে রাতের অন্ধকার যেন এখনও চেপে বসে আছে জায়গাটার উপর। খুব সাবধানে, নিঃশব্দে সেদিকে এগিয়ে গেল সে। কাছাকাছি যাওয়ার পর যা দেখল তাতে আতঙ্কে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল। অন্ধকার জায়গাটা সেই বিশাল মাকড়সাদের আস্তানা। মাকড়সার ঘন, আঠাল জালে ঘেরা জায়গাটা, আর তার ভেতর বসে আছে অনেকগুলো দানব মাকড়সা!

আরও একটু কাছে যাওয়ার পর মাকড়সাগুলোর কথা শুনতে পেল বিলবো। কর্কশ, খরখরে গলায় নিজেদের ভেতর কথা বলছে তারা।

‘ধরতে একটু কষ্ট হলেও, শিকার কিন্তু খাসা!’ বলল একটা মাকড়সা। ‘দারুণ রসালো হবে খেতে!’

‘তেমন তো মনে হচ্ছে না, সবকটা শুকনো, হাড় জিরজিরে। না খেয়ে ছিল বোধহয় অনেকদিন।’ জবাব দিল আরেকটা।

‘আরে না, দেখাচ্ছি তোমাকে, দাঁড়াও,’ বলে জাল বেয়ে এগিয়ে এল একটা মাকড়সা। জালের এক প্রান্তে ঝুলছে বেশ কয়েকটা পুটলি, তার একটার কাছে গিয়ে থামল সে, তারপর লোমশ পা দিয়ে খোঁচা দিল পুটলিটায়। ভেতর থেকে ‘আউ’ করে চেঁচিয়ে উঠল কে যেন, সেই সাথে একটা পা বেরিয়ে এসে লাথি মারল মাকড়সার পেটে। ধপাস করে মাটিতে পড়ল মাকড়সাটা। গলা শুনেই চিনতে পারল বিলবো, বোম্বারের গলা!

‘এত্ত বড় সাহস, আমাকে লাথি মারে!’ রাগে জ্বলে উঠল মাকড়সাটার দুই চোখ, অন্যদিকে তার দুরবস্থা দেখে বাকিরা খিক খিক করে হেসে উঠল। আরও রেগে উঠল পড়ে যাওয়া মাকড়সাটা, তরতর করে জাল বেয়ে উঠতে শুরু করল উপরে। উদ্দেশ্য, ছিবড়ে বানিয়ে ফেলবে বেয়াদব পুটলিটাকে!

বিলবো বুঝতে পারল, হাতে একেবারেই সময় নেই, যা করার এখনই করতে হবে। ঢিল ছুঁড়ে লক্ষ্যভেদ করায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না হবিটদের এলাকায়। নিজের দক্ষতার উপর পরিপূর্ণ আস্থা আছে তার। মাটি থেকে মুরগির ডিমের সমান একটা পাথর তুলে নিল সে, তারপর গায়ের জোরে ছুঁড়ে মারল মাকড়সাটাকে লক্ষ্য করে। থ্যাপাস করে মাকড়সার মাথায় লাগল পাথরটা, সাথে সাথে দ্বিতীয়বারের মত মাটিতে আছড়ে পড়ল প্রাণীটা।

শোরগোল পড়ে গেল মাকড়সাদের মধ্যে। ততক্ষণে আরও কয়েকটা পাথর এসে লেগেছে কয়েকজনের গায়ে, আহত বা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে খসে পড়েছে তারা। বিলবোকে দেখতে পাচ্ছে না কেউ, কিন্তু বোকা নয় মাকড়সারা। পাথরগুলো কোনদিক থেকে আসছে আন্দাজ করে নিল তারা, তারপর জাল থেকে নেমে তীরবেগে আট পায়ে ছুটে আসতে লাগল সেদিকে। বেগতিক দেখে সুড়ুৎ করে জায়গা থেকে সরে গেল বিলবো, ঠিক করেছে মাকড়সাগুলোকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।

বিলবো যেখানটায় এক মূহুর্ত আগে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে কয়েকটা আঠালো সুতো এসে গিট পাকিয়ে ফেলল, তারপরেই অন্তত পঞ্চাশটা মাকড়সা জটলা পাকাল সেখানে। রাগের চোটে গরগর করছে তারা, কে কার আগে অদৃশ্য শত্রুকে বাগে পেতে পারে তার পায়তারা কশছে। সেই জটলার মাঝখানে আরও কয়েকটা পাথর ছুঁড়ে মারল বিলবো, তার পরেই গাছের আড়াল দিয়ে এঁকে বেঁকে সরে গেল আরেক দিকে। শুধু তাই নয়, মাকড়সাগুলোকে আরও একটু রাগিয়ে তোলার জন্য ব্যঙ্গ করে হেসে উঠল, অপমানজনক কিছু কথা ছুঁড়ে দিল তাদের উদ্দেশ্যে।

‘সব আলসের ধাড়ি কুৎসিত মাকড়সার দল! মাছি যে তোদের হাত ফসকে বেরিয়ে গেল! কিছুই করতে পারলি না!’

আগুনে যেন ঘি পড়ল। যত মাকড়সা বাসা বেঁধেছিল জায়গাটায় তারা সবাই ছুটে এল বিলবোর অবস্থান লক্ষ্য করে, কেউ মাটির উপর দিয়ে, কেউ গাছের ডালে ঝুলে। আবার সরে গেল বিলবো। কিন্তু মাকড়সারাও ওদিকে চালাকি করতে শুরু করেছে, সবাই মিলে শত্রুর পিছনে না ছুটে কয়েকজন ব্যস্ত হয়ে গেছে অন্ধকার জায়গাটার চারদিকে জাল বুনে দেয়াল তৈরি করতে, যাতে ভেতরে আটকা পড়ে শত্রু। এমনই একটা দেয়ালের সামনে এসে বাঁধা পেয়ে দাঁড়িয়ে গেল বিলবো, তারপর তলোয়ারটা বের করল জাল কেটে ফেলার উদ্দেশ্যে। কয়েক পোচেই জালের দফারফা হয়ে গেল, বাইরে বেরিয়ে দৌড় দিল সে।

বিলবোকে দেখতে না পেলেও তলোয়ারটা ঠিকই দেখতে পেল মাকড়সাগুলো। সাথে সাথে সেটার পিছনে ধাওয়া করল তারা, রাগে চোখগুলো জলজল করছে। জঙ্গলের ভেতর বহুদূর তাদের টেনে নিয়ে গেল বিলবো, তারপর টুক করে তলোয়ারটা ঢুকিয়ে ফেলল খাপে। হঠাৎ করে শত্রুর চিহ্ন হারিয়ে ফেলায় দ্বিধায় পড়ে গেল মাকড়সাগুলো, তাদের সেই দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থাতেই রেখে মাকড়সাদের আস্তানায় ফিরে এল বিলবো।

হাতে সময় বেশি নেই, জানে সে। মাকড়সারা ফিরে আসবে একটু পরেই, তার আগেই উদ্ধার করতে হবে বামনদের। মাকড়সার জাল বেয়ে উপরে উঠে গেল সে, খুব একটা অসুবিধা হল না। কিন্তু বন্দীদের পাহারায় যে একটা মাকড়সা রয়ে গেছে তা বুঝতে পারেনি বিলবো। গাছের উপরে উঠে দেখতে পেল মোটাসোটা মাকড়সাটা বন্দীদের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খোঁচা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কার গায়ে রস বেশি হবে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার পিছনে চলে এল বিলবো, তারপর স্টিং এর এক আঘাতে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিল ঘিনঘিনে প্রাণীটার।

এবার বন্দীদের মুক্ত করার পালা। সবার আগে সামনে যাকে পেল তার সারা গায়ে পেঁচিয়ে থাকা মাকড়সার আঠালো সুতোগুলো তলোয়ার দিয়ে কাটতে শুরু করল বিলবো। একটু পরেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ফিলি। বের হয়েই সারা শরীরে লেগে থাকা মাকড়সার জাল আর আঠা পরিষ্কারে লেগে পড়ল সে। দুই জন মিলে এবার বাকিদের মুক্ত করতে শুরু করল। সবার অবস্থাই কমবেশি খারাপ, বিশেষ করে মাকড়সার বিষে কাহিল হয়ে পড়েছে বন্দীরা। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই কিলি, বাইফুর, বোফুর, ডোরি আর নোরি মুক্ত হল। বোম্বারকে জাল কেটে বের করার সাথে সাথে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল সে, কপাল ভাল যে শুকনো পাতার স্তুপ ছিল নিচে। তার অবস্থাই বেশি খারাপ। এখনও পাঁচটা পুটলি ঝুলছে গাছের ডালে, কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎ করে অন্যদিকে মোড় নিল। ফিরে আসতে শুরু করেছে মাকড়সারা!

বামনদের সাহায্য করতে গিয়ে হাত থেকে আংটি খুলে ফেলেছিল বিলবো। এবার তাকে দেখতে পেল মাকড়সারা। হিসিয়ে উঠল তারা বিলবোকে দেখে, তারপর গাছের উপর দিয়ে আট পায়ে কিলবিল করে এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে। ওদিকে বাকিদের জাল কেটে বের করতে লেগে গেছে সদ্য মুক্ত হওয়া বন্দীরা। হঠাৎ নিচের দিকে তাকাতেই বিলবো দেখতে পেল, কয়েকটা মাকড়সা ঘিরে ধরেছে বোম্বারকে। আক্রোশের একটা চিৎকার ছাড়ল সে, তারপর লাফিয়ে পড়ল ঠিক মাকড়সাগুলোর মাঝখানে। তলোয়ার বেরিয়ে এসেছে হাতে, কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই তার আঘাতে প্রাণ হারাল সেগুলো। উপর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল বিলবো, ‘নেমে এস সবাই! গাছের উপর ওদের সাথে পারব না আমরা!’

বিলবোর কথা কানে যেতেই যে যেভাবে পারে নেমে এল গাছ থেকে। বাইফুর আর বোফুর দুই দিক থেকে বোম্বারকে সোজা করে ধরে রাখল, বিলবো ওদিকে তলোয়ার নিয়ে শাসাচ্ছে চারদিকে জড়ো হওয়া শত শত মাকড়সার দলকে। গত রাতে অন্ধকারে অসাবধান অবস্থায় সবাই ধরা পড়েছিল মাকড়সাদের হাতে, কিন্তু এখন অবস্থা ভিন্ন।

এবার শুরু হল যুদ্ধ। বামনদের কারও কাছে ছুরি, কারও কাছে লাঠি। তাছাড়া মাটি থেকে কুড়িয়ে নেওয়া পাথর তো আছেই, সেই সাথে বিলবোর হাতে তার প্রিয় তলোয়ার স্টিং। বারবার মাকড়সারা এগিয়ে এসে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করল অভিযাত্রীদের চক্রব্যুহকে, আর ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে গেল, পেছনে রেখে গেল মরা মাকড়সার দঙ্গল। কিন্তু অভিযাত্রীরাও ক্লান্ত হয়ে পড়ছে সেই সাথে, বুঝতে পারছে এভাবে বেশিক্ষণ প্রতিরোধ ধরে রাখা সম্ভব নয়। ওদিকে মাকড়সারা আবার চার দিকে জাল বুনতে শুরু করেছে। বিলবো বুঝতে পারল, বাঁচতে হলে বেপরোয়া না হয়ে উপায় নেই। আংটির কথা বামনদের জানানোর সময় হয়েছে।

‘আমি এখন অদৃশ্য হয়ে মাকড়সাগুলোকে এক দিকে সরিয়ে নিয়ে যাব,’ বলল সে, ‘তোমরা সেই ফাঁকে অন্যদিকে পালিয়ে যাবে! বাম দিকে কিছুদূর গেলেই সেই জায়গাটা চোখে পড়বে, যেখানে গত রাতে শেষবারের মত এলফদের দেখেছিলাম আমরা।’

হইচই আর শোরগোলের মাঝে তার কথা সবাই বুঝল কিনা কে জানে, কিন্তু অপেক্ষা করার সময় নেই হাতে। আংটিটা পরে নিল বিলবো, সাথে সাথে বামনরা অবাক হয়ে দেখল হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ছোট্ট হবিট!

একটু পরেই ডান দিকে বিলবোর ব্যঙ্গাত্বক হাসি ভেসে এল, সে শব্দ কানে যেতেই মাকড়সাদের মনোযোগ ঘুরে গেল সেদিকে। অভিযাত্রীদের বাদ দিয়ে বেশিরভাগ মাকড়সা বিলবোর পেছনে ছুটল, ফলে পালানোর সুযোগ তৈরি হয়ে গেল একটা। এবার বেলিনের নেতৃত্বে মাকড়সাদের উপর হামলা করল বামনরা, বৃষ্টির মত পাথর ছুঁড়ে হটিয়ে দিল তাদের, তারপর বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এল বাইরে, বিলবোর দেখিয়ে দেওয়া পথে ছুটতে শুরু করল। পেছনে ধাওয়া করল মাকড়সাগুলো।

অভিযাত্রীদের কারও গায়ে খুব একটা জোর নেই, ফলে বেশি ছুটতে পারছে না তারা। অল্পক্ষণের মধ্যেই মাকড়সাগুলো প্রায় ধরে ফেলল তাদের। মনে হল আর টিকবে না তারা, কিন্তু ঠিক এই সময় ফিরে এল বিলবো! ‘এগিয়ে যাও সবাই, আমি এদের দেখছি!’ চিৎকার করে উঠল সে, তারপর খোলা তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাকড়সাগুলোর মধ্যে। আরও অনেকগুলো মাকড়সা মারা পড়ল স্টিং এর আঘাতে। এদিকে বিলবোকে ধীরে ধীরে ভয় পেতে শুরু করেছে আক্রমণকারীরা, পিছু হটছে তারা। বিলবো একাই তাদের দমিয়ে রাখল, আর সেই সুযোগে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল বামনরা।

বিলবোর হাত ব্যথায় টনটন করছে, কিন্তু থামার উপায় নেই। অবিশ্রান্ত ভাবে তলোয়ার চালাচ্ছে সে, স্তুপ হয়ে জমে উঠছে মাকড়সাগুলোর মৃতদেহ। তারপর একসময় যখন মনে হল যে আর পারবে না সে, তখনই হাল ছেড়ে দিল অবশিষ্ঠ মাকড়সাগুলো, পিছু হটে ফিরে গেল তাদের আস্তানায়। শেষ হল লড়াই।

গত রাতে যে খোলা জায়গাটায় শেষবারের মত আগুন দেখা গিয়েছিল সেখানে এসে পৌছাল বিলবো। বামনরা সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছিল সেখানে, সে এসে পৌছাতেই প্রশ্নে প্রশ্নে ছেঁকে ধরল তাকে। কিভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল, কিভাবে এত ভাল লড়াই করতে শিখল ইত্যাদি ইত্যাদি। অগত্যা সবকিছু গোড়া থেকে খুলে বলল বিলবো, এমনকি পাহাড়ের গুহায় গোলমের সাথে সেই ধাঁধার লড়াই পর্যন্ত নতুন করে বলতে হল তাকে। সবকিছু শোনার পর তার প্রতি বামনদের শ্রদ্ধা অন্তত কয়েকশ গুন বেড়ে গেল। সবাই উপলব্ধি করল, গ্যান্ডালফ ঠিকই বলেছিলেন বিলবোর সম্পর্কে!

কিন্তু এখন কি করা যায়? খাবার নেই, পানি নেই, পথের নির্দেশ জানা নেই। সম্পুর্ণ অজানা অচেনা এই বিপদসংকুল জঙ্গলে কতক্ষণ টিকবে অভিযাত্রীরা? আকাশ পাতাল ভেবেও কোন সুরাহা করতে পারল না বিলবো, শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল মাটিতে। বাকিরাও অনুসরণ করল তাকে, এত কিছুর পরে কারও মধ্যে আর এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্ঠ নেই।

হঠাৎ সোজা হয়ে উঠে বসল ডোয়ালিন। ‘থোরিন! থোরিন কোথায়?’ বিহ্বল গলায় প্রশ্ন করল সে। সাথে সাথে বাকিদেরও খেয়াল হল, সত্যিই তো, থোরিন তো নেই তাদের সঙ্গে? কোথায় গেল সে?

এখানে আমরা একটু পেছনে ফিরে যাব। গত রাতে এলফদের আগুন দ্বিতীয়বার নিভে যাওয়ার পর বিলবো কেমন হঠাৎ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল সেটা নিশ্চয়ই মনে আছে? থোরিনের বেলায়ও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল, তৃতীয়বারে। আলো নিভে যেতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, হয়তো এটা এলফদের কোন গোপন জাদুর কারণে। যাই হোক, অন্ধকারে কেউ আর তার খোঁজ রাখতে পারেনি, আর ঘুম থেকে উঠেই মাকড়সাদের সাথে লড়াইয়ে নামতে হওয়ায় বিলবোরও তার কথা মনে ছিল না। তবে এলফরা কিন্তু পরে ঠিকই সে জায়গায় ফিরে এসেছিল, আর থোরিনকে ঘুমন্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তারাই তুলে নিয়ে গেছে। উড-এলফরা অন্যান্য এলফদের তুলনায় বেশ বুনো ধরনের, তাছাড়া বাইরের মানুষকে খুব একটা পছন্দও করে না তারা। এ কারণেই গত রাতে বারবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল তারা। তবে সেটা অভিযাত্রীদের জানার কথা নয়।

মার্কউড জঙ্গলের এক পাশে, পাহাড়ের ভেতর বিশাল এক গুহায় বাস করে উড-এলফদের রাজা। পাহাড় থেকে নেমে এসেছে এক খরস্রোতা নদী, গুহার সামনে দিয়ে বয়ে গেছে নিচের সমভূমির দিকে। নদীর পাশে জঙ্গলে আর সমভূমিতে কাঠের বাড়ি ঘরে বাস করে এলফরা। তাদের রাজা যে গুহায় বাস করে তা মোটেই গবলিনদের গুহার মত অন্ধকার আর সরু নয়, যদিও মাটির নিচে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত তা। আরও অনেক ছোট ছোট গুহা বের হয়ে গেছে সেখান থেকে, যুদ্ধের সময় আশ্রয় হিসেবে সেগুলো ব্যবহার করে এলফরা, সেই সাথে বন্দীশালা হিসেবেও কাজে আসে গুহাগুলো।

বামনদের বিশ্বাস করে না তারা, কারণ বেশ কয়েকবার তাদের সাথে যুদ্ধ হয়েছে এলফদের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ছিল এলফদের রাজার সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে। বামনদের বিভিন্ন সময়ে কাজে লাগিয়েছে এলফরা, কিন্তু কাজ শেষে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আর সেটাই ছিল যুদ্ধের কারণ। তবে থোরিনের বংশের কেউ সে যুদ্ধের সাথে জড়িত ছিল না। তবে থোরিনকে বন্দী হিসেবেই ধরে নিল তারা, আটকে রাখল পাহাড়ের অনেক ভিতরে এক দুর্গম গুহায়। ওদিকে তাদের এমন ব্যবহারে মনে মনে ক্ষেপে উঠল থোরিন, সিদ্ধান্ত নিল যে তাদের আসল উদ্দেশ্যের কথা কিচ্ছু জানাবে না এলফদের রাজাকে। ফলে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল যে মার্কউডের জঙ্গলে কি করছিল সে তখন বিলকুল চুপ মেরে গেল সে। ফলশ্রুতিতে আরও ক্ষেপে উঠল এলফরা।

বন্দী করে রাখা হলেও বেশ ভাল ভাল খাবার সরবরাহ করা হল থোরিনকে, কারণ গবলিনদের তুলনায় উড-এলফরা অনেক সভ্য, শত্রুদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে জানে না তারা। তাদের একমাত্র ঘৃণার বস্তু হচ্ছে বিশাল মাকড়সাগুলো।

ফলে পাহাড়ের ভেতর সেই দুর্গম বন্দীশালায় বন্দী হয়ে থাকল থোরিন, তার সঙ্গীদের কি পরিণতি হয়েছে ভেবে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যে। সেটা জানতে অবশ্য খুব বেশি সময় লাগবে না তার, তবে সে কাহিনী আসবে পরের অধ্যায়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *