ধারাবাহিক

জে আর আর টোলকিনের জগদ্বিখ্যাত কল্পকাহিনী “দ্য হবিট” এর বাংলা অনুবাদ – সপ্তদশ অধ্যায়

পরদিন বেশ সকাল সকাল ট্রাম্পেটের আওয়াজ শোনা গেল এলফদের ক্যাম্পে। কিছুক্ষণ পর একজন বার্তাবাহক এগিয়ে এল গুহার প্রাচীরের সামনে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে অভিযাত্রীদের উদ্দেশ্যে জানতে চাইল সে, নতুন একটা ব্যপারে থোরিনের মতামত জানতে চায় তারা, থোরিন আলোচনায় রাজি আছে কিনা।

‘ডেইন চলে এসেছে তাহলে!’ শুনতে পেয়ে বলল থোরিন। ‘এলফরা নিশ্চয়ই তার আসার খবর পেয়েছে। আমি জানতাম সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হবে ওরা। ঠিক আছে, কি বলতে চায় ওরা শুনব আমি। অস্ত্র রেখে আসতে বল ওদের, তবে কয়েকজনের বেশি যেন না আসে।’

দুপুরের দিকে জঙ্গল আর লেক-টাউনের পতাকা নিয়ে একটা দলকে আসতে দেখা গেল। বিশ জন তারা সংখ্যায়। কিছু দূরে থাকতে সাথের অস্ত্র মাটিতে নামিয়ে রাখল তারা, তারপর এগিয়ে আসল সামনে। বার্ড আর এলফ রাজাকে দেখা গেল তাদের মাঝে। সাথে একজন অপরিচিত লোক, আলখাল্লায় চেহারা ঢাকা তার। শক্ত কাঠের একটা ছোট বাক্স বহন করে আনছে সে।

‘থোরিন!’ প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় ডাক দিল বার্ড। ‘তোমার মত কি বদলেছে?’

‘আমার কথা এত ঠুনকো নয় যে কয়েকদিন পরপর বদলাবে,’ জবাব দিল থোরিন। ‘এলফদের বিদায় না করলে তোমাদের কোন কথা শুনতে রাজি নই আমি।’

‘তার মানে কোন কিছুর বদলেই তোমার কথার নড়চড় হবে না?’

‘না।’

‘যদি বলি যে আর্কেনস্টোনটা আছে আমাদের কাছে?’ বলল বার্ড, সেই সাথে আলখাল্লা পরা লোকটা সামনে এগিয়ে এসে বাক্সের ভেতর থেকে বের করে আনল রত্নটা। সকালের সূর্যের আলোয় ঝলসে উঠল পাথরটা।

প্রচণ্ড বিস্ময়ে যেন পাথর হয়ে গেল থোরিন। শুধু সে নয়, বামনদের সবার অবস্থাই কমবেশি একই রকম। কিছুক্ষণ কোন কথা বের হল না কারও মুখ দিয়ে। তারপর নীরবতা ভাঙল থোরিন।

‘ওই পাথরটা ছিল আমার বাবার, এবং এখন আমার,’ ক্রুদ্ধ, থমথমে গলায় বলল সে, ‘আমার জিনিস আমাকেই দিতে চাইছ? কিভাবে পেলে ওটা তোমরা?’

‘চুরি করিনি আমরা, যদি তেমন কিছু ভেবে থাক,’ জবাব দিল বার্ড। ‘আমাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলেই তোমার জিনিস পেয়ে যাবে তুমি।’

‘ওটা কিভাবে পেলে তোমরা?’ আগের চাইতেও থমথমে গলায় প্রশ্ন করল থোরিন।

‘আমি দিয়েছি ওদেরকে পাথরটা!’ ভয়ে ভয়ে বলল বিলবো।

সাথে সাথে এক কোণে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকা বিলবোর গলার কাছটা দুই হাতে চেপে ধরল থোরিন। ‘তুমি!’ হিসিয়ে উঠল সে, ‘ব্যাটা হবিটের বাচ্চা হবিট! নোংরা ইঁদুর!’ বিলবোর কলার ধরে ছোট্ট একটা খরগোশের মত ঝাঁকাতে লাগল সে।

‘ডুরিনের কসম, এখানে যদি গ্যান্ডালফ থাকত এখন, তার সবকটা দাড়ি টেনে ছিড়তাম আমি! তার জন্যেই আমার দলে তোর মত একটা চোর ঢুকেছে!’ বিলবোকে প্রাচীরের উপর থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত হল সে।

‘দাঁড়াও! তোমার ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে, এই যে আমি!’ বলে উঠল কেউ একজন। আলখাল্লাধারী লোকটা এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, তার মুখ থেকেই বের হয়েছে কথাগুলো। নিজের মুখের উপর থেকে আড়াল সরিয়ে দিল সে। দেখা গেল, আর কেউ নয়, লোকটা স্বয়ং গ্যান্ডালফ!

‘এসো, দেখি আমার ক’টা দাঁড়ি ছিড়তে পারো তুমি!’ থোরিনকে আহ্বান জানালেন তিনি। ‘বিলবোর কোন দোষ নেই, ছেঁড়ে দাও ওকে।’

চোখ পাকিয়ে বিলবোর দিকে তাকাল থোরিন। ‘এসবের মানে কি?’ জানতে চাইল সে।

‘তুমি দেখছি পুরো ব্যপারটা গুলিয়ে ফেলেছ,’ বলল বিলবো। ‘আসার সময় তো তোমরা আমাকে বলেছিলে যে নিজের ভাগ নিজেই বেছে নিতে পারব আমি। ঠিক সে কাজটাই করেছি আমি, নিজের জন্য বেছে নিয়েছি আর্কেনস্টোনটা। কিন্তু এখন যে তোমার কথা এভাবে বদলে যাবে তা তো ভাবতে পারিনি! এত উপকার করলাম তোমাদের, তার বদলে কিনা এই ব্যবহার করলে আমার সাথে?’

‘ঠিক আছে,’ গম্ভীর গলায় বলল থোরিন। ‘তোমার কথাই থাকল তাহলে। কিন্তু আশা করব আর কোন দিন আমার সামনে পড়বে না তুমি, তাহলে কি করব আমি নিজেও জানি না!’ বিলবোকে ছেঁড়ে দিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে ফিরল সে। ‘ঠকানো হয়েছে আমাকে,’ বলল সে। ‘ঠিকই ধরেছিলে তোমরা, আর্কেনস্টোনের মায়া ত্যাগ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ওটার বদলে মোট সম্পদের চৌদ্দ ভাগের এক ভাগ দিতে রাজি আছি আমি। কিন্তু এই বিশ্বাসঘাতককে আর একটা কানাকড়িও দেব না। নিয়ে যাও ওকে!’

এবার বিলবোর দিকে তাকাল সে। ‘ভাগো এখান থেকে, তোমার বন্ধুদের কাছে যাও,’ বলল সে। ‘না হলে এখান থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেব তোমাকে!’

‘যাচ্ছি,’ বলল বিলবো। ‘এলফ আর লেক-টাউনের অধিবাসীদের প্রাপ্যটা পাঠিয়ে দিও।’

‘তা নিয়ে ভাবতে হবে না তোমাকে!

সুতরাং দেয়ালের উপর দিয়ে দড়ি বেয়ে আবার নিচে নেমে এল বিলবো, সম্পূর্ণ শূন্য হাতে। এই বিশাল অভিযানের পর একমাত্র গায়ের বর্মটা ছাড়া আর কিছুই জুটল না তার ভাগ্যে। তার এভাবে চলে যাওয়ায় বামনদের অনেকেই দুঃখ পেল, কিন্তু থোরিনের কথার বিপরীতে যাওয়ার সাহস নেই তাদের।

‘একজন রাজার এমন আচরন করা উচিত নয়, থোরিন,’ নিচ থেকে বললেন গ্যান্ডালফ। ‘আশা করি নিজেকে বদলাতে পারবে তুমি।’

‘তার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না,’ জবাব দিল থোরিন, মনে মনে ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করেছে যে কিভাবে ডেইনের সাহায্যে সম্পদের কোন অংশ না হারিয়েই আর্কেনস্টোনটা পুনরুদ্ধার করা যায়।

‘আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত সময় দিচ্ছি তোমাকে,’ বলল বার্ড। ‘আশা করি তার আগেই আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে তুমি, আর সেটা পেলেই নিজেদের জায়গায় ফিরে যাব আমরা। তার আগ পর্যন্ত আর্কেনস্টোন থাকবে আমাদের কাছেই। তাহলে বিদায়!’

বিলবোকে নিয়ে সবাই ফিরে গেল ক্যাম্পে। ওদিকে তারা চলে যাওয়ার পরেই থোরিন দাঁড়কাকদের সাহায্যে সবকিছু জানিয়ে খবর পাঠাল ডেইনের কাছে, তাড়াতাড়ি আসতে বলল তাকে।

পরদিন কাকভোরে এক গুপ্তচর দৌড়ে এসে ক্যাম্পে ঢুকল। সে জানাল, পাহাড়ের পূব পাশ দিয়ে কয়েকশ বামনের এক বাহিনী আসছে এদিকেই। পৌছে গেছে ডেইন। থোরিনের কাছ থেকে খবর পেয়ে আর দেরি করেনি সে, সারা রাত তার সেনাবাহিনী নিয়ে মার্চ করে অবশেষে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌছে গেছে।

বামনরা সাধারনত উচ্চতায় খাটো হলেও প্রচণ্ড শক্তি ধরে শরীরে, তবে ডেইনের বাহিনীর সদস্যরা এমনকি অন্যান্য বামনদের চাইতেও শক্তিশালী। প্রত্যেকের শরীরে আঁটা রয়েছে ইস্পাতের তৈরি মজবুত বর্ম, পায়ে পেঁচানো এক ধরনের নমনীয় ধাতব মোজা। যুদ্ধক্ষেত্রে দুই হাতে ধরা ভারী কুঠার ব্যবহার করে তারা। সেই সাথে পিঠে ঝোলানো খাট তলোয়ার আর ঢাল, মাথায় লৌহ শিরস্ত্রান আর কঠোর চেহারায় সত্যিই ভয়ঙ্কর লাগছে তাদের দেখতে।

ট্রাম্পেট বেজে উঠল যুদ্ধের সুরে, অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হল ক্যাম্পের মানুষ আর এলফরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই নদীর ওপারে এসে থামল বামনদের বাহিনীটা। তার ভেতর থেকে কয়েকজন আলাদা হয়ে নদী পার হয়ে চলে আসল এপারে, সবাই এক হাতের তালু উপরে তুলে রেখেছে সন্ধির ভঙ্গিতে। বার্ড আর বিলবো এগিয়ে গেল তাদের সাথে কথা বলতে।

‘ডেইনের প্রতিনিধি আমরা,’ বার্ডের প্রশ্নের জবাবে বলল তারা। ‘ওই পাহাড়ে আমাদের স্বজাতি বামনদের সাথে দেখা করতে চাই, আমাদের কাছে সাহায্যের আবেদন পাঠিয়েছে তারা। কিন্তু তোমরা কারা? পাহাড়ের চারদিক অবরোধ করে বসে আছ কেন?’ কথাগুলো ভদ্র সুরেই বলল তারা, তবে প্রচ্ছন্ন হুমকির ভাবটা চাপা থাকল না তাতে। তাদের কথার ভেতর যে অর্থটা লুকিয়ে আছে তা অনেকটা এইরকমঃ “এখান থেকে ভাগো, না হলে যুদ্ধ কর আমাদের সাথে!’

তবে বার্ডকে কোনভাবেই পথ ছাড়তে রাজি করাতে পারল না বামনরা। নিজের পরিকল্পনায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সে, সোনার ভাগ না নিয়ে এক পাও নড়তে রাজি নয়। থোরিনের কথায় বিশ্বাস করতে পারেনি সে, বুঝতে পারছে যে এই বিশাল সেনাবাহিনীর সহায়তা পেলে সাথে সাথে চোখ উল্টে নেবে থোরিন। বামনদের সাথে প্রচুর পরিমাণে রসদ আছে, সেই সাথে অস্ত্রশস্ত্রেরও কমতি নেই। কয়েক সপ্তাহ টিকে থাকতে পারবে ওরা এগুলোর সাহায্যে, আর তারপর যে আরও বামন এসে হাজির হবে না তার নিশ্চয়তা কি? প্রধান ফটক ছাড়াও পাহাড়ে প্রবেশের আরও অনেক রাস্তা আছে। এখন সেগুলো বন্ধ হয়ে থাকলেও একটু সময় পেলেই সেগুলো খুলে ফেলতে পারবে বামনরা, তখন আর তাদের পাহাড়ে আঁটকে রাখা সম্ভব হবে না।

বামনরাও ঠিক এমনই পরিকল্পনা করেই এসেছে। গতকাল সারা রাত দাঁড়কাকদের সাহায্যে সংবাদ বিনিময় করেছে ডেইন আর থোরিন, যুদ্ধের ছকও এঁটে ফেলেছে তারা। কিন্তু বার্ডের কাছে হার মানতে হওয়ায় রেগেমেগে ফিরে গেল আলোচনার উদ্দেশ্যে আসা বামনরা। ওদিকে এলফদের ক্যাম্পেও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে, যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে সবাই।

‘খোলা জায়গায় যুদ্ধ করে আমাদের সাথে পারবে না বামনরা,’ বলল বার্ড। ‘ওরা পাহাড়ের নিচে গুহার ভেতর যুদ্ধে অভ্যস্ত, এমন খোলা পরিবেশে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই ওদের। আমাদের তীরন্দাজরা পাথরের আড়ালে অবস্থান নিয়েছে ওদের বাম পাশটায়। ওদের তীর ছুঁড়তে নির্দেশ দিচ্ছি আমি। এতদিন শুনে এসেছি বামনদের তৈরি বর্ম নাকি খুব শক্তিশালী, আজ তার পরীক্ষা হয়ে যাবে!’

কিন্তু এলফ রাজা বাঁধা দিলেন তাকে। ‘আমার মনে হয় আমাদের অপেক্ষা করা উচিত,’ বললেন তিনি। ‘সংখ্যায় অনেক বেশি আমরা, যুদ্ধে আমাদেরই জয় নিশ্চিত। কিন্তু শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চাই আমি।’

কিন্তু তার ধৈর্য বামনদের মাঝে অনুপস্থিত। আর্কেনস্টোন যে শত্রুর হাতে পড়েছে এ খবর জানে তারা, ক্রোধে ফেটে পড়ছে সবাই। হঠাৎ করে কোন সংকেত ছাড়াই এক যোগে সামনে মার্চ করতে শুরু করল বামন সৈন্যরা। যে কোন মূহুর্তে শুরু হবে সংঘর্ষ!

কিন্তু ঠিক তখনই চারদিক কালো করে অন্ধকার নেমে আসল হঠাৎ, ঝড়ের মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। নিঃসঙ্গ পর্বতের মেঘে ঢাকা চুড়ায় ঝলকে উঠল বিদ্যুতের নীল শিখা। ওদিকে ঝোড়ো মেঘের ঠিক নিচেই ততোধিক কালো এক টুকরো মেঘ দেখা গেল, উত্তর দিক থেকে দ্রুত এগিয়ে আসছে সেটা।

‘থামো!’ বজ্রনির্ঘোষের মত চারদিকের পাহাড়ের গায়ে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলল গ্যান্ডালফের কণ্ঠস্বর। কখন যেন সামনে এগিয়ে এসেছেন তিনি, দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছেন যুদ্ধংদেহী দুই সেনাবাহিনীর মাঝখানে। ‘থামো!’ আবার চিৎকার করে বলে উঠলেন তিনি, হাতের লাঠিটার মাথা থেকে বজ্রের মতই নীল একটা আলো জ্বলে উঠল।

‘ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছে তোমাদের সামনে! আমি যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক দ্রুত! তাকিয়ে দেখ, ডেইন, মোরিয়ার খনিতে যার বাবাকে হত্যা করেছিলে তুমি, সেই বোলগ আসছে তার বিশাল গবলিন বাহিনী নিয়ে! হিংস্র ওয়ার্গদের পিঠে চড়ে আসছে ওরা, ওই দেখ, লক্ষ লক্ষ বাদুড় উড়ছে ওদের মাথার উপর! নিজেদের ভেতর যুদ্ধের সময় নয় এখন, গবলিনদের বিরুদ্ধে জিততে হলে একসাথে লড়াই করতে হবে আমাদের!’

কাজ হল তার কথায়। প্রথমে কিছুটা অনিশ্চয়তা কাজ করল বামন আর এলফদের মাঝে, তবে খুব দ্রুত তা কাটিয়ে উঠল সবাই। গবলিনরা সবারই শত্রু, সুতরাং দ্রুত নিজের করনীয় ঠিক করে নিল ডেইন। একটু আগে যে দুই বাহিনী নিজেদের মাঝে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তৃতীয় শত্রুর আগমনে সন্ধিতে চুক্তিবদ্ধ হল তারা।

এবার এমন এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হল যেমনটা কেউ দেখেনি আগে, ইতিহাসে “পাঁচ বাহিনীর যুদ্ধ” নামে পরিচিত হয়েছিল তা। এক পক্ষে গবলিন আর তাদের সঙ্গী ওয়ার্গদের বিশাল বাহিনী, আরেক পক্ষে এলফ, মানুষ আর বামনরা।

এই যুদ্ধে গবলিনদের আগমন কিভাবে ঘটল তা জানতে হলে একটু পিছনে ফিরে যেতে হবে আমাদের। কুয়াশা পর্বতমালায় অভিযাত্রীদের হাতে গবলিন নেতার মৃত্যুর পরেই বামনদের বিরুদ্ধে নতুন করে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে গবলিনদের মাঝে। পুরো পাহাড় আর তার আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গবলিন বসতিগুলো একত্রিত হয়ে ওঠে, গোপনে যুদ্ধের রসদ আর প্রস্তুতি নিতে শুরু করে তারা। চূড়ান্ত এক যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিটা এলাকায় গবলিনদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার শপথ নেয় তারা, তাদের নেতৃত্ব প্রদান করা হয় গবলিন নেতার ছেলে বোলগকে। গবলিনদের রাজধানী গুন্ডাবাডকে বেছে নেয়া হয় সেনাবাহিনীর প্রধান অবস্থান হিসেবে।

গুন্ডাবাডে জড়ো হতে থাকে গবলিনরা, এবং স্মগের মৃত্যুসংবাদও শুনতে পায় তারা। ঠিক হয় চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য এটাই সর্বোৎকৃষ্ট সময়। পাহাড়ের নিচে গুহায় তাদের আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে আসে গবলিন সেনাবাহিনী, যাত্রা করে নিঃসঙ্গ পর্বতের উদ্দেশ্যে। এলফ, মানুষ আর বামনরা যে এলাকাতেই জড়ো হয়েছে সে খবর আগেই জানতে পেরেছিল তারা। আর কেউ তাদের আসার কথা জানতে না পারলেও গ্যান্ডালফ কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু এমনকি তিনিও তাদের এই অতর্কিত আক্রমণের কথা ধারনা করতে পারেননি।

এলফ রাজা, বার্ড আর ডেইনের মিলিত পরামর্শে ঠিক হল পাহাড়ের সামনে খোলা উপত্যকায় নামিয়ে আনা হবে গবলিনদের, তারপর আক্রমণ করা হবে দুই পাশ থেকে। গবলিনদের সংখ্যা সম্পর্কে কিছু জানা নেই, ফলে যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে কিছুটা অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু এখন এর চেয়ে ভাল কোন উপায় জানা নেই কারও।

ঝড়ের মেঘ কেটে গেল একটু পরেই, কিন্তু আকাশ কাল করে উড়ে আসা বাদুড়ের দল এগিয়ে এল আরও কাছে। সূর্যের আলো ঢেকে গেল তাদের ছায়ায়, আবছা অন্ধকার নেমে এল পুরো উপত্যকায়।

‘পাহাড়ের উত্তরে অবস্থান নাও সবাই!’ চিৎকার করে নিজের বাহিনীকে নির্দেশ দিল বার্ড। সে এবং এলফ রাজার নির্দেশ অনুযায়ী পাহাড়ের উত্তরে অবস্থান নিল মানুষ আর বামনরা, আর দক্ষিণে রইল এলফ সেনাদল। বার্ড তার সাথে দক্ষ কিছু মানুষ এবং এলফকে নিয়ে উঠে গেল পাহাড়ের চুড়ায়। দেখা গেল, পাহাড়ের উল্টোদিকের ঢাল কাল হয়ে গেছে ক্রম অগ্রসরমান গবলিন বাহিনীর কারণে, তাদের মাথার উপর উড়ছে বাদুড়ের দল। বার্ডের দল থেকে কয়েকজন এগিয়ে গেল সামনে, কিন্তু ওয়ার্গের পিঠে বসা গবলিনদের হাতে সাথে সাথে মারা পড়ল তারা। তাড়াতাড়ি বাকিদের নিয়ে নিচে নেমে এল বার্ড।

বার্ডের পিছু হটা দেখতে পেয়েছে গবলিনরা, আক্রোশে গর্জন করে উঠে পাহাড় পেরিয়ে নিচে নেমে এল তাদের সৈন্যরা। নেকড়ে আর গবলিনদের মিলিত উন্মাদ যুদ্ধ-হুংকারে ভারী হয়ে উঠল পাহাড়ের বাতাস।

এবার শুরু হল ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। প্রথমেই এলফ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল গবলিনদের উপর, গবলিনদের সাথে বহু পুরনো শত্রুতা তাদের। এলফদের শক্তিশালী বর্শা আর তলোয়ারগুলো ঝলসে উঠল এক অপার্থিব আলোয়, বহু দিন পর তাদের চিহ্নিত শত্রুর সংস্পর্শে আসার ফল। সেই সাথে গবলিনদের উপর আকাশ কালো করে নেমে এল তীরের মেঘ, তাদের পেছনে পেছনে এল বর্শধারী সৈনিকরা। মাটি কাল হয়ে গেল গবলিনদের রক্তে। তারপর যখন সবেমাত্র অতর্কিত আক্রমণের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে সংগঠিত হতে শুরু করেছে গবলিনরা, ঠিক তখনই উপত্যকার অপর পাশ থেকে ভেসে এল বামনদের রক্ত হীম করা হুংকার। “মোরিয়া! ডেইন!” বলে হুংকার ছেড়ে ডেইনের বামন বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল গবলিনদের উপর, তাদের সাথে এল লেক-টাউনের যোদ্ধারা। দুই দিক থেকে তিন বাহিনীর মিলিত আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ল গবলিনরা। নদী পার হয়ে পালাতে শুরু করল কেউ কেউ, বাকিরা মারা পড়তে লাগল এলফ, মানুষ আর বামনদের আক্রমণে। মনে হতে লাগল গবলিনদের বিরুদ্ধে বিজয় সমাগত।

কিন্তু তারপরেই মোড় ঘুরে গেল যুদ্ধের। দুই দিক থেকে হামলার শিকার হয়ে অন্য বুদ্ধি খাটিয়েছে গবলিনরা, পিছু হটে পাহাড়ের উপর উঠে গেছে তারা, তারপর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে উপর থেকে হামলা চালিয়েছে পাহাড়ের দুই পাশে অবস্থানরত এলফ, বামন আর মানুষদের উপর। এই হামলার মুখে টিকতে পারল না তারা, দারুণ ক্ষয়ক্ষতির বোঝা নিয়ে পিছু হটতে শুরু করল একটু পরেই।

এবার এক দল গবলিন দেহরক্ষীর আড়ালে সুরক্ষিত হয়ে পাহাড় থেকে উপত্যকায় নেমে এল স্বয়ং বোলগ। ওদিকে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে, আকাশে উড়ে বেড়ানো বাদুড়গুলো তাতে আরও অন্ধকার তৈরি করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকা আহতদের উপর নেমে আসছে তারা, রক্তপান করছে তাদের ক্ষতস্থান থেকে। নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বার্ড আর এলফদের বাহিনী, কিন্তু ধীরে ধীরে পিছু হটতে হচ্ছে তাদের।

হঠাৎ পাহাড়ের ভেতর থেকে ট্রাম্পেটের তীক্ষ্ম আওয়াজ ভেসে এল। থোরিনের কথা ভুলেই গিয়েছিল সবাই, এবার তীব্র গর্জন ছেড়ে গুহা থেকে বেরিয়ে এল থোরিন আর তার ছোট্ট বাহিনীটা। প্রধান ফটকের সামনে গড়ে তোলা ফটকটা ভেঙে ফেলা হয়েছে একটু আগেই, এবার সেই দরজা দিয়ে বের হয়ে গবলিনদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। গোধূলীর ম্লান আলোয় ঝলসে উঠল তাদের শরীরের ঝকঝকে বর্ম আর হাতের অস্ত্রগুলো। নেকড়ে আর গবলিনরা একের পর ধরাশায়ী হতে লাগল তাদের কুঠারের আঘাতে, মনে হল যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তারা!

‘আমার সাথে এসো সবাই!’ চিৎকার করে উঠল থোরিন, তার ডাকে সাড়া দিয়ে আবার সংগঠিত হল এলোমেলো হয়ে যাওয়া বামন যোদ্ধারা। আরও একবার গবলিনদের উপর হামলা চালানো হল, সরাসরি উদ্যত কুঠার হাতে বোলগের দিকে তেড়ে গেল থোরিন। কিন্তু বোলগের দেহরক্ষীদের ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে পারল না তারা। গবলিনদের সাথে সাথে বিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতিও কম হয়নি, ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে তাদের লাশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল বিপজ্জনক ভাবে কমে এসেছে বামন আর এলফদের সংখ্যা, চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে তাদের গবলিনরা। নতুন উদ্যমে বোলগের দেহরক্ষী গবলিনগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের উপর, মনে হল এবারই বোধহয় হার মানতে হল বামনদের!

তবে পুরো যুদ্ধে বিলবোর ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। যুদ্ধের শুরুতেই আংটিটা পরে নিয়েছিল সে, অদৃশ্য হয়ে সরে গিয়েছিল নিরাপদ দূরত্বে। তাছাড়া বোধহয় কিছু করারও ছিল না তার। র‍্যাভেনহিলে এলফ শিবিরে বসে পুরো যুদ্ধটাই দেখছিল সে, তার সাথে ছিলেন গ্যান্ডালফ। সারাক্ষণ কি যেন ভাবছিলেন, হয়তো জাদুর সাহায্যে কিভাবে এলফদের সাহায্য করা যায় তাই ঘুরছিল তার মাথায়।

‘যুদ্ধের বেশি বাকি আছে বলে মনে হচ্ছে না,’ ভাবল বিলবো। গবলিনদের আক্রমণের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না বামনরা, সবাই মারা পড়ব আমরা। এতদূর এসে কিনা শেষ পর্যন্ত কপালে এই লেখা ছিল!’ অনেক যুদ্ধের গল্প শুনেছে সে, সব জায়গাতেই বলা ছিল যে পরাজয়ের মাঝেও সম্মান আছে। কিন্তু এখন তা মনে হচ্ছে না, তিক্ত মনে ভাবল সে।

দিগন্তরেখার ওপারে ডুবতে বসেছে সূর্যটা। অস্তগামী সূর্যের লাল রশ্মি এসে চোখে লাগতে সেদিকে তাকাল সে। হঠাৎ কি যেন চোখে পড়ল তার! লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে, দেখতে পাচ্ছে দূরে এক দল ছায়া উড়ে আসছে আকাশপথে!

‘ঈগলরা এসে গেছে!’ চেঁচিয়ে উঠল বিলবো। ‘ঈগলরা এসে গেছে!’

ভুল দেখেনি বিলবো। তার চিৎকারের প্রায় সাথে সাথেই মাথার উপর উড়ে এল বিশাল পাহাড়ী ঈগলের ঝাঁক, সারি বেঁধে নিচের যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে নেমে আসছে তারা। অগুনতি তারা সংখ্যায়, মনে হচ্ছে যেন শেষ নেই তাদের। বিলবোর চিৎকার নিচের উপত্যকায় যুদ্ধরত অনেকেরই কানে গেল, চকিত দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকাল তারা।

ঠিক সেই মূহুর্তে উপর থেকে একটা পাথরের টুকরো এসে আঘাত করল তার শিরস্ত্রাণে, শক্ত আবরণটা না থাকলে সেই মূহুর্তে মাথা ফেটে যেত তার। প্রাণে বেঁচে গেলেও জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *