টুকরো চিন্তা

“আমি সরকারী দলের লোক, আমার দল এখনও ক্ষমতায়”

আরও একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশে। কয়েক মাস আগেই দেশ ছেড়েছি, তাই ভোটের উত্তেজনা বা আমেজ কোনোটাই সচক্ষে দেখার সুযোগ হয়নি এবার। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই অভাব অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পেরেছি। বন্ধু তালিকার অনেকেই তাদের ভোট দেয়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন, নীল দাগ দেয়া বুড়ো আঙুলের ছবিতে ছেয়ে গেছে মুখবইয়ের পৃষ্ঠা। কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে জনগনের অভিব্যক্তিটা ঠিক কেমন দাড়িয়েছে এই নির্বাচনে?

এক বন্ধু দেখলাম লিখেছেন, তার মাকে বাধ্য করা হয়েছে একটি বিশেষ দলকে ভোট দিতে। আরও কয়েকজন একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। নির্বাচন কেন্দ্রের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভোটাররা, যারা নিজদের নাম যদিওবা বলতে পারছে, কিন্তু পিতার নাম জিজ্ঞেস করলেই থমকে যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছে জাল ভোট দেয়ার জন্য। আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম বগুড়ার এক আসনের বিতর্কিত এক প্রার্থীকে পিটিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। তাকে যারা পেটাচ্ছিল তাদের মধ্যে একজনকে বলতেও শোনা গেল, আমি সরকারী দলের লোক। আমার দল এখনও ক্ষমতায়। বেশিরভাগ কেন্দ্রে বিএনপির কোনো পোলিং এজেন্টকে দেখা যায়নি। এই যদি হয় দেশের অবস্থা, তাহলে কি এটা ধরে নেয়াই যুক্তিযুক্ত নয় যে এটা নির্বাচন নামের সাজানো একটা নাটক ছাড়া আর কিছুই ছিল না?

শেষ পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী বিএনপি সব মিলিয়ে আটটা আসন পেয়েছে। ২৯৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৫৯ টা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে জাতীয় পার্টি, ২০ টা। বিএনপি পেয়েছে ৭ টা, আর দুধভাতেরা পেয়েছে বাকিগুলো। একটা আসনে নির্বাচন হয়নি।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৃতীয় বারের মতো আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার রাস্তা সুগম হলো। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দল টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার নজির দেখাচ্ছে। গত মেয়াদে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেটা তারা অনেক অংশে করেও দেখিয়েছে। কিন্তু তারপর নতুন কোনো অস্ত্র আর ছিল না তাদের হাতে, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ছাড়া। কিন্তু এটা যে যে কোনো সরকারেরই দায়িত্ব, এটা তারাও যেমন ভুলে গেছে, তেমন নাগরিকরাও মনে রাখেনি। দুইবার ক্ষমতায় থাকার পর তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার রাস্তা অনেকটাই প্রশস্ত হয়ে যায়, এজন্য হয়তো তারাও বেশি কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।

এই বছরেই ঘটে যাওয়া দুটো আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতি জনতার ক্ষোভ বেশ ভালই প্রকাশ পেয়েছিল। তারপরেও এমন সার্বিক জয়ের পেছনে কারণটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই অনুমান করা যায়। আওয়ামী লীগ এখন আর জনগনের কাছে দায়বদ্ধ থাকার প্রয়োজন বোধ করছে না। নিজেদের “স্বৈরাচারী” ইমেজ সম্পর্কে তারাও সচেতন, ফলে এখন যা হবে খুললাম খুল্লা – এমনটাই তাদের মনোভাব। চাইলে হয়তো আরও কিছু আসন তারা বিপক্ষ দলকে ছেড়ে দিতে পারত, তাতে নির্বাচনের চেহারাটা কিছুটা হলেও সুষ্ঠু দেখাত। কিন্তু তাদের বোঝা হয়ে গেছে যে যাই করুক না কেন, তাদের ইমেজ তাতে বদলাবে না। তাই এই ব্যবস্থা। তার চাইতে শরীক দল জাতীয় পার্টিকেই প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রাখা যাক। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের যে ভূমিকা তা মুছে ফেলতে চাইলে এটাই তো সর্বোত্তম উপায়, তাই না?

বাংলাদেশের এখনও অনেক দূরের পথ পাড়ি দেয়া বাকি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এই সাতচল্লিশ বছরে দেশটা খুব কমই আলোর মুখ দেখতে পেয়েছে। যতটা পথ এসেছে, নেহাতই ভাগ্যের জোরে বলা যায়। কারণ দেশের কান্ডারীর ভূমিকায় এখন পর্যন্ত যারা এসেছে তাদের তেমন কারও মধ্যেই সদিচ্ছা দেখা যায়নি – সবাই নিজের আখের গোছাতেই ব্বাংযস্লাত ছিল। দেশের মানুষের কাছে এখন তাই একটা পথই খোলা-ভাগ্যের কাছে প্রার্থনা করা যেন সদিচ্ছা নামক বস্তুটির উদয় দেখা যায় শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *