ফিচার

ভারত ভ্রমণের গল্পঃ ঢাকা থেকে মানালি

ঘুরতে ভীষণ ভাল লাগে, দেশের ভেতর বেশ কয়েকটা জায়গা ঘুরেও ফেলেছি ইতোমধ্যে। সময় আর টাকাপয়সা পর্যাপ্ত হাতে থাকলেই বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু দেশের বাইরে যাওয়া হয়নি কখনো। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লোজ বড় ভাই শুভদা যখন ইন্ডিয়া ট্যুরের প্রস্তাব দিলেন তখন এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু সাথে যাওয়ার মতো আর কাউকে পাওয়া গেল না। তাই শেষ পর্যন্ত আমরা দুজনই প্ল্যান করলাম সব কিছুর।
দেশের বাইরে এই প্রথম যাওয়া, ফলে ঝক্কি ঝামেলা অনেক। কোথায় কোথায় যাব সেটাও জানা নেই। দাদার ছুটি মিলল দশ দিনের জন্য। বিস্তর আলোচনার পর ঠিক হলো কোলকাতা হয়ে আগ্রা, দিল্লী, সেখান থেকে মানালি যাওয়া হবে। এই সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম এবার।
 
পাসপোর্ট আগেই করানো ছিল। এবার ভিসার পালা। দাদার ভিসা আগেই করানো ছিল। ঠিক করলাম টিকিট না করে ইটোকেন করাব, কারণ যাওয়ার ডেট তখনও ঠিক হয়নি। নিজে দুই দিন চেষ্টা করে না পেরে শেষে এক শ্যামলী থেকে এক দালাল ধরলাম। তাকে ১৬০০ টাকা দিয়ে ডলার এনডোর্স আর ইটোকেনের ডেট নিলাম। ভিসা পাওয়া গেল ছয় মাসের জন্য। প্রাথমিক বাঁধাটা গেল!
 
১২ এপ্রিল রাতে ঢাকা থেকে সোহাগের নন এ সি বাসে রওনা দিলাম যশোর। দাদা আগেই চলে এসেছিল। ১৩ তারিখ সকালে যশোর থেকে বেনাপোলের গাড়িতে উঠলাম। বর্ডারে পরিচিত এক এজেন্ট ছিল, তাকে দুইশ টাকা দিয়ে কাগজপত্র রেডি করিয়ে বর্ডার ক্রস করলাম। ট্রাভেল ফি দিতে হলো পার হেড আরও পাঁচ শ টাকা করে। কোন ঝামেলাই হয়নি।
 
এই পাশে এসে টাকা ভাঙিয়ে রূপি করে নিলাম বর্ডারের সাথেই এক মানি এক্সচেঞ্জের কাছ থেকে। হাজারে আট শ’র কিছু বেশি রূপি করে পাওয়া গেল। সব টাকা না ভাঙিয়ে এক শ ডলারের একটা নোট রেখে দেয়া হলো। আরেক দোকান থেকে কিনলাম একটা ভোডাফোন সিম। দিল্লীর ওইদিক থেকে নাকি ভোডাফোনের নেটওয়ার্ক ভাল। অল ইন্ডিয়া কাভারেজ পাওয়ার জন্য কিছু এক্সট্রা খরচ করতে হলো, সব মিলিয়ে নিল ৩৬০ টাকা, মানে রূপি। এখন থেকে সুবিধার জন্য রূপিকে টাকাই লিখব।
 
তারপর সেখান থেকে অটোতে করে রওনা দিলাম বনগা রেল স্টেশনের দিকে। ভারতের প্রধান চলাচলের মাধ্যম হচ্ছে ট্রেন। বনগা থেকে শিয়ালদার ভাড়া পার হেড ৩০ টাকা। বনগায় কিছু ক্ষণ পরপর লোকাল ট্রেন আসে, শিয়ালদার উদ্দেশ্যে যায় যেগুলো। তবে আমরা নেমে গেলাম দমদম, শিয়ালদার ঘন্টাখানেক আগে। এখানে দাদার এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেমে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করলাম। বিকেলে বের হলাম দমদম শহর ঘুরে দেখতে। বেশি বড় না, বাংলাদেশের যে কোন জেলা শহরের মতোই। গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে পায়ে হেঁটেই ঘুরলাম।
 
রাত নয়টার দিকে রওনা হলাম শিয়ালদার উদ্দেশ্যে। শিয়ালদা থেকে আগ্রার ট্রেন, আজমীর এক্সপ্রেসের টিকেট আগেই কাটা ছিল। স্লিপার ক্লাসের টিকিট ৬৭৫ টাকা, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে দুটো টিকেট প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশী টাকা লেগে যায়। যাই হোক, শিয়ালদা নেমে রাতে খাওয়ার জন্য কিছু খাবার কিনলাম। ট্রেন আসল এগারোটার দিকে। উঠে পড়লাম। স্লিপার ক্লাস মানে লম্বা একটা সিট, যাতে শোয়া বসা সবই চলতে পারে।


ট্রেনে পরিচয় হলো এক পিচ্চির সাথে। নাম দয়াল সিং!


ট্রেনের সবচেয়ে কম দামের টিকিট। ট্রেনের ভেতর খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে ভারতের খাবার আমাদের একেবারেই ভাল লাগেনি। যাই হোক, এই ট্রেন আমাদের পর দিন ১৪ এপ্রিল রাত দশটায় নিয়ে নামিয়ে দিল আগ্রা ক্যান্টনমেন্ট রেল স্টেশনে।
 
ট্রেন থেকে নেমে একটা অটো নিলাম। অটো ড্রাইভারের কাছে জিজ্ঞেস করে একটা হোটেলে উঠলাম। এসি ডাবল রুম, এক হাজার টাকা ভাড়া। রাতের খাবার রুমে দিয়ে গেল, ভাত আর বুটের ডাল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি কি একটা সবজি। খেতে পারলাম না, স্রেফ ডাল দিয়েই খাওয়ার পালা শেষ করলাম। প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে আছি। বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুম।
 
১৫ এপ্রিল। সকালে উঠে একটা অটো ভাড়া করলাম। ঠিক হলো তাজ মহল আর আগ্রা ফোর্ট দেখাবে, সেই সাথে আর কোথাও যেতে চাইলে তাও নিয়ে যাবে। ভাড়া চাইল চার শ রূপি। তারপর চললাম সেই কিংবদন্তীর তাজ মহল দেখতে।

তাজ মহলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা
 

তাজ মহলের সামনে এসে দেখলাম, দেয়ালগুলো এমনভাবে তৈরি যে কোনভাবেই বাইরে থেকে ভিতরের দৃশ্য দেখার উপায় নেই। আঁকাবাঁকা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ, ভেতরে যাওয়ার জন্য। বিদেশীদের জন্য নির্ধারিত লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট করলাম। টিকিটের দাম পঁয়ত্রিশ টাকা, কিন্তু বিদেশীদের জন্য ট্রাভেল ট্যাক্স দিতে হয় অতিরিক্ত পাচশ টাকা। টিকিটের সাথে সান্তনা পুরষ্কার হিসেবে শু কাভার আর একটা আধ লিটারের পানির বোতল ফ্রি।


 
বেশ কয়েকজন গাইড কানের পাশে মাছির মতো ভনভন করছিল। তাদের মধ্য থেকে একজনকে তিন শ টাকায় ঠিক করা হলো। এবার সে ভীড়ের মধ্য দিয়ে লাইনে দাঁড়ানো ছাড়াই সরাসরি আমাদের নিয়ে হাজির হলো মূল গেটে। এটা কি তার যোগসাজস ছিল কি না বুঝতে পারলাম না। যাই হোক, তার বদৌলতে লাইনে না দাঁড়িয়েই গেট দিয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। বেশ কিছুক্ষণ ছবিটবি তোলার পর চলে গেলাম তাজ মহলের প্রধান প্রাঙ্গণে। সেখানে আরও কিছু ছবি তোলা হলো, আহা উঁহু করা হলো। তারপর তাজ মহলের ভেতরের অংশ দেখে টেখে বেরিয়ে এলাম অন্য দিক দিয়ে। অটোওয়ালা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বাইরে। তাকে নিয়ে এবার রওনা দিলাম আগ্রা ফোর্টের উদ্দেশ্যে।

 
রাস্তায় একটা রেস্টুরেন্টে থেমে খেয়ে নিলাম। নন ভেজ থালি নিলাম, আড়াই শ টাকা খরচ পড়ে গেল। তবে এই একটা জায়গাতেই সম্ভবত খেয়ে তৃপ্তি পেয়েছি।
আগ্রা ফোর্টে ঢুকতে অবশ্য স্রেফ পঁয়ত্রিশ টাকার টিকিটই লেগেছিল, কারণ ট্রাভেল ট্যাক্স আগেই দেয়া আছে। টিকিট নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সত্যি কথা বলতে তাজ মহলের চাইতে আগ্রা ফোর্টই বেশি ভাল লেগেছে আমার কাছে। মুঘলরা যে কত অবিশ্বাস্য রকমের জৌলুসে বাস করত তার সামান্য কিছু প্রমাণ এখানে দেখা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে দুর্গের অর্ধেকটার মতোই সংরক্ষিত, ট্যুরিস্টদের প্রবেশের অধিকার নেই। ফলে পুরোপুরি দেখা হলো না।

 

আগ্রা ফোর্টের ভেতরে।
 


কেল্লা থেকে বেরিয়ে এলাম ঘন্টা দুয়েক পর। বিকেল হয়ে গেছে, হোটেলে ফিরতে হবে। অটো নিয়ে চলে এলাম হোটেলে। ব্যাগ নিয়ে বিল মিটিয়ে বের হতে হতে সন্ধ্যা ছয়টা বাজল। অটো ওয়ালার কাছে জানা গেল দিল্লীর বাস ছাড়বে সাতটায়। চলে গেলাম বাস স্টেশনে। সাত শ টাকা দিয়ে দুটো টিকেট কেনা হলো। রাত এগারোটার দিকে নামলাম দিল্লিতে।

 
ঠিক করেছিলাম দিল্লী ফেরার পথে দেখব, এখন সরাসরি উঠে পড়ব মানালির বাসে। তাহলে পরদিন সকালেই মানালি পৌছে যাওয়া যাবে। কিন্তু বাস স্টেশনে গিয়ে জানা গেল যে রাত সাড়ে দশটায় শেষ বাস ছেড়ে গেছে, আজ রাতে আর কোন বাস নেই। কি আর করা! অগত্যা আঠাশ শো টাকা দিয়ে পরের দিনের দুটো টিকিট করে নিয়ে চলে গেলাম পাহাড়গঞ্জ। এখানে একটা হোটেলে উঠলাম। ডিনারসহ ভাড়া পড়ল সতেরো শ টাকা।
 
পর দিন, অর্থাৎ ১৬ এপ্রিল সকালে উঠে বের হলাম দিল্লী ঘুরতে। কিন্তু প্রচণ্ড গরম। অটো নিয়ে কোন মতে ইন্ডিয়া গেট দেখে আসলাম। তারপরে ফিরে আসলাম হোটেলে। সন্ধ্যা সাতটায় বাসের সময়। বিকেলের দিকে একটা অটো নিয়ে চলে গেলাম নির্ধারিত জায়গায়। বাস এসে দাঁড়াল ঠিকই, কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ছাড়ছিল না। সেই বাস ছাড়ল রাত সাড়ে দশটায়। শুনলাম এক যাত্রী নাকি বারবার ফোন দিয়ে বাস আটকে রাখছিল। সে এসে পৌছানোর পর এক চোট ঝাড়ি খেল ড্রাইভার আর যাত্রীদের কাছে। অবশেষে যাত্রা শুরু হলো।
 
রাতে এক হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে বাস থেমেছিল। সেখানে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। ভাত আর পনির দিয়ে রান্না করা বুটের ডাল। দুজনের বিল পড়ে গেল চার শ টাকা, তাও। দুই চামচ খেয়েই বমি আসছিল। হাইওয়ে রেস্টুরেন্টগুলো সব ভেজ। এক টুকরো মুরগির মাংসও যদি কেউ এনে দিত তখন, যা চাইত তাই দিয়ে দিতাম!
 
১৭ এপ্রিল। পর দিন সকালে ঘুম ভাঙতেই যে জিনিসটা প্রথম চোখে পড়ল তা হচ্ছে রাস্তার দুই পাশে কুয়াশার চাদর পরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়, আর তার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট বাড়িঘর। হিমাচল প্রদেশ এসে গেছে! আর কয়েক ঘন্টা পরেই মানালি পৌছে যাবে।

মানালি যখন আর কিছু দূরে মাত্র!
 

সকাল এগারোটায় নামলাম মানালি বাস স্টেশনে। সেখান থেকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে গেলাম হোটেল ডে নাইট। ঠিক হলো, এক রাত থাকা, দুই দিনের ব্রেক ফাস্ট আর ডিনার, সেই সাথে গাড়িতে মানালি ঘুরিয়ে দেখানো-এই বাবদ দুজনের জন্য আমরা চার হাজার টাকা দেবো। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে নিচে নেমে এসে নাস্তা করলাম। গাড়ি আগেই দাঁড়িয়ে ছিল, এবার তাতে করে বের হলাম মানালি শহর দেখতে। সাথে সঙ্গী হলো দুই দম্পতি। এক জোড়া এসেছে কোলকাতা থেকে, আরেক জোড়া ছত্তিশগড়।

বন বিহার


মানালি শহরে দেখার জায়গা মূলত বেশি নেই। বিয়াস নদী বয়ে গেছে পাশ দিয়ে, তার সাথে এক টুকরো পার্ক। নাম বন বিহার। ভেতরটা খুব সুন্দর। বিয়াসের পাশে গিয়ে বসলে দারুণ লাগে। পার্কে ঢুকতে হয় বিশ টাকার টিকিট কেটে। কিছুক্ষণ সেখানে সময় কাটালাম, তারপর চলে গেলাম হাডিম্বা টেম্পল দেখতে। মহাভারতে বর্ণীত হিড়িম্বা রাক্ষষীর মন্দির।

হাডিম্বা টেম্পল


সেখানে আরও এক টুকরো পাহাড়ি বাগান আছে। ইচ্ছে করলে ইয়াকের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো যায় কিছুক্ষণ, অথবা টুকটাক কেনাকাটাও করা যায়।
 
এখান থেকে চলে গেলাম আরও এক টেম্পল, শিয়ালি মহাদেবের মন্দির দেখতে। বিকেল হয়ে এল। মন্দির দেখা শেষ হতে গাড়ি আমাদের ফিরিয়ে দিয়ে গেল হোটেলের কাছে। ক্যামেরাটা হাতে ছিল, কিন্তু ব্যাগটা কখন মন্দিরে ফেলে এসেছি মনে নেই। পরে যখন মনে পড়ল তখন আর ফেরার উপায় ছিল না। ঠিক হলো পর দিন সকালে খোঁজ নিতে হবে। সন্ধ্যাবেলা আরও কিছুক্ষণ ঘুরলাম, এক ট্রাভেল এজেন্টের কাছ থেকে দিল্লী টু কোলকাতার দুটো টিকিট করিয়ে নিলাম এক হাজার টাকা দিয়ে। মানালি রাত আটটা নয়টার দিকেই নিঝুম হয়ে যায়। অগত্যা আমরাও ফিরে গেলাম হোটেলে। ডিনার করে নিয়ে রুমে ফিরে ঘুম।
 
১৮ এপ্রিল সকাল নয়টায় আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করার কথা ছিল। সকালবেলা দাদার ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙল, “ওঠো, সাড়ে আটটা বেজে গেল!” তাড়াতাড়ি করে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিচে নেমে এলাম। এবং অবাক হয়ে দেখলাম, সব শুনশান! ম্যানেজার বসে ছিল কাউন্টারে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, দেরি করে ফেলেছি নাকি? লোকজন কি সব ঘুরতে বের হয়ে গেছে? ব্যাটা মুচকি হেসে জবাব দিল, এখন তো সবে সাতটা বাজে!
 
অবাক হয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সত্যিই তাই। চোখ গরম করে দাদার দিকে তাকালাম। শুনলাম, তার মোবাইলের সময় নাকি উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে অবশ্য ভালই হলো। এবার পায়ে হেঁটেই রওনা দিলাম সেই শিয়ালী মহাদেবের মন্দিরের দিকে। উদ্দেশ্য ক্যামেরার ব্যাগ পুনরুদ্ধার করা। আগের দিন পথ মোটামুটি চেনা হয়ে গিয়েছিল, তাই সকালবেলার শুনশান পাহাড়ি শহর দিয়ে হাঁটতে মন্দ লাগল না।
 
মন্দিরে পৌছে ইতিউতি দেখছি কাউকে পাওয়া যায় কি না, এ সময় এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখা গেল এগিয়ে আসতে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, দিদিমা, এখানে গতকাল একটা ব্যাগ ফেলে গেছি। আপনি কি বলতে পারেন, ওটা কেউ পেয়েছে কি না? মহিলা মাথা নেড়ে না বললেন।
 
হতাশ হয়ে অন্য দিকে চলে যেতে যাব, এই সময় পেছন থেকে ডাক দিলেন তিনি। বললেন, কেমন ব্যাগ? বর্ণনা দিলাম। এবার তার মুখে ফোকলা হাসি দেখা গেল। বললেন, আছে আমার কাছে। এসো। বাড়ির ভেতর থেকে ব্যাগ এনে দিলেন কিছুক্ষণ পরেই। খুব ভাল লাগল তার আন্তরিক ব্যবহারে।

শিয়ালী মহাদেব মন্দির

 
তারপর হোটেলে ফিরে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম গুলাবা ক্যাম্প দেখতে। মানালি থেকে গাড়িতে সময় লাগে প্রায় দুই আড়াই ঘণ্টা। সেখানে পৌছে ইচ্ছামতো বরফে গড়াগড়ি করলাম, পাহাড়ে উঠে ছবি তুললাম গাঁদা খানেক।

গুলাবা ভ্যালি।


তারপর রওনা দিলাম সোলাং ভ্যালির উদ্দেশ্যে। গুলাবা হয়েই সর্বোচ্চ পথ রোটাং পাসের দিকে যেতে হয়, কিন্তু আমরা যখন গেছি তখনও রোটাং পাসের পথ খোলেনি। বরফ জমে আটকে আছে। শুনলাম ২০ মে’র আগে খুলবে না। সোলাং ভ্যালিতে তেমন কিছু নেই, প্যারাগ্লাইডিঙের জন্য কিছু দোকান ছাড়া। বত্রিশ শ টাকার বিনিময়ে দশ মিনিটের জন্য প্যারাসুট নিয়ে আকাশে ভেসে বেড়ানো। পকেট হাতড়ে আমাদের মুখ শুকনো হয়ে গেল। এখানে খরচ করে ফেললে আর বাড়ি ফিরতে হবে না। তাই কিছুক্ষণ লোকজনের ওড়াউড়ি দেখে উদাস চেহারায় আবার গাড়ির কাছে ফিরে এলাম। দুপুরে খেয়ে নিয়েছিলাম পথের এক জায়গায়। পঞ্চাশ টাকা প্লেটের নুডলস। বিকেলের দিকে ফিরে এলাম হোটেলে। পথে আরেকটা জায়গা দেখলাম, হিম ভ্যালি নামের একটা থিম পার্ক। যদিও ভেতরে ঢুকে বুঝেছিলাম যে দুইশ টাকার টিকিটই পানিতে গেল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছে মানুষের সৃষ্টি কিছুই নয়।
 
হোটেল থেকে মালপত্র বুঝে নিয়ে চলে গেলাম বাস স্টেশনে, দিল্লীর বাসে উঠে পড়লাম। ফেরার সময় হয়েছে।

লাল কেল্লা।


১৯ এপ্রিল। দিল্লীতে নেমে আর হোটেলে ওঠার ঝামেলায় গেলাম না, কারণ সন্ধ্যা বেলাতেই কোলকাতার ট্রেন ছাড়বে। সারাটা দিন ঘুরলাম ভাল মতো। এবার লাল কেল্লা দেখা হলো। বিশাল এলাকা নিয়ে তৈরি, পায়ে হেঁটে ঘোরা প্রায় অসম্ভব! মুঘল স্থাপত্যের আরও কিছু নিদর্শনের সাক্ষী হয়ে বিকেলবেলা চলে এলাম স্টেশনে। লকার রুমে ব্যাগেজ রেখে গিয়েছিলাম সকালে, এবার সেগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম।
২০ এপ্রিল। পর দিন রাত দশটা নাগাদ শিয়ালদা স্টেশনে নামলাম। তারপর বের হয়ে চলে গেলাম একটা হোটেলে। শুনলাম রুম খালি নেই। আরও কয়েকটা হোটেলেও একই অবস্থা দেখা গেল। কি করা যায়? ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে থাকলাম কোলকাতার রাস্তায়!
বিপদ থেকে উদ্ধারে এগিয়ে এল এক পিচ্চি রিকশাওয়ালা। দাদা, হোটেল পাচ্ছ না? ওঠো আমার রিকশায়। যতক্ষণ হোটেল না পাবে, ঘুরবে। পেয়ে গেলে আমাকে দশ টাকা দিয়ে দিও।
 
তখন আর কিছু বলার সামর্থ্য নেই। সারা দিন জার্নি করে, তার উপর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভয়াবহ টায়ার্ড হয়ে পড়েছি। এবার রিকশায় উঠে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ ঘোরার পর একটা হোটেল পাওয়া গেল ঠিকই, কিন্তু ভাড়া চাইল দুই হাজার টাকা। বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিলাম। আজ ভাগ্য আমাদের সহায় নেই, বোঝা গেছে।
 
পাশের একটা রেস্টুরেন্টে ঠান্ডা চিকেন বিরিয়ানি আর শক্ত হয়ে যাওয়া নান রুটি পাওয়া গেল। তাই দিয়ে ডিনার করে রাত বারোটার দিকে ফিরে এলাম রূমে। টাকা পয়সার হিসেব করতে বসলাম এবার। প্রায় শেষ… হোটেলের ভাড়া দিয়ে হাতে আছে আর সবে দুই শ টাকা! এবার সেই এক শ ডলারের নোটটা কাজে লাগল। পর দিন সকালে সেটা ভাঙিয়ে টুকটাক শপিং করা হলো, তারপর চলে গেলাম শিয়ালদা স্টেশনে। সেখান থেকে একইভাবে বনগা, তারপর অটোতে করে বেনাপল সীমান্তে পৌছানো। তারপর বর্ডার পার হয়ে যশোর। ঘরের ছেলে ঘরে। ২১ এপ্রিল বিকেলে বাংলাদেশে পা রেখেই গুনগুন করে দুই লাইন জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে নিলাম। সাত আট দিন দেশের বাইরে থেকেই আমার এই অবস্থা, বছরের পর বছর থাকতে গেলে কি করতাম!
 
এই ছিল আমাদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত। কোন কিছুই তেমন প্ল্যান করে এগোইনি, যখন যেভাবে মন চেয়েছে ঘুরেছি। গেছি সবচেয়ে সস্তা টিকিটে, কিন্তু উল্টোপাল্টা খরচ করেছি প্রচুর। পার হেড খরচ পড়েছিল সব মিলিয়ে বিশ হাজারের মতো, শপিং বাদ দিয়ে। কিন্তু কেউ যদি চায় এর চাইতে কমে, সাপোজ পনেরোর মধ্যেই ঘুরে আসতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। আমরা মাত্র দুজন হওয়ায় খরচ কিছু বেশি লেগেছে, তিন বা পাঁচ জন হলে আরও কমে আসত।
 
যারা ইন্ডিয়া ঘুরতে যেতে চাইছেন প্রথমবারের মতো তাদের জন্য কিছু টিপস। সব জায়গায় বার্গেন করবেন। এক দাম বললে আরও বেশি করে করবেন। এবং যেখানেই সম্ভব হবে অগ্রীম বুকিং দিয়ে রাখবেন, সেটা হোটেল হোক আর টিকিট হোক। কোলকাতা বাদে ভাতের দাম অন্যান্য জায়গায় বেশি, সবাই রুটি খায়। কিন্তু বাঙালীর পেট কি ভাত ছাড়া মানতে চায়? গরমের মধ্যে গিয়েছিলাম, তাই পানির পেছনেই বোধহয় হাজার খানেক খরচ হয়ে গেছে। রেল স্টেশনগুলোতে খাবার পানির ব্যবস্থা আছে, সেখান থেকে রিফিল করে নিতে পারেন। পাসপোর্ট আর ভিসা সাবধানে রাখবেন, ফটোকপি রাখবেন সাথে। কখনো হারিয়ে গেলে কাজে লাগবে। এই তো। হ্যাপি ট্রাভেলিং!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *